Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি  ||  ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ ১৪১৬ •  9th  year  2nd  issue  May-June  2009 পুরনো সংখ্যা
মুক্তিযুদ্ধে মহাযাত্রা Download PDF version
 

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি

মুক্তিযুদ্ধে মহাযাত্রা

 মোহাম্মদ নরুল সগীর

১৯৭১-এর ২৫ মার্চের কাল রাতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সেনা বাহিনী ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর বর্বরতাকে তুচ্ছ প্রমাণ করে দিয়ে এক অমানবিক দানবের জিঘাংসা নিয়ে বাংলার নিরীহ, অসহায়, নিরস্ত্র জনগণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। এই রূপ নৃশংস হত্যাযজ্ঞের পর কোন সুস্থ বাঙালির পক্ষেই নীরব, নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকা সম্ভব ছিল না। তাই আমরা ক’জন- ওয়াহিদুল হক, কমল সিদ্দিকী, মাহমুদর রহমান (বেনু), কাজী ইকবাল (বড় বাবু), সৈয়দ লুতফর রহমান (খোকা), গোলাম রাব্বানী, আলী যাকের, রফিউজ্জামান তরফদার আর দশজন বাঙালির মত এই গণহত্যার প্রতিশোধ নিতে এবং পাকিস্তানের নাম ও নিশানা চিরতরে বাংলার মাটি থেকে নির্মূল করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা করার উদ্দেশে ২৭ মার্চ কারফিউ তুলে নেয়ার পর গোপনে ধানমন্ডি ২ নম্বর রোডে বেনুর বড় ভাই (জনাব আলী মোরশেদ মাহমুদ) এর একটি খালি বাড়ীতে পরপর কয়েকবার মিলিত হই এবং এই বর্বরতার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে আমরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। এদিকে সৈয়দ হাসান ইমাম, ওয়াহিদ ভাইর মাধ্যমে আমাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন। তাঁকে আমাদের এই সিদ্ধান্তের কথা জানান হয় এবং তিনিও আমাদের সাথে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। হাসান ভাই ২৫ মার্চের পরে সাভারের কাছে ফুলবাড়িয়া নামক একটি গ্রামে তাঁর এক আত্মীয়ের বাড়ীতে রোজী ও শিশু কন্যা সঙ্গীতাকে নিয়ে আশ্রয় নেন। কারণ তাঁর নাম পাকিস্তান আর্মীর হত্যার লিস্টের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল বলে জানা যায় এবং এক পর্যায়ে ওরা হাসানভাইর এলিফেন্ট রোডের বাড়ীতে এসে তাঁকে না পেয়ে আগুন লাগিয়ে তার বাড়ীটি পুড়িয়ে দেয়।

আমরা চারজন, ওয়াহিদ ভাই, কমল, বড়বাবু ও আমি ২ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার উদ্দেশে ঢাকা থেকে আমাদের যাত্রা শুরু করি, এ যাত্রাকে যাত্রা না বলে মহাযাত্রা বললে ঠিক হবে। রাব্বানী ও বেনু জনাব আবুল খায়ের, এমসিএ মোকশেদপুর, গোপালগঞ্জ থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সদস্য এবং বেনুর ভগ্নিপতির গাড়ীতে করে আমাদের আরিচা ঘাট পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। এই যাত্রাকে মহাযাত্রা বলছি এই কারণে যে আমাদের এই যাত্রা কোন সাধারণ যাত্রা ছিল না। এ যাত্রার উদ্দেশ্য যে কোন তীর্থ যাত্রার চেয়েও অনেক বেশী মহৎ এবং যাত্রাপথ ছিল শুরু থেকে গন্তব্য পর্যন্ত বন্ধুর ও কন্টকাকীর্ন। মানুষ তীর্থ যাত্রা করে আপন পাপ স্খলন করতে, নিজের ও নিজ পরিবারের ইহকালের সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও পরকালে স্বর্গলাভের আশায়। সে পথে কোন প্রকার বিপদ-আপদ থাকে না, সকল ব্যবস্থা নিশ্চিত হওয়ার পরই এই যাত্রা শুরু হয়। অনেকে আবার আপন মর্যাদা ও অর্থের দ্বারা এই যাত্রাকে বেশ আরামদায়ক ও বিলাশবহুলও করে থাকেন। কিন্তু আমাদের এই যাত্রা নিজেদের সুখ, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য নয়, এ যাত্রা জাতি-ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বাংলার সকল মানুষের নিরাপত্তা ও সুখ-শান্তি নিশ্চিত করার জন্য, তাদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। এ পথে যে কোন সময় যে কোন দিক থেকে বিপদ আসতে পারে এবং কোন প্রকার আরাম-আয়েশের কিংবা বিলাসিতার প্রশ্নই উঠে না। আমাদের এ যাত্রা ছিল বাংলার মানুষের প্রাণ রক্ষার জন্য, বাঙালি নারীর মর্যাদা রক্ষার জন্য, বাঙালি জাতিকে চিরতরে নিশ্চিন্হ করার অপচেষ্টাকে প্রতিহত করার জন্য, বাংলার আপামর জনতার মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য, বাংলাদেশের মাটি থেকে পাকিস্থানী হানাদার ঘাতকদের চিরতরে উচ্ছেদ করে বাংলার স্বাধীনতা লাভের জন্য বাঙালির সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মহাযাত্রা। প্রথম থেকেই আমাদের এই যাত্রা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপদজনক ছিল তার কারণ আমরা বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের বক্তৃতার একটি রেকর্ড সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছিলাম আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে প্রচার করে পাকিস্তানী অসভ্য বর্বরতার বিবরণ এবং বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা বঙ্গবন্ধুর বজ্রকন্ঠে ঐশী বাণীর মত ঘোষণি ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ভারতসহ পৃথিবীর সব সভ্য জাতির কাছে পৌঁছে দেবার জন্য। পথে কোথাও যদি পাকিস্তান আর্মী বা তাদের অবাঙালি দোশর কিংবা বাঙালি দালাল, রাজাকার এই রেকর্ডের কথা জানত, যা ওদের কাছে একটি পরমাণু বোমার চেয়েও ভয়ংকর তাহ’লে আমাদের নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার কোন উপায় থাকত না। এই রূপ বিপদের সবচাইতে বেশী সম্ভাবনা ছিল মোহাম্মদপুর ও মীরপুর দিয়ে যাওয়ার সময়। ওয়াহিদ ভাই এর কন্ঠে শোনা রবীন্দ্র সংগীতের কথা ‘ওঠো ওঠো জয়রথে তব জয় যাত্রায় যাওগো’, শুনে মনে হোল আমাদের এ যাত্রাওতো জয়যাত্রা। কারণ এই যাত্রার চুড়ান্ত উদ্দেশ্যইতো ছিল জয়। আর তাই আমরা বাঙালিরা জীবন বাজি রেখে সেই জয় ছিনিয়ে এনেছি ১৬  ডিসেম্বর ১৯৭১-এ পাকিস্তানী দস্যুদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়ে।

