Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  মূল রচনাবলীঃ  ||  ৯ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা আষাঢ় ১৪১৬ •  9th  year  3rd  issue  Jun-Jul  2009 পুরনো সংখ্যা
বঙ্গ সম্মেলনে দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালি Download PDF version
 

বঙ্গ সম্মেলন ও ফোবানা সম্মেলন

বঙ্গ সম্মেলনে দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালি

অনির্বাণ চ্যাটার্জী

আমার কাছে মনে হয় বঙ্গ সম্মেলন যেন সব সময়ই আমার জীবনের অংশ ছিল। প্রথম যখন বঙ্গ সম্মেলনে যাই, তখন আমার বয়স নয় বছর, আর এবার জুলাই এ যখন বঙ্গ সম্মেলনে অনুষ্ঠিত হবে, তখন আমার বয়স হবে বত্রিশ। দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালি আমেরিকান হিসেবে বঙ্গ সম্মেলনের পেছনে যে ভাবনা কাজ করে, সেটা আমার খুব ভাল লাগে, কিন্তু বাস্তবে সব সময় এই সম্মেলন আমাকে যথেষ্ট আপন করে নিতে পেরেছে বলে মনে হয় নি।

বঙ্গ সম্মেলনের যেটা আমার সবচাইতে ভাল লাগে, তা হল পুরনো নতুন বন্ধুসহ হাজার হাজার লোকের সাথে একত্র হয়ে তিন দিন ধরে শিল্প সংস্কৃতির উৎসব উদযাপন করা। বাবা-মা, বন্ধুরা কলকাতার দূর্গা পূজোর আনন্দ নিয়ে গল্প করেছেন, কিন্তু সেই সময়টাতে কখনও আমার দেশে ফেরা হয়নি। আমি এভাবে এই উৎসবকে দেখি বঙ্গ সম্মেলনটা আসলে একটি আমেরিকান, ধর্মনিরপেক্ষ দূর্গা পূজোর মত। সেই একই উৎসবমুখর পরিবেশ, সেজেগুজে আনন্দোচ্ছ্বল অনেক মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে, তেমনই বহু কিছু দ্রষ্টব্য রয়েছে এখানেও।

দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালি বলে বঙ্গ সম্মেলনের পরিবেশে খাপ খাওয়াতে একটু হিমসিম খেতে হয়, কারণ আমি জানি যে আর সবাই সব কিছুর মর্ম যেমন ভাবে উপলদ্ধি করতে পারছেন, আমি তেমনটা পারব না। বাংলায় শৈশব আর কৈশোর কাটানোর ফলে সংস্কৃতির সাথে যে নাড়ির যোগ তৈরি হয়, তা তো আমার নেই। আমার মা যখন অমুক রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীর সাথে তমুক শিল্পীর গায়কীর কি তফাৎ, তার চুলচেরা বিশ্লেষণে মেতে ওঠেন, আমি তখন গানের কথা বুঝতে পারব কিনা সেই চিন্তায় অস্থির। পরিবারের কোন বন্ধু হয়ত দুপুরের মাছের দারুন তারিফ করলেন, আমি সসংকোচে আর বলতে পারি না যে বাঙালি কোন মাছ রান্নাই আমার ভাল লাগে না, তাছাড়া আমি নিরামিষ খেতে বেশি পছন্দ করি। আমি হিন্দী বুঝি না, বলিউডের বিশেষ খবর রাখিনা, তাই বাঙালি শিল্পীদের চটুল বলিউডি পপ সঙ্গীত আমাকে একদমই স্পর্শ করে না।

কিন্তু সংস্কৃতির গভীরে পৌঁছুনোর বাধা অতিক্রম করা তো অসম্ভব নয়। আমার তখন কুড়ি ছুঁই ছুঁই, বঙ্গ সম্মেলনের একটা ঘরে ঢুকে দেখি রেজোয়ানা বন্যা চৌধুরী গান গাইছেন। ওঁর গান আমি আগেও শুনেছি, কিন্তু এবার হয়ত একা ছিলাম বলে, এবং ভাল লাগার কোন আগাম আশা ছিল না বলে কি না জানিনা, ওঁর গান আমাকে একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ করে দিল। পাশে যিনি বসে ছিলেন ঠিক তারই সমান সবটা হয়ত বুঝতে পারিনি, কিন্তু আমি আমার মত করে ওঁর গান থেকে আনন্দ লাভ করছিলাম। এই ব্যাপারটি বারবার ঘটেছে। একই সম্মেলনে ভারত আর বাংলাদেশের এত ধরনের শিল্পী একটা অপূর্ব সুযোগ এনে দেয় নতুন কিছু পরখ করার, আবিষ্কার করার, নিজের রুচি অনুযায়ী পছন্দ ঠিক করার। বঙ্গ সম্মেলন আর অন্যান্য বাংলা অনুষ্ঠানে উপস্থিতির কল্যাণে আমি উপলব্দ্ধি করেছি যে আমার পছন্দ হল আধুনিক গান ও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত আর নাটক। বাংলা রক গান, জীবনমখী গানও আমার পছন্দ, তবে শেষোক্ত দুধরনের গানের সাথে সম্পর্কটা আরেকটু নিবিড় বলে পছন্দের ব্যাপারে আমি আরও বেশি খুঁতখুঁতে।

অভিবাসী বাঙালি সমাজ অনেক সময় ঠিক করে উঠতে পারে না, দ্বিতীয় প্রজন্মের তরুণদের নিয়ে কি করবে। বঙ্গ সম্মেলন তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় যে সুযোগ দেয় তা হল যে কো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ। তরুণরা তো সবাই এসব সখে করেন, এদের জন্য বঙ্গ সম্মেলনের মত উৎসবে গাইবার, নাচবার বা অভিনয় করার সুযোগ একটি বিশেষ সম্মান এর ফলে একটা বড় দর্শকমন্ডলীর সামনে মঞ্চে উপস্থিত থাকার সুযোগ পাওয়ায় বেশ ভাল করে অনুশীলন করার তাগিদ আসে, আর সম্মেলনের সাথে আত্মীয়তা নিবিড় করার সুযোগ হয় তখন সত্যি সম্মেলনকে আপন মনে হয়। কিন্তু এটা শুধু ৫-১৫ বছরের কিশোরদের বেলায় প্রযোজ্য, তারপর অনুষ্ঠান করার সুযোগ অনেক কমে যায়, আর সমস্যার সেখানেই শুরু হয়।

যে সব দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালিরা বাবা মায়ের বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, তাদের কাছে বঙ্গ সম্মেলনকে কি ভাবে আরও অর্থপূর্ণ করে তোলা যায়? এই প্রশ্নটা যে আদৌ করতে হচ্ছে সেটাই একটা গভীতর সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। এ হল অনেকটা এধরনের প্রশ্ন করা - বঙ্গ সম্মেলনকে কি করে পুরুষদের কাছে অথবা বাংলাদেশীদের কাছে অর্থবহ করা যায়। বাঙালিরা ১৯৬৫ সাল থেকে মার্কিন দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে রয়েছেন। ৬৫-উত্তর দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালিদের মধ্যে যারা একটু পুরনো, তাদের বয়স চল্লিশ এর মত ওদের বাবা মা এদেশে যে বয়সে এসেছিলেন, তার চাইতে বেশি তাদের বয়স। অথচ এই ব্যাপারটা খুব লক্ষ্যণীয় যে বাবা অথবা প্রবাসীর মত দেশজ সংগঠনগুলো এই বড় একটি গোষ্ঠীকে ধরে রাখতে পারেনি যদিও এদের অনেকেই আমাদের সংগঠনের নেতৃস্থানীয় অনেক তরুণ অভিবাসীর চাইতে বয়সে বড়।

এমন নয় যে দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালিরা সমষ্টিগতভাবে তাদের সংস্কৃতির সাথে একাত্মতা অনুভব করে না। এরাই তো এদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দক্ষিণ এশীয়, বাংলাদেশী ও মুসলিম ছাত্র সংগঠনের সাথে মিলে মিশে কাজ করে। গোটা মার্কিন সমাজের সাথে সামাজিক যোগাযোগের অবাধ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেকেই বাঙালি সমজেই বন্ধুত্ব করে, প্রেমও করে।

অর্থবহ বলতে কি বোঝাচ্ছি, সেটা বোঝার জন্য চলুন দেখি দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালিরা বাবা মা বা বন্ধুদের তাগাদা ছাড়াই ঠিক কি ধরনের বাঙালি কর্মকান্ডে অংশ নেয়। আমার বাঙালি বন্ধুমহলে দেখেছি, দুটো ব্যাপারে বাঙালি সমাজের চৌহদ্দীর বাইরেও ওরা অনেকেই স্বেচ্ছায় অংশ নেয় চলচ্চিত্র আর রাজনীতি।

বে এরিয়াতে দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালির একটা বড় দল রয়েছে যারা চলচ্চিত্র উৎসব হোক, বা আর কোথাও হোক, কোন বাংলা ছবি দেখান হলেই গিয়ে হাজির হবে। চলচ্চিত্র উৎসব নানা রকমের হতে পারে আন্তর্জাতিক, এশীয় আমেরিকান, দক্ষিণ এশীয়, এমনকি দক্ষিণ এশীয় সমকামী চলচ্চিত্র উৎসবও। মেঘে ঢাকা তারা থেকে শুরু করে চতুরঙ্গ, মুক্তির গান চলচ্চিত্র অহরহ নানা ধরণের দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালিদের মিলিত করছে।

গত এক দশক ধরে একটা বিষয় আমাকে খুব আনন্দিত করেছে তা হলো বাঙালিদের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ। ১৯৯৯ সালে প্রায় ৩০ জন দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালিরা যখন বঙ্গ সম্মেলনের তরুণদের অনুষ্ঠান পরিকল্পনা করছিল তখন ওরা কর্তৃপক্ষের বাজেট ছাঁটার হুমকি উপেক্ষা করে বাক স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাড়ায়। ঝগড়াটা লেগেছিল সম্মেলনে একজন সমকামী বক্তাকে তার প্রকাশ্যে আত্মপরিচয় ঘোষণার কাহিনী বলতে দেওয়া হবে কি না সেটা নিয়ে। ২০০১ সালে স্থানীয় তরুণরা প্রবাসী দূর্গা পূজোয় বিদ্বেষ-প্রসত অপরাধের (hate crimes) বিরুদ্ধে কাজ করে। ২০০২ সালে এরা তৈরী করে Progressive Bengali Network বলে একটা সংগঠন। সংগঠনটি ঢাকায় ডিজনীর কারখানায় শ্রমিকদের দুরবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল। এছাড়া সংগঠনটি একাধিকবার একাধিক প্রজন্মের বাঙালিদের একত্রিত করে দল বেঁধে যুদ্ধের প্রতিবাদ করেছে, মার্কিন সরকারের বিশেষ নিবন্ধিকরণ প্রকল্পের সময় বাংলাদেশী পুরুষদের জন্য ব্যাপক আইনী পরামর্শের বন্দোবস্ত করেছে। ২০০৯ সালে বঙ্গ সম্মেলনের তরুণদের কমিটি সমকামী বাঙালি আর বিশ্বের পরিবেশ পরিবর্তনের হুমকি নিয়ে আলোচনার আয়োজন করছে।

আমি বলছিনা যে বঙ্গ সম্মেলন যদি আরও ভাল ভাল বাংলা ছবি দেখায়, অথবা সমাজসেবামূলক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের বক্তৃতা দিতে আমন্ত্রণ জানায় তাহলে কোন জাদুস্পর্শে দ্বিতীয় প্রজন্মের অংশগ্রহ হু হু করে বেড়ে যাবে। আসল কথা হল ধৈর্য ধরে শুনতে হবে নতুন প্রজন্মের কথা, আর একটা আন্ত-প্রজন্ম সংলাপ গড়ে তুলতে হবে, তাকে বিকশিত করতে হবে। চলচ্চিত্র বা রাজনীতির জন্য পাগল হওয়া ব্যাপারটা এত বাঙালিসুলভ, এই ধরনের কর্মকান্ড এবং বাঙালিপনার আরও অন্যান্য প্রকাশ যেন অনুষ্ঠানে ঠাঁই পায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

__________

অনির্বাণ চ্যাটার্জী এক সময় বঙ্গ সম্মেলনের তরুণদের কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন। Progressive Bengali Network এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, আর দীর্ঘদিন বে এরিয়ার সংগঠন Alliance for South Asians for Taking Action-এর সাথে যুক্ত। (লেখাটি ইংরেজি থেকে অনদিত)। লেখকের ই-মেইল: anirvan@chatterjee.net

 

স্যান ফ্রান্সিস্কো, ক্যালিফোর্নিয়া

২ জুন, ২০০৯

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.