Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  মূল রচনাবলীঃ  ||  ৯ম বর্ষ ৫ম সংখ্যা ভাদ্র ১৪১৬ •  9th  year  5th  issue  Aug-Sept  2009 পুরনো সংখ্যা
বাংলা সাহিত্যে হাস্যরস Download PDF version
 

বাংলা সাহিত্যে হাস্যরস

বাংলা সাহিত্যে হাস্যরস

ইউনুস রাহী

 

সাহিত্যের রসদ হিসেবে হাস্য-রস নিতান্তই অপরিহার্য্য এটি নতুন কোন কথা নয়। বিশ্বের সকল ভাষার সাহিত্যের মত বাংলা সাহিত্যেও হাস্য রসের কমতি নেই। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সেই জন্ম লগ্ন থেকে অর্থাৎ ঈশ্বর চন্দ্র বন্দোপাধ্যায় (বিদ্যাসাগর) এর সমাজ সংস্কারমূলক রচনাবলি থেকে হাল আমলের সল সাহিত্যিক আনিঁসুল হকের লেখায়ও প্রচুর হাস্য রসের সন্ধান মেলে। বস্ত্তুত: এমন কোন সফল লেখক বা সাহিত্যিক নেই যাঁর লেখায় কোন না কোন ভাবে হাস্য-রস উপজীব্য হয়নি। যদিও সফল তথা মনে দারুনভাবে দাগ কেটে থাকার মত সাহিত্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বেদনা বিধুর ও কান্ন জাগানিয়া বিষয়বস্তু-নির্ভর, দীর্ঘদিন মনে রেখে দেওয়ার মত এবং সুযোগ-সাপেক্ষে অন্য সকলের কাছে হুবহু পরিবেশন করার মত সাহিত্য-গল্প প্রায় সবসময়ই হাস্য-রস ভিত্তিক। বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য আসনে প্রতিষ্ঠিত আমাদের পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের কথাই ধরা যাক। আদি বেদনা মিশ্রিত এত এত গ্রাম্য-গল্প-গাঁথায় তাঁর সাহিত্য দেশ-বিদেশে সুনাম কুড়িয়ে এসেছে, তবুও গ্রাম বাংলার লোক-মুখে অনদিকালে থেকে প্রচলিত হাস্য-রসাত্মক গল্প কাহিনী সংগ্রহ করে এবং তা নিজের একান্ত সহজ ও সুললিত ভাষায় প্রকাশের প্রচেষ্টা তাঁর সাহিত্যিক জীবনের অনেকখানিই ব্যয় করেছিলেন। বাঙালীর হাসির গল্প নামক তাঁর বিখ্যাত সেই বইটিতে তিনি মোট ২৭টি হাস্যরসাত্মক গল্প লিখেছেন। তাঁর নিজের কথায় .....গল্পগুলি বহুদিন আমার মনে থাকিয়া বাহির হইবার জন্য কিচির মিচির করিত।---- একবার লিখিয়াও খুশি হইতে পারিলাম না। বারবার করিয়া লিখিলাম। আমার খাতাগুলি যদি তোমরা দেখ, বুঝিতে পারিবে, আমি কত কাটাকুটি করিয়া, কথাকে কত অদল বদল করিয়া এই বইখানি লিখিয়াছি। এই গল্পগুলি লিখিতে দশ-বার বৎসর আমাকে তপস্যা করিতে হইয়াছে। মূলত: ছোটদের জন্য তাদের উপযোগী ভাষায় লিখলেও তাঁর ভাষায় ... বড়দের হাতেও এগুলি সমান বিকাইবে বলিয়া আমার বিশ্বাস। কার গ্রামদেশে এই শব্দগুলি ছোটরা বড়রা সমানে উপভোগ করে

আমাদের সময়ে একজন অত্যন্ত সফল, হাস্য-রসাত্মক সাহিত্যিক হিসেবে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে আছেন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়, পরশুরাম (রাজশেখর বসু)এর পর বুদ্ধিদীপ্ত বাঙালি হাসতে ভুলে গিয়েছিল....... সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় সেই শূণ্যস্থানে তুলেছেন হাসির তুফান। বহু বিচিত্র অসঙ্গতিতে পূর্ণ বর্তমান জীবনের হাস্যরসের বিপুল সম্ভাবনাময় দিকটির উম্মোচনের চাবিকাঠি রয়েছে এই সিদ্ধহস্ত শিল্পীর হাতে