হাসান ভাইকে ফুলবাড়িয়া থেকে তুলে নিয়ে আমরা আরিচা ঘাটে পৌঁছে দেখি একটি মাত্র লঞ্চ প্রচুর যাত্রী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরও যাত্রী নেওয়ার জন্য। এরই মধ্যে হঠাৎ এক সুদর্শন যুবক ঐ লঞ্চ থেকে হাসান ভাইকে ডাকলো। হাসান ভাই ফিরে তাকিয়ে বলে উঠলেন আরে জাফর যে, কি খবর? তারপর আমরা সবাই মিলে ২৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে লঞ্চে উঠে পরলাম। পরে হাসান ভাইর কাছে জানতে পারলাম ঐ ঢাকা চলচ্চিত্র জগতের জনপ্রিয় নায়ক জাফর ইকবাল।

আমরা ওপারে দৌলতদিয়া ঘাটে নেমে একটি বাস নিয়ে কামারখালি পর্যন্ত যেয়ে একটা খালি ট্রাক পেয়ে যাই এবং সেটা নিয়ে সন্ধ্যার পর মাগুরায় পৌঁছে সরাসরি কমলদের বাড়ীতে উঠি। ওখানে খালাম্মা (কমলের মা) ও বেবী ভাই আমাদের খাওয়া-দাওয়া ও রাতে থাকার সুন্দর বন্দোবস্ত করে দিলেন। এরই মধ্যে আমাদের আসার খবর পেয়ে মাগুরার আওয়ামী লীগ নেতা জনাব সোহরাব হোসেন এমসিএ ছুটে এলেন আমাদের কাছে ঢাকার পরিস্থিতি সম্বন্ধে বিস্তারিত জানতে এবং বেশ রাত পর্যন্ত ওখানকার পরিস্থিতি ও ওদের প্রস্তুতির কথাও জানালেন। পরদিন সকালে ঊঠে আমাদের বন্ধু ওয়ালিউল ইসলাম, এসডিও মাগুরার সাথে দেখা করতে গেলাম। ওয়ালি ভাইকে দেখে আমরা কিছুটা অবাক হোয়ে গেলাম, তার চুল উস্কখুস্ক, জামা কাপড়ে ধুলোবালি, আমাদের জানালেন যে আমাদের আরও দুই বন্ধু ঝিনাইদহের এসডিপিও মাহবুবুদ্দিন আহমেদ ও মেহেরপুরের এসডিও তৌফিক এলাহী চৌধুরীর সাথে সার্বক্ষিণিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন এবং পরস্পরের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নিচ্ছেন। স্থানীয় জনগণ ও আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মীদের সাথে নিয়ে যথাযথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং যথাসম্ভব গোলা-বারুদ ও অস্ত্র-সস্ত্র সংগ্রহ করেছেন। মাগুরা থেকে আমরা তার দেওয়া জীপ নিয়ে ঝিনাইদহে মাহবুবের ওখানে গেলাম। মাহবুবের ওখানে যুদ্ধের প্রস্তুতি আরও কঠোর ও দুর্ভেদ্য মনে হলো।

যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেশ কিছু বাঙালি সৈনিক কিছু হাল্কা ও মাঝারি ধরনের অস্ত্র সস্ত্র ও গোলা-বারুদ সহ পালিয়ে এসে মাহবুবের সাথে যোগ দিয়েছে। মাহবুব ওর প্রস্তুতি সম্বন্ধে আমাদের কিছুটা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিল। আমরা ঐ রাত ওখানে থেকে সকালে মেহেরপুরের পথে মাহবুবের দেওয়া একটি খোলা জীপে রওয়ানা হলাম। মীরপুরের পর থেকে আরিচা, দৌলতদিয়া, কামারখালি, মাগুরা, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা হয়ে মেহেরপুর পর্যন্ত সমস্ত পথের দুইদিক থেকে গ্রামের মানুষ আমাদের দেখে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ধ্বনি দিতে থাকে এবং আমরাও তাদের সাথে গলা মিলিয়ে একই ধ্বনি দেই। ঢাকা থেকে যতই দূরে আসছিলাম রাস্তার উপর প্রতিবন্ধকতা ততই বাড়ছিল। যে কারণে ঘুরে ঘুরে আসতে আমাদের অনেক বেশী সময় লেগেছিল। তিন চার ঘন্টার পথ অতিক্রম করতে প্রায় ছয় সাত ঘন্টারও বেশী  লেগেছিল।

তৌফিক আর মাহবুবও ওয়ালিউল ইসলামের মত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। তার উপর চুয়াডাঙ্গার এসডিও ছিল এক অবাঙালি যুবক, তার নিরাপত্তার জন্য তৌফিক তাকে বন্দী করে ওখানে হাজতে রেখেছিল। তৌফিকের মতে সে আমাদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। কিছুদিন পর তৌফিকের কাছে জানতে পারি যে ঐ বেচারাকে মুক্তিযোদ্ধাদের হাত থেকে বাঁচাতে পারেনি। আমরা ঐ রাত মেহেরপুরে থেকে পর দিন সকালে বেতাই সীমান্তে মুক্তিবাহিনী ক্যাম্পের পথে যাত্রা শুরু করি। ঐ ক্যাম্পের প্রধান ছিলেন মেজর আযম চৌধুরী এবং ওখানে আমাদের হুদা ভাইর (কর্ণেল হুদা, ১৯৭৫ এর নভেম্বরে শহীদ হন) সাথেও দেখা হয়। তিনি জানালেন যে দুই এক দিনের মধ্যেই অন্য কথাও দায়িত্ব নিয়ৈ চলে যাবেন।

ওরা দুজনেই আমাদের দেখে বেশ খুশী হলেন, ঢাকার বিস্তারিত খবর জানতে চাইলেন। ওদের কাছেই জানতে পারলাম যে ওখানে দুজন বিদেশী সাংবাদিক আমাদের আসার খবর পেয়ে আমাদের সাথে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করছে। একজন ছিল মনট্রিয়াল স্টারের ও অন্যজন শিকাগো হেরালড ট্রিবুনের সাংবাদিক। ওদের নাম এই মুহূর্তে মনে করতে পারছিনা বলে দুঃখিত। ওদের কাছেই জানতে পারলাম যে আমরাই প্রথম দল যারা সরাসরি ঢাকা থেকে এই পর্যন্ত এসেছে। তাই ওরা আমাদের কাছ থেকে ঢাকার পরিস্থিতির প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ শুনতে অত্যন্ত উদগ্রীব। আমরা বিশেষ করে ওয়াহিদ ভাই যিনি তখন ঢাকার একটি অতন্ত জনপ্রিয় ইংরেজী দৈনিক পিপলের একজিকিউটিভ এডিটর, আর হাসান ভাই ওদের বেশীরভাগ প্রশ্নের উত্তর দিলেন। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, জগন্নাথ হল, রোকেয়া হল, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ইপিআর (বিডিআর) ক্যাম্প-এর উপর পাকিস্তানি আর্মির হত্যাযজ্ঞ ও বর্বরতার বর্ণনা দিলেন। কমল, কাজী ইকবাল ও আমিও ওদের কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর দিলাম। শুনেছি আমাদের এই ইন্টারভিউ নাকি ওদের কাগজে প্রথম পৃষ্ঠায় বেশ গুরুত্বসহ ছাপা হয়েছিল, দুঃখের বিষয় ওটা দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। দি পিপল পত্রিকার অফিসটি পাকিস্তান আর্মী ২৫ মার্চ রাতেই পুড়িয়ে সম্পুর্ণ ভস্মীভূত করে দেয় এবং এর কিছুদিন পর হাসানভাইকে না পেয়ে তার এলিফেন্ট রোডের বাড়ীটিও পুড়িয়ে দেয়।

পরের দিন সকালে উঠে রওয়ানা হলাম। প্রথমে বাস, তারপর ট্রেনে শিয়ালদহ স্টেশন। তারপর ট্যাক্সী নিয়ে যখন সোজা পার্ক সার্কাসে হাসান ভাইর মামা জনাব মনসুর হাবিবুল্লাহ সাহেবের দিলকুশা রোডের বাড়ীতে এসে উপস্থিত হলাম তখন রাত দেড়টা। হাসান ভাই মামা বাড়ীর আবদারের মত বাইরের প্রধান ফটকে ধাক্কা দিতে লাগলেন আর মামা, মামা বলে প্রায় চিৎকার শুরু করলেন। একপর্যায়ে বেশ জোরে জোরে দরজায়ে ধাক্কা দিতে থাকলেন, প্রায় পাড়া প্রতিবেশীদের ঘুম ভাঙ্গানোর উপক্রম হতে যাচ্ছিল। এমন সময় কে, কে ওখানে বলে মামা বেড়িয়ে এলেন তার পিছে পিছে মামীও। ঐ রাতে আমাদের সবাইকে সামনে দাড়ানো দেখে মামা, মামী দুজনেই এমন অবাক হয়ে তাকালেন। একেবারে যাকে বলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা যেন চোখের সামনে সাক্ষাত যমকে দাঁড়ানো দেখলেও বোধ হয় এতটা হতবাক হতেন না। একটু পরে চমক ভাঙ্গার পর আমাদের সবাইকে আমন্ত্রণ ক’রে মামার চেম্বারে বসালেন। তারপর আমাদের সাথে পরিচয়পর্ব শেষে হাসান ভাইকে নিয়ে দুজনে বাড়ীর ভিতরে প্রবেশ করলেন এবং কিছুক্ষণ পরে তিনজনই চেম্বারে ফিরে এলেন। মামা-মামী দুজনেই আমাদের সবার পরিবারের বিস্তারিত খোজ খবর নিলেন। ঐ গভীর রাতে মামীর তৈরী খাবার খেয়ে, আমরা ঐ রাত মামার চেম্বারের মেঝেতে বিছানা করা শুয়ে পড়লাম।

মামা, মামী দুজনেই অত্যন্ত ভালো মানুষ, মামীতো সাক্ষাত দেবী। মামা কলকাতা হাইকোর্টের প্রখ্যত এডভোকেট এবং সিপিএম-এর একজন শীর্ষ স্থানীয় নেতা ছিলেন। পরে সিপিএম পশ্চিম বাংলায় ক্ষমতায় এলে মামা জ্যোতিবসুর সরকারে প্রথমে আইন ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী এবং পরে পশ্চিম বাংলা বিধান সভার বিধায়ক (স্পীকার) নিযুক্ত হন।

আকাশবাণী কলকাতায় মামা অনেককেই চিনতেন, তাই পরের দিন সকালে আমরা বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের বক্তৃতার রেকর্ড নিয়ে মামার সাথে আকাশবাণী কলকাতায় সোজা অনুষ্ঠান পরিচালক, শ্রী সন্তোষ কুমার দত্তের অফিসে গেলাম। সেখানে ওর সাথে বসে ছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক মনোজ বসু ও সেই সময়ে বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে প্রিয় কন্ঠের অধিকারি শ্রী দেব দুলাল বন্দোপাধ্যায়। ওদের ওখানে দেখে আমাদের অবস্থা আগের রাতে আমাদের দেখে মামা-মামীর যেমন হয়েছিল অর্থাৎ একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। যাহোক, ওদের সাথে কিছুক্ষণ আলাপ করে রেকর্ডটা সন্তোষ বাবুকে দিয়ে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম। মামা চলে গেলেন হাইকোর্টে আর আমরা গেলাম ৯ নম্বর সার্কাস এভিনিউ, পাকিস্তান ডেপুটি হাইকমিশন অফিসের সামনে। ডেপুটি হাই কমিশনার ছিলেন জনাব হোসেন আলী। তখন জোর গুজব যে ডেপুটি হাই কমিশনের সব বাঙালি কর্মচারী যেকোন সময় ডিফেক্ট করতে পারেন। ডেপুটি হাই কমিশনে বাঙালিদের অন্যতম আনোয়ারুল করিম চৌধুরী তখন তৃতীয় সচিব যিনি কয়েক বছর আগে জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের স্থায়ী প্রতিনিধীর দায়িত্ব পালন শেষে অবসর গ্রহণ করে জাতীসংঘে আন্ডার সেক্রেটারী জেনারেল পদে নিযুক্ত হন। শহীদ এ এস এম এস কিবরীয়ার পরে ঐ উচ্চতম পদে দ্বিতীয় বাঙালি। তার এবং অন্যান্য কয়েক জন সহকর্মীর অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলে অবশেষে ১৮ই এপ্রিল অর্থাৎ ১৭ই এপ্রিলে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার মুজিবনগরে শপথ গ্রহণের পরের দিন জনাব হোসেন আলী সকল বাঙালি অফিসার এ কর্মচারীদের নিয়ে পাকিস্তান সরকারের চাকুরি ত্যাগ করে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন। একমাত্র জনাব আর আই চৌধুরী (বঙ্গবন্ধুর অন্যতম খুনী মেজর ডালিমের শ্বশুর) ছাড়া। জনাব আর আই চৌধুরী বেশ কিছুদিন পর অনেকের অনেক চেষ্টার ফলে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন। এখানে উল্লখযোগ্য যে ৩নং সোহরাওর্দী এভিনিউর তিন তলা বাড়ীর এক তলায় জনাব আনোয়ারুল করিম চৌধুরী, দোতলায় জনাব খন্দকার আসাদুজ্জামান যিনি টাঙ্গাইলের ডিসির পদ ছেড়ে সীমান্ত পেড়িয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থ সচিব নিযুক্ত হয়ে তার পরিবার নিয়ে মাত্র কিছুদিন আগেই ঐ বাড়ীতে উঠেন।

সিপিএম এর অনেক সিনিয়র নেতা এবং তাদের পরিবারের সাথেও হাসান ভাইর বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেখে আমরা কিছুটা আশ্চর্য্ই হয়েছিলাম। এর আরও ভাল প্রমাণ পেলাম হাসান ভাইর সাথে একদিন সিপিএম এর এক কিংবদন্তী নেতা শ্রী হরে কৃষ কুঙ্গার, মাত্র ১২ বছর বয়সে যার আন্দামানে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হয়েছিল তাঁর বাড়ীতে যেয়ে। অতি সাধারণ একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের বাড়ী, প্রথমে ঢুকেই একটা ঘর তার এক পাশে তিনটা কাঠের চেয়ার ও ছোট একটা কাঠের টেবিল, বেশ পুরান আর একপাশে একটা অতি প্রাচীন খাট, একটা মলিন রঙ্গীন চাদরে ঢাকা বিছানা তার উপর অর্ধশায়িত আমাদের কিংবদন্তী নায়ক লম্বা লম্বা হাত পা, কৃশকায়, শ্যামলা রং (প্রায় কালো), লম্বা খাড়া নাক, প্রশস্ত কপাল, মাথায় কাঁচা পাকা চুল অবিন্যস্ত, পঞ্চাশ উর্ধ এক পুরুষ। হাসান ভাইকে দেখে উঠে বসে সোৎসাহে আশ্চর্য রকমের দরাজ কন্ঠে বলে উঠলেন আরে পিন্টু যে (হাসান ভাইর ডাক নাম যে পিন্টু এই প্রথম জানতে পারলাম) এসো এসো। কুশল বিনিময় ও আমাদের পরিচয়পর্ব শেষে ওর স্ত্রীকে ডাকলেন, আরে দেখে যাও কে এসেছে। কিন্তু ভদ্রমহিলার আসার আগেই হাসান ভাই চলে গেলেন বাড়ীর ভিতরে। আমরা বাইরের ঘর থেকে হাসান ভাইর গলা শুনতে পেলাম, কাকীমা কেমন আছেন? একটু পরে ওরা দুজনেই বাইরের ঘরে ফিরে এলেন, হাসান ভাই আমাদের সাথে ওর পরিচয় করিয়ে দিলেন। আলাপ আলোচনা ও চা-মুড়ি পর্ব শেষে আমাদের বিদায় দিতে এসে সিপিএম নেতা হাসান ভাইকে আশ্বাস দিয়ে বললেন আমাদের পক্ষ থেকে তোমাদের সকল প্রকার সাহায্য ও সহযোগিতা দিতে চেস্টা করব। আমরা সবাই ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে খুশীমনে সেদিনের মত বিদায় নিলাম। তারপর আর একদিন আমি, ওয়াহিদ ভাই, হাসান ভাই, কমল ও বড়বাবু সিপিএম এর এক সদস্যের একটা বেশ পুরানো কনভার্টিবল গাড়ীতে করে প্রখ্যাত বৈজ্ঞানিক অধ্যাপক সত্যেন বোসের বাড়ীতে যাই, উদ্দেশ্য ঐ ক্ষনজন্মা পুরুষকে স্বচক্ষে দেখা এবং তাঁকে পাকিস্তানী বর্বরতার কথা এবং আমাদের সংগ্রামের কথা জানাতে আর সেই সাথে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থনের অনুরোধ জানিয়ে পৃথিবীর বিখ্যাত কিছু বৈজ্ঞানিক দার্শনিক ও আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দের কাছে আমাদের এই সংগ্রামে তাদের সহযোগিতা কামনা করে তার কাছ থেকে একটা আবেদনপত্র সংগ্রহ করতে।

হাসান ভাইর সৌজন্যে জ্যোতিবসুর সাথেও আমার একবার দেখা করার সৌভাগ্য হয়েছিল। আজ থেকে প্রায় ৩৭ বছর আগেও পশ্চীম বাংলার এই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও সিপিএম নেতা বর্তমানের মতই কেতা-দুরস্থ ছিলেন। ধবধবে সাদা সদ্য ইস্ত্রি করা ধুতি পাঞ্জাবী পরিহিত অতি পরিচ্ছন্ন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব।

এরই মধ্যে আমাদের অনান্য বন্ধুরাও সীমান্ত পেড়িয়ে এসে পড়েছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে এবং নিয়মীত অনুষ্ঠান প্রচার শুরু করেছে। অতিশয় জনপ্রিয় এম আর আক্তার মুকুলের চরম পত্র ছাড়াও নিয়মিত বাংলা ও ইংরেজী সংবাদ প্রচার হচ্ছে। হাসান ভাই সালেহ আহমেদ ছদ্য নামে বাংলা সংবাদ এবং আমাদের আরেক বন্ধু, আলী যাকের, আবু তাহের নামে ইংরেজী খবর পড়ত।

বেনুর সৌজন্যে ওয়াহিদ ভাইর সাথে আমাদের পরিচয় ষাটের দশকের গোড়ার দিকে ছায়ানটের প্রতিষ্ঠার সময় থেকে। প্রথম পরিচয়ের পর থেকেই ওয়াহিদ ভাই আমাদের সবার অত্যন্ত প্রিয় এবং শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে উঠেন। ওয়াহিদ ভাইর প্রায় সকল বিষয়ে অগাধ পান্ডিত্য আমাদের সবাইকে প্রথম পরিচয়েই মুগ্ধ করেছিল। আর হাসানভাইকে আমার কাছে থেকে জানার সৌভাগ্য হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময়। হাসান ভাইর অমায়িক ব্যবহার সবাইকে খুব সহজেই আকর্ষণ করে। আমাদের সাথে যাত্রার প্রথম থেকেই হাসান ভাইকে প্রায়ই দেখতাম অন্যমনস্ক হয়ে পরতে আর মাঝে মাঝে দু হাতে মুখ ঢেকে চোখ মুছতে। স্ত্রী ও শিশুকন্যা সঙ্গীতাকে রেখে এসে বারবার তাদের চিন্তায় কাতর হয়ে পরতেন। কোলকাতা এসে নানা কাজে ব্যস্ত থাকায় কিছুটা মানিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আবার মানসিক অশান্তিতে ভুগতে শুরু করলেন। আমরা সকলেই আপনজনদের ছেড়ে এসে তাদের জন্য প্রায় সব সময়ই মানসিক অশান্তিতে দিন কাটাতাম।

আমি যেদিন ঢাকা থেকে রওয়ানা হই তার আগের দিন থেকেই আমার মাত্র কয়েক মাসের শিশু ভাগ্নী তুপ্তী ১০৩ ডিগ্রি জ্বরে ছটফট করছিল। আমার যাত্রা পথে শুধু ওর ঐ অসুস্থ শিশু মুখখানি বারবার আমার চোখের দৃষ্টিটাকে ঝাপসা করে দিচ্ছিল। আজও সেই কথা মনে হলে ভীষণ অনুতাপ বোধ করি।

আমাদের পাঁচ জনের মধ্যে তখন শুধু ওয়াহিদ ভাই ও হাসান ভাই বিবাহিত ও সন্তানের জনক। যতদূর মনে পড়ে মে মাসের মাঝামাঝি কোন এক সময়ে ঠিক হোল হাসান ভাই আর আমি বাংলাদেশে ফিরে যাব রোজী ভাবী আর সঙ্গীতাকে নিয়ে  আসতে। সেই মত আমরা ইন্ডিয়ান এয়ার লাইনসে এ চৌধুরী ও বি চৌধুরী নামে দুই ভাই কোলকাতা থেকে গৌহাটী যাওয়ার ওয়ান ওয়ে টিকেট নিয়ে দমদম এয়ারপোর্টে পৌঁছালাম এবং প্রাথমিক ফরমালিটিস সম্পন্ন করে যথা সময়ে চেক-ইন করে অপেক্ষামান বিমানে উঠে নির্ধারিত আসনে গিয়ে বসলাম। দুঃঝের বিষয় বিমানে প্রচুর যাত্রী হওয়ার কারণে আমরা পাশাপাশি সীট পাইনি, আমার সীটটা হাসান ভাই এর সীটের দুই সীট সামনে একই সারিতে পেলাম। সকল যাত্রী নিজ নিজ আসনে বসে পড়ার একটু পরেই এক সুন্দরী বিমানবালা তার সুললিতকন্ঠে আমাদের অনুরোধ করলো যার যার সীট বেল্ট লাগিয়ে নিতে। এরপর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে আমাদের নিয়ে বিমান মাটির উপর দিয়ে আস্তে আস্তে চলতে শুরু করল। কিছুদূর যেয়ে স্পীড ক্ষাণিকটা বাড়িয়ে দিল। আমার তখন একটা বাংলা মনে পড়ে গেল ‘ঘড়ায় চড়িয়া মর্দ হাটিয়া চলিল, কত দূর যাইয়ে মর্দ্য রওয়ানা হইলো’। কিন্তু আমাদের মর্দ্য হঠাৎ থেমে গেল। এদিকে দেখি সেই সুন্দরী বিমানবালা হাসান ভাইয়ের কাছে এসে কি যেন জিজ্ঞেস করছে আর হাসান ভাইও করুণভাবে কি যেন সব বোঝানোর চেষ্টা করছেন। একটু পরে বিমান আবার চলতে শুরু করল, আমি ভাবলাম টেক অফের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এরই মধ্যে দেখলাম ঐ বিমালবালা ককপীটের দিক থেকে একজন পাইলোটকে (খুব সম্ভব ক্যাপটেন) নিয়ে আবার হাসান ভাইয়ের কাছে আসল। এবার দুজনে মিলে হাসান ভাইয়ের কাছে আসল। এবার দুজনে মিলে হাসান ভাইকে কি যেন বোঝানোর চেষ্টা করছে আর হাসান ভাই মাথা ও হাত নেড়ে কি যেন নিষেধ করে যাচ্ছেন। ওরা আবার ককপীটে ফির গেলে আমি হাসান ভাইর কাছে যেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কি ব্যাপার ওরা আপনাকে কি বলছিল? উত্তরে জানালেন যে ওর কেমন যেন অস্থির লাগছিল, কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসছিল, শ্বাস নিতে কস্ট হচ্ছিল কিন্তু এখন একদম ভালো হয়ে গেছেন।

আমি শুনে বললাম যে আপনার বোধহয় ক্লস্ট্রোফোবিয়া হয়েছে, আমি শুনেছি ক্লস্ট্রোফোবিয়া হলে এমন হয়। এই কথাবার্তার মধ্যে হঠাৎ মনে হোল প্লেন থেমে গেছে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি আমরা যেখান থেকে বিমানে উঠেছিলাম ঠিক সেখানেই ফিরে এসেছি। আমাদের প্লেন টার্মিনাল ভবনের সামনে দাড়িয়ে। প্লেনের সিড়ি লাগানো হলো, বিমানের দরজা খোলা হলো। পাইলোট এসে হাসান ভাইকে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে জানালো যে তাকে নেমে যেতে হবে কারণ তার অবস্থা কন্ট্রোল টাওয়ারে জানানোর পর তাকে নিয়ে ঊড়তে নিষেধ করা হয়েছে। সাথে সাথে এও জানালো যে তার জন্য বিমানের নীচে মেডিকেল টীম হুইল চেয়ার নিয়ে অপেক্ষা করছে। অগত্যা একপ্রকার বাধ্য হয়েই আমাদের বিমান থেকে ব্যর্থ মনেরথ হয়ে অবতরণ করতে হলো।

বিমান থেকে বেরিয়ে দেখি নীচে সত্যিই হুইল চেয়ার নিয়ে একজন নার্স ও তার পাশে একজন ডাক্তার আর একজন সহকারি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাসান ভাইকে দেখে ওরা এগিয়ে এলো আর হাসান ভাই ওদের পাশ দিয়ে মাতৃগর্ভে প্রাপ্ত আপন দুই পায়ে গড় গড় করে হেঁটে টার্মিনাল বিলডিঙের দিকে চলে গেলেন আর মেডিকেল টীম হাঁ ক’রে তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকলো।

ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ আমাকে জানালো যে যেহেতু আমার কিছু হয়নি তাই আমি ঐ ফ্লাইটে না গেলে ওরা আমার টিকেটের মূল্য ফেরত দিবে না উত্তরে আমি জানালাম যে আমার পক্ষে অসুস্থ বড়ভাইকে রেখে একা গৌহাটী যাওয়া সম্ভব নয়। অতএব আমাকে তার সাথে তার দেখাশুনা করতে ফিরে যেতে হবে। তারপর ওখান থেকে বেরিয়ে হাসতে হাসতে আমার প্রায় দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। দমদম থেকে কোলকাতা পর্যন্ত পুরোটা রাস্তা আমরা দুজনে মিলে বিশেষ করে ঐ ডাক্তার ও নার্সের চেহারা ভিসুয়ালাইজ করে এত হেসেছিলাম যে বোধহয সাড়া জীবনেন হাসির কোটা পূর্ণ হয়ে গেছে।

আমার মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণকালীন অনেক ছোট বড় ঘটনার থেকে দুটি মর্মান্তিক ঘটনার উল্লেখ করব। প্রথমটি আমার অত্যন্ত স্নেহের পাত্র, মুক্তিযুদ্ধে যাত্রার সহযাত্রী এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী ইকবালকে (বড় বাবু) কেন্দ্র করে আর দ্বিতীয়টি এক বীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে। তিনি তৎকালীন ইপিআর-এর হাবিলদার দেলোয়ার হোসেন যিনি মাতৃভুমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য পাকিস্তানী শত্রুর গুলিতে প্রাণদান করে শহীদ হন ।

আমি মুক্তিযুদ্ধে ছিলাম ৮ নম্বর সেক্টরে, প্রথমে বানপুর ও ভোমড়া ক্যাম্পে। ৮ নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত এবং মেজর এম এ মঞ্জুর ছিলেন অগাস্ট থেকে মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যন্ত।

জুন মাসের প্রথম দিকে আমি কাজী ঈকবাল (বড় বাবু) আর রব্বানী ৮ নম্বর সেক্টরের অধীন সাব-সেক্টর বানপুর ক্যাম্পে ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজুর রহমানের (প্রাক্তন সেনা প্রধান) অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। কাজী ইকবাল (বড় বাবু) ওখানে যাওয়ার দুইদিন পরে এক অপারেশনে যেয়ে দর্শনার কাছে একটা বড় ব্রিজ এক্সপ্লোসিভ দিয়ে ধংস করে ফিরে আসার পথে পাকিস্তানী সেনাদের হাতে ধরা পড়ে। এই খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত ক্যাম্পে দারুণ এক শোকের ছায়া নেমে আসে। ২৫ মার্চের অভিজ্ঞতার পর আমাদের সবার মনে ওর একমাত্র চরম পরিণতির কথা ছাড়া আর কোন পরিণতির কথা ভাবতেই পারিনি। তারপর অনেকদিন ওর কোন খোঁজ খবর না পেয়ে আমরা সবাই ধরে নিয়েছিলাম আমরা যা ভয় করেছিলাম হয়তো তাই হয়েছে। ওকে পাকি সেনারা আর এতদিন জীবিত রাখেনি। বড়বাবু ধরা পরার পরে আমাদের ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজের অধীনে বানপুর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের সকল সদস্যর প্রথম দায়িত্ব হল বড়বাবুকে যারা পাক সেনাদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে তাদের নেতা ও স্থানীয় শান্তিবাহিনীর সভাপতি আবদুল মালেক মোল্লাকে যেভাবে হোক ধরে নিয়ে আসা। এই মোল্লার দোতলা বাড়ীর ছাদের উপর পাক বাহিনী অবজারভেটোরি বানিয়ে ঐ এলাকার চতুর্দিকে বিশেষ করে আমাদের ক্যাম্পের দিকে লক্ষ্য রাখত। বড়বাবু ধরা পড়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই আমাদের ক্যাম্পের একটি দল একজন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধার নেতৃত্বে এক রাতে মোল্লার বাড়ীতে হানা দিয়ে ওকে হাত ও চোখ বেঁধে আমাদের ক্যাম্পে এনে সোজা ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজের সামনে হাজির করে।

আমরা সবাইতো একেবারে হতবাক, কারও মুখে টু-শব্দটি নেই। ক্যাপ্টেনের নির্দেশে ওর চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হোল। সে নিজের অবস্থান বুঝে এবং আমাদের সবাইকে সামনে দেখে হাউমাউ করে ক্যাপ্টেনের পায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল আর বলতে লাগল ‘স্যার আমি নির্দোষ, আমি কোন অপরাধ করি নাই, ইনারা আমারে খালি খালি ধরে নিয়ে আসিছে’। যেইনা বলা, আর যায় কোথায়, সাথে সাথে ঐ স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ছেলেটি ওকে ক্যাপ্টেনের পায়ের সামনে থেকে চুল ধরে টেনে তুলে রীতিমত কিল, থাপ্পড়, লাথি ও ঘুষি মারতে শুরু করে আর সেই সাথে বলতে থাকে স্যারের সামনে বল, তুই আর তোর শান্তিবাহিনীর লোকেরা মিলে আমাদের ইকবাল স্যারকে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দিয়েছিস, তোর বাড়ীকে পাকসেনাদের ক্যাম্প বানিয়েছে। তোর দোসররা তাদের মদদ করে, মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের লোকদের উপর অত্যাচার করে এবং তাদের বাড়ীঘর জ্বালিয়ে পূড়িয়ে ছাই করে দেয় আর মুক্তিযোদ্ধের পাক সেনাদের হাতে ধরিয়ে দেয়। তুই তাদের টাকা পয়সা দিয়া সাহায্য করিস। এরকম আরও কিছুক্ষণ চলার পরে এক পর্যায়ে মোল্লা সাহেব স্বীকার করতে বাধ্য হল যে পাকিস্তানী সেনারা তার বাড়ীতে প্রায় এক মাস যাবত ক্যাম্প করে আছে এবং তাকে দিয়ে জোর করে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে কাজ করায় কিন্তু সে কখনও মুক্তিযুদ্ধের কাজ করতে চায়না কারণ সে বরাবরি মওলানা ভাসানীর দল ন্যাপ করে। দুঃক্ষের বিষয় তার একথা যেমন দোসর পাকিস্তানীরা বিশ্বাস করেনি তেমনি তাদের শত্রু  এই মুক্তিযোদ্ধারাও বিশ্বাস করলনা। কারণ তার এই দাবীটি সর্বৈব মিথ্যা। এলাকাবাসী সবাই জানে যে সে একজন কুখ্যাত মুসলিম লীগার এবং সেচ্ছায় শান্তিবাহিনীর চেয়ারম্যানের আর্কষণীয় পদটি অলংকৃত করেছেন এবং এর জন্য মোটা অংকের দক্ষিণাও দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তার ভাষ্য অনুযায়ী তার সন্মানিত অতিথিরা যাদের জন্য প্রায়ই প্রচুর পরিমাণ মুরগী, ডিম, পরটা, বিরীয়ানী ও কয়েকটি করে খাশির বন্দবস্ত করা হোত। তাই যাবার একদিন আগে তাদের পাকিস্তানী স্টাইলে তার দুই কন্যা, এক পুত্রবধু, তার নিজের স্ত্রী এমনকি তার বাড়ীর কাজের প্রায় নাবালিকা দুটি মেয়েকেও বলাৎকারের শিকার করে যায়। ওদের চরিত্র এতই জঘন্য যে ওদের পশু বলে সম্বোধন করলে পশুকুলেরই অপমান করা হয়। যাহোক, মালেক মোল্লার এই হৃদয়বিদারক কাহিনী শোনার পরেও আমাদের মুক্তিবাহিনীর বিচারের রায়কে কোনভাবেই প্রভাবান্বিত করতে পারেনি। রাত প্রায় নয়টার পরে তাকে আমাদের ক্যাম্পের বাইরে নিয়ে যেয়ে গুলি করে হত্যা করে তার লাশটিকে নিয়ে তার বাড়ীর উঠানে রেখে একটা কাগজে ‘বিশ্বাসঘাতকেরা সাবধান, রাজাকারের শাস্তি’ কথাগুলো লিখে বুকের উপরে লাগিয়ে রেখে আসা হয়।

অবশেষে অগাস্ট মাসের মাঝামাঝি কোন এক সময় আমরা জানতে পারি যে আমাদের সবার কনিষ্ঠ, সবার প্রিয় বড় বাবু (কাজী ইকবাল) বেঁচে আছে এবং তাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দী করে রাখা হয়েছে। পরে কোন এক সময়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং অবশেষে বিজয় দিবসের দিন ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১-এ সে মুক্তি লাভ করে।

আমাদের আরেক বন্ধু ও সহযাত্রী কমল সিদ্দিকী, বীর উত্তমের ডান চোখটি ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনার সারেন্ডারের ঠিক দুইদিন আগে শত্রুর গুলিতে উড়ে যায়।

দ্বিতীয় ঘটনাটি আরও মর্মান্তিক। অগাস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে আমি আর মাহবুব ৮ নম্বর সেক্টরের অধীন তৎকালীন খুলনা জেলার ভোমড়া সাব-সেক্টরে ক্যাপ্টেন সালাউদ্দীনের অধীনে তার ক্যাম্পে যোগদান করি। এর দুইদিন পরে ক্যাপ্টেন সালাউদ্দীন মাহবুবকে এই ক্যাম্পের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে হেডকোর্য়াটারে রিপোর্ট করেন। মাহবুব আর আমি ক্যাপ্টেনের তাবুতে ঘুমাতাম। প্রথম দুইদিন আমরা ঐ এলাকার ‘রেকি’ (রিকনেইসানসকে মিলিটারিতে সংক্ষেপে রেকি বলা হয়) করে কাটলাম এবং এর মাঝেমাঝে স্থানীয় লোকজনদের সাথে আলাপ করে যতটা সম্ভব ঐ এলাকায় পাকি বাহিনীর অবস্থান এ গতি বিধি জেনে নিলাম। এই ক্যাম্পে আমাদের দ্বিতীয় দিন হঠাৎ রাত ১:৩০ মিঃ এর সময় সীমান্তের কাছে এক বেরিবাঁধের দিক থেকে প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দ আসছিল এবং মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল কিছু গুলি আমাদের ক্যাম্পের খুবই কাছে এসে পরছিল। মাত্র চার পাঁচ জনকে ক্যাম্পে পাহাড়ায় আমরা সবাই যার যার অস্ত্র, গোলা বারুদ, গ্রেনেড নিয়ে বেরীবাঁধের দিকে শত্রুর সামনা করতে দ্রুত রওয়ানা হই এবং যেদিক থেকে গোলাগুলি হচ্ছিল আমরা তার ঠিক বিপরীতে অবস্থান নিয়ে পালটা আক্রমণ শুরু করলাম। এই ভাবে দুই পক্ষের আক্রমণ ও পাল্টা  আক্রমণে সারারাত কেটে গেল তবুও গোলাগুলি বন্ধের কোন লক্ষণ দেখা গেলনা। মাহবুব অয়্যারলেসের মাধ্যমে আগেই রিয়ার হেডকোয়ার্টারে এই যুদ্ধের সংবাদ জানিয়ে দিয়েছিল। পরেরদিন বেলা প্রায় ২:০০ টার সময় ১৫-২০ জন মুক্তিযোদ্ধার এক রি-ইনর্ফোসমেন্ট যথেস্ট পরিমাণ আর্মস ও গোলাবারুদ লজিস্টিকস সাপোর্ট নিয়ে আসে। প্রায় ১৬-১৭ ঘন্টা দুই দিক থেকে প্রচুর পরিমাণ গুলি হওয়ার পরে বিশেষ করে আমাদের প্রচন্ড আক্রমণের ফলে পাক বাহিনী শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু শেষের প্রায় দুই ঘন্টা পাক বাহিনী তাদের নিহত তিন সৈনিকদের মরদেহ নিয়ে যেতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে থাকে আর আমাদের দিক থেকেও অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বাধা প্রয়োগ করা হতে থাকে। এরই মধ্যে হাবিলদার দেলওয়ার হোসেন অসম সাহসীকতার পরিচয় দিয়ে শত্রুর দিকে ক্রলিং করে এগিয়ে যেতে থাকে এবং আস্তে আস্তে এক নিহত পাকিস্তানী সেনার মৃতদেহের কাছে পৌঁছে যায়। আমাদের দিক থেকে তাকে সারাক্ষনই লংরেঞ্জ শুটিং এর মাধ্যমে নিরাপত্তা ছাউনি দেওয়া হচ্ছিল কিন্তু সে নিহত পাকিস্তানী সেনার মৃতদেহ নিয়ে ফেরার সময় হঠাৎ শত্রুপক্ষের লাইট মেশিনগানের একটা গুলি তার তলপেটে এসে লেগে পিঠে কোমড়ের নীচ দিয়ে বেশ বড় গোল আকারের একটা ফুটো করে বেড়িয়ে গেছে।

এই শহীদের সদ্য মাটিতে লুটিয়ে পড়া দেহটি ওখান থেকে আনতে অনেকক্ষণ যুদ্ধ করতে হয়। অবশেষে আমরা আমাদের বীর শহীদের প্রাণহীন দেহটি আমাদের ক্যাম্পে নিয়ে আসি এবং সেই সাথে যে পাকসেনার মৃতদেহ আনতে যেয়ে আমাদের হাবিলদার দেলোয়ার হোসেন শহীদ হলেন সেই মৃতদেহটিও পাক সেনাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে আমাদের ক্যাম্পে নিয়ে আসতে সক্ষম হই।

শহীদ দেলোয়ারের বয়স ৩০/৩৫ এর বেশী হবে না, উচ্চতা সাড়ে পাঁচ ফুটের একটু কম, বেশ সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন। খবর পেয়ে আমাদের হেডকোয়ার্টার থেকে দুই  তিন জন সিনিয়র আর্মী অফিসার আমাদের ক্যাম্পে আসেন এবং সব বিষয় বিস্তারিত জানতে চান। পাকিস্তানী সেনার পকেটে একটা ৭৫ রুপিজের মানিঅর্ডার রশীদ পাওয়া যায়। ওটা পাকিস্তানে উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের কোন একটি গ্রামের ঠিকানায় পাঠান হয়েছিল খুব সম্ভব ওর স্ত্রী কিংবা মায়ের নামে। ঐ সেনার বয়সও খুব বেশী হলে ৩৫ হবে, বেশ লম্বা প্রায় ৬ ফুটের একটু বেশী হবে। দেখে আমাদের সবারই দুঃখ হল, হয়তো ওকে বাধ্য করা হয়েছিল এই সুদূর দেশে এসে যুদ্ধ করতে। যাহোক যাবতীয় প্রয়োজনীয় করণীয় সব কার্য্যক্রম সমাধা করে শহীদ হাবিলদার দেলোয়ার হোসেনকে যথাযথ মর্যাদার সাথে আমাদের ক্যাম্পের এক পাশে গাছের ছায়ায় সমাধিস্থ করা হয়। পাক সেনার মৃত দেহটি যথাযথ মর্যাদার সাথে আমাদের রিয়ার ফিলড হেডকোয়ার্টারে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা ও অন্যান্য ওফিসিয়াল রীতিনীতি সম্পাদনের জন্য। আমার জীবনে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু আর কখনও দেখিনি। এই ঘটনার পর বেশ কিছুদিন স্বাভাবিকভাবে কোন কাজ করতে পারিনি। এরপর সেম্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ঐ ক্যাম্প থেকে চলে আসি এবং অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে মুজিবনগর বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ে বাজেট অফিসার হিসেবে যোগদান করি। ২০ জানুয়ারী ১৯৭২-এ ঢাকায় ফিরে আসি ২২ জানুয়ারী থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারে অর্থ মন্ত্রনালয়ে বাজেট অফিসার হিসেবে যোগদান করি।

শুধুমাত্র স্মৃতির উপর নির্ভর করে ৩৮ বছর পরে এ সব ঘটনা বর্ণনা করতে যেয়ে যদি কিছু ঘটনা, চরিত্র ও তারিখের ক্ষেত্রে কিছু ভুল হলে তার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।

নিউ ইয়র্ক

২১ এপ্রিল ২০০৯
 

মন্তব্য:
jiajiagg   September 23, 2016

cheap oakley sunglasses

michael kors outlet online

michael kors outlet

http://www.tiffanyandcojewellery.us.com

adidas nmd runner

chrome hearts wholesale

oakley sunglasses,oakley outlet sunglasses

ugg boots uk

tiffany & co

adidas stan smith

chrome hearts online

michael kors handbags

vera bradley outlet

air jordan

michael kors outlet online

tiffany and co jewellery

chrome hearts

hogan outlet online

ugg outlet

http://www.cheap-airjordans.us.com

tiffany online

cheap nfl jerseys

cheap rolex watches

cheap nfl jerseys

air jordan shoes

skechers shoes

timberland boots

adidas stan smith sneakers

timberland outlet

nike huaraches

basketball shoes,cheap basketball shoes,nike basketball shoes,cheap jordan basketball shoes

hermes belt for sale

hogan shoes

links of london sale

adidas tubular runner

adidas neo

nike zoom running shoe

jordans for cheap

tiffany and co outlet

michael kors handbags

jordan shoes

michael kors handbags

skechers shoes

lacoste online shop

skechers shoes for men

http://www.kobebasketballshoes.us.com

ralph lauren online

adidas nmd runner

skechers outlet

tiffany online

yeezy boost 350

cheap tiffanys

nike huarache

cheap air jordan

adidas nmd online

nike air huarache

kobe shoes

cheap nfl jerseys

timberland boots

http://www.kobesneakers.com

nike roshe uk

nike air huarache

cheap mlb jerseys

michael kors outlet clearance

kobe basketball shoes

adidas nmd

nike huarache

michael jordan shoes

michael kors handbags outlet

http://www.airjordanretro.uk

cheap jordans online

http://www.yeezyboost350.uk

tiffany,tiffany and co,tiffany and co jewelry,tiffany necklace,tiffany bracelet,tiffany ring,tiffany earrings

huaraches shoes

nike roshe run

tiffany & co

michael jordan shoes

adidas neo

links of london

tiffany and co outlet online

lacoste outlet

adidas nmd

nfl jerseys wholesale

adidas nmd uk

ray ban sunglasses,ray ban outlet,ray ban sale,cheap ray bans,cheap ray ban sunglasses,ray ban sunglasses outlet,ray ban,rayban,ray bans,ray-ban,raybans,ray ban wayfarer,ray-ban sunglasses,raybans.com,rayban sunglasses,cheap ray ban

lacoste outlet

adidas stan smith shoes

michael kors factory outlet

chrome hearts online

adidas neo shoes

nike huarache

http://www.jordanretro.uk

huarache shoes

fitflops sale clearance

cheap jordans

http://www.raybanglasses.in.net

tiffany and co

jordans for cheap

tiffany and co jewellery

oakley sunglasses

adidas nmd runner

michael kors uk

chrome hearts

yeezy shoes

kobe shoes

cheap air jordans

air max thea

oakley sunglasses

nike zoom kobe

air jordan shoes

ray ban sunglasses

oakley store online

skechers outlet

yeezy boost 350

nike air max thea

hogan outlet online

roshe shoes

skechers shoes

christian louboutin outlet

michael kors handbags

nike polo shirts

cheap ralph lauren

kobe bryant shoes

nike zoom

skechers outlet store

nike kobe sneakers

cheap real jordans

yeezy shoes

toms outlet

roshe run

fitflops outlet

http://www.cheapairjordan.uk

michael kors factory outlet

kobe bryant shoes

air jordan retro

true religion jeans

michael kors outlet

nike air huarache

michael kors outlet online

louboutin shoes uk

oakley sunglasses,oakley vault,oakley sunglasses cheap,oakleys,oakley.com,sunglasses outlet,cheap oakley

timberland outlet

yeezy boost

michael kors handbags

michael kors outlet

tiffany jewelry

nfl jerseys

skechers uk

cheap nfl jerseys

nike huarache

tiffany and co jewelry

retro jordans

mlb jerseys shop

adidas nmd

http://www.tiffanyandcooutletonline.us.com

oakley sunglasses

cheap nfl jerseys

skechers shoes

nike huarache

jordan retro

tiffany and co uk

nike dunks shoes

adidas tubular

michael kors handbags

michael kors outlet online

adidas neo shoes

oakley vault

michael kors outlet online

louis vuitton handbags

yeezy boost 350

discount oakley sunglasses

kobe shoes,kobe zoom,nike zoom kobe

michael kors handbags

yeezy boost 350

nike air zoom

michael kors outlet

mlb jerseys wholesale

nike air max thea

adidas stan smith

toms outlet store

tiffany and co outlet

http://www.cheapauthenticjordans.us.com

nike roshe one

fitflops

true religion jeans

cheap authentic jordans

adidas tubular

cheap watches,cheap rolex watches,rolex watches for men,buy rolex online

michael kors handbags

ralph lauren online,cheap ralph lauren

http://www.tiffanyand.co.uk

http://www.rayban-sunglasses.uk

michael kors purses

fitflops

kobe sneakers

oakley outlet online

authentic jordans

michael kors handbags clearance

links of london outlet store

christian louboutin outlet

lacoste outlet

tiffany and co

ralph lauren online

nike roshe run

kobe shoes

hermes belt

nike air zoom

nike huarache

http://www.michaeljordanshoes.us.com

oakley sunglasses

michael kors handbags

ray ban sunglasses outlet

adidas superstar shoes

fitflops clearance

nike polo

cheap oakley sunglasses

coach outlet online

cheap retro jordans

cheap air jordan

http://www.cheap--jordans.us.com

ray ban sunglasses outlet

ray ban uk,cheap ray ban sunglasses

nike dunks

hermes belt

lacoste online shop

chrome hearts online store

yeezy sneakers

adidas superstar

kobe shoes,kobe zoom,kobe bryant shoes

tiffany and co

adidas nmd

tiffany jewelry

lacoste polo shirts

yeezy boost 350 for sale

yeezy boost

http://www.cheaprealjordans.us.com

fitflop shoes

adidas nmd

michael kors outlet store

yeezy boost 350

nike air huarache

true religion sale

Kanye West shoes

air jordan retro

kobe basketball shoes

hermes belts for men

michael kors outlet online

links of london

nike zoom

nfl jerseys from china

nfl jerseys

adidas superstar shoes

cheap uggs

michael kors outlet

http://www.kobeshoes.uk

jordan shoes

yeezy boost

adidas tubular sale

http://www.jordansforcheap.us.com

huarache shoes

http://www.oakleyoutlet-store.com

vera bradley outlet sale 2016

kobe shoes

cheap oakley sunglasses

tiffany and co uk

http://www.christian-louboutin-outlet.uk

louboutin shoes

cheap basketball shoes

hogan shoes clearance

tiffany and co outlet

michael kors handbags clearance

air max thea

skechers outlet

cheap true religion jeans

ralph lauren uk

adidas superstar

michael kors outlet

kobe shoes for sale online

gg923
2016913yuanyuan   September 13, 2016

discount oakley sunglasses

coach outlet online

mlb jerseys

red bottom shoes for women

polo outlet

ugg boots

coach factory outlet online

true religion outlet online

cheap ugg boots

oakley sunglasses

birkenstock shoes

coach factory outlet online

canada goose jackets

red bottom heels

rolex watches for sale

rolex watches

longchamp bags

chaussure louboutin

kobe bryant shoes

true religion jeans outlet

uggs for kids

uggs outlet

coach factory outlet online

canada goose outlet

polo ralph lauren outlet

oakley vault outlet store

michael kors outlet online

canada goose sale

coach factory outlet online

rolex watches


এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.