Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাহিত্য  ||  ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ ১৪১৬ •  9th  year  2nd  issue  May-June  2009 পুরনো সংখ্যা
নিবন্ধ : বিশ্বায়িত বিভীষিকা Download PDF version
 

সাহিত্য

বিশ্বায়িত বিভীষিকা

মীজান রহমান

আর ভাল লাগে না দেশের খবর শুনতে। দেশের খবর শব্দটাই এখন আতংক সৃষ্টি করে মনে। ভাগ্যিস আমার বাংলা চ্যানেল নেই। থাকলে হয়ত অন্যদের মত আমিও আঠার মত লেগে থাকতাম টিভির সামনে। সব কাজকর্ম গোল্লায় যেত। লেখাপড়া শিকেয় উঠত। পৃথিবীর অন্য সব ঘটনাতে ঠুলি দিয়ে কেবল দেশের খবরেই ডুবে থাকতাম।

            কিন্তু তবুও আমি শুনি। আমাকে শুনতে হয়। টেলিফোন তুললেই স্বদেশী ভাইবোনদের উদ্বিগ্ন প্রশ্নঃ শুনেছেন মীজানভাই? খবর শুনেছেন চাচা? কি খবর মা, আমি হয়ত নিদ্রা-জড়িত কন্ঠে বলি। সর্বনাশ হয়ে গেছে চাচা, সর্বনাশ হয়ে গেছে। এবার বুঝি দেশটা একেবারেই গোল্লায় চলে গেল। তাই নাকি? এইটে বলার জন্যে এত রাত্রে আমাকে ঘুম থেকে জাগালে মা? দেশ তো আজকে যায়নি গোল্লায়, অনেক আগেই গেছে। নতুন করে আবার যায় কি করে একই জায়গায়। দেশের গোল্লাযাত্রা তো শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার পরপরই। ৭৫ এ সে যাত্রা ষোলকলায় পূর্ণ হয়। মনে নেই বুঝি?

            ওরা বলে পিলখানার মত বর্বরতা বাংলাদেশে আর কোনদিন ঘটেনি। বটেই তো। মুক্তিযুদ্ধের কথা ভুলে গিয়েছ বুঝি? রাজারবাগের পুলিশব্যারাকে যে অবর্ণনীয় ঘটনাগুলো ঘটেছিল সেগুলো বোধহয় মনে নেই তোমাদের। বিবস্ত্র নারীদের ধর্ষণ করবার পর আংটা দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হত কড়িকাঠের সঙ্গে, তারপর ধারালো ছুরি দিয়ে তাদের জীবন্ত শরীর থেকে চামড়া ছাড়িয়ে নেওয়া হত নিদারুণ হর্ষ সহকারে, শোননি বুঝি? এমনকি স্বাধীনতার পরপর প্রকাশ্য ময়দানে, দুনিয়াশুদ্ধ সাংবাদিকদের টিভি ক্যামেরার নাকের ডগায় রাজাকার-সন্দেহে-ধৃত শ্রমিককে বেয়নেট দিয়ে গুঁতিয়ে গুঁতিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, সেটাই বা কম বর্বরতা ছিল নাকি? ওসব তোমাদের মনে নেই বলেই পিলখানাকে মনে হয় অকল্পনীয়। বাংলাদেশের কোন বর্বরতাই এখন আর অকল্পনীয় নয়। সবই পুরনো এবং পরিচিত বর্বরতা। আমরা বড়াই করে বলি, বাঙালি শান্তিপ্রিয়, নিরীহ জাতি। আমরা নিরীহ ঠিকই, তবে ধরা পড়ার পর। ধরা পড়লে আমরা যাকে দেখি তাকেই পায়ে ধরে বাপ ডাকতে শুরু করি। তারপর হাতকড়া খুলে ফেললেই বাঘের বাচ্চা পুনরায় ব্যাঘ্ররূপ  ধারণ করি।