বাংলা সাহিত্যের অঢেল হাস্য-রসের ভান্ডার থেকে এখানে দুটি লেখা উদাহর স্বরূপ তুলে ধরা সমীচীন মনে করছি দুই বাংলার দুই সফল সাহিত্যিকের হাস্যরসাত্মক দুই লেখা - জসীম উদ্দীনের গোপ্যার বউ ও সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের বই আর বউ

গোপ্যার বউ

গোপ্যাকে লইয়া পাড়ার লোকের হাসি-তামাসার আর শেষ নাই। কেহ তাহার মাথায় কেরাসিন তৈল মালিশ করিতে ছুটিয়া আসে, কেহ তাহার গায়ে ধুলি দেয়। তবু তার গল্প থামেনা। জোয়ারের পানির মত তাহার মুখ হইতে সব সময় নানা রকম মিছা আজগুবী গল্প বাহির হইয়া আসিতে থাকে। আজ মাঠে যাইয়া দেখি এক অজগর সাপ! আমাকে দেখিয়া সাপ ত তাড়িয়া আসিল। আমিও দে ছুট- সাপও আমার পিছে পিছে। দৌড়াইতে দৌড়াইতে দৌড়াইতে আছাড় খাইয়া পড়িয়া গেলাম। পট-ফণা মেলিয়া সাপ আমাকে ছোবল দেয়ই আর কি! তখন আমি কি করি? তাড়াতাড়ি এক লাফে সাপের ফণার উপর চড়িয়া বসিলাম। সাপ তখন ছুটিয়া চলিল। আমি ত ফণার উপর বসিয়াই আছি। ছুটিয়া যাইয়া সাপ ঢুকিল এক সাপলা-বিলে। আমি সাপের ফণার উপর বসিয়াই চারটি সাপলা ফুল ছিঁড়িয়া ফেলিলাম। তারপর সাপের ফণাটা ঘুরাইয়া ধরিলাম বাড়ির দিকে। ওই আম-বাগানতক আসিয়া সাপ খোড়লে ঢুকিল। আমি সাপলাফুল কয়টি লইয়া তোমাদের এখানে আসিলাম। তোমরা সাপের কথা সাঁচা না মনে করিলে আমবাগানের ওখানে খুঁড়িয়া দেখিতে পার, আর আমার হাতের সাপলাফুল ত দেখিতেই পাইতেছ। সুতরাং তার কথা সাঁচা না মানিয়া আর উপায় আছে? কে যাইবে সাপের খোড়ল খুঁজিতে।

এইরূপ গল্পের আর শেষ নাই। কোন দিন সে আসিয়া বলে, মৌমাছির চাক কুলগাছের উপর। তার উপরে যাইয়া বসিয়া পড়িলাম। অমনি মৌমাছির দল মৌচাক লইয়া আসমানে উড়িতে লাগিল। আমি ত চাকের উপরে বসিয়াই আছি। উড়িতে উড়িতে উড়িতে আসমানে চলিয়া গেলাম। সেখানে নীল মে, কালো মেঘের দেশ। তারও উপরে সাঁঝ-মণির বাড়ি। চারিদিকে সিন্দুরের পাহাড়, সেখান হইতে চলিয়া গেলাম সাত গাঙের ধারে। সেখানে রাজার মেয়ে জোনাকি ধরিয়া মালা গাঁথিতেছে। তারই কাছ হইতে তিনটি জোনাকি ধরিয়া বাড়ি ফিরিয়া আসিলাম

শুনিয়া সকলে বলে বাড়ি কেমন করিয়া ফিরিলে? আসমান হইতে লাফাইয়ে পড়িলে নাকি?গোপপ্যা কোন জবাব দিতে পারে না। পাড়ার লোকেরা তাকে তাড়া করিয়া ফেরে। ছোটরা তবু গোপ্যাকে বড়ই ভালবাসে। হোক তার গল্প মিছা আজগুবী, তবু শুনিতে ত খারাপ লাগে না!

