Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাহিত্য  ||  ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ ১৪১৬ •  9th  year  2nd  issue  May-June  2009 পুরনো সংখ্যা
য়্যতা কেন্যালে অ্যাডভেঞ্চার Download PDF version
 

সাহিত্য

য়্যতা কেন্যালে অ্যাডভেঞ্চার

মনীষা রায়

এবছর তাদের তৃতীয় বিবাহ বার্ষিকীতে নিউ ইয়র্ক বাসী পঞ্চাশ বছরের টমাস উইলসন এবং তার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী জুলিয়া স্থির করল জুলিয়ার পূর্বপুরুষদের দেশ সুইডেন যাবে বেড়াতে। ইন্টারনেট ঘাটতে ঘাটতে ওরা খবর পেল যে স্টকহোম থেকে রেনোভেট করা স্টিমশিপে জল পথে দেশের পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্তে ভ্রমণ করার ব্যবস্থা আছে চার দিন তিন রাত পর সুইডেনের পশ্চিম উপকুলে দ্বিতীয় বড় শহর গটেনবার্গ পৌঁছোন যায়।

আমার অনেক দিনের সখ য়্যতা কেন্যালে ছোট স্টিমশিপে বেড়াতে যাব। বাবার কাছে এই কেন্যালের কথা শুনেছি। জান ত, আসলে আমার ঠাকুরদার বাবা ছিলেন এই লম্বা খাল কাটার ব্যাপাবে অন্যতম ইঞ্জিনিয়ার টমাসের সামনে টেবিলের ওপর রাখা ম্যাপের দিকে তাকিয়ে জুলিয়া বলে উঠল।

সত্যি? তাহলে  ত যেতেই হচ্ছে। তার আগে খোঁজ নেওয়া দরকার তোমার কোনও আত্মীয় বেঁচে আছেন কিনা। ভাবো ত, যদি দেখা করতে পার, কী আনন্দ হবে

সে সব খোঁজ খবর আমি অলরেডি করে ফেলেছি। আমার বাবার এক কাজিনের ছেলে আর তার স্ত্রী থাকে য়্যটল্যান্ড প্রভিন্ সে সুইডেনের ঠিক মাঝখানে। আমি ভাবছি ওদের আমার পরিচয় দিয়ে একটা ই-মেল পাঠাব যদি দেখা করতে পারে। জুলিয়া উৎসাহের সঙ্গে বলল।

বাঃ তুমি দেখছি আমার আগেই সব চিন্তা করে ফেলেছ। দাঁড়াও, কাল আমি লাইব্রেরি থেকে য়্যতা কেন্যালের ডিটেল ম্যাপ নিয়ে আসব, দেখি তোমার বাবার কাজিনের ছেলে কোথায় থাকে। ওরা যদি কেন্যাল থেকে বেশি দূরে না থাকে তাহলে হয়ত পথে আমাদের সঙ্গে দেখাও হতে পারে। কি বল?

ও, তাহলে ত দারুন মজা হবে। আমি আজই ইন্টারনেটে সব এয়ারলাইনগুলোর টিকিটের দাম কম্পেয়ার করব

সে দায়িত্ব আমার। আমাদের বিবাহ বার্ষিকী উপলক্ষে বেড়াতে যাব, খরচ নিয়ে চিন্তা করতে চাই না। জুলিয়া স্বামীর বদান্যতায় খুশি হয়ে হাসল।

এসব আলোচনার পর দুমাস কেটে গেছে। উইলসন দম্পতি জুলাই মাসের এক বুধবার সকালে ছোট ছোট ব্যাগে জামা কাপড় গুছিয়ে স্টকহোমের সেপসরুন বন্দরে হাজির। পূবের আকাশে ভোরের লাল আলোর ছোপ ছড়িয়ে পড়ছে, দু তিনটি গাংচিল বন্দরের শান্ত জলের আশে পাশে কর্কশ শব্দ করে উড়ছে। একে একে সব যাত্রীরা এসে গেল। জাহাজের মাথায় বড় বড় অক্ষরে নাম লেখা জুনো। গ্যাঙ্গওয়ের পাশে দাঁড়িয়ে সবাইকে অভ্যর্থনা জানালেন জুনোর মাঝারি বয়সের ক্যাপ্টেন নস্ট্রম আর ফার্ষ্ট অফিসর য়্যনসন। তাঁর পাশে সেকেন্ড অফিসার ও গাইড এক মহিলা, নাম ভিভেকা। জাহাজের ওপর কম বয়স্ক ক্রু রোগা লম্বা পিংগল চুল ও নীল চোখের তিনজন ছেলে আর দুটি মেয়ে। একটি ছেলে জুলিয়াদের মাল পত্র নিয়ে অনুসরণ করতে বলল। ওদের ক্যাবিন মেইন ডেকের তলায় আরও আটটি ক্যাবিনের একটি। ক্যাবিনটা এত ছোট যে দুজন একসঙ্গে কোনও কাজ করা কঠিন, যদিও ঐটুকু জায়গার ভেতর সব কিছুর ব্যবস্থা রয়েছে। দুটো বাঙ্ক বেড ছাড়াও একটা সিঙ্ক যেটা জাহাজ চলার সময় ঢাকা থাকে এবং যার তলায় দুটো ড্রয়ার। তাছাড়া দেয়ালের সঙ্গে লাগোয়া একটা ছোট ক্লসেট আছে কোট প্যান্ট ঝুলিয়ে রাখার জন্য। টমাস ও জুলিয়া ওদের সুটকেস খালি করে ক্যাবিনের সামনে রেখে দিল, ক্যাবিন বয় যাতে স্টোরেজে রাখতে পারে। ওরা তাড়াতাড়ি ওপর তলায় উঠে এল। জুনো ছাড়ার সময় হয়েছে।

জুলিয়া ডেকের রেলিং এ ভর দিয়ে চারদিকে তাকিয়ে দেখল রোদ-ঝলমল সকালে স্টকহোমের এই বন্দরটিকে আরও সুন্দর লাগছে। অফিস যাত্রী কয়েকজন তড়িৎ পদে চললেও একটু না দাঁড়িয়ে পারল না। হাত নেড়ে জাহাজ যাত্রীদের বিদায় জানাল। জুলিয়া খুশি হয়ে হাত নেড়ে উত্তর দিল। এই স্বর্ণোজ্জ্বল প্রভাতে পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর নগরীর বন্দরে স্বপ্নে দেখা জলযানের মত জুনো-র ডেকে দাঁড়িয়ে আগামী চার দিনের প্রত্যাশা জুলিয়ার দেহ মনে এক শিহরণ দিয়ে গেল।