            দেশের অবস্থা গুরুতর তাতে সন্দেহ নেই। অত্যন্ত গুরুতর। তার প্রধান লক্ষণ হল যে বিদেশের স্থানীয় পত্রিকাগুলোতেও বাংলাদেশের খবর বেরুতে শুরু করেছে। প্রথম বা শেষের পাতায় নয়, মাঝের পাতায়, বিবিধ খবরের মাঝখানে। বাংলাদেশ ছোট দেশ নয়, কিন্তু গুরুত্বে ছোট, আন্তর্জাতিক মানমর্যাদায় ছোট, সেই কারণে বিদেশের ছোট কাগজগুলোও বাংলাদেশকে ছোট মনে করে। শুধু ঘটনার গুরুত্বটাকেই তারা খানিক গুরুত্ব দেয়। তাই এদেশের স্থানীয় পত্রিকায় বাংলাদেশের উল্লেখ দেখলেই আমার পিলে কাঁপে। তখনই বুঝি যে অকথ্যরকম খারাপ কিছু ঘটেছে দেশে। যেমন পিলখানার ব্যাপারটা। ঘটনার পর এখানকার পত্রিকায় দুদিন পরপর ছোট করে খবর বেরিয়েছিল। টেলিভিশনে বিডিআরের জোয়ানদের জমায়েত দেখিয়েছিল।

            আধুনিক সভ্য সমাজে জীবহত্যা কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়, সেটা নরহত্যাই হোক আর প্রাণীহত্যাই হোক। জীবনরক্ষা বা জীবনধারণের জন্য যে প্রাণীহত্যা তাকে মেনে নেওয়া যায়, কারণ হাজার হলেও মানুষ তো জীব-জগতেরই অংশ, এবং জীবজগতের ধর্মই হল দুর্বলতর জীবকে হত্যা করে তার মাংস ভক্ষণ করে নিজেদের জীবন রক্ষা করা। কিন্তু যেটা গ্রহণযোগ্য নয় সেটা হল প্রয়োজনাতিরিক্ত হত্যা, সেটা ব্যক্তিগত রোষ-আক্রোশের কারণেই হোক আর ধর্মীয়-সামাজিক বিধানের কারণেই হোক। সেটা অবশ্যই অমানুষিকতা, আমার মতে। কিন্তু অমানুষিকতাকে যদি এক থেকে দশের মাপকাঠিতে বিচার করতে হয় তাহলে সর্বোচ্চ স্থানের দাবি রাখে মতবাদজনিত অমানুষিকতা। বিশেষ করে ধর্মীয় মতবাদ। মধ্যযুগের ইতিহাসে তার ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত। বর্তমান যুগেও দৃষ্টান্তের অভাব নেই। মধ্যপ্রাচ্য, ইজরায়েল আর পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকার খবর তো কারো অজানা নয়। ইরানে সমকামী হবার অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তির গলায় দড়ি লাগিয়ে ক্রেনে ঝুলানো হয়, সেটা বর্বরতা। প্যালেস্টাইন থেকে পাকিস্তান পর্যন্ত মুসলিম দেশগুলোতে অনেক জায়গায় অনার কিলিং নামক এক অবর্ণনীয় বর্বরতার প্রথা এখনো, এই অত্যুন্নত প্রযুক্তির যুগেও, পূর্ণমাত্রায় প্রচলিত। ইনফিডেল বা অবিশ্বাসীর শিরশ্ছেদ করে পুণ্যলাভের আকাঙ্ক্ষা এখনো দূর হয়নি। সবচেয়ে জঘন্য বর্বরতা হল যখন ভিন্ন ধর্মে জন্মলাভ করার দায়ে পুরো একটা পরিবারকে, এমনকি একটা জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার আয়োজন করা হয়। যেমন পাকিস্তান করেছিল ৭১-এ, বাংলাদেশী হিন্দুদের ওপর। যুগোশ্লাভিয়া করেছিল কসভোতে। যেমন মধ্যযুগের ধর্মযুদ্ধের সময় খৃষ্টান বাহিনী করেছিল মুসলমানদের ওপর, এবং মুসলমানরা করেছিল খৃষ্টানদের ওপর।