গোপ্যার বউ বড় ভাল মানুষ। দেখিতেও খুব খুবছুরত, আর তার কথা-কওয়া, চলন বলন আরও চমৎকার; তবু সবাই তাকে দেখিলে বলে, এই যে গোপ্যার বউ আসিল। গোপ্যা যেখানে যত মিছা আজগুবী গল্প বলে তাহাই নানা ভঙ্গি করিয়া লোকে গোপ্যার বউকে বলে; আর নানা রকমের হাসি-তামাসা করে।

বেচারী কত আর সয়? সেদিন গোপ্যা বউকে খুশী করিবার আশায় মনে মনে একটি চমৎকার আজগুবী গল্প বানাইয়া আনিয়াছিল, বাড়ি আসিয়া বউ-এর মুখের দিকে চাহিয়া বড়ই মনমরা হইয়া পড়িল। সে কহিল কি হইয়াছে বল ত?

বউ ঠেস দিয়া উঠিয়া বলিল, কি হইয়াছে বুঝিতে পার না? এই যে পাড়ায় পাড়ায় মিছা আজগুবী গল্প বানাইয়া বানাইয়া বলিয়া বেড়াও, লোকের টিট্কারিতে ত আমি ঝালাপালা হইয়া পড়িলাম। আমাকে যে দেখে সেই বলে, ওই যে গোপ্যার বউ আসিল

বউয়ের দুঃখ দেখিয়া গোপ্যার মনটা বড়ই খারাপ হইয়া পড়িল। সে বউকে কহিল বল ত আমাকে কি করিতে হইবে? বউ বলিল, করিতে আর কি হইবে? তুমি তোমার ওই গল্পের ছালা কোথাও ফেলিয়া দিয়া আস

অনেকক্ষণ ভাবিয়া গোপ্যা বলিল, কাল সকালে আমি সামনের ওই পাহাড়টার ওখানে যাইয়া গল্পের ছালা ফেলিয়া দিয়া আসিব। সেখানে অনেক বাঘ-ভালুক থাকে, বড়ই বিপদের পথ। আর ফিরি কি না ফিরি কে জানে? তবু যাব সেখানে কাল

বউ বলিল, তুমি ফের বা না ফের তার ধার ধারি না। গল্পের ছালা তোমাকে ফেলিয়া আসিতেই হইবে”।

রাগের মাথায় একথা বলিলে কি হইবে? সাঁচা ত মনে হয় না, তবু যদি সেখানে বাঘ-ভালুকের ভয় থাকে। বউ সকালে উঠিয়া ভালমত পাক করিয়া দুধে-ভাতে গোপ্যাকে পেট ভরিয়া খাওয়াইয়া দিল। খাইয়া দাইয়া পান চিবাইতে চিবাইতে গোপ্যা গল্পের বোঝা ফেলিয়া আসিতে দূর পাহাড়ের পথে রওয়ানা হইল। পথে যাইতে এমন ভঙ্গি দেখাইয়া চলিল যেন কত বড় বোঝাটা সে মাথায় করিয়া লইয়া চলিয়াছে।

সাঁঝের বেলা গোপ্যা ফিরিয়া আসিল। বউ কহিল গল্পের ছালা একেবারে উজাড় করিয়া ফেলিয়া দিয়া আসিয়াছ ত?

গোপ্যা বলিল, ফেলিতে কি পারিলাম? আমি ত ওই পাহাড়ের কাছে গিয়াছি, অমনি এক বাঘ আসিয়া দিল আমাকে তাড়া। আমিও দৌড়! বাঘও আমার পাছে পাছে দৌড়। দৌড়াইতে দৌড়াইতে দৌড়াইতে পাহাড়ের গোড়ায় যাইয়া পড়িলাম।

সামনে আর পথ নাই। বাঘ ত একেবারে কাছে আসিয়া পড়িয়াছে। জানের ভয়ে কি আর করি? সামনে দেখিলাম একটি কচু গাছ। তার ডা ধরিয়া উপরে উঠিতে লাগিলাম। বাঘও আমার পিছে পিছে উঠিতে লাগিল। উঠিতে উঠিতে আরও উঠিলাম- আরও উঠিলাম। বাঘও উঠিতে লাগিল। আমিও উঠিতেছি - বাঘও উঠিতেছে, আমিও উঠিতেছি - বাঘও উঠিতেছে। তারপর আমাদের দুইজনের ভারে কচুগাছের ডাল গেল ভাঙ্গিয়া। পড়ি ত পড়ি একেবারে তোমার ভাইদের বাড়ির সামনে যাইয়া পড়িলাম। তোমার ভাই-এর বউ আজ মুরগী পাক করিয়াছিল, আর চিতই পিঠা। তাই খাইয়া বাড়ি ফিরিলাম

গল্প শুনিয়া গোপ্যার বউ হাসি গোপন করিয়া বলিল ও-মা। তোমাকে পাঠাইলাম গল্পের ছালা ফেলিয়া দিয়া আসিতে, আর তুমি কি না, আর এক ছালা গল্প মাথায় করিয়া বাড়ি ঢুকিলে

সূত্র: জসীম উদ্দীন (পল্লী কবি), বাঙালীর হাসির গল্প, পলাশ প্রকাশনী, ঢাকা, ১৯৯০

বই আর বউ

আমরা বইয়ের কথা বলতে গেলেই বউয়ের কথা বলি। কারণটা কী! বর্ণমালায় ই আর উ প্রায় পাশাপাশি আছে। প করে এক ঘাট এগিয়ে যাই। এইটাই কী কারণ? স্লিপ অফ পেনের মতো স্লিপ অফ টাং। নাকি, দুটিই আমাদের সমান প্রিয় বলে। রোমান্টিক উপন্যাস পড়ে সেই আমাদের কচি গোঁফের কালে প্রেমিকা সম্পর্কে একটি ধারণা গজায়। সে ছাতের আল্ সেতে চুল এলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। পর্দা সামান্য ফাঁক করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে। প্রবল বৃষ্টিতে একই আশ্রয়ে মাথা বাঁচাবার জন্যে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে পারি। সে আমার সহপাঠিনী হতে পারে। জীবনের সেই জ্বালাময়ী যৌবনের দিনে উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে দাঁড়ায় আমার কল্প-প্রেমিক। সময়টা বসন্ত হতে পারে। জানলায় গোল চাঁদ লেগে থাকতে পারে। একটা কোকিল বিরহের ডাক ছাড়তে পারে। পুবে কোনও বিয়েবাড়িতে সানাই বাজতে পারে। আমার পাশের বাড়ির মেয়েটি চোখে কোনও বার্তা নিয়ে ঠিক ওই সময়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াতে পারে। মৃদু গলায় ডাকতেও পারে।

বই থেকে জীবন খুব বেশি দুরে নয়। অক্ষরের প্রেমিকা শরীর ধারণ করে ময়দানের গাছতলায় আমার পাশে বসতে পারে। ঘাসের টাকনা দিয়ে চিনেবাদাম খেতে খেতে আমাদের ভবিষ্যৎ সংসারে পরিকল্পনাটা ছকে ফেলতে পারি। শেষ ট্রামে চড়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে, মনে হতে পারে আমি এক বিদেহী আনন্দ। শেলির এরিয়াল আমি। কীটসের গ্রিসিয়ান আর্ন-এর গায়ে উৎকীর্ণ জীবনলীলার চরিত্র আমি। আমি সুইনবার্ন। গোলাপ হাতে জাহাঙ্গির। বুড়ো সাজাহান কখনওই নই। এই প্রেম যদি ট্র্যাজেডি হয়ে যায়, তাহলেও কোনও আপত্তি নেই। বউয়ের শোক বই পড়ে ভুলব। দেবদাসের মতো বোতলে প্রবেশ করব না। আর যদি মিলনান্তক হয়, তাহলে বউয়ের পেছন পেছন কিছু বইও এসে ঢুকবে বাড়িতে।

একালে অবশ্য বই উপহার দেওয়ার রেওয়াজ কমে গেছে। এখন হল ইউটিলিটি গুড্ স দেওয়ার প্রথা। সুন্দর করে মোড়া একটা ফুলঝাড়ু, অথবা একটা তোলা উনুন। বিশাল এক স্যুটকেস। তোমাদের নতুন সংসারে কাজে লাগবে। হয়তো এমনও হবে, উপহার দিয়ে গেল একজন কাজের মেয়ে। এই তো, আর একটি প্রাণ এল বলে। ড্রইজিনের মতো ড্রাই প্রেম তো আর হয় না, ফল ধরবেই, তাই এই দূর্লভ উপঢৌকন। মাস গেলে তিনশো ম্যানেজ করে দিয়ে দিয়ো।

বই আর বউ এই নিয়েই সংসার। দুজনের স্বভাবও মনে হয় এক। লেপকে খোলে ঢোকানোর মতো বউকে যদি চ্যাপ্টা করে কোনও কায়দায় দুমলাটের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তা হলেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একটি অলিখিত বই হয়ে যাবে। বই জ্ঞানদায়িনী, বউও জ্ঞানদায়িনী। উঠতে বসতে, চলতে ফিরতে, শুতে ঘুমোতে, প্যারার পর প্যারা খালি জ্ঞান। সেই জ্ঞানে আলস্যমোচনের কথা থাকবে, স্বভাব সংশোধনের কথা থাকবে। বউ-এর ফাস্ট চ্যাপ্টার হল প্রেম। তার আগে সামান্য ভুমিকা। তিনি এলেন। ঘরেতে ভ্রমর এল গুনগুনিয়ে। অষ্ফুট প্রেমের মৃদু গুঞ্জন। সুবাস, সৌরভ। যেমন বলে, বই পড়, জীবনের কমপ্লেকসানটাই পালটে যাবে, সেই রকম, বউ এলে জীবনের সব কিছু পালটে যায়। আলাদা একটা ঘর হয়। খাতিরের বিছানা। ড্রেসিং টেবিলে আত্মদর্শনের আয়না। সামনে সাজানো সৌন্দর্য বর্ধনের শিশি, বোতল। মানুষের বিয়ে হলে চিরুনিরও বিয়ে হয়। মেল, ফিমেল পাশাপাশি। বই যেমন অক্ষরের ভাষায় রঙ ছড়ায়, বউও সেইরকম শাড়ির ভাষায় ঘরে ছড়িয়ে দেয় বর্ণমালা। ভাল উপন্যাসের মতো নিজেকে এস্ ট্যাবলিশ করতে থাকে। প্রথম প্রথম ঘরেই বেশিক্ষণ থাকা। এর মানে, এই নয় যে প্লট আটকে গেছে। বউ নামক বইটি প্রথমে মূল পাঠকটিকে চিনতে চায়। আগে তার মগজধোলাই করো। সংসার-কুরুক্ষেত্রে কৃষ্ণসারথি। কয়েক বছরের মধ্যেই তো গীতার অমৃতময় বাণীতে সবাই কাত হবে। ধৃতরাষ্ট্র শ্বশুর, স্নেহান্ধ শাশুড়ি গান্ধারী, ভ্রাতা কৌরবকুল। মধ্যরাতের নিভৃতিতে প্রেম-বিনিময়ের অবসরে স্খলিত-গান্ডিব পার্থকে বলবেন, ক্লৈব্যং মাস্ম গমঃ পার্থ। হতাশায় উঠে বোসো, তস্মাদুত্তিষ্ঠ কৌন্তেয় যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়ঃ উত্তিষ্ঠিত জাগ্রত, কেরিয়ারের সঙ্গে যুদ্ধ করো, আনওয়ান্টেড আত্মীয়স্বজন ছেঁটে ফেল, নিট অ্যান্ড ক্লিন সংসার, নো ওল্ডম্যান, ওল্ড ওম্যান নৈব চ। ফ্ল্যাট চাই, চাই চারচাকা, না পারলে দুচাকা। তোমার একটা পুং হেলমেট, আমার একটা স্ত্রীং হেলমেট। তোমার মধ্যপ্রদেশটিকে কাল্টিভেটেড করে অ্যাটলাসের মতো কর, যাতে আমি জাপ্টে  ধরে বসতে পারি, মাঝখানে, দুই রুটির মাঝে মাখনের মতো আমাদের ননিগোপাল। থ্রি অন এ রাইডার। প্রশ্নটা, এইখানেই, বই আমাদের বেশি উদ্ধুদ্ধ করে, না বউ করে। বলছে, পেন ইজ মাইটিয়ার দ্যান সোর্ড। হতে পারে। সেকালে হয়তো তাই ছিল, একালে ওয়াইফ ইজ মাইটিয়ার দ্যান বুক। সে কারণেই, বউকে যদি ঠিকমতো পড়ে ফেলতে পারো, তাহলেই তুমি প্রবুদ্ধ, আদারওয়াইজ তুমি বুদ্ধু; কিন্তু স্ত্রীয়াশ্চরিত্রম, অত সহজ নয়। যত পড়বে ততই নিত্যনতুন ব্যাখ্যা বেরোবে।

এক ধরনের বউ আছেন যাঁরা বইয়ের পোকা। যে সব বই পুরুষরা পড়তে পারে না, সে সব বইও তাঁরা নির্বিচারে পড়েন ও রসগ্রহন করেন। খুব মোটা ঢাউস বইও তাঁদের ভয় দেখাতে পারে না। ঝুড়িঝুড়ি অক্ষর নেশা, অ্যাডিকসান। বই নাকে বসে আছেন। সংসার প্রায় রসাতলে।

এক কাপ চা হবে?

হুঁ

আধঘন্টা পরে, এক কাপ চা চেয়েছিলুম কিন্তু। আধঘন্টা হয়ে গেল

গম্ভীর গলায়, ঠিক সময়ে পাবে

বইটা এইবার রাখো না। সংসারে তো আগুন জ্বলে গেল। সেই সকাল থেকেই তো চলছে। দুধ পড়ে আছে। মাছ বেড়াল টেনে নিয়ে যাচ্ছে। বাজার গড়াগড়ি যাচ্ছে। এইবার দয়া করে ওঠো না। অফিসটফিস আছে তো

অতই যদি তাড়া, একদিন নিজে করে খাওনা। অত পরমুখাপেক্ষী কেন?

হয়ে গেল। যাদের বউকে বইয়ে ধরেছে তাদের হাতে হারিকেন। মেয়েরা আবার এক ধরনের বই-ই বেশি পছন্দ করেন। বেশ একটা রগরগে সিনেমা-মার্কা গল্প চাই। উত্তমকুমারের মতো নায়ক, সুচিত্রা সেনের মতো নায়িকা। প্রেমের রং ধরেই একটা বিচ্ছেদ। দুজনে দুপ্রান্তে। একজন বড়লোক, একজন মধ্যবিত্ত। বড়লোকের সম্পদ, অহংকার, মধ্যবিত্তের আদর্শ। ধুন্ধুমার কান্ড। মাঝখানে আর একজন ঢুকবে। আর একটি মেয়ে। একটা ত্রিভুজ হবে। কড়া লিকার ডায়ালগ। শেষে মিলন। নিউ থিয়েটার-মার্কা উপন্যাস। চুম্বকের গায়ে পেরেকের মতো আটকে যাবেন মহিলারা। এইরকম বইপ্রেমী বউ এক সমস্যা। রাত বারোটা বাজে, একটা বাজে। চোখের ওপর চড়া আলো। এবার শোও না!

তুমি ঘুমোও না। আমার যখন খুশি তখন ঘুমোব। তোমার কিসের অসুবিধে!

চোখের আলো পড়লে ঘুমোনো যায়। সঙ্গে সঙ্গে মশারির চালে চাদর চাপা পড়ে গেল। যাতে কর্তাটি অমাবস্যার অন্ধকারে তলিয়ে যেতে পারেন। গৃহিণী তখন উপন্যাসের ভয়ংকর জায়গার। নায়ক আর নায়িকা গৃহত্যাগ করে ট্রেনে উঠেছে। একটা লুম্পেন টাইপের লোক উল্টোদিকে বসে ঘোলাটে চোখে তাকাচ্ছে। প্রেমের ঢেউয়ে ভেসে দুজনে সম্বলপুরে চলেছে। সেখানে এক কমন ফ্রেন্ড আছে। জীবিকা তো একটা চাই। তা না হলে প্রেম তো ফেঁসে যাবে। ভিলেনটা উপকারী বন্ধু সেজে ঢোকার তাল খুঁজছে। রাত বাড়ছে, শীত বাড়ছে, ট্রেন ছুটছে, প্লট জমছে। কর্তা ঘুম-জড়ানো গলায় বলছেন, ওগো, এইবার দয়া করে শোও না গো।

সঙ্গে সঙ্গে ধমক, চুপ করো।

কিছু মানুষ আছেন ক্রিমিন্যাল টাইপ। তারা বই ছাড়া কিছু বোঝেন না। ড্রাগ অ্যাডিক্টের মতো, বুক অ্যাডিক্ট। বই কিনেই ফতুর। দেয়াল, আলামারি, টেবিল, মেঝে সব বইয়ে বইয়াক্কার। সর্বত্র বই। যখনই ফাঁক পান তখনই বই নিয়ে বসে পড়েন আর এখন হয়েছেও সেইরকম, এত বিষয়ে এত বই বেরোচ্ছেএক জীবনে পড়ে শেষ করা যাবে না। আর একবার বই যাকে ধরে, তার আর ঘর সংসারে তেমন মন থাকে না। এমন মানুষের স্ত্রীদের মহাক্ষোভ। লোকটা যত পড়ছে ততই গাধা হয়ে যাচ্ছে। পাঁচশো টাকার রাসেল না কিনে একটা শাড়ি কিনলে কী ক্ষতি হয়! মাছ, মাংস খেলে রক্ত হয়, ভাল ভাল শাড়ি পড়লে সৌন্দর্য বাড়ে, লোকে ফিরে তাকায়, কনফিডেন্স বাড়ে, বই পড়লে কী হয়! চোখ খারাপ হয়। টাক পড়ে, বদহজম হয়। চোখ খারাপ হয়। সর্বোপরি মানুষ দরিদ্র হয়ে যায়।

মানুষকে উদ্যোগী হতে হবে। রেটির তেলের প্রদীপের পৃথিবী আর নেই। হ্যালোজন ওয়ার্লডে, জেটসেট ম্যান। দালালি করো, ইনসিওরেনসের এজেন্ট হও, প্রমোটার হও। মাল বেচো, নিজেকে বেচো, গোল্ডেন আইডিয়ালস লকারে রেখে ধান্দার পৃথিবীতে লাফ মারো। বইপত্তরের ডেডওয়ার্লডে হরিশচন্দ্রের মতো বসে থেকো না। স্মরণ করো পুরনো প্রবাদ লেখাপড়া করিবে মরিবে দুঃখে, মৎস্য ধরিবে খাইবে সুখে। প্র্যাকটিক্যাল বউ ঝন ঝন, খনখন করে উঠবেন, এইবার যেখানে যত আবর্জনা আছে সব কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে দোবো, প্লাতো, সোক্রাতেস, সার্ত্র, উমবের্তো, কুন্ডেরা, বেলো, কামু, কাফকা, বুভ্যেয়ার, ব্রেশট, সব এক গতি, এ হ্যান্ডফুল অফ ডাস্ট। থাকবে শুধু তিনটে বই- রূপচর্চা, রকমারি রান্না আর কেরিয়ার গাইড।

বুড়ো বয়সে আমি পড়বটা কী

শোনো ছোকরা, বুড়ো বয়সে তোমার মাথার ওপর পারিবারিক ছাত থাকবে কি! স্নেহের বন্ধন! বৃদ্ধনিবাসেই হয়তো থাকবে। সেখানে, কোথায় তোমার পার্সোন্যাল লাইব্রেরি। সেখানে আমেদপুর সুগার ফ্যাকট্রি হয়ে থাকবে বিছানায়। ব্লাডসুগার ফোর ফোরটি। চোখে ভারী পর্দা। ডায়াবেটিক হার্ট কিডনি। প্রেসারের উত্থানপতন। আধুনিক হাইটেক জীবন চল্লিশের মধ্যেই তোমার সব শুষে নিয়ে হিউম্যান গার্বেজে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। দিস ইজ ইওর ফিউচার।

ডার্লিং। তাহলে, তোমার উপদেশটা কী! বই তো কেবল ভাঁওতা দেয়। বউ কী বলে শুনি

আমি বলি, বুদ্ধিমান প্রাণী হও। আদিখ্যেতার বই না কিনে ইউনিট কেন। জ্ঞান অনন্ত, জীবন সীমিত, অতএব শেষ জীবনের ইনসুলিনের ব্যবস্থা করাটাই হল ধ্রুব জ্ঞান। অ্যান্ড দাস সেজ মাই বউ। আমার বাইবেল। বাইবেলের নতুন মানে পেয়েছি- বেল মানে ঘন্টা, বাই মানে পাশে। বিবাহসূত্রে যে ঘন্টাটি আমার গলায় ঝুলেছিল, সেই বউ আমার সব কেতাবের সেরা কেতাব।

সূত্র: সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, মাপা হাসি চাপা কান্ন (৩), বিকাশ গ্রন্থ ভবন, কলকাতা, ১৯৯৫।

 

 

লস এঞ্জেলেস, ক্যালিফোর্নিয়া।

 

মন্তব্য:
M Sarkar   September 2, 2009
This story/article is just a combo of two Bangla stories. So why not publish them with the name of original writers rather than using another name?
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.