স্টকহোমের পুরোন ইটের অট্টালিকাগুলি পেরিয়ে অপেরা হাউস, রিডারহুস অথবা হাউস অব নবল্ স্, সিটি হল যেখানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় এসবের পাশ কাটিয়ে জুনো ভক্ ভক্ করতে করতে বেশ কিছু কালো কাগজের মত কয়লার ঝুল ছাড়িয়ে বন্দর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। স্থানীয় যাত্রীরা ডেকে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন জিনিসের দিকে আঙ্গুল তুলে বলতে লাগল কোনটা কী। বিদেশী যাত্রীরা কেবল হাসি মুখে মাথা নাড়ল। অল্প ক্ষণের ভেতর জাহাজটা পরিচিত জায়গা পেরিয়ে বলটিক সাগরে ঢুকল। এবার  আর্কিপেলাগোর রাজত্ব। এই দ্বীপমালার সংখ্যা অগণিত। ফলে স্টকহোমবাসি অনেকেই কোনও না কোনও দ্বীপে একটি ছুটির কুটির বানিয়ে রেখেছে, যেখানে ওরা গ্রীষ্মকালটা কাটায়। শান্ত রোদে ঝক্ ঝকে কালচে ছাই রঙ্গের সমুদ্রের জলে অগুণতি দ্বীপ অধিকাংশই  কালো গ্র্যানিট পাথরের, ছোটগুলিতে গাছপালার বালাই নেই, বড় গুলিতে গাছে ঘেরা বাড়িগুলি যেন রূপকথার দেশ। কোনও কোনও বাড়ির কাছাকাছি ছোট নৌকা বাঁধা। পুরো ছবিটাই শিল্পীর আঁকা ক্যানভাস মনে হয়। টমাস পাশে দাঁড়ান এক ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করল, আপনি কি সুইডেনের লোক? এই দ্বীপগুলি থেকে স্টকহোমে যাবার জন্য ফেরির নৌকো আছে কিনা জানেন?

হ্যাঁ নিশ্চয়ই। রোজ বেশ কয়েকবার ফেরি যাতায়াত করে, অবশ্য কেবল গ্রীষ্মকালে। অনেকের আবার নিজস্ব নৌকোও আছে যাতায়াতের জন্য। আমার নাম লার্ স এরিক্সন, বসবাস উপসালাতে। ওখানকার য়্যুনিভারসিটিতে পড়াই। আপনি? টমাস হাত বাড়িয়ে লারস্ এরিক্সনের করমর্দন করে বলল, আয়্যেম টমাস উইলসন। আমার স্ত্রী জুলিয়া ও আমি থাকি নিউ ইয়র্কে। যদিও আমার স্ত্রীর পরিবার সুইডিস, ও জন্মেছে অ্যামেরিকায়। পেশায় আমি সিভিল ইজ্ঞিনিয়ার

ও তাহলে ত আপনার এই ট্রিপটা খুব ভাল লাগবে। এই য়্যতা কেন্যাল প্রায় দেড়শ বছর আগের সুইডিস সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর চমৎকার নিদর্শন।

অল্পক্ষণের ভেতর দুজনের আলাপ বেশ জমে উঠল। টমাস এই প্রৌঢ় ও শিক্ষিত ভদ্রলোকটির কাছ থেকে তাদের জলপথ সম্বন্ধে অনেক ঐতিহাসিক তথ্য জানতে পারল। য়্যতা দৈর্ঘে একশ একান্নব্বই কিলোমিটার যার আটাশি মিটার হচ্ছে মানুষের তৈরি। পুরো জলপথ তিনটা নদী, আটটি হ্রদ ও একটি সাগরের অংশকে যোগ করেছে। কথার ফাঁকে ফাঁকে টমাস জুলিয়াকে খুঁজছিল। হয়ত ও নিচের তলায় গেছে স্নান টান সারতে। প্রফেসর এরিক্সনের সঙ্গে কথোপকথন চলল আরও কিছুক্ষণ। কথা অবধারিত নিয়মে ইতিহাস থেকে পলিটিক্সে পৌঁছল। ওবামার পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে এরিক্সনের প্রশ্নের উত্তর দেবার আগেই একটা গংগ বেজে উঠল। লার্ স এরিক্সন হেসে বললেন, এই যে কফির ঘন্টা। চলুন ডাইনিং রুমে, ওখানেই না হয় আরও গল্প হবে।

জুলিয়া ঘন্টার শব্দ শুনে ওপরে উঠে এল। এদিক ওদিক তাকিয়ে টমাসকে আবিস্কার করতে দু মিনিটও লাগল না তার। টমাস স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ভাবল, স্নানের পর পোষাক বদলে ওকে খুব ফ্রেস দেখাচ্ছে। ও তাড়াতাড়ি জুলিয়াকে একটা ছোট্ট চুমু খেয়ে অন্য সবাইকে অনুসরণ করে খাবার ঘরে পৌঁছে গেল। সব মিলিয়ে মাত্র আটটি গোল টেবিল এবং প্রতি টেবিলে চার জনের বসার জায়গা। কফির সঙ্গে এলাচের গুঁড়ো দেওয়া বান্ রুটি। ক্যাপ্টেন এসে সবাইকে আবার সাদর অভ্যর্থনা জানালেন এবং কফির শেষে মেইন ডেকের পারলারে সবাইকে উপস্থিত হতে বললেন ওরিয়েন্টেশনের জন্য।

ডু য়্যু হ্যাভ স্পেল্ ন্ডা? জুলিয়া স্টার্চ দেওয়া সাদা টাইট স্কার্ট ও জ্যাকেট পরা মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করল। মেয়েটি, অর্থাৎ কিচেন ক্রুদের একজন, যার নাম আনা, কফি ঢালতে ঢালতে মাথা নেড়ে জানাল ও ঠিক বুঝতে পারছে না জিনিস টা কী। টমাস চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে জুলিয়াকে বলল,

আমি এনে দিচ্ছি। কোথায় রেখেছ?’

