Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  মূল রচনাবলীঃ  ||  ৯ম বর্ষ ৫ম সংখ্যা ভাদ্র ১৪১৬ •  9th  year  5th  issue  Aug-Sept  2009 পুরনো সংখ্যা
হাসির রাজা সৈয়দ মুজতবা আলী Download PDF version
 

বাংলা সাহিত্যে হাস্যরস

হাসির রাজা সৈয়দ মুজতবা আলী

দলিলুর রহমান

 

পড়শীর অগাষ্ট-সেপ্টেম্বর ২০০৮ এর সংখ্যায় বাংলা সাহিত্যে রম্য লেখা প্রবন্ধে শামীমা সরকার ও সুতপা বড়ুয়া বাংলা সাহিত্যে হাস্যরসধারা যাদের লেখায় প্রবাহমান তাঁদের  কথা লিখেছেন, তাঁরা বিশেষকরে উল্লেখ করেছেন সন্জীব চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার রায়, শিবরাম চক্রবর্তী, সৈয়দ মুজতবা আলী, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোঁসেন, জসীমউদ্দিন, আনিসুল হক ও হুমায়ুন আহমেদ সম্পর্কে। এ সংখ্যায় আমরা সৈয়দ মুজতবা আলীর কিছু লেখার উদাহর তাঁর বই থেকে দিতে চাই। বাংলা সাহিত্যে তাঁর রম্যরসবোধ সর্বজনবিদিত। সাহিত্যে যারা হাস্য, কৌতুক, ব্যাঙ্গ লিখে আনন্দ সাগরে ডুবিয়ে রেখেছেন তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম একজন।

তিনি কবিগুরুর সাহচর্যে ছিলেন, সরাসরি তাঁর শিষ্য সুতরাং সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখায় কবিগুরুর হাস্যরস বোধ ও প্রকাশ পেয়েছে। যেমন তাঁর বই চতুরঙ্গে লিখেছেন

(১) ভালই হল টাকা ধারের কথা মনে পড়ল।

দেহলীর উপরে থাকতেন তিনি, নীচের তলায় তাঁর নাতি দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ওরফে দিনুবাবু।

তাঁরই বারান্দায় বসে আশ-কথা-পাশ-কথা নানা কথা হচ্ছে। হতে হতে টাকা ধার নেওয়ার কথা উঠলো। হঠাৎ রবীন্দ্রনাথ বললেন, বুঝলি, দিনু, আমার কাছ থেকে একবার একজন লোক দশ টাকা ধার নিয়ে গদগদ কন্ঠে বললে, আপনার কাছে আমি চিরঋণী হয়ে রইলুম সভায় যাঁরা ছিলেন তাঁরা পয়েন্টটা ঠিক কি বুঝতে না পেরে চুপ করে রইলেন। আফ্টার অল্, গুরুদেবের পক্ষেও কালে-কস্মিনে কাঁচা রসিকতা করা অসম্ভব নাও হতে পারে।

খানিকক্ষণ পরে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে গুরুদেব বললেন, লোকটার শত-দোষ থাকলেও একটা গুণ ছিল। লোকটা সত্যভাষী। কথা ঠিক রেখেছিল। চিরঋণী হয়েই রইল

শ্রীযুত বিধুশেখর শাস্ত্রী, নেপালচন্দ্র রায়, ইত্যাদি মুরব্বীরা অট্টহাস্য করেছিলেন। আমরা, অর্থাৎ চ্যাংড়ারা, থামের আড়ালে ফিক্ ফিক্ করেছিলুম।

(২) এই বইতে আরেকটি মজার কাহিনী যেটি সৈয়দ মুজতবা আলী নিজেই বলেছেন সবচেয়ে ভাল

রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে প্রচলিত গল্পের ভিতর আমার সবচেয়ে ভালো লাগে গুরুদেব-ভান্ডারে কাহিনী। অবশ্য আমার মনে হয়, গল্পটির নাম ভান্ডারে-গুরুদেব কাহিনী দিলে ভালো হয়, কারণ কাহিনীটি সম্পুর্ণ নির্ভর করছে, ভান্ডারের একটি সৎকর্মের উপর।

রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তাধারা ইংরেজ পছন্দ করতো না বলে শান্তিনিকেতন আশ্রমটিকে নষ্ট করার জন্য ইংরেজ একটি সূক্ষ্ম গুজোব বাজারে ছড়ায়-শান্তিনিকেতনের ইস্কুল আসলে রিফরমেটরি। অন্তত এই আমার বিশ্বাস।

