Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাহিত্য  ||  ৯ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা আষাঢ় ১৪১৬ •  9th  year  3rd  issue  Jun-Jul  2009 পুরনো সংখ্যা
আজ আছি কাল কোথায় রব Download PDF version
 

সাহিত্য

আজ আছি কাল কোথায় রব

মীজান রহমান

 আমার যৌবনের অন্যতম জনপ্রিয় গানের কলিঃ আজ আছি কার কোথায় রব কেও তা জানেনা। খুব গাইতাম তখন। মন উদাস হত। কোথায় কোথায় চলে যেতে চাইত মন।

 অনেকদিন পর মনে পড়ল গানটা। এমন কোন অসাধারণ গান নয়, কিন্তু অসাধারণ কিছু ঘটনা ঘটে গেল এ-সপ্তাহে, তাই মনে পড়া। লোকে বলবে, ভাগ্যে ছিল তাই ঘটেছে। ধর্মপ্রাণরা বলবেন, আল্লার ইচ্ছা। ভাগ্য, পূর্বলিখন, নিয়তি, এসব আমি বিশ্বাস করিনা। যা অজ্ঞাত বা অজ্ঞাতব্য তা যখন ঘটে তখনই মানুষ বলে, ভাগ্যের লিখন। আর আল্লার ইচ্ছা? তাঁর বিষয়ে আমার জ্ঞান খুব সামান্য। সুতরাং ওটা থাক।   আজকের প্রসঙ্গে আসি।

  আজকে, এই মুহূর্তে, আমার থাকবার কথা ছিল নিউ ইয়র্কে। উর্বি আমার ঔরসজাত নয়, আরাধনালব্ধ কন্যা। কন্যার সাধ ছিল অনেকদিনের, করুণাময় সে-সাধ পূর্ণ করেছেন শেষ বয়সে। কথা ছিল ওর বাড়িতে আরাম-আয়েশে কাটাব দুটি সপ্তাহ। যোগাড়যন্ত্রে কোন ত্রুটি ছিল না, পরিকল্পনায় ছিল না কোন ফাঁকফোকর। দুমাস আগে ট্রেনের টিকেট কিনে রাখা, যথেষ্ট পরিমাণ মার্কিন মুদ্রা সংগ্রহ করা, নিউ ইউয়র্কবাসী প্রিয়জনদের জন্যে ছোটখাট উপহার কেনা- কোনদিকেই কোনরকম গাফিলতি বা অবহেলা ছিল না। বাক্সপত্র গোছানো হয়ে গিয়েছিল এক সপ্তাহ আগে থেকেই, যা আমার বরাবরের অভ্যাস। দুয়ারে গাড়ি আসবার অনেক আগেই আমি প্রস্তুত হয়ে থাকি।

  সবই ঠিক ছিল। তবুও আমার যাওয়া হয়নি। আজকে, এই মুহূর্তে, নিউ ইয়র্কের পরিবার-পরিবেষ্টিত আনন্দময়তার বদলে আমি নিজেরই অভ্যস্ত বাসগৃহের নিঃসঙ্গ শীতল টেবিলে বসে লিখছি। তবুও বলব আমি ভাগ্যবান, অশেষ ভাগ্যবান। ভাগ্যকে বিশ্বাস না করলেও আজকে আমি না মেনে পারছি না যে ভাগ্যলক্ষী অশেষ দয়ার পরিচয় দিয়েছেন আমার প্রতি। নইলে অনেক অমঙ্গল ঘটতে পারত আমার ওপর। এমুহূর্তে আমি নিজের বাসায় না থেকে আমেরিকার কোনও অন্ধকার জেলখানাতে বসে ইহকাল ও পরকালের নানা বিচিত্র খেলার কথা ভাবতাম। জেলখানায় কেন, জানতে চাইছেন তো? আমার নিজেরই পাসপোর্ট ব্যবহার করতে চাওয়ার অপরাধে!

 রহস্যজনক মনে হচ্ছে, তাইনা? তাহলে খুলেই বলি।

 নিউ ইয়র্ক যাত্রার প্রথম পর্ব মন্ট্রিয়লে। অটোয়া থেকে কোনও সরাসরি ট্রেন নেই নিউ ইয়র্ক পর্যন্ত। মন্ট্রিয়ল হয়ে যেতে হয়। পাঁচ দিন আগেই চলে গেলাম সেখানে। প্রিয়জনদের অভাব নেই সেখানেও। লেখালেখি আমাকে শত্রুমিত্র দুইই যুগিয়েছে। কাছের মানুষ হয়ত দূরে সরে গেছে, দূরের মানুষ কাছে এসেছে। এমনি করে কাছে আসা মানুষদের মধ্যে পারভেজ, তাজুল, রাকিব, মনিকা, আকলিমা, সকাল। এবং তাদের গোটা পরিবার। প্রাণ উজাড় করে ওরা ভালবাসা দিয়েছে আমাকে। ফলে আকলিমা আমার মন্ট্রিয়লের কন্যা, সকালও, পারভেজ আমার ভ্রাতুষ্পুত্র, তাজুল, রাকিব আমার অনুজ, মনিকা আমার আদরের বোন। ওদের পরিবার পরিজন আমার প্রাণের পরাগছড়ানো প্রসারিত পরিবার। মন্ট্রিয়লে যাবার প্রয়োজন হলে আমি সাধারণত আকলিমার বাড়িতেই উঠি, উঠতে হয় বলেই উঠি, নইলে ওর অভিমানের সীমা থাকবে না। ও প্রায় ১৩ ঘন্টা কাজ করে সপ্তাহে পাঁচ দিন, রাত ১১টা থেকে ভোর ৭টা, তারপর ৮টা থেকে ৩টা। কেন করে, উন্মাদ না হলে কেও এরকম অমানুষিক খাটুনি খাটে না, তা আরেকদিন বলা যাবে। আজ শুধু এটুকু ইঙ্গিত দিয়ে রাখিঃ নিজের ভোগবিলাসের জন্যে নয়, পৃথিবীর দুঃস্থ মানবতার জন্যে। আকলিমা সামান্য পরিচ্ছদে এক অসামান্য মেয়ে। এবারও আমি ওর বাড়িতেই উঠেছিলাম। সারারাত জেগেথাকা চাকরির পর সেই আমাকে ভোর সাড়ে সাতটায় মন্ট্রিয়লের সেন্ট্রাল স্টেশনে নিয়ে গিয়েছিল নিউ ইয়র্কের ট্রেন ধরার জন্যে। শেষ মুহূর্তে ট্রেনে চাপার চিন্তা ছেড়ে দিয়ে ওর সঙ্গে ফিরে এসেছিলাম ওর বাড়িতে।

  মন্ট্রিয়লের পাঁচদিন লোকজনের বাড়ি বাড়ি খেয়ে বেড়ালাম। বুড়োবয়সে, একা একা বাউলের মত ঘুরে ঘুরে, দ্বারে দ্বারে মানুষের ভালবাসা কুড়োলাম। যাবার আগের দিন, বিস্যুদবার, দুপুরবেলায়, ইসরাত আলম আমন্ত্রণ জানালেন তাঁর সঙ্গে লাঞ্চ খেতে শহরতলীর এক রেস্টুরেন্টে। তার আগের রাতটি পারভেজ ও তার স্ত্রী বিউটির আতিথেয়তায় পরম আনন্দে কাটালাম তাদের বাড়িতে। বিস্যুদবার বেলা সাড়ে বারোটায় পারভেজ আমাকে পৌঁছে দিল কোটে ভার্চুর উচ্চ মধ্যবিত্ত এলাকার ফায়ারগ্রিল রেস্টুরেন্টের পার্শ্ববর্তী পার্কিং লটে। ঠিক সেই মুহূর্তে, অদৃষ্টের প্রচ্ছন্ন ইশারাতেই হয়তবা, প্রচণ্ড এক ঝড় শুরু হয়ে গেল আকাশপাতাল কাঁপিয়ে। সাথে সাথে বৃষ্টি। দেশের কালবোশেখী ঝড়ের মত। সেই ঝড়ের তাণ্ডবে ভুলেই গেলাম যে আমার দুখানা ব্যাগ ( যার একটির ভেতর ছিল আমার পাসপোর্ট আর ট্রেনের টিকেট, দ্বিতীয়টির ভেতর গরিবের ব্যবহারজীর্ণ লুঙ্গি, গেঞ্জী আর ক্ষৌরসামগ্রীর একখানি হীনদর্শন থলে) আমার হাতে না রেখে সাহাবের, অর্থাত্‌ ইসরাতের স্বামীর গাড়িতে রেখে এসেছিলাম। সাধারণ ব্যাপার, এতে কোন বিভ্রাট ঘটবার কথা নয় সচরাচর, এদেশে মানুষ অহরহই মূল্যবান জিনিস গাড়িতে রেখে অন্যান্য কাজে চলে যায়, কোন ক্ষতি হয় না। কিন্তু, ভাগ্য অপ্রসন্ন হলে, কখনো কখনো বিপদ এসে হানা দিতে পারে বইকি। সেই কখনো কখনোর সীমানার ভেতর এবার আটক হতে হল আমাকে।

  ক্যানাডায় কালবোশেখীর ঝড় খুবই বিরল। মন্ট্রিয়লের সেদিনকার ঝড়টি ছিল তেমনি এক বিরল ঘটনা-পত্রিকার প্রথম পাতায় বড় বড় অক্ষরে স্থান পাওয়ার মত ঘটনা। গাড়ি থেকে রেস্টুরেন্ট পর্যন্ত সামান্য পথটুকু একছুটে পার হতেই মনে হচ্ছিল গ্রামের বাড়ির টিনের চালের মত আমিও উড়ে যাব আকাশে। রেস্টুরেন্টের দরজা দিয়ে ঢুকবার পরে নিশ্চিত হলাম যে আমার পা এখনো মাটিতে। মহাশান্তি!

  রেস্টুরেন্টটি বেশ ভাল। প্রচুর খেলাম। গালগল্প হল। হাসিঠাট্টা হল বিস্তর। আমার চিরাচরিত প্রগলভ স্বভাব সেদিন বুঝি বলগা হারিয়েছিল খানিক। ওদের দশবছরের ছেলে তানভির--সজাগ সচেতন ছেলে--তাকেও আলোচনার অংশিদার করে নিলাম। বাইরে বৃষ্টি। জানালায় জলের উচ্ছাস ক্রুদ্ধ বিক্রমে আছড়ে পড়ছিল বারবার। এমন দিনে এমন কথা তারে বলা যায় জাতীয় পাগলা হাওয়া। বেশ লাগছিল ভেতর থেকে। বিগত যৌবন স্মৃতির অন্ধকার সরণী বেয়ে উথলে উঠতে চাইছিল যেন। নির্বাধ সংলাপে মুখর হয়ে উঠছিল আমাদের টেবিল। পুরো দুটি ঘন্টা কাটল নিরবচ্ছিন্ন আনন্দময়তায়। একসময় যাবার সময় হয়ে গেল। রাতে ঘুমোতে যেতে হবে আগেভাগে। আগামীকাল আমার ট্রেন। ওরা নিউ ইয়র্কের পেন স্টেশনে অপেক্ষা করবে আমার জন্যে। বৃদ্ধ শরীরে সাঁঝের বেলার শেষ উত্তেজনাটুকু এখনো মিলিয়ে যায়নি একেবারে। মৃদু কম্পন এখনো অনুভব করি প্রাণে। প্রিয়জনদের মুখ এখনো আনন্দ দেয়।

  সাহাব বেরিয়ে গেলেন গাড়ি আনতে। সদাশিব লোক। আমিও তাই করতাম। সবার একসাথে ভেজার চাইতে একজনের ভেজা অনেক বিবেচনার কাজ। আমরা অপেক্ষা করতে থাকলাম দরজার সামনে। পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট, পনেরো মিনিট। এতক্ষণ তো লাগার কথা নয়। কোথায় গেলেন সাহাব? শেষে সাহাব এলেন, আকাশের সবটুকু জল নিজের গায়ের ওপর ধারণ করে, আপাদমস্তক বৃষ্টিস্নাত, বিচলিত বিদ্ধস্ত চেহারা নিয়ে। কি হয়েছে সাহাব, জিজ্ঞেস করলেন উদ্বিগ্ন সহধর্মিনী।

  সর্বনাশ হয়েছে। গাড়ির জানালা ভেঙ্গে মীজানভাইএর ব্যাগ চুরি করে নিয়ে গেছে। এক নিঃশ্বাসে বলে গেলেন কথাগুলি, যেন কোন স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের কন্ঠনিঃসৃত।

  মুহূর্তটির বিশালতা আমার মাথায় প্রবেশ করতে খানিক সময় নিল। মুহূর্তটির প্রচণ্ড পরিহাস, প্রচণ্ড বিড়ম্বনা আমাকে প্রায় অবশ এবং বাকশক্তিহীন করে ফেলল। যারা এই দিনেদুপুরে, সিনেমাহলের গাড়িচত্তরে, চারদিকের নিরাপত্তাদৃষ্টির সতর্ক প্রহরাতে জানালা ভেঙ্গে দুঃসাহসী চৌর্যকর্ম সাধন করতে পারে, তারা নিশ্চয়ই গরিব শিক্ষকের পরিচয়ে দয়াপরবশ হয়ে সেগুলো ফেরত পাঠাবার চেষ্টা করবে না। ঐ মুহূর্তে অন্তঃশীলা স্রোতের মত এক শীতল উপলব্ধি আমার শিরা বেয়ে উঠল যে কাল আমার নিউ ইয়র্ক যাওয়া হবে না। পাসপোর্ট ছাড়া আমি সীমান্ত পার হব কেমন করে? কোনক্রমেই পারব না। ৯/১১ এর যুগে তা একেবারেই অসম্ভব, বিশেষ করে যার নামের শেষে একটি রহমান সংযুক্ত রয়েছে।

  আমার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে একটা জিনিস আমি শিখেছি যে, চরম বিপদ যখন আসে (যা সবার জীবনেই আসে কোন-না-কোন সময়) তখন প্রথম করণীয় কাজটি হল মাথা ঠাণ্ডা রাখা। এটা সবচেয়ে দুরূহ তা জানি, বয়স না হলে আসে না। কিন্তু আমার বয়স হয়েছে এবং আমার এই সংকটটি অত্যন্ত গুরুতর তা বলাই বাহুল্য। গুরুত্বের প্রধান কারণ, অবিশ্বাস্য হলেও, আমার নিউ ইয়র্ক যাওয়া পণ্ড হয়ে গেল তা নয়, পাসপোর্ট চুরি হয়ে গেল বলে। এর সঙ্গে শুধু আমার ব্যক্তিগত পরিচয়ের প্রশ্ন নয়, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, পুলিশ, অপরাধচক্রের জালিয়াতি ব্যবসা, ইমিগ্রেশন, ক্যানাডার জাতীয় নিরাপত্তা- সবকিছু জড়িত। পাসপোর্ট হারালে প্রথম কাজটি হল কর্তৃপক্ষের গোচরে আনা ঘটনাটি- কখন, কোথায় কিভাবে ঘটল তার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া। সৌভাগ্যবশত (পরে মনে হল আসলে দুর্ভাগ্যবশত) প্লাজা ভার্চুর অনতিদূরে পাসপোর্ট বিভাগের একটি প্রাদেশিক শাখা আছে। ইসরাতের পরামর্শে সেখানে গিয়ে আমি একটা ফর্ম পূরণ করে বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে দিলাম। ওরা তৎক্ষনাৎ কম্পিউটারের বোতাম টিপে খবরটি সর্বত্র প্রচার করে দিলেন। অর্থাৎ খবরটি তখন মানুষের হাত থেকে যন্ত্রের হাতে চলে গেল যার ওপর মানুষের কোন হাতই থাকবে না, যা আমি তখনো ঠিক বুঝিনি। মানুষের মন বদলানো যায়, যন্ত্রের মন বদলানো যায় না।

  ইতোমধ্যে সাহাব তার সেলফোনে কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছিলেন পুলিশের সঙ্গে গাড়ির জানালা ভাঙ্গার ব্যাপারে। পুলিশের উপদেশ, সশরীরে থানায় গিয়ে সমস্ত ঘটনার পুংখানুপুংখ বিবরণ দেওয়া। ঠিক আছে। তথাস্তু বলে আমরা সবাই মিলে থানায় গেলাম এবং আদ্যোপান্ত কাহিনীটি পুনরায় ব্যক্ত করলাম। মজার ব্যাপার হল, পুলিশে রিপোর্ট দেওয়ার সময় পর্যন্ত ভাবা হয়েছিল যে জানালা ভেঙ্গে আমার দুখানা ব্যাগ ছাড়া আর কিছুই তারা স্পর্শ করেনি। সে ভুলটা ভাঙ্গল আরো ঘন্টাখানেক পর।

  যাই হোক, চুরির ঘটনা উভয় কর্তৃপক্ষের কাছে যথারীতি রিপোর্ট করবার পর আমরা আকলিমার বাড়িতে গিয়ে যখন পৌঁছুলাম তখন ঘড়িতে সন্ধ্যা ৬টা। সবারই মন খারাপ। সম্ভবত আমিই ছিলাম সবচেয়ে ঠাণ্ডা মেজাজের, যদিও ক্ষতিটা সবচেয়ে বেশি হয়েছিল আমারই, তখনকার ধারণা অনুযায়ী। যা হবার হয়ে গেছে, তাকে তো ঘোরানো যাবে না। আমাদের দুঃখের কাহিনী শুনে নানাজন নানা মন্তব্য দিতে শুরু করলেন। গাড়ির ভেতর পাসপোর্ট রেখে আসা উচিত হয়নি। গাড়িটা পেছনের দিকে না রেখে সামনে রাখা উচিত ছিল। রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়াটাই বোধ হয় ঠিক হয়নি। ইত্যাদি ইত্যাদি। বিপদ না এলে বোঝা যায়না আমাদের সমাজের বিচক্ষণ ব্যক্তিরা কতখানি জ্ঞান ধারণ করেন!

  আকলিমার বাসায় কিছুক্ষণ বসার পর সাহাব গেলেন গাড়ি থেকে কি একটা কাগজ আনতে। ফিরে এলেন কাগজ নিয়ে নয়, কাগজের মত পাংশু চেহারা নিয়ে। চরম দুঃসংবাদ। চোর শুধু আমার জিনিসই নেয়নি, ওদের জিনিসও নিয়েছে, এবং আমার চেয়ে ঢের বেশি মূল্যবান জিনিস। তাদের ব্যবসাসংক্রান্ত যাবতীয় কাগজপত্র, রশিদ, দলিল, আয়করবিষয়ক চিরকুট- অর্থাৎ ব্রিফকেসে মূল্যবান যা কিছু ছিল সব সাফ করে নিয়ে গেছে চোর। এগুলো পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব। দুজনের মাথায় তখন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। বেচারি সাহাব আর ইসরাত আমাকে ভালোবেসে একবেলা খাওয়াতে গিয়ে কি বিপদেই না পড়ে গেলেন। দশ বছরের কচি ছেলে তানভির তো প্রায় কেঁদে ফেলার অবস্থায়। আকলিমার বাসায় বসেই ওরা নানা জায়গায় ফোন করে যতখানি সম্ভব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনবার চেষ্টা চালালেন।

 ইতোমধ্যে আমার অসমাপ্ত কাজগুলো চালিয়ে যেতে থাকলাম। আমার আমেরিকা যাওয়ার সঙ্গে তো অনেক কটা লোকই জড়িত ছিল। নিউ ইয়র্কের উর্বি, নিকট বন্ধুরা, আমার দুই ছেলে, এমট্রাক রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, একে একে প্রত্যেকের কাছে খবর পাঠানো যে আমার যাওয়া হচ্ছে না। প্রথমেই ডাকলাম উর্বিকে, তার সমস্ত যোগাড়যন্ত্র, জল্পনাকল্পনা, আনন্দউল্লাসের ওপর এক কলস ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিয়ে। তারপর বাবু আর রাজাকে। এমট্রাককে। প্রত্যেকের কাছে আলাদা আলাদা করে সমস্ত ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা দিতে হল। এ নিয়ে যে কত হাজারবার একই কাহিনী বলতে হয়েছে আমার। ই-মেইলের মত কথার কপি পাঠাতে পারলে কি ভালোই না হত। এদিকে আমি নিজেই তো আধুনিক অতিযান্ত্রিকতার ঘোর বিরোধী। নাহ, তাও ভাল, বারবার একই কথা বলতে হচ্ছে, হোক, তাও লোকে আমার গলাই শুনুক, যন্ত্রের গলা যেন শুনতে না হয় আমার ফোন থেকে।

 ৮টার দিকে সাহাবরা চলে গেলেন। টেবিলে বসে আকলিমার সঙ্গে খাওয়াদাওয়া সেরে নিলাম। সাড়ে আটটার দিকে শুরু হল নাটকের দ্বিতীয় খণ্ড- যাকে বলে সত্যিকার নাটক। ৮টা ৩৫মিনিটে ক্যালিফোর্নিয়ার এক বন্ধু ডাকলেন আকলিমার স্থলফোনে। এমন সময় আমার নিজস্ব সেলফোনে বেজে উঠল পরিচিত বাদ্য। সাধারণত আমি সেল ব্যবহার করিনা- ওটা আমার পথের সাথী, বিপদের সহায়, সুসময়ের আলাপচারিতার জন্যে নয়। কিন্তু সেদিন আমি ফোনটা খোলা রেখেছিলাম, কি জানি কে ডাকে জরুরী কোন খবর দিতে। থানাতে আমার সেল নাম্বারই দেওয়া ছিল। মন বলল এটা হয়ত পুলিশেরই ফোন। ক্যালিফোর্নিয়ার বন্ধুর কাছে ক্ষমা চেয়ে তাড়াতাড়ি সেল ধরলাম। ঠিক যা ভেবেছিলাম- পুলিশ। বিরাট খবর- আমার কালো ব্যাগটি পাওয়া গেছে যার ভেতর পাসপোর্ট এবং অন্যান্য কাগজপত্র ছিল। কোন এক সদয়চিত্ত নাগরিক সেটা তাঁর পাড়ার শপিং মল থেকে পেয়ে নিকটবর্তি থানায় জমা দিয়ে গেছেন। অর্থাৎ চোর যা আশা করেছিল তা না পেয়ে ব্যাগটা ফেলে গেছে ওখানে। চোরের নজর ভাল, মানতেই হবে। গরিব শিক্ষকের নিরীহ ব্যাগের ভেতর আকর্ষণীয় কিছু না পেয়ে রাগের মাথায় ব্যাগটা তছনছ করে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দেয়নি, অক্ষত অবস্থায় রেখে গেছে এমন জায়গায় যাতে কারো না কারো চোখে পড়ে। মনে মনে চোরের প্রতি ছোট একটা ধন্যবাদ না জানিয়ে পারলাম না। খবরটা আমার চুপষে যাওয়া উৎসাহটাকে ফিরিয়ে আনল চট করে। হারানো খেলনা ফিরে পাওয়া বালকের মত আনন্দে নেচে উঠল মন। আহা, শেষ পর্যন্ত আমার নিউ যাওয়া হচ্ছে তাহলে। এদিক ওদিক না ভেবে আমি তৎক্ষণাৎ উর্বিকে ডেকে জানিয়ে দিলাম- দারুণ খবর, উর্বি, ব্যাগ পাওয়া গেছে, আমি আসছি। কিন্তু আসছি বললেই তো আসা হয়না, আমার দ্বিতীয় ব্যাগটি যে এখনো গায়েব।ওটাতে আমার গেঞ্জীলুঙ্গি আর দাড়ি-কামানোর সরঞ্জাম ছাড়া যে জিনিসটি ছিল সবচেয়ে মূল্যবান সেটা হল আমার তিন সপ্তাহের ওষুধপত্র। একটা-দুটো নয়, দশ প্রকারের ওষুধ, যার মধ্যে চারটি অত্যন্ত জরুরী, একদিন বাদ গেলে আমার অবস্থা কাহিল হয়ে যাবার সম্ভাবনা। অন্যান্য জিনিস বাজারে কেনা যাবে দরকার হলে, কিন্তু ওষুধ? ওটা তো আমার অটোয়ার ফার্মেসি ছাড়া কারো পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। তাহলে কি উপায় হবে? হঠাৎ একটা বুদ্ধি এল মাথায়। ফার্মেসির নাম্বার তো আমার জানাই ছিল। ওখানে ফোন করলে কেমন হয়? কিন্তু ওরা তো নটায় বন্ধ হয়ে যায়। সর্বনাশ, কটা বাজে এখন? ঘড়িতে চেয়ে দেখি ৮টা ৫০। আর দেরি করা যায়না। ফোন করলাম অটোয়ায়। সৌভাগ্যবশত যে মহিলাটি খুব ভাল করে চেনে আমাকে, ডলরেস, তিনিই ধরলেন ফোন। সমস্ত ঘটনাটা ব্যক্ত করলাম তাঁকে- একশ একবারের মত। অনুরোধ করলাম আমার যাবতীয় ওষুধপত্র তৈরি করে রাখতে, যাতে আমার বন্ধু মকসুদ পরের দিন সকালে গিয়ে ওটা তুলে আনতে পারে। ওদিকে মকসুদকে ডেকে একশ দুবারের মত কাহিনীটা বর্ণনা করে জানালাম আমার কি উপকার দরকার। সে সঙ্গে সঙ্গে রাজী হয়ে গেল। ওষুধপত্র এনে সে ফেডেক্স করে আমাকে পাঠিয়ে দেবে সেদিনই। ফোনপর্ব শেষ করে পারভেজকে (ও তখন আকলিমার বাসায় এসেছিল আমার বিপদের খবর পেয়ে) নিয়ে রওয়ানা হলাম থানার দিকে, ব্যাগ তুলে আনার জন্যে। থানার পুলিশ অত্যন্ত ভদ্রভাবে আমার হাতে ব্যাগ দিয়ে বললেন কোন সমস্যা হলে যেন তাঁদের জানাতে দ্বিধা না করি। ব্যাগের ভেতর কেও হাত ঢুকিয়েছে বলে মনে হল না। যেমনটি ছিল ঠিক তেমনি অবস্থায় পাওয়া গেল। আমার খুশি দেখে কে!

  কিন্তু। রাতে বিছানায় শুয়ে ছোট্ট পোকার মত একটা প্রশ্ন খুঁত খুঁত করতে লাগল মনে। আচ্ছা, ওরা যদি পাসপোর্ট চুরির ঘটনাটা সীমান্তরক্ষীদের দপ্তরে পাঠিয়ে দিয়ে থাকে, তাহলে আমি যে পাসপোর্টটা পুলিশ স্স্টেশন থেকেই পেয়েছি সেটা তো তারা বিশ্বাস নাও করতে পারে। আর বিশ্বাস করলেও, আমি বা ওরা কেমন করে জানবে যে আমার পাসপোর্টটি এরি মধ্যে জাল করে ফেলা হয়নি তস্করদের দ্বারা? প্রশ্নটা সারারাত জাগিয়ে রাখল আমাকে। বলতে গেলে এক মিনিটও ঘুম হয়নি। সকালবেলা আকলিমা কাজ থেকে ফেরার পর সেও খানিক দ্বিধার ভাব প্রকাশ করল- চাচা, আপনার কি সত্যি সত্যি যাওয়া ঠিক হবে? মনে মনে জানতাম, হয়ত না। কিন্তু আরেক মন বলল, বাহরে, এটা তো আমারি পাসপোর্ট। আমার ছবি, আমার ঠিকানা, জন্মদিন সবই আছে এখানে, তাহলে সমস্যা হবে কেন? আমি এক অবসরপ্রাপ্ত গণ্যমান্য অধ্যাপক, আমার কথা তারা বিশ্বাস করবে না কেন? হায়রে মূর্খ অধ্যাপক! সারাজীবন ছাত্র পড়িয়ে পড়িয়ে মাথা খালি হয়ে গেছে তা প্রমাণ হল এবার।

 বিশ্বাস? আজকাল কি বিশ্বাস বলে কোন জিনিস আছে? যন্ত্রকে বিশ্বাস করে মানুষ, মানুষকে নয়, সে অধ্যাপকই হোক আর গীর্জার পাদ্রীই হোক। মনের খুঁতখুঁতি গেল না। ভাবলাম, পাসপোর্ট অফিস যখন খুলবে সাড়ে সাতটায় তখন জিজ্ঞেস করে নেব। ওদিকে ট্রেনের সময় যে কাছিয়ে আসছে। তাহলে কি করব? যাহ, যা হবার হবে। ভেবে আকলিমাকে বললাম, চল মা, রওয়ানা হই। গাড়ি থেকেই আমি ডাকব ওদের। যদি ভরসা না পাই তাহলে না হয় ফিরে আসব।

  শুক্রবার সকাল। মন্ট্রিয়লের যানবাহন। সেন্ট্রাল স্টেশনের রাস্তাটি একেবারে ঠাসা- গায়ে গায়ে চলার অবস্থা। আকলিমা গাড়ি চালাচ্ছে। আমি ফোন করার চেষ্টা চালাচ্ছি ৭টা ৩০ মিনিট থেকে। দশ মিনিট পর একটি স্বাভাবিক নারীকন্ঠের সাড়া পেলাম, যন্ত্র নয়। গতরাতের গোটা ঘটনাটি আদ্যোপান্ত উগড়ে দিতে হল তাকে, একশ তিনবারের মত। সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম মেয়েটিকে, এই পাসপোর্ট নিয়ে কি আমার যাওয়া ঠিক হবে? মেয়েটি কম্পিউটারের পর্দা দেখে বলল, আমাদের এখানে খবর পৌঁছায়নি এখনো, তবে তার অর্থ এই নয় যে বর্ডারে তা পৌঁছায়নি। আপনি যেতে পারেন, তবে কোন বিপদ হবে না, এমন ভরসা আমাদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। মনটা দমে গেল। এরাই যদি নিশ্চয়তা দিতে না পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সদাসন্দিহান সীমান্তরক্ষীরা আমার মত সাধারণ অধ্যাপকের কথা শুনেই তারা মুগ্ধ হয়ে আমাকে ছেড়ে দেবে সেরকম উদ্ভট ধারণা আমি পোষণ করব কি করে। সিদ্ধান্ত নিলাম যাবনা। আকলিমা সোৎসাহে সায় দিল তাতে। ওদিকে পারভেজেরও একই মত। না চাচা, অনর্থক এই বিপদের ঝুঁকি আপনি নিতে যাবেন কেন?

 বিপদ, সেটা আমরা সবাই বুঝতে পেরেছিলাম, কিন্তু কত বড় বিপদ তার সম্যক ধারণা আমাদের কারুরই ছিল না তখন। ধারণা হল অটোয়াতে ফিরে পাসপোর্ট অফিসে যাওয়ার পর। হ্যাঁ, আকলিমার বাসায় এসে আমি কালবিলম্ব না করে ফিরে এলাম অটোয়ায়। এবং একটু বিশ্রাম করে রওয়ানা দিলাম স্পার্ক স্ট্রীটের পাসপোর্ট অফিসের দিকে। ঠিক আছে, নিউ ইয়র্ক যাওয়া হলনা এবার, তাতে সবারই মন খারাপ হয়েছে। তাই বলে আরেকবার চেষ্টা করা যাবেনা কেন? তার জন্যে প্রথম যা দরকার সেটা হল নতুন পাসপোর্ট।

 এর আগে আমি যতবার গিয়েছি পাসপোর্ট অফিসে ততবারই লম্বা লাইনে পড়তে হয়েছে। এবার কোন ভিড়ই ছিল না। একেবারে ফাঁকা। পনেরো মিনিটে প্রাথমিক প্রক্রিয়াগুলো সব সারা হয়ে গেল। আমার পুরোনো পাসপোর্টটা আমার হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিলেন ভদ্রমহিলা। ভাগ্যিস এই পাসপোর্ট নিয়ে আপনি সীমান্তে যাবার চেষ্টা করেননি, তাহলে মহা বিপদ ঘটতে পারত আপনার। এ পাসপোর্টটি একটি চুরি হয়ে যাওয়া বেআইনী জিনিস। তার অর্থ তো বুঝতেই পারছেন--। বলে ভদ্রমহিলা চোখের তারা ঘুরিয়ে হাসিমুখে তাকালেন আমার দিকে।

 বুঝবনা আবার! মনে মনে ধন্যবাদ জানালাম অন্তরালের অদৃশ্য শক্তিকে। সম্মান নিয়ে ফিরে এলাম এযাত্রা। সত্যি তো, সীমান্ত পুলিশ তো তৎক্ষণাৎ আমার হাতে হাতকড়া পরিয়ে হাজতে নিয়ে যেতে পারত, আমার নিজেরই পাসপোর্ট ব্যবহার করতে চাওয়ার অপরাধে। জীবনে আমি হাজত দেখিনি, শেষ বয়সে দেখার সাধ নেই। এ সাধ পূর্ণ না হলেও চলবে।

  লোকে বলে জীবনের সব অভিজ্ঞতারই একটা গূঢ় অর্থ আছে। আমার এ অভিজ্ঞতাটির কি গূঢ় অর্থ বুঝিনা, এর কোন আধ্যাত্মিক তাৎপর্য আছে কিনা জানিনা, আধ্যাত্মিক শব্দটাই আমার কাছে হেঁয়ালির মত লাগে, তবে একটা তাৎপর্য আমি নিজেই বুঝতে পারি যে এর ভেতর শিখবার জিনিস আছে। জীবনের একটা নতুন দিক খুলে দেয় একেকটা নতুন অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে যদি তাতে নেতিবাচক বস্তু ছাড়া আর কিছুই চোখে না পড়ে আপাতদৃষ্টিতে। আমি মনে করি সেখানেই চরিত্রের পরীক্ষা। লোকে হয়ত বলবে সবই ভাগ্য, আমি বলি মানুষের চরিত্রই তার ভাগ্য। এছাড়া সবই প্রকৃতির আকস্মিকতার নিয়মানুসারে চলে। নেতিবাচক ঘটনা থেকে ইতিবাচক আলোটুকু আবিস্কার করতে পারা, তাতেই আসল সাফল্য, আমার মতে। আকাশভরা মেঘের আড়ালেও সূর্য থাকে সেটা যেন কখনোই ভুলে না যাই আমরা। শুধু যে সূর্য থাকে তাই নয়, সূর্য থাকে বলেই মেঘ সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ চরম হতাশার মাঝেও আশার শিখা জ্বলবে, তারই নাম জীবনসংগ্রাম। তা নাহলে আমরা এগুতে পারতাম না এক কদম। প্রতি পদে পদে হোঁচট খেতাম। আমার এবারের অভিজ্ঞতাটি থেকে এটুকু শিখলাম যে পাসপোর্ট আর ওষুধপত্র কখনো হাতছাড়া করতে নেই। ভবিষ্যতে অন্য ভুল আমি অবশ্যই করব, আশা করি এই ভুলটুকু আর হবে না।

অটোয়া, কানাডা

২০শে মে, ২০০৯

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.