            প্রাতিষ্ঠানিক বর্বরতার ইতিহাসে ধর্মের পরপরই যার স্থান, আমার মতে, সেটা হল জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদের ধূয়া তুলেই হিটলার আর মুসোলিনী ক্ষমতার তুঙ্গে উঠেছিলেন গত শতাব্দীর ত্রিশ আর চল্লিশ দশকে। এবং সেই ক্ষমতার ধংসলীলাতে ছারখার হয়েছিল সারা ইউরোপ, প্রাণ হারিয়েছিল ষাট লক্ষ ইহুদী, অগণিত সেনাসামন্ত, সর্বহারা হয়েছিল আরো বহু লক্ষ সাধারণ মানুষ। শুধু একটি ধংসাত্মক মতবাদ, একটি কি দুটি উণ্মাদ স্বৈরাচারী শাসক, পুরো একটা সভ্যতাকে ধ্বংস করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। বিড়ম্বনা এই যে জাতীয়তাবাদ এমনই এক বিষাক্ত জিনিস যে আজকে যারা এক জাতির উগ্র জাতীয়তাবাদের শিকার, কাল তারা ক্ষমতা হাতে পেলে অন্য জাতিকে ঠিক একই রকম নিগ্রহ-নির্যাতনের নিগড়জালে আবদ্ধ করতে দ্বিধা করবে না। তার অন্যতম দৃষ্টান্ত হল ইজরায়েল আর প্যালেস্টাইন। আরেকটি দৃষ্টান্ত হল সাবেক রোডেশিয়া আর বর্তমান জিম্বাবুয়ে। সোভিয়েট সাম্রাজ্যের মধ্যাহ্নকালে কি প্রচণ্ড দাপট আর দৃঢ়তার সঙ্গে রাজত্ব করেছিল মস্কোর ক্রেমলিন তা জানতে চাইলে যে-কোন ইউক্রনবাসীকে জিজ্ঞেস করুন। ক্ষমতা আর মতবাদ, দুটির সংমিশ্রন মানবজাতির জন্য কল্যাণকর হয়েছে এমন নজির ইতিহাসে খুব বেশি নেই।

            পিলখানার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর স্বদেশী ভাইবোনদের মুখ থেকে শোনা গেলঃ এমন নৃশংসতার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। তাই নাকি? পৃথিবীর ইতিহাসের কতটুকু জানি আমরা? পৃথিবীর ইতিহাস দূরে থাক নিজের দেশের ইতিহাসই জানি না। হালের বিশ্বায়িত জগতের কোথায় কি হচ্ছে তার খবর রাখি আমরা? রাখিনা। খবর রাখবার সময় আমাদের নেই, স্পৃহারও অভাব। আমাদের সময় কাটে চারপাঁচ ঘন্টা বলিউডের মুভি দেখে, বাংলা চ্যানেলে দেশের খবর দেখে, পরনিন্দা-পরচর্চা করে, এবং ফাঁকে ফাঁকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে। বিদেশী খবরের কাগজ পড়ার অভ্যাস যদি থাকত আপনার বা বিদেশী চ্যানেল খুলে দেশবিদেশের খবর জানবার, তাহলে বুঝতেন পিলখানার বীরপুরুষগণ নৃশংসতার পাল্লায় চ্যাম্পিয়ান হতে পারবে কিনা সন্দেহ। সারিয়েভোর কথা মনে আছে আপনার? জোয়ান তাগড়া ছেলেগুলোকে বাড়ি থেকে তুলে এনে দাঁড় করানো হত এক জায়গায়। তারপর তাদের হাতে কোদাল দিয়ে হুকুম করা হতঃ খোঁড়, গর্ত খোঁড়। গর্ত খোঁড়া হয়ে গেলে বলা হতঃ ঘাড়ের পেছনে দুহাত একসাথে করে দাঁড়াও। তারা দাঁড়াতো। দাঁড়াবার পর পাষণ্ডগুলো ফটাফট গুলি চালিয়ে ছিন্নভিন্ন করে ফেলত ওদের বুক মাথা ধড়। অসাড় দেহগুলো আপনা থেকেই ঢলে পড়ত সেই গর্তের ভেতর। পরবর্তী যে দলটিকে আনা হত তাদের স্থান দখল করার জন্যে তাদের দিয়ে ভরাট করা হত ওই গর্তগুলো। আপনি নিশ্চয়ই বলবেন না পিলখানার বর্বরতা সারিয়েভো আর কসভোর বর্বরতাকে ছাড়িয়ে গেছে। এরপর ধরুন রোয়াণ্ডার কথা। কবেকার ঘটনা সেটা? পনেরো বছর, তাই না? আপনার হয়ত মনে নেই, আমার আছে। আমি বুড়ো হয়ে গিয়েছি। আমার কোন কাজকর্ম নেই আপনার মত। পুরনো দিনের সুন্দর স্মৃতিগুলোর মত কুৎসিত স্মৃতিগুলিও মনের মধ্যে এঁটে রয়েছে। কি করব বলুন। বুড়োদের স্মৃতিভ্রম হয় জানি, আমার হয়নি এখনো, সে আমার পরম ভাগ্য, কিন্তু স্মৃতির জ্বালাও যে বড় দুঃসহ জ্বালা। আমি যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি এখনো, ছোট্ট খুকিকে দা দিয়ে কুপিয়ে মারছে তারই প্রতিবেশী, তারই খেলার সাথীর পিতা! দেখছি গর্ভবতী নারীর পেটে বেয়নেট ঢুকিয়ে ভ্রূণহত্যা করার অবিশ্বাস্য দৃশ্য, টেলিভিশনের পর্দায়। কেন? কেন এই অকল্পনীয় পাশবিকতা? শুধু একটাই কারণ- ভিন্ন গোত্রে, ভিন্ন সম্প্রদায়ে জন্মগ্রহণ করার অপরাধ! সেই আদিকালের আদিমতম বৃত্তি- সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, গৌত্রিক শত্রুতা। এই আদিমতার বিষ থেকে মুক্ত হতে পেরেছে কি আজকের মানুষ? কোন কোন সমাজে আংশিকভাবে হয়েছে, সার্বিকভাবে না হলেও স্থানীয়ভাবে, যেখানে মানবতা আর সভ্যতা শুধু অভিধানের দুটো নিষ্প্রাণ শব্দই নয়, সমাজের সর্বজনগৃহীত এবং সর্বজনপালিত নীতি ও আদর্শও বটে। কিন্তু আমাদের অভাগা দেশে, এবং আমাদের মত এশিয়া-আফ্রিকার আরো অনেক অভাগা দেশে, এগুলো শুধু মুখের বুলি আর কবিতার ছত্র ছাড়া কিছু নয়।

আজকের বিশ্বায়িত পৃথিবীতে আদিম বর্বরতা ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশ পাচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন দেশে। পশ্চিমের তথাকথিত উন্নত বিশ্বে প্রাচ্যের নগ্ন সাম্প্রদায়িকতা বা সামাজিক পশ্চাতপদতা হয়ত নেই তেমন, কিন্তু যা আছে তার চেহারাও তেমন চিত্তহারী নয়। পশ্চিমের সমস্যা প্রধানত ক্ষমতা আর প্রাচুর্যের অন্ধ নেশাজাত। প্রাচুর্যের নেশা থেকে সৃষ্টি হয় অন্যান্য নেশা, নিম্নতর ও ঘৃণ্যতর নেশা। সেই নেশার আগুনে পুড়ে ছারখার হচ্ছে আমেরিকার একটা বড় অংশ, ছারখার হচ্ছে নিঃশেষ হচ্ছে ল্যাটিন আমেরিকার ড্রাগোত্পাদক রাষ্ট্রসমূহ। সেদিন টেলিভিশনে দেখলাম মেক্সিকো আর আমেরিকার সীমান্তে অবস্থিত একটি ছোট্ট শহরে মস্তকহীন একটা ধড় ঝুলে আছে বিলবোর্ডের গায়ে লাগানো আংটা থেকে। নিচে, রাস্তার ফুটপাথে, উপুড় হয়ে পড়ে আছে একসারি গলাকাটা মৃতদেহ। রাস্তাঘাট খালি, দোকানপাট অফিস আদালত স্কুলকলেজ সব খালি। রাস্তায় ধূলো উড়ছে, কাক ডাকছে, শকুনেরা ভোজ বসিয়েছে- জনমানবশুন্য এক অদ্ভূত নীরব শহর। পুরাকালের ধর্মযুদ্ধের পর যেমন হত। একালের যুদ্ধ ধর্মের নয়, নেশাদ্রব্যের। ড্রাগের যুদ্ধ। একদল ড্রাগব্যবসায়ী আরেকদলকে উত্খাত করার চেষ্টায় চূড়ান্ত ত্রাসের রাজ্য স্থাপন করেছে, যাতে কেউ তাদের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়াবার সাহস না পায়। শহরটিতে পুলিশের সংখ্যা ছিল ছয়। তার মধ্যে দুজনের গলাকাটা হয়ে গেছে। বাকি চারজন পলাতক, জানের ভয়ে। সেখানে মিলিটারিও সাহস পায় না যেতে। সেখানে সাংবাদিক নেই, উকিল-ডাক্তার-শ্রমিক-শিক্ষক, কেউ নেই। একেবারে মরা শহর।

            এই হল পৃথিবীর সর্বোন্নত দেশ আমেরিকার প্রতিবেশী রাষ্ট্রের চালচিত্র। মূল কারণ? মেক্সিকোর মানুষ এখনো পুরোপুরি সভ্য হয়নি বলে? সর্বোন্নত দেশের সার্বিক উন্নতির সামান্যতম ছোঁয়া তাদের গায়ে লাগেনি বলে? আমার মনে হয় না। এর কারণ আরো গভীর। আমেরিকার বাইরের অনেকেই তা জানে। ইউরোপের প্রায় সকলেই জানে কি কারণ। সেই কারণেই ইউরোপের ড্রাগনীতি আমেরিকার চেয়ে অনেক আলাদা। আমেরিকার ভেতরেও অনেক চিন্তাশীল মানুষ বোঝেন কেন ড্রাগসমস্যা নিয়ে ল্যাটিন আমেরিকার গরিব দেশগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ওপরতলার শক্তিশালী মানুষগুলো তা কোনদিনই স্বীকার করেননি। কিছুদিন আগে নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী ক্লিন্টনই প্রথম সাহস পেলেন সেই বিলম্বিত স্বীকৃতিটুকুর আভাস দিতে।

            পৃথিবী এই ভয়াবহ মূর্তিতে পৌঁছালো কেমন করে? এই অত্যাধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে, আন্তর্জাল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আর তথ্যপ্রযুক্তির যুগে, এমনটি তো হওয়ার কথা ছিল না। এ কি শুধুই আলোর নিচে অন্ধকার, না, আরো গভীর কিছু যা অলক্ষ্যে আধুনিক মানুষকে ধেয়ে নিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন কোনও গুহার পথে? এত অপার সম্ভার থাকা সত্বেও বর্তমান কেন এমন অসহায়ভাবে জিম্মি হয়ে পড়ল অতীতের প্রেতাত্মার কাছে? মজার ব্যাপার হল যে, জিম্মি যে হয়ে পড়েছি আমরা তাই যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছিনা কেউ। জিম্মি? কে, কোথায়? কই, আমরা তো জানিনা। বলবে অনেকেই। অথচ ভেবে দেখুন, আজকের পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রতিটি দেশে, বিশেষ করে ধনমানে সমৃদ্ধ পশ্চিম দেশসমূহে, কত লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে শুধু নিরাপত্তার জন্যে। নিরাপত্তা রক্ষা করতে যেয়ে দেশগুলো অলক্ষ্যে নিরাপত্তাহীন পুলিশরাষ্ট্রে পরিণত হয়ে চলেছে। আজকে রাস্তার মোড়ে মোড়ে গোপন ক্যামেরার চোখ চেয়ে আছে প্রতিটি পথিকের দিকে, দোকানে দোকানে গুপ্ত গোয়েন্দা মোতায়েন দিনরাত, অফিসে আদালতে মাঠে ঘাটে বাগানে পার্কে, চতুর্দিকে ছদ্মবেশী পুলিশ প্রহরী। দশবারো বছর আগে বিমানবন্দরে পাঁচ মিনিট আগে পৌঁছালেও ফ্লাইট পাওয়া যেত, আজকে সেখানে দুঘন্টা তিনঘন্টা আগে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হয়, কাপড়চোপড় আর জুতামোজা খুলে প্রায় দিগম্বর সেজে চোরের মত ভাব করে থাকতে হয় যাতে তারা আপনার আপাদমস্তক পরীক্ষা করতে পারে। আপনার পাসপোর্টে আরবি নাম থাকলে তো কথাই নেই, আপনাকে ভেতরে গিয়ে অনেকরকম জেরার সম্মুখীন হতে হবে। প্রতিটি মানুষ আজকে সন্ত্রাসের ভয়ে, গুলিগোলার ভয়ে, বোমাবাজীর ভয়ে, একা একা রাস্তায় হাঁটতে সাহস পায় না, ছেলেমেয়েদের একা একা স্কুলে পাঠাতে সাহস পায় না, রাতের বেলা চাঁদের আলোতে নদীর ঘাটে যেতে সাহস পায় না। আজকের প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি নগরবাসী মানুষ, নিজের অজান্তে একটা লোহার প্রাচীর গড়ে তুলেছে তার চারপাশে- সে কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না, কারো ওপর ভরসা করতে পারে না, যেদিকে তাকায় সেদিকেই সে বিপদের সংকেত দেখতে পায়। আজকের মানুষ একপ্রকার মানসিক রোগে আক্রান্ত, আতংকরোগ, প্যারানয়া। বিশ্বায়িত বিভীষিকার রাজ্য আজকে চতুর্দিকে বিস্তৃত। এ কেমন পৃথিবী সৃষ্টি হয়ে গেল বিজ্ঞানের এই অবিশ্বাস্য অগ্রগতি আর জয়যাত্রার গৌরব মুহূর্তে?

             আমি বিশেষজ্ঞ নই। নিজের ক্ষুদ্র এলাকাটি ছাড়া অন্য সব বিষয়েই আমার পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব। তবুও অনেক বিষয়েই আমার একটা মতামত আছে। হাজার হলেও আমি বাঙালি, মাছ-মাংস আর ডাল-ভাত খাওয়া বাঙালি। মতামতশূন্য বাঙালি আমার চোখে পড়েনি আজ পর্যন্ত। পৃথিবী এমন একটা সঙ্গিন অবস্থায় এসে দাঁড়ালো কেমন করে তার ওপরও একটা নিজস্ব মতামত আছে আমার। সেটা শুনবার আগ্রহ হয়ত কারো নেই, কিন্তু আমি বাঙালি বলেই হয়ত না বলে পারছি না। আমার মনে হয় গত শতাব্দীর দুচারটে বড় বড় ঘটনার ফলশ্রুতিতেই আজকের এই দুর্দশা আমাদের। দুটি অর্থপূর্ণ সময়, দুটি সাল- ১৯৭৯ ও ১৯৮৯, পৃথিবীর চক্রপথ ঘুরিয়ে দিয়েছিল উল্টোদিকে, আমার মতে।

প্রথমে ৭৯-এর কথাই বলা যাক। কি হয়েছিল সেবছর? প্রধানত দুটি ঘটনা। এক, আফগানিস্তানে সোভিয়েটের আক্রমণ, যার প্রতিক্রিয়াতে বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মার প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলার প্রস্তুতি এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাত্মক সমর্থন ও সহায়তা- অর্থাৎ আফগানিস্তানের মত একটি হীনদরিদ্র দেশ দুই মহাশক্তির ঠাণ্ডাযুদ্ধের মঞ্চপটে পরিণত হওয়া। সেসময়কার ঘটনাপ্রবাহ যারা একেবারে ভুলে যাননি তাদের নিশ্চয়ই মনে আছে কিভাবে আমেরিকার কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার ধূর্ত পররাষ্ট্রনীতির কারণে পরবর্তিকালের তালেবান এবং আলকায়দার বীজ বপন হয়েছিল। তখনকার সোভিয়েট আক্রমণের মুখে ইসলামরক্ষার জিগির তুলে মুসলিম জিহাদীরা যে অভিযান চালিয়েছিল তাতে পূর্ণমাত্রায় সায় দিয়েছিল কারা? আমেরিকা। ইসলামরক্ষার স্বার্থে নিশ্চয়ই নয়, এক ঢিলে দুই পাখি মারার কুটিল চিন্তায়। তারা তখন বুঝতে পারেনি যে তাদের চালে খানিক ভুল হয়ে গিয়েছিল। দুই পাখির মধ্যে একটা পাখি একটু জখম হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু দ্বিতীয়টি পাখির খোলশ খুলে ভয়ালমূর্তি নরদানবে পরিণত হয়েছিল। সেই দানবই এখন আমেরিকার সবচেয়ে বড় শিরপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নরদানবকে নিধন করার জন্যে তারা লক্ষ লক্ষ সৈন্য মোতায়েন করছে সেখানে, হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, এবং সেই ফাঁকে গোটা আফগানিস্তানকে তারা একটি শ্মশানক্ষেত্রে পরিণত করছে। শুধু তাই নয়। সেই নারকীয় নরদানবের উত্থান শুধু আমেরিকার জন্যই হুমকি হয়ে ওঠেনি, সারা বিশ্বের জন্যও। আধুনিক সভ্যতার এই যে বিষম বিপন্ন অবস্থা আজকে তার অন্যতম মূল কারণই বোধ হয় এই অশুভ অপশক্তির উত্থান। পার্শ্ববর্তী দেশ পাকিস্তান একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র বললে অত্যুক্তি হবেনা এখন। দ্রুত উন্নয়নমান ভারত তাদের ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত। আমাদের চির-অভাগা বাংলাদেশে কমপক্ষে গোটা ত্রিশেক ইসলামী জঙ্গি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যাদের অনেকেই প্রশিক্ষণ লাভ করেছে আফগানিস্তানের সমর শিবিরে। আজকে এশিয়ার প্রায় প্রতিটি মুসলিমপ্রধান দেশে জঙ্গিতত্পরতা আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত।

             দ্বিতীয় ঘটনাটি ছিল ইরানে মোল্লাতন্ত্রের অভ্যুত্থান। শাহ্‌বিরোধী গণআন্দোলনের সমাপ্তিতে প্যারিসের নির্বাসন থেকে বিজয়ীর বেশে দেশে ফিরলেন আয়েতুল্লাহ হোমাইনী। শাহ পাহ্‌লবির রাজতান্ত্রিক একনায়কত্বের স্থলে প্রতিষ্ঠিত হল মোল্লাতান্ত্রিক একনায়কত্ব। আধুনিক জগতে মোল্লাশাসিত রাষ্ট্রশক্তির নজির স্থাপিত হল ইরানের মত একটি ঐতিয্যময় কাব্য-সঙ্গীত-শিল্প-সাহিত্য-সমৃদ্ধ দেশে। বলতে পারেন আমেরিকার মদদপুষ্ট স্বেচ্ছাচারি শাসক শাহ পাহ্‌লবির চেয়ে মোল্লাদের স্বেচ্ছাচারি শাসন কি শ্রেয় নয়? তার বিচার আমার নয়, আমেরিকা বা পশ্চিমের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোরও নয়, তার বিচার ইরানে যারা সারাজীবন ধরে বাস করছেন এবং আমৃত্যু করবেন, তাদের। আমার বক্তব্য শুধু এটুকু যে ইরানের দৃষ্টান্ত থেকে বিশ্বব্যাপী গোঁড়া মুসলিম সম্প্রদায়ে একটা নতুন ধারণা সৃষ্টি হয় যে তাহলে অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোও অনুরূপভাবে শরিয়াভিত্তিক ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করা যেতে পারে। আমার মতে, আফগানিস্তানে জঙ্গিবাদী ইসলামের উত্থান এবং ইরানে সাংবিধানিক মোল্লাতন্ত্রের অভ্যুদয়, দুয়ে মিলে মুসলিমবিশ্বে একপ্রকার সাম্রাজ্যবাদী ধূয়া তুলতে সক্ষম হয়েছে যে পশ্চিমের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক সংবিধান ইসলাম, শরিয়া এবং কোরান হাদিসের পরিপন্থী সুতরাং বর্জনীয়, অতএব প্রকৃত ইসলাম রক্ষার একমাত্র উপায় হল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। তবে এই সংকটজনক উদ্যোগ হয়ত অতটা পালে-বাতাস পেত না যদি ইতোমধ্যে আরেকটি যুগান্তকারী ঘটনা ঘটত ১৯৮৯এ ।

            ঘটনাটি ছিল সোভিয়েট সমাজতন্ত্রের পতন। ১৯১৭ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত একটানা ৭২ বছর রাজত্ব করার পর তাদের সমস্ত কাঠামোটি হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ল। সেই পতনের উল্লাসে মাতোয়ারা হয়ে উঠল আমেরিকাসহ গোটা পশ্চিম বিশ্ব, পূর্ব জার্মানী থেকে শুরু করে সোভিয়েট রাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যসমূহ তাদের প্রায়-রুদ্ধ অবস্থা থেকে পেল পরিত্রাণ। দেশে দেশে নগরে বন্দরে বেজে উঠল আনন্দধ্বনি। কিন্তু আনন্দধ্বনি বাজেনি তৃতীয় বিশ্বের অভাগা দেশগুলোতে। সোভিয়েট রাষ্ট্রের পতন এক হিসেবে এই দেশগুলোকে নির্বান্ধব এবং অসহায় করে ফেলেছিল, আক্ষরিক অর্থে না হলেও মানসিকভাবে। আমরা বাংলাদেশীরা, যারা দেশের স্বাধীনতাকে স্বাভাবিক অবস্থা বলে ধরে নিতে অভ্যস্ত, তারা যেন ভুলে না যাই যে, ৭১-এ সোভিয়েট ইউনিয়ন যদি আমাদের সমর্থন না জানাত ভারতের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে,  তাহলে আমেরিকার ষষ্ঠ নৌবহর হয়ত বঙ্গোপসাগরের পানিতে বসে ফাঁকা হুংকার দিয়েই ক্ষান্ত হত না, বাঘের মত লাফিয়ে পড়ত আমাদের ঘাড়ে, পাকিস্তানি হানাদারদের সাথে হাত মিলিয়ে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা রাজনৈতিকক্ষেত্রে ততটা হয়ত হয়নি যতটা হয়েছিল আদর্শের জগতে। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি অনুন্নত দেশেই তখন যুবসম্প্রদায়ের মধ্যে সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন। সেটা বাংলাদেশেই বলুন, ভারতেই বলুন আর মিশর-সিরিয়াতেই বলুন। প্রায় প্রতিটি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা ছিল সমাজতান্ত্রিক সমাজগঠনের আদর্শে উদ্বুদ্ধ। তাদের সামনে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের চরম সাফল্যের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়েছিল মার্কস-লেনিন-স্ট্যালিনের গৌরবময় সোভিয়েট রাষ্ট্র। তাই সোভিয়েট পতন তাদের মেরুদণ্ডে কঠোর আঘাত হানে। সোভিয়েট মডেল ছিল তাদের আলোকবর্তিকা, তাদের মানসিক অবলম্বন। ১৯৮৯তে সেই অবলম্বনটি ধুলিসাৎ হয়ে যায়। ধনতান্ত্রিক ক্ষমতার রাহুগ্রাস থেকে দুর্গত মানবতার পরিত্রাণ এবং সোভিয়েট অনুকরণে একটা সুন্দর সুশীল সমাজ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষাতে ঘটে বজ্রাঘাত। আদর্শগতভাবে তারা হয়ে পড়ে বিভ্রান্ত ও বিস্রস্ত। সেই যে একটা ফাঁক সৃষ্টি হল তখন তরুণসমাজের আদর্শজগতে সেই ফাঁকটির পূর্ণ সুযোগ  গ্রহণ করে নেয় কট্টর ইসলামপন্থী ছাত্রসমাজ। ৪০ থেকে ৭০ দশক অবধি যারা ছিল নগণ্য সংখ্যালঘু তারাই হঠাৎ করে হয়ে উঠল পরম শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠ, প্রায় প্রতিটি ক্যাম্পাসে। আমার মনে হয় ৮৯-র সেই বিপর্যয়টি যদি না ঘটত তাহলে আমাদের বাংলাদেশের এই শোচনীয় অবস্থা হয়ত দাঁড়ায়না আজকে।

       প্রশ্ন হল আমাদের জন্মভূমির,  আমাদের প্রাণের দেশটির ভবিষ্যৎ কি। গত নির্বাচনে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর শোচনীয় পরাজয়ের পর অনেকের মনেই একটা নতুন আশার উদ্রেক করেছে যে, হয়ত মেঘমুক্ত আকাশের সূর্য সত্যি উদয় হবে এবার। আশা ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারেনা, তাই আশা আমাদের করতেই হবে। কিন্তু আমার দীর্ঘ জীবনে অনেক সিঁদুড়ে মেঘ দেখেছি আমি। তাই কিছুতেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিনা যে নির্বাচনে হেরে গিয়েছে বলেই অন্ধকারের বনিকরা হাল ছেড়ে বসে থাকবে। ওরা তো এমনিতেই গণতন্ত্র মানে না, জনমতের ধার ধারে না, মানবাধিকারের তোয়াক্কা করে না। ওদের একরোখা দৃষ্টিঃ ইসলামী রাষ্ট্র। ওরা আল্লার সেবক, আল্লার শাসন প্রতিষ্ঠা করবে, সেখানে মনুষ্যত্ব আছে কি নেই তাতে কি আসে যায়। এই মন্ত্রে শুধু বিশ্বাসীই নয় তারা, এই মন্ত্রের জন্যে তারা প্রাণ দিতে প্রস্তুত। ৭৫ থেকে রাজনৈতিক সমর্থন ও মদদ দিয়ে ওদের আমরা পোষণ করে এসেছি। এদের কর্মক্ষেত্র এখন শুধু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এদের বিস্তার সারা বিশ্বজুড়ে। এরা অত্যন্ত দৃঢ়চিত্ত, একনিষ্ঠ ও সঙ্ঘবদ্ধ। এদের আমরা রুখব কেমন করে?

 

অটোয়া, কানাডা

এপ্রিল ৯, ২০০৯।

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.