খুব সম্ভব তারই ফলে আশ্রমে মারাঠী ছেলে ভান্ডারের উদয়।

ইস্কুলের মধ্য বিভাগে বীথিকা-ঘরে ভান্ডারে সীট পেল। এ ঘরটি এখন আর নেই তবে ভিতটি স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। তারই সম্মুখ দিয়ে শাল বীথি। তারই এক প্রান্তে লাইব্রেরি, অন্য প্রান্তে দেহলী। গুরুদেব তখন থাকতেন দেহলীতে।

দেহলী থেকে বেরিয়ে, শালবীথি হয়ে গুরুদেব চলেছেন লাইব্রেরীর দিকে। পরনে লম্বা জোব্বা, মাথায় কালো টুপি। ভান্ডারে দেখামাত্রই ছুটলো তাঁর দিকে। আর সব ছেলেরা অবাক। ছোকরা আশ্রমে এসেছে দশ মিনিট হয় কিনা হয়। এরই মধ্যে কাউকে কিছু ভালো-মন্দ না শুধিয়ে ছুটলো গুরুদেবের দিকে।

আড়াল থেকে সবাই দেখলে ভান্ডারে গুরুদেবকে কি যেন একটা বললে। গুরুদেব মৃদু হাস্য করলেন। মনে হল যেন অল্প অল্প আপত্তি জানাচ্ছেন। ভান্ডারে চাপ দিচ্ছে। শেষটা ভান্ডারে গুরুদেবের হাতে কি একটা গুঁজে দিলে। গুরুদেব আবার মৃদু হাস্য করে জোব্বার নিচে হাত চালিয়ে ভিতরের জেবে সেটি রেখে দিলেন। ভান্ডারে এক গাল হেসে ডরমিটরিতে ফিরে এল। প্রণাম না, নমস্কার পর্যন্ত না।

সবাই শুধালে, গুরুদেবকে কি দিলি?

ভান্ডারে তার মারাঠী-হিন্দীতে বললে, গুরুদেব কৌন্? ওহ্ তো দরবেশ হৈ

বলিস কি রে ও তো গুরুদেব হ্যায়!

ক্যা গুরুদেব গুরুদেব করতা হৈ। হম্ উসকো এক অঠন্নী দিয়া

বলে কি? মাথা খারাপ না বদ্ধ পাগল? গুরুদেবকে আধুলি দিয়েছে!

জিজ্ঞেসাবাদ করে জানা গেল, দেশ ছাড়ার সময় ভান্ডারের ঠাকুরমা তাকে নাকি উপদেশ দিয়েছেন, সন্ন্যাসী দরবেশকে দানদক্ষিণা করতে। ভান্ডারে তাঁরই কথামত দরবেশকে একটি আধুলি দিয়েছে। তবে হ্যাঁ, দরবেশ বাবাজী প্রথমটায় একটু আপত্তি জানিয়েছিল বটে, কিন্তু ভান্ডারে চালাক ছোকরা, সহজে দমে না চালাকি নয়, বাবা, একটি পুরী অঠন্নী!

চল্লিশ বছরের আগের কথা। অঠন্নী সামান্য পয়সা, এ-কথা কেউ বলেনি। কিন্তু ভান্ডারকে এটা কিছুতেই বোঝানো গেল না যে তার দানের পাত্র দরবেশ নয়, স্বয়ং গুরুদেব।

ভান্ডারের ভুল ভাঙ্গতে কতদিন লেগেছিল আশ্রম পুরাণ এ-বিষয়ে নীরব। কিন্তু সেটা এ-স্থলে অবান্তর।

ইতিমধ্যে ভান্ডারে তার স্বরূপ প্রকাশ করেছে। ছেলেরা অস্থির, মাস্টাররা জ্বালাতন, চতুর্দিকে পরিত্রাহি আর্তরব।

হেড মাস্টার জগদানন্দবাবু এককালে রবীন্দ্রনাথের জমিদারী-সেরেস্তায় কাজ করেছিলেন। লেঠেল ঠ্যাঙ্গানো ছিল তাঁর প্রধান কর্ম। তিনি পর্যন্ত এই দুঁদে ছেলের সামনে হার মেনে গুরুদেবকে জানালেন।

আশ্রম-স্মৃতি বলেন, গুরুদেব ভান্ডারেকে ডেকে পাঠিয়ে বললে, হ্যাঁ রে, ভান্ডারে, একি কথা শুনি?