সিন্কের নিচে ড্রয়ারে দেখবে একটা ছোট প্লাস্টিকের ব্যাগে রয়েছে। ভাগ্যিস সঙ্গে এনেছিলাম। এরা দেখছি ডায়েটের ব্যাপারে একেবারে মাথা ঘামায় না। দ্বিতীয় বাক্যটি জুলিয়া ফিস্ ফিস্ করে বলল। পাশের টেবিল থেকে দুজন বৃদ্ধা তাঁদের নীল চোখ তুলে তাকালেন। টমাস তাড়াতাড়ি খাবার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নিচের ডেকের দিকে পা বাড়াতে গিয়ে এক মহিলার সঙ্গে প্রায় ধাক্কা লাগার জোগাড়। আয়্যাম সো সরি বলে মহিলার দিকে তাকাল। দোহারা চেহারা, মাথার বাদামি চুল জলের হাওয়ায় দুলছে, দুটি উজ্জ্বল চোখ নাচিয়ে মহিলা বললেন,

কই, ধাক্কা ত লাগেনি। লাগল না বলে আমি বরঞ্চ দুঃখিত। টমাস এই দূর্বিনীত মহিলাকে কী ভাবে একটা যুৎসই উত্তর দেবে যখন ভাবছে, তখন দেখল মহিলা উধাও। ও তাড়াতাড়ি নিচে নেমে স্পেল্ ন্ডা নিয়ে যখন ওপরে উঠল তখন অনেকেই খাবার ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। এতোক্ষণ লাগল? আমার কফি ত ঠান্ডা হয়ে আইস কফি হয়ে গেল। জুলিয়ার কন্ঠে মৃদু ভৎসনা। টমাস হাতের ইশারায় আনাকে ডেকে আরেক কাপ গরম কফি দিতে অনুরোধ করল এবং গলা নামিয়ে বলল,

প্লীজ, ফরগিভ্ মি। তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে অধিকাংশ টেবিল খালি কেবল এক কোণায় দুজন মহিলা বসে তখনও কফি খাচ্ছে। তাদের একজন টমাসের সঙ্গে চোখাচোখি হতে হাত তুলে পরিচিতি জানাল। টমাস চিনতে পারল কিছুক্ষণ আগে সিঁড়ির গোড়ায় দেখা সুন্দরীকে। মহিলা ততক্ষণে তার সঙ্গিনীকে টেনে টেবিল থেকে উঠে এসে ডান হাত বাড়িয়ে নিজের পরিচয় দিল এবং তার সঙ্গিনীর পরিচয় করিয়ে দিল। এরা দুই যমজ বোন দেখতে হুবহু এক নাম জিল এ শীলা, অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরে থাকে। ওরা পৃথিবী ভ্রমণে বেরিয়েছে। টমাস ও জুলিয়া নিজেদের পরিচয় দিল। টমাস যে জিলের দিকে বিশেষ ভাবে তাকাচ্ছিল সেটা জুলিয়ার দৃষ্টি এড়ায় নি।

ওরিয়েন্টেশনে ক্যাপ্টেন নস্ট্রম জাহাজের নিয়ম কানুন বুঝিয়ে বলার পর যোগ করলেন, এটা সমুদ্র যাত্রা নয়, তাই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা খুব কম। তবে আমরা যখন বড় লেকদুটোর ভেতর দিয়ে যাব তখন হয়ত হাওয়ার জোর বাড়তে পারে। এই যাত্রার সব চেয়ে বড় আকর্ষণ হচ্ছে আমরা আগামী চার দিনে ছেষট্টিটা লক পার হব। জাহাজ যখন লকের মধ্য দিয়ে যাবে তখন যাত্রীরা নেমে হেঁটে আবার জাহজে উঠতে পারেন, কারণ লক পেরোতে কুড়ি থেকে তিরিশ মিনিট সময় লাগতে পারে। জাহাজের বাইরে থাকার সময় গাইড ভিভেকার কথা শুনতে হবে, একা কেউ যেন কোথাও যাবেন না, তাহলে তাদের ফেলে জাহাজ আবার রওনা হয়ে যাবে। জাহাজের লাইব্রেরি যদিও ছোট, তবু মূল্যবান তথ্যপূর্ণ বই রয়েছে এই কেন্যাল সম্বদ্ধে। সেগুলো পড়ে দেখতে পারেন। এঞ্জয় ইওর স্টে উইথ আস। আশা করব আপনারা সবাই আবার শীঘ্র আমাদের সঙ্গে এই যাত্রায় যোগ দেবেন এবং আপনাদের বন্ধু ও আত্মীয় পরিজনকে আমাদের এই ট্রিপ রেকমেন্ড করবেন। বলে হেসে যোগ করলেন, এনি কোশ্চেন? এক মিনিট অপেক্ষা করে ক্যাপ্টেন নস্ট্রম বিদায় নিয়ে মাত্র দশটা সিঁড়ি বেয়ে তাঁর ব্রীজে ফিরে গেলেন।

লাঞ্চে ডাইনিংরুম ভর্তি। সব মিলিয়ে একুশ জন যাত্রী। টমাস-জুলিয়া, অস্ট্রেলিয়ান ভগ্নিদ্বয় ও প্রফেসর এরিক্সন ও তাঁর স্ত্রী ইরেনা ছাড়াও আছে দুই মধ্যবয়স্ক ইংরেজ দম্পতি, সুইডেনের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছজন ছাত্র ছাত্রী যারা কেন্যাল সম্বন্ধে রিসার্চ করতে বেরিয়েছে। আর আছে এক লম্বা চওড়া জার্মান এবং দুই নরয়েজিয়ান বৃদ্ধা এবং সর্ব শেষ দুই পুরুষ বন্ধু যারা সর্বদা হাসি খুশি এবং সবার সঙ্গে আলাপে ব্যস্ত। পোচড্ স্যামন মাছের সঙ্গে ডিল মেশান নতুন আলু সেদ্ধ, স্যালাড আর সুস্বাদু ডেসার্ট সহযোগে পর্যাপ্ত ভুড়িভোজনের পর জুলিয়া আর টমাস ওপরের ডেকে গিয়ে দাঁড়াল তীরের শোভা দেখতে। যাত্রীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কেউ কেউ সিগারেট বা চুরুট ধরিয়ে ডেক চেয়ারে আধ শোয়া অবস্থায় আরাম করছে, কেউ বা রেলিং এর ওপর ঝুঁকে ক্যামেরায় ছবি তুলছে। কেন্যালের ব্যাপ্তি সংকীর্ণ, তীর আর জাহাজের ভেতর মাত্র কয়েক ফুট জায়গা, যেন হাত বাড়ালেই তীরের গাছপালা ছোঁয়া যায়।

বাইরে তাকিয়ে জুলিয়ার চোখ এবং হ্রদয় ভরে উঠল। প্রায় তার হাতের নাগালের মধ্যে দুধের মত সাদা বার্চ গাছের সারি প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে আছে সার বেঁধে। তাদের পায়ের তলায় খাটো ঝোপ আর ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে টুকটুকে লাল ছোট্ট লিঙ্গন বেরির ঝোপ আর নানারকম মাশরুম যা এদেশের লোকেরা খেতে ভালবাসে। জুলিয়া তার বাবার কাছে কী ভাবে মাশরুম চিনতে হয় শিখেছিল। মিনিয়োচার হরিণের সিঙ্গের মত কমলা রঙ্গের দুর্মূল্য সান্তারেল মাশরুম দেখে জুলিয়া উত্তেজিত হয়ে টমাসকে বলল,

দ্যাখ, দ্যাখ কত স্যান্তারেল ঐ বার্চ বনে! ইস্ যদি নেমে কুড়োতে পারতাম! এগুলির দারুণ দাম বাজারে, স্যান্তারেল-সস্ দিয়ে মাংস খেতে যে কী ভাল লাগেকথা শেষ করে তাকিয়ে দেখে টমাস উলটোদিকে অষ্ট্রেলিয়ান ভগ্নীদ্বয়ের একজনের সঙ্গে কথা বলছে। একই সময়ে ডান দিক থেকে এক লম্বা ও সুশ্রী প্রৌঢ়া এগিয়ে এসে বললেন,

আমিও ঐ একই কথা ভাবছিলাম। যদি মাশরুমগুলি কুড়োন যেত!

ইতিমধ্যে জাহাজ মন্থর গতিতে এগিয়ে চলেছে। বার্চ বন পেরিয়ে কিছু ক্ষেত খামার এসে পড়ল। কোথাও বা সোনালি-হলুদ গমের ক্ষেত, এখনও ফসল কাটা হয়নি। অল্পক্ষণ পরে এসে পড়ল মাইলের পর মাইল বার্লির ক্ষেত যার রং থিন এ্যারারুট বিস্কিটের মত। বার্লি ক্ষেতের মাঝে মাঝে স্ক্যান্ডেনেভিয়ার মেয়েদের চোখের রঙের ঘন নীল বিন্দুর মত ফুল ছড়িয়ে আছে। অপরাহ্ণের সূর্যের তেরচা আলোয় বার্লির ক্ষেতে সেই নীল বিন্দুগুলি অপূর্ব দেখাচ্ছে। পাশের প্রৌঢ়া হেসে বললেন,

আরন্ট দীজ বিউটিফুল? দীজ আর, হোয়াট দ্য ইংলিশ কল, স্ট্র ফ্লাওয়ার। দে গ্রো ওয়াইল্ড ইন দ্য বার্লি ফিলড্স। তারপর একটু থেমে হাত বাড়িয়ে, আয়্যাম ইরেনা এরিক্সন। মাই হাসবেন্ড হ্যাজ অল্রেডি মেট ই্ওর হাসবেন্ড। জুলিয়া নিজের পরিচয় দিল। দুজনের ভেতর আরও কিছুক্ষণ গল্প হল নানা বিষয়ে।

জাহাজের দুলুনিতেই হোক অথবা দুপুরের ওয়াইন সহযোগে লাঞ্চের ফলেই হোক, জুলিয়ার হঠাৎ ক্লান্ত লাগছে। মনে হল নিচে গিয়ে একটু বিশ্রাম করলে মন্দ হয় না। ইরেনা এরিক্সনের কাছে বিদায় নিয়ে জুলিয়া তাদের ক্যাবিনের দিকে রওয়ানা হল। একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে টমাসকে খুঁজল। ওর দেখা না পেয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল। মেন ডেকের পোর্ট সাইডে দেখল ক্রুদের এক যুবক- যার মাথার লম্বাচুল পনিটেল করে বাধাঁ- এক মহিলার সঙ্গে হেসে কী যেন বলছে। মহিলাটি খিল খিল করে হেসে উঠল। জুলিয়া তাকিয়ে চিনতে পারল অষ্ট্রেলিয়ান বোনদের একজনকে। একস্কু্যজ মি বলে জুলিয়া ওদের পাশ কাটিয়ে আরেকতলা নেমে গেল।

যাত্রার দ্বিতীয় দিন

সকাল থেকে হাওয়া দিচ্ছে জোর। তা সত্ত্বেও জুলিয়ার মেজাজ ভাল। আজ তার সুইডিস কাজিনরা আসবে দেখা করতে। ব্রেকফাস্টের পর জাহাজটা যখন প্রথম লকের জন্য থামবে ঠিক তখন থিও আর লায়লি ওখানে এসে দেখা করবে। ওরা জাহাজ কম্পানির সঙ্গে কথা বার্তা বলে ঠিক সময় ও স্থানটা আগেই জেনে নিয়েছে। জুলিয়ার চিন্তা ওরা জাহাজ না মিস্ করে। ব্রেকফাস্টের একটু আগেই উইলসন দম্পতি তৈরি হয়ে মেইন ডেকে উঠে এল। টমাস আবার নিচে নেমে গেল ওদের পকেট বাইনোকুলারটা আনতে। এদিকে জলের একটা নতুন দৃশ্য জুলিয়াকে খুব আকর্ষণ করছে। ও অনিমেষ তাকিয়ে রইল জাহাজের গা ঘেঁষে সারি বাধা জলো ঘাসের দিকে। জাহাজের ধাক্কা খেয়ে ঘাসগুলি জলের তলায় ডুব দিচ্ছে যেন এক দল নর্তকী মাথা নিচু করে দর্শকদের অভিবাদন জানাচ্ছে, আবার জাহাজ এগিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে মাথা উঁচু করে জলের উপর ভেসে উঠছে। জুলিয়া টমাসকে এই অভিনব দৃশ্যটা দেখাতে যাবার আগেই হঠাৎ একটা প্রবল হাওয়া এসে ওর গলায় ঝোলান দামী সিণ্কের স্কার্ফটা উড়িয়ে নিয়ে গেল। টমাস ততক্ষণে ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সেদিকে তাকিয়ে হেই হেই করে উঠল, কিন্তু কিছু করার  নেই। যদিও জাহাজের গতি তেমন নয় কিন্তু চারদিকে জল উত্তাল। ডেকের অন্য পাশ দিয়ে ফার্ষ্ট অফিসর য়্যনসন হেঁটে আসছিলেন। তিনি পুরো ব্যাপারটা দেখে দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, ইফ য়্যুয়ার লাকি, ইওর স্কার্ফ মে শো আপ। অনেক সময় এই ধরণের কাপড়ের টুকরো জাহাজের তলায় আটকে থাকে, লকে যখন জাহাজ উঠবে তখন সেটা  সহজেই পাওয়া সম্ভব। নয়ত হাওয়ার গতি পরিবর্তনে ওটা জল থেকে উঠে জাহাজের কিছুর সঙ্গে আটকে যেতে পারে। ফার্ষ্ট অফিসার জুলিয়ার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলেন।

যাক্ তোমার তাহলে--- টমাসের কথা শেষ হবার আগেই ব্রেকফাষ্টের ঘন্টা বেজে উঠল।

ব্রেকফাষ্টের পর জাহাজ প্রথম লকের জন্য থামল। যাত্রীরা সবাই দল বেঁধে নেমে গেল। ছাত্র ছাত্রীদের দল জাহাজ থেকে সাইকেল ধার করে গলায় বড় বড় ক্যামেরা ঝুলিয়ে এগিয়ে গেল, নিশ্চয় ওদের রিসার্চের মাল মশলা জোগাড় করতে। জুলিয়া লকের ওঠা নামা দেখার জন্য জাহাজেই রয়ে গেল। আরও আধ ঘন্টা পর ওর কাজিনদের আসার কথা। টমাস তার বায়নোকুলার সহ টপ্ ডেকে গেল, দূর থেকে ওদের আসতে দেখলেই জুলিয়াকে বলবে। জুলিয়া মন্ত্রমুগ্ধের মত ক্রুদের কর্মব্যস্ততা দেখছিল। হঠাৎ কোথেকে এক ভোল্ ভো গাড়ি চড়ে একটি স্বাস্থ্যবতী যুবতী হাতে এক গুচ্ছ চাবি নিয়ে এল লক খুলতে। জাহাজের কম বয়স্ক ক্রুদের দুটি ছেলে ও একটি মেয়ে ধুপ ধাপ নেমে দড়ি শেকল দিয়ে জাহাজটাকে ব্যালেন্ স করতে লাগল। মাথায় পনিটেলের ছেলেটা ওর দিকে তাকিয়ে দাঁত বার করে হেসে বলল,

রেলিং ধরে ঝুলবেন না। একটু সরে দাঁড়ান। ছবি তোলার জন্য ঐ কোণাটা সবচেয়ে ভাল। সুযোগ বুঝে জুলিয়া তাকে তার স্কার্ফের কথা বলল। সে অবশ্য কোনও ভরসা দিল না। জুলিয়া কালচে সবুজ জলের দিকে তাকিয়ে ভাবল জলটা কী পরিস্কার, একবারে তলা অব্দি দেখা যাচ্ছে। স্কার্ফটা জাহাজের তলায় আটকে থাকলে ঠিক দেখা যেত। এখানে কিছু লুকিয়ে থাকা সম্ভব নয়। লক খোলা-বন্ধ সব দেখে, এই রোগা রোগা ছেলে মেয়েগুলির কর্ম ক্ষমতায় ও মুগ্ধ। জাহাজটা কেমন অবলীলাক্রমে নিচে নেমে যায় আবার লক খোলার পর জল বাড়লে লক পেরিয়ে ওপরে উঠে আসে।

মিনিট পনেরো পর ওপর থেকে টমাস নেমে এসে জুলিয়াকে জানাল দুরে দুজন লোককে সে সাইকেল চালিয়ে আসতে দেখেছে, সঙ্গে একটা বড় কুকুর। জুলিয়া উত্তেজিত হয়ে বলল, নির্ঘাৎ লায়লি আর থিও। ওরা লিখেছিল ওদের কুকুর সঙ্গে থাকবে। ওদের গায়ে কি লাল কোট?

তা ত লক্ষ্য করিনি

কিছুক্ষণের মধ্যে জুলিয়ার কাজিনরা এসে গেল। লায়লির হাতে ফয়েলে ঢাকা কেক আর থিওর হাতে এক গুচ্ছ গ্রীষ্মের ফুল। এক-দুমিনিটের মধ্যেই ওরা হেসে পরস্পরকে আলিঙ্গন করে কথা বলতে আরম্ভ করল। জাহাজ যাত্রার মধ্য-পথে এভাবে দেখা হবার অভিনবত্ব এদের চারজনকেই উত্তেজিত করেছে। খালের পাশে একটা গাছের তলায় বসে ওরা কেক খেতে খেতে নিজেদের পূর্বপুরুষদের গল্প করল এবং এখন থেকে যোগাযোগ রাখবে বলে প্রতিজ্ঞা করল। জাহাজের টপ ডেক থেকে ভিভেকা হাত নেড়ে জুলিয়াদের ইঙ্গিত করল জাহাজে ফিরতে। আধ ঘন্টার এই মধুর মিলন শেষ। জাহাজ না ছাড়া পর্যন্ত থিও ও লায়লি দাঁড়িয়ে হাত নাড়তে লাগল। জুলিয়া তাড়াতাড়ি ছুটে জাহাজের শেষ মাথা স্টার্নে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল ওদের দেখার জন্য। ধীঁরে ধীঁরে ওরা ছোট হতে হতে দুটো লাল বিন্দু হয়ে মিলিয়ে গেল।

জুলিয়া বিষন্ন মনে আস্তে আস্তে সবচেয়ে ওপরের ডেকে উঠে এল একা থাকার জন্যে। টমাস গেল লাইব্রেরিতে। ওপরের ডেক খালি, কেবল শেষপ্রান্তে যেখানে সুইডেনের পতাকাটা পৎ পৎ করে উড়ছে সেখানে দুজন লোক জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে। সেদিকে না গিয়ে জুলিয়া অন্য দিকে পা বাড়াল। হয়ত ওর পায়ের আওয়াজে একজন ফিরে তাকাল। জুলিয়া চিনতে পারল জিলকে। সঙ্গের লোকটিকেও চেনা সহজ সবচেয়ে লম্বা চওড়া স্বল্পভাষী জার্মান। একস্ক্যুজ মি বলে জুলিয়া তাড়াতাড়ি আবার সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল।

ঘন্টা দুই পর জাহাজ ভেটার্ন লেকে পৌঁছল। সঙ্গে সঙ্গে হাওয়ার জোর বাড়ছে। জাহাজটাএ দুলছে ভাল রকম। ডিনারে অনেকেরই কফি ও ওয়াইন ছলকে পড়ল ইস্ত্রি করা সাদা টেবিলক্লথে। ইংরেজ দম্পতিদের একজন অনুযোগ করলেন, নির্ঘাৎ এই ছোট জাহাজ প্রেসারাইজড্ নয়।

সেরাত্রে শুতে গিয়ে জুলিয়ার হঠাৎ মনে পড়ায় ওপরের ডেকে টমাসকে যা দেখেছে সেটা বলল। টমাস সব শুনে কেবল বলল,

আর য়্যু সিওর, লোকটা ঐ লম্বা জার্মান?

ইয়েস্ , আয়্যাম সিওর। হোয়াই ইজ দ্যাট ইম্পোরট্যান্ট? ওপরের বাংক থেকে আর কোনও আওয়াজ শোনা গেল না। জুলিয়া ভাবল টমাস হয়ত ঘুমিয়ে পড়েছে।

যাত্রার তৃতীয় দিন

সকাল থেকে আকাশ মেঘে ঢাকা। সঙ্গে দমকা হাওয়া এবং ঠান্ডা ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি, যেন রাতারাতি গ্রীষ্ম থেকে হেমন্ত এসে হাজির। খাবার টেবিলে সবার মুখে এক কথা। সবাই নানা রঙ্গের সোয়েটার, জ্যাকেট লাগিয়ে ছোট লাইব্রেরি ঘরে এবং পার্লারে জড়ো হয়েছেন। সারা রাত জাহাজটা অনেকগুলি লকের মধ্য দিয়ে যাওয়ায় এবং নানাবিধ আওয়াজের ফলে অনেকেরই ভাল ঘুম হয়নি। জুলিয়া এসব কথায় যোগ না দিয়ে বেরিয়ে এল ডেকে। ঠান্ডা হাওয়ার জন্য ডেকে দাঁড়িয়ে থাকা মোটেই আরামদায়ক নয়। ব্রেকফাস্টের পর থেকেই টমাস উধাও। ও একটু বিরক্ত হয়ে টমাসকে না খুঁজে নিজেই এক কাপ গরম চায়ের অন্বেষণে কিচেনের দিকে গেল। সেখানে অট্টহাস্যের আওয়াজ শুনে দেখে হাসি খুশি পুরুষ বন্ধু দুটি জাঁকিয়ে আড্ডা দিচ্ছে আনা ও অন্য শেফ্ দের সঙ্গে। জুলিয়াকে দেখে একজন বলে উঠল,

কাম জয়েন আস। উই আর গেদারিং দ্য লেটেস্ট শিপ গসিপ্ । কাল রাত্রে নাকি একজন ক্রু মেম্বার আর অষ্টেলিয়ান বোনদের একজনকে কম্প্রমাইজিং পজিসনে পাওয়া গেছে। এই মুহূর্তে ফার্ষ্ট অফিসারের ঘরে সেই ক্রু-মেম্বারকে ইন্টারোগেট করা হচ্ছে। জুলিয়া ওর গরম জলের কাপ আর টি ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে আসতে আসতে ভাবল অস্ট্রেলিয়ান বোনটি কি জিল না শীলা? পার্লারে অথবা লাইব্রেরিতে টমাসকে দেখতে না পেয়ে ভাবল ওদের ক্যাবিনে বসে চা টা খাবে। নিচে এসে দেখে ক্যাবিনের দরজা ভেতর থেকে তালা বন্ধ। দু-তিন বার নক্ করে কোনও সাড়া শব্দ না পেয়ে জুলিয়া ধরে নিল টমাস একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছে। হয়ত কাল রাতে অন্যদের মত ওরও ঘুম হয়নি। ও আবার ওপরের ডেকে উঠে এল। সিঁড়ির মাথায় অস্ট্রেলিয়ান বোনদের একজনের সঙ্গে দেখা। সে জিজ্ঞাসা করল,

হ্যাভ্যয়ু সীন জিল? ওকে খুঁজে পাচ্ছি না। ওর গলায় উৎকন্ঠা ও চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।

নো, আইহ্যাভ্ ন্ট। সরি। হয়ত তোমাদের ক্যাবিনে ঘূমোচ্ছে

জুলিয়া শীলাকে তার বোনের ক্যাবিনে ঘুমোবার কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে ওর মাথায় আরেকটা কথা উড়ে এল। ও তাড়াতাড়ি আবার নিচে নেমে গেল। এবারে ওদের ক্যাবিনের দরজা ভেজান। আস্তে নক্ করে ঢুকে দেখে কেউ নেই। টমাসের বিছানা সকালে যেমন ছিল তেমনি আছে। একটু বিস্মিত মনে জুলিয়া আবার ওপরে উঠে এল। জাহাজ এখন আবার সরু খালের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। পার্লারে গিয়ে দেখে টমাস কোনার একটা চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছে।

হিয়ার য়্যু-য়ার! আমি তোমাকে খুঁজে খুঁজে একশেষ। বলে টমাসের পাশের সোফায় বসে পড়ল।

কেন, কী হল আবার? এইটুকু জাহাজে কেউ কি হারিয়ে যেতে পারে? তুমি এত অনর্থক চিন্তা করতে পার। জুলিয়া টমাসের কন্ঠস্বরে একটু অবাক না হয়ে পারল না। শুধু বলল,

নতুন খবর কিছু আছে?

এই তিন দিনে পৃথিবীতে এমন কী ঘটতে পারে বলে তোমার মনে হয়?’ জুলিয়া কিছু বলার আগেই মিডমর্ণিং-এর কফি পেস্ট্রি এসব নিয়ে আনা পার্লারে ঢুকল। ইতিমধ্যে আরও অনেকে এসে গেছে। ডেকের ঠান্ডা হাওয়ায় বিতাড়িত হয়ে সবাই গরম কফি বা চায়ের অপেক্ষায় আছে। আনা কফির ট্রে নামিয়ে ঘোষনা করল,

‘আজ আমাদের যাত্রার শেষ সন্ধ্যা। তাই ক্যাপ্টেনের ডিনার, অর্থাৎ আপনারা সবাই ক্যাপ্টেনের গেস্ট। লেডিস, ড্রেস আপ। দিস ইজ ইওর চান্স টু লুক ইওর বেস্ট। মহিলা যাত্রীদের ভেতর একটা লটারি করে ঠিক হবে কে কে ক্যাপ্টেনের আর ফার্ষ্ট অফিসারের টেবিলে বসবেন। গুড লাক!

সন্ধ্যা ছটায় ডিনারের ঘন্টা বাজল। একমাত্র ক্যাপ্টেনের টেবিল ছাড়া আজ যে যার সঙ্গে খুশি বসতে পারেন। কিন্তু পুরোন সংগীদের সঙ্গে বসা চলবে না। জুলিয়া কী করে যেন নরওয়েজিয়া্ন বৃদ্ধাদের একজনের পাশে জায়গা পেল। সবাই বসার পর ও দেখল টমাস দুই যমজ বোনের মাঝখানে বসেছে। কোনও একটা অজানা কারণে পুরো ডিনারটাই  ওর বিস্বাদ মনে হল, যদিও অনেক লোভনীয় সব ডিশ ছিল মেনুতে। ছয কোর্সের এই ডিনারে হেরিং মাছের পিক্ ল থেকে আরম্ভ করে স্যান্তারেল মাশরুমের সস্ সহ হরিণের মাংসের রোস্ট এবং সর্বশেষে তিন চার রকমের ডেসার্ট। কোনওটাই জুলিয়ার পছন্দ হল না। ও কেবল স্নাপ্ স এর ছোট গ্লাস গলায় ঢালতে লাগল। ক্যাপ্টেন নস্ট্রম হেড টেবিলের মাথায় দাঁড়িয়ে একটা মিনি লেকচার দিলেন এবং শেষ করলেন এই বলে যে এবারের যাত্রা খুব সহজ ভাবে হয়েছে, একমাত্র দুর্ঘটনা হল মিসেস উইলসনের স্কার্ফ হারান। এবং সেটাও জাহাজ বা ক্রুর দোষে হয়নি, কারণ দমকা হাওয়া স্বাধীন, সে ক্যাপ্টেনের আদেশ মানে না। সবাই ক্যাপ্টেনের সঙ্গে হাসিতে যোগ দিল।

খাবার পর টমাস জুলিয়াকে বলল যে সে একটু পরে শুতে আসবে, ওপরের ডেকে যাবে হাঁটতে, অনেক খাওয়া হয়ে গেছে। জুলিয়া প্রচুর স্নাপ্ স খেয়ে ক্লান্ত, তাই কিছু না বলে নিচে নেমে গেল। ক্যাবিনে বিছানার ওপর একটা কম্প্যুটার প্রিন্টয়াউটে লেখা ইনস্ট্রাক্সন যাতে সকালে ব্রেকফাস্টের আগেই প্যাকিং শেষ করে লাগেজ ক্যাবিনের সামনে রেখে দেয় সবাই। দুএকটা জিনিষ গুছিয়ে জুলিয়া শুয়ে পড়ল। তিন দিনের জাহাজ যাত্রার আনন্দ ও উত্তেজনা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ওর কাজিনদের সঙ্গে দেখা হওয়াটাই হাইলাইট। কিছু ছোট খাটো ঘটনা মনের ভেতর খচ্ খচ্ করছে। জুলিয়া সেগুলিকে প্রশ্রয় না দিয়ে ঘুমোবার চেস্টা করল এবং টমাস কখন ক্যাবিনে ঢুকল বা আদৌ ঢুকল কিনা জানতেও পারল না। ততক্ষণে সে অকাতরে ঘুমোচ্ছ।

যাত্রার শেষ দিন

সকাল থেকে ব্যস্ততা চারদিকে। তিনজন ক্রু মেম্বার যাত্রীদের লাগেজ নিয়ে টানা টানি করছে ডেকের এক জায়গায় জড়ো করার জন্য। ব্রেকফাস্ট আজ সংক্ষিপ্ত। জুলিয়া তার ক্যামেরা নিয়ে সবচেয়ে ওপরের ডেকে গেল শেষবারের মত কিছু ছবি তুলতে। সেখানে অস্ট্রেলিয়ান বোনদের একজন দাঁড়িয়ে আছে। কে যে জিল আর কে শীলা এই তিন দিনেও জুলিয়া বুঝে উঠতে পারেনি।

গুড মর্নিং বলে দুজন দুজনকে সম্ভাষণ জানাল।

হাও ইজ ইওর সিস্টার? কিছু চিন্তা না করেই জুলিয়া জিজ্ঞাসা করল।

আই রিয়েলি ডোন্ট নো। জিলকে আমি কাল ডিনারের পর থেকে দেখিনি। আমি একটু তাড়াতাড়ি শুতে গিয়েছিলাম, ও হয়ত দেরিতে বিছানায় এসেছে। আজ সকালে নির্ঘাৎ খুব ভোরে উঠে কোথাও সর্দারি করছে। আমার বোনকে সামলান আমার কাজ নয়। সী ইজ ওয়াইল্ড। এই ট্রিপের আগেই আমি ওকে বলেছি, সী ইজ অন হার ওঔন। বলে শীলা একটু হাসল। কিন্তু জুলিয়ার কাছে ব্যাপারটা একেবারেই হাস্যকর মনে হল না। ওর একসঙ্গে অনেক ঘটনা মনে পড়ে গেল। জাহাজের পোর্টসাইডে পোনিটেলের ক্রু মেম্বারের সঙ্গে জিলের অট্টহাসি, আবার তাকে নিয়ে কিচেনের গসিপ এবং দুদিন আগে টপ্ ডেকে জার্মান লোকটির বাহুবন্ধনে ইত্যাদি ইত্যাদি। ও শুধু বলল, এত ছোট জাহাজে তোমার বোন কোথায় আর যাবে? হয়ত ক্যাপ্টেনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে ব্রীজের যন্ত্রপাতি দেখছে

আই ডাউট দ্যাট। এনিওয়ে, থ্যাংস

ইতিমধ্যে জাহাজ সুন্দর গ্রামের দৃশ্য ছাড়িয়ে শহরের উপকন্ঠে এসে গেছে। দুরে সব নানা রকমের ফ্যাক্টরির সাদা সাদা চিমনি দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ যেন ছন্দ পতন হল। গত তিন দিনের ঢিলে ঢালা উদ্বেগমুক্ত জাহাজি জীবন বদলে গেছে। একটা ব্যস্ততা চারদিকে। কারও হাতে সময় নেই একটু দাঁড়িয়ে দৃশ্য দেখার। জুলিয়া যখন ক্যামেরার খাপ বন্ধ করে এসব কথা ভাবছে তখন টমাস এসে পেছন থেকে ওর পিঠে হাত রাখল। ওর গালে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল, চল জাহাজের বাওতে গিয়ে দাঁড়াই, গটেনবার্গের হার্বারে ঢোকাটা দেখতে চাই। বাঁচা গেল, আর এই খুপড়িতে গাদা গাদি করতে হবে না। মাটিতে নেমে একটু হাত পা ছড়াতে পারব। এই বলে টমাস জাহাজের সামনের দিকে হাঁটতে লাগল। জুলিয়া ওর কথায় বেশ ক্ষুণ্ণ হল। এই সুন্দর জাহাজ ভ্রমণটা টমাস কিনা এক কথায় বাতিল করে দিল। গত কদিন স্বামীর মন মেজাজের গতি বিধি সে ঠিক বুঝতে পারছিল না। এতগুলো ডলার খরচ করে এত সব পরিকল্পনা করে এই ট্রিপটা করা হল। অথচ মাত্র চার দিনের মাথায় টমাস এসব কী বলছে! মনটা রীতিমত দমে গেল। ধীরে ধীরে টমাসকে অনুসরণ করে জাহাজের সামনে গিয়ে দেখে বেশ ভীড় আর সবাই বাও-এর রেলিং ধরে ঝুঁকে কী যেন দেখছে আর একসঙ্গে কথা বলছে, চোখে মুখে আতংকের ছাপ। টমাস এগিয়ে গিয়ে এক ঝলক দেখে নিয়ে ফিরে এসে জুলিয়াকে প্রায় জোড় করেই ফিরিয়ে নিয়ে চলল উলটো দিকে।

কী ব্যাপার? হাত ছাড়, আমার ব্যথা লাগছে। কী দেখছে সবাই? জুলিয়া প্রায় চিৎকার করে উঠল। জাহাজ ইতিমধ্যে থেমে গেছে। লাউডস্পিকারে ক্যাপ্টেনের গলা ভেসে এল।

এ্যজ য়্যু ক্যান সী উই ল্যান্ডেড ইন গটেনবার্গ। দুর্ভাগ্যবশতঃ আমাদের এখন তীরে নামা সম্ভব নয়। এক চুড়ান্ত দুর্ঘটনা ঘটায় আমাদের সবাইকে অন্তত আগামী দশ ঘন্টা জাহাজেই কাটাতে হবে। আপনারা কেউ জাহাজ ছেড়ে এক পাও নড়বেন না। অচিরেই একটা পুলিশ তদন্ত শুরু হবে। সবাইকে পার্লারে অপেক্ষা করার জন্য অনুরোধ করছি। দ্য কিচেন ক্রু উইল সার্ভ সাম স্যান্ডুইচেস শর্টলি। আমি আবার দরকার মত ঘোষণা করব। এই অসুবিধার জন্য আমি অশেষ দুঃখিত। জুলিয়া টমাসের দিকে তাকিয়ে চোখের ইঙ্গিতে প্রশ্ন করল, কী ব্যাপার? ভীড়ের মধ্য থেকে হঠাৎ ইরেনা এরিক্সন এগিয়ে এসে জুলিয়াকে এক পাশে টেনে নিয়ে ফিস ফিস করে বললেন,

ঐ স্কার্ফটা ত আপনার? আই রেকগনাইজড্ ইট

হোয়াট আর য়্যু টকিং এবাউট? আমি আপনার কথার এক বর্ণও বুঝতে পারছিনা। বলে জুলিয়া কাতর নয়নে তাকাল। ও লক্ষ্যও করেনি টমাস কখন ওর পাশ থেকে সরে গেছে। ইরেনা এরিক্সন দ্রুত বেগে যা বলে গেলেন তার সারমর্ম হল এই:

আজ খুব সকালে জুনো যখন গটেনবার্গের বন্দরে ঢুকছিল তখন হঠাৎ কী কারণে থেমে গেল। ব্রীজে ছিলেন ফার্স্ট অফিসর। তিনি ক্যাপ্টেন সহ নিচে গিয়ে দেখেন কিছু একটা জাহাজের বাওতে আটকে আছে। ততক্ষণে দু-একজন যাত্রীও উঠে ডেকে প্রাতঃভ্রমণ করছিলেন। তাঁদের মুখে মুখে খবরটা ছড়িয়ে যায়। ভয়াবহ ঘটনা। যা আটকে ছিল সেটা একটি নারী দেহ। ক্রুর জোয়ান ছেলেগুলো নেমে দেহ উদ্ধার করেছে এবং এখন জানা গেছে যে অষ্ট্রেলিয়ান বোনদের একজন এই অপমৃত্যুর শিকার হয়েছে। দ্বিতীয় বোনটি আপাতত ক্যাপ্টেনের ঘরে আছে। আমিও সকালে সামনের ডেকে হাঁটছিলাম, তখনই দেখলাম চারজন ক্রু দেহটা ঢেকে নিয়ে যাচ্ছিল, গলার পাশ থেকে হুবহু আপনার স্কার্ফটার মত একটি স্কার্ফ ঝুলে ছিল। ইরেনা এরিক্সন যোগ করলেন।

সব শুনে জুলিয়া ধপ্ করে একটা ডেক চেয়ারে বসে পড়ল। তার মাথার ভেতর অনেক ঘটনা জট পাকিয়ে হুড়মুড় করে এসে হাজির। কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল এসব এই মুহূর্তে বিচার করা অসম্ভব। অভ্যাস মত সে টমাসের হাতটা জড়িয়ে ধরতে চাইল। কিন্তু কোথায় টমাস? অসহায় চোখে ও ইরেনা এরিক্সনের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল, হ্যাভয়্যু সীন মাই হাসবেন্ড? ঠিক তক্ষুণি আবার লাউড স্পিকারে ক্যাপ্টেনের গলা শোনা গেল, ডাক্তার সহ গটেনবার্গের পুলিশের ডিটেক্টিভ ডিপার্টমেন্ট থেকে লোক আসবেন প্রাথমিক তদন্ত করতে। প্লীজ্ সবাই পাঁচ মিনিটের ভেতর পার্লারে জড়ো হোন। আয়্যাম রিয়েলি সরি ফর সাচ এ্যা টার্ন অব ইভেন্টস

পুরো দুদিন তদন্ত চলল। বন্ধ ঘরে একজন একজন করে সবাইকে প্রশ্নের সম্মু্খীন হতে হয়েছিল। দ্বিতীয় দিনের মাথায় এরিক্সন দম্পতি, নরওয়েজিয়ান বৃদ্ধাদ্বয়, ছাত্র ছাত্রীদের দল আর পুরুষ বন্ধু যুগলকে ছেড়ে দেওয়া হল। যাবার আগে ইরেনা এরিক্সন জুলিয়াকে আলিঙ্গন করে বললেন, গুড লাক উইথ এভ্রিথিং। তারপর তিনদিনের মাথায় জুলিয়া আর টমাসও ছাড়া পেল। তদন্তে নাকি কনক্লুসিভ কোনও সিদ্ধান্ত করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত জিল আত্মহত্যা করেছে বলে পুলিশ রায় দিল।

গটেনবার্গের একটা বড় হোটেলে টমাস জুলিয়াকে নিয়ে উঠল; আগেই রিসারভেসন করা ছিল। ওরা এখানে এক সপ্তাহ থেকে নিউ ইয়র্ক ফিরে যাবে। হোটেলে ঢুকেই জুলিয়া প্রথমে এক টাব গরম জলে গা ভাসিয়ে অনেকক্ষণ ধরে স্নান করল। গত এক সপ্তাহের উৎসাহ, আনন্দ, বিষাদ, উৎকন্ঠা এবং সর্বোপরি সন্দেহ মাখা এলোমেলো চিন্তা যেন সে স্নানের জলে ভাসিয়ে দিতে চায়। টমাসকে তার অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করার আছে।

কেম্ব্রিজ, ম্যাসাচুসেটস।

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.