ভান্ডারে চুপ।

গুরুদেব নাকি কাতর নয়নে বললেন, হ্যাঁ রে ভান্ডারে, শেষ পর্যন্ত তুই এসব আরম্ভ করলি? তোর মত ভালো ছেলে আমি আজ পর্যন্ত দেখি নি। আর তুই এখন আরম্ভ করলি এমন সব জিনিস যার জন্য সক্কলের সামনে আমাকে মাথা নিচু করতে হচ্ছে। মনে আছে, তুই যখন প্রথম এলি তখন কি রকম ভালো ছেলে ছিলি? মনে নেই, তুই দান-খয়রাত পর্যন্ত করতিস? আমাকে পর্যন্ত তুই একটি পুরো আধুলি দিয়েছিলে? আজ পর্যন্ত কত ছাত্র এল গেল কেউ আমাকে একটি পয়সা পর্যন্ত দেয়নি। সেই আধুলিটি আমি কত যত্নে তুলে রেখেছি। দেখবি?

(৩) আর্ট না অ্যাক্সিডেন্ট

আর্ট বলতে আমরা আজকাল মোটামুটি রস-ই বুঝি। তা সে কাব্যে, চিত্রে, ভাস্কর্যে, সঙ্গীতে যে কোনো কলার মাধ্যমেই প্রকাশিত হোক না কেন।

এখন প্রশ্ন আর্ট বা রসের সংজ্ঞা কি? সে জিনিস কি? তার সঙ্গে দেখা হলে তাকে চিনব কি করে? অন্যান্য রস থেকে তাকে আলাদা করব কি করে? সরেস আর্ট কোন্ টা আর নিরসই বা কোনটা?

প্রাচীন ভারত, গ্রীস এবং চীন-এই তিন দেশেই এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে এবং অধুনা পৃথিবীর বিদগ্ধ দেশ মাত্রেই এ নিয়ে কলহ-বিসংবাদের অন্ত নেই। বিশেষ করে যবে থেকে মডার্ণ আর্ট নামক বস্তুটি এমন সব রস পরিবেশন করতে আরম্ভ করলে যার সঙ্গে আমাদের কণামাত্র পরিচয় নেই। এলোপাতাড়ি রঙের পোঁছকে বলা হল ছবি, অর্থহীন কতকগুলো দুর্বোধ শব্দ একজোট করে বলা হল কবিতা, বেসুরো বেতালা কতকগুলো বিদঘুটে ধ্বনির অসমন্বয় করে বলা হল সঙ্গীত। বলছে যখন তখন হতেও পারে, কিন্তু না পেলাম রস, না বুঝলাম অর্থ, না দিয়ে গেল মনে অন্য রসের ব্যঞ্জনা বা ইঙ্গীত। তাই বোধহয় হালের এক আলংকারিক মডার্ণ ভাস্কর্যের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, যখন ভাস্কর এক বিরাট কাঠের গুঁড়ি নিয়ে তার উপর ছমাস ধরে প্রাণপণ বাটালি চালানোর পর সেটাকে কাঠের গুঁড়ির আকার দিতে পারেন, এবং নিচে লিখে দেন কাঠের গুঁড়ি তখন সেটা মডার্ণ ভাস্কর্য

ইতিমধ্যে এই মডার্ণ আর্টের বাজারে একটি নতুন জীব ঢুকেছেন এবং সেখানে হুলস্থুল বাধিয়ে তুলেছেন- এর নাম অ্যাক্সিডেন্ট, বাংলায় দূর্ঘটনা, দৈবযোগ, আকস্মিকতা যা খুশী বলতে পারেন।

************************

র আবির্ভাব হয়েছে সুইডেনের মতো ঠান্ডা দেশে-যেখানে মানুষ ঠান্ডাভাবে ধীরে-সুস্থে কথা কয়, চট করে যা-তা নিয়ে খামখা মেতে ওঠে না।

সুইডেনের মহাসম্মানিত ললিত-কলা  আকাদেমির বিজ্ঞ বিজ্ঞ প্রফেসর, কলারসিক গুণীজ্ঞানীরা অকস্মাৎ কিংকর্তব্যবিমুখ হয়ে কর্ণমূলের পশ্চাদেশ কন্ডুয়ন করতে লাগলেন। তাঁদের মহামান্যবর প্রেসিডেন্ট তো খুদাতাল্লার হাতে সব-কিছু ছেড়ে দিয়ে সোজাসুজি বলেই ফেললেন, কি করি, মশাইরা, বলুন। কে জানত শেষটায় এ-রকম ধারা হবে? আজকাল নিত্য নিত্যি এত সব নয়া নয়া এক্ স্ পেরিমেন্ট আর কোন্ টা যে অ্যাক্ সিডেন্ট কি করে ঠাওরাই? আমরা ভেবেছি, চিত্রকর ফাল্ স্ট্র্যোম্ আর্টের ক্ষেত্রে একটা অভিনব নবীন পন্থা আবিস্কার করতে পেরেছেন এবং তাই ভেবে ঐ ছবিটাও এক্ জিবিশনের অন্যান্য ছবির পাশে টাঙ্গিয়ে দিয়েছি-

ওদিকে আটির্স্ট ফাল্ স্ট্যোম্ রেগে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সর্বত্র চেচামেচি করে বলতে লাগলেন, তাঁকে লোকচক্ষে হীন করার মানসে দুষ্ট লোক কুমতলব নিয়ে অপকর্মটি করেছে।

অপকর্মটি কি?

ফাল্ স্ট্যোম্ ছবি আঁকার সময় একখানা ম্যাসনাইটের টুকরোয় মাঝে মাঝে তুলি পুঁছে নিতেন। কাজেই সেটাতে হরেক রকম রঙ লেগে থাকার কথা। ঐ সময়ে সুইডিশ ললিত-কলা আকাদেমি এক বিরাট মহতী এক্ জিবিশনের ব্যবস্থা করেন-স্বতঃস্ফূর্ত কলা (স্পন্টানিস্ মুস বা Spontaneous art) ও তার সর্বাঙ্গীণ বিকাশ এই নাম দিয়ে সে চিত্র-প্রদর্শনীতে সুইডেন তথা অন্যান্য দেশের স্পন্টানিস্ মুস কলার উত্তম নিদর্শন তাতে থাকবে। ( ক্যুবিজম, দাদাইজমের মতো স্পন্টানিয়েজম-ও এক নবীন কলাসৃস্টি পদ্ধতি-আমি অবশ্য এখানে সে প্রশ্ন তুলছি নে যে সার্থক কলাসৃষ্টি মাত্রই স্পন্টেনিয়াস বা স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে থাকে, - বিশেষ পদ্ধতিকে এ নাম দিলে তাকে চেনবার কি যে সুবিধে হয় বোঝা কঠিন।)

এখন হয়েছে কি, আর্টিষ্ট ফাল্ স্ট্যোম্ তাঁর অন্য ছবি যাতে করে ডাকে যাবার সময় জখম না হয় সেই উদ্দেশ্যে ঐ রঙবেরঙের ম্যাসনাইটের টুকরোখানা তাঁর ছবির উপরে রেখে চিত্রপ্রদর্শনীতে পাঠিয়েছিলেন। আকাদেমির বড় কর্তারা ভাবলেন, এটাও মহৎ আর্টিষ্টের এক নবীন মহান কলানিদর্শন এবং পরম শ্রদ্ধাভরে সেই ম্যাসনাইটের টুকরোটির নিচে আর্টিষ্টের স্বনামখ্যাত নামটি লিখে ঝুলিয়ে দিলেন আর্টিষ্টের অন্য ছবির পাশে!

ব্যাপারটা যখন ধরা পড়ল তখন আর্ট সমালোচকরা কি যে করবেন ঠিক করতে না পেরে চুপ করে গেলেন আর সুইডেনবাসী আপনার আমার মতো সাধারণজন মুখ টিপে হাসলে যে বাঘা বাঘা পন্ডিতেরা ঐ স্বতঃস্ফুর্ত রসিকতাটা ধরতে না পেরে ফাঁদে পা ফেলেছেন বলে।

কিন্তু এইখানে ব্যাপারটার গোড়াপত্তন মাত্র।

সুইডেনের কাগজে কাগজে তখন আলোচনা আরম্ভ হল এই নিয়েঃ একখানা উটকো কাঠ জাতীয় জিনিষের উপর এলোপাতাড়ি রঙের ছোপকে যদি পন্ডিতেরা আর্ট বলে মেনে নিতে পারেন তবে তাঁদের ঢাক-ঢোল পেটানো এই মহা সাধনার মডার্ণ আর্টের মূল্যটা কি?

ওইভিন্দ ফাল্ স্ট্যোম্ সুইডেনের নাম করা তরুণ চিত্রকর। তিনি সম্প্রতি এই স্বতঃষ্ফুর্ত কলা-মার্গে প্রবেশ করেছেন এবং কলা নির্মাণের ক্রমবিকাশে তিনি ইতিমধ্যেই তাঁর ঢং একাধিকবার আগাপাস্তলা বদলিয়েছেন। সুইডেনে এখন এই কনক্রীট, স্থূল, বা বাস্তব মার্গের খুবই নামডাক; এঁরা নিজেদের অনুভূতি স্বতঃষ্ফূর্ত অনব্যবহিতভাবে রঙের মারফতে প্রকাশ করেন-সে প্রকাশে কোনো বস্তু বা কোনো-কিছুর প্রতিকৃতি থাকে না, কোনো-কিছু রূপায়িত করে না, ছবির নাম পর্যন্ত থাকে না- এবং দর্শক তাই দেখে স্বতঃস্ফুর্তভাবে, সরাসরি আর্টিষ্টের অনুভুতি বুঝে গিয়ে তার অর্থ করে নেয়,-কিংবা ঐ আশা করা হয়।

এই হল মোটামুটি তার অর্থ-অর্থাৎ অর্থহীন জিনিষের যদি অর্থ দিয়ে বোঝাতে হয় তবে যে অর্থ দাড়ায়।

ফাল্ স্ট্যোম্ চিত্রপ্রদর্শনীতে দুখানি ছবি পাঠাতে চেয়েছিলেন, এবং পূর্বই বলেছি, সে দুখানি ছবি যাতে করে পোস্টাপিসের চোট না খায় তাই সঙ্গে সেই ম্যাসনাইটের টুকরো দিয়ে সেগুলোকে প্যাক্ করে তিনি চলে যান গ্রামাঞ্চলে ছুটি কাটাতে। এদিকে আকাদেমির বাঘ-সিঙ্গিরা ছবি তিনখানা (আসলে অবশ্য দুখানা) ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বার বার নিরীক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বাছাই করে নিলেন দুখানা- এবং তার মধ্যে মনোনীত হয়ে গেল তুলি পোঁছার সেই ম্যাসনাইটের পট্টি! ক্রিটিকদের কারোরই কাছে ঐ ম্যাসনাইটের অঙ্কিত তুলিপোঁছা রঙ-বেরঙ করা জিনিসটির স্টাইল বা বিষয়বস্তু অদ্ভূত বা মূল্যহীন ঠেকে নি। তার অর্থ, একদিকে চিত্রকরের ন্যায়ত ধর্মসঙ্গত আঁকা ছবি ও অন্যদিকে তাঁর তূলি পৌঁছাবার এলো পাতাড়ি রঙের ছোপ- এ দুয়ে কোনো পার্থক্য নেই।

তাই লেগেছে হূলস্থুল তর্কবিতর্ক, সে আর্ট তবে কি আর্ট যেখানে ভূল জিনিস অক্লেশে খাঁটি আর্টি বলে পাচার হয়ে যায়?

এটা ধরা পড়ল কি করে? ফাল্ স্ট্যোম্ ছুটি থেকে ফিরে একদিন স্বয়ং গিয়েছেন চিত্রপ্রদর্শনী দেখতে। সেখানে ঐ ম্যাসনাইট ছবির কান্ড দেখে যখন ভূলটা ধরা পড়ল তখন কোথায় না তিনি বিচক্ষণ জনের মতো চুপ করে থাকবেন-তিনি উল্টে আরম্ভ করলেন তুলকালাম কান্ড!

ফলে জ্ঞানগর্ভ পন্ডিতমন্ডলী, তীক্ষ্ণচক্ষু কলাসমালোচকদের দল, ঝানু ঝানু আর্টসংগ্রহকারিগণ, সরলচিত্ত সাধারণ দর্শক এবং সর্বশেষে নিজেকে আর তামাম ঐ স্বতঃষ্ফুর্ত-কলা-পন্থীকে বিশ্বজনের সম্মুখে তিনি হাস্যাস্পদ করে ছাড়লেন।

এর কয়েক বছর পূর্বে এক বিদগ্ধ বিদুয়ক চিড়িয়াখানার শিম্পাঞ্জীর আঁকা একখানি ছবি ঐ রকম এক চিত্রপ্রদর্শনীতে পাঠিয়ে শহরের লোককে বোকা বানিয়েছিল-তখনও কেউ ধরতে পারেন নি, ওটা বাঁদরের মস্করা।

কিন্তু প্রশ্ন, অই ধরনের তামাশা চলবে কতদিন ধরে? এই যে স্টন্টানিস্টের দল, কিংবা অন্য যে-কোনো নামই এদের হোক-এরা আর কতদিন ধরে আপন ব্যবহার দিয়ে ইচ্ছায় প্রকাশ করবেন যে এদের আর্ট কোনো কিছু সৃজন করার দুরুহ শক্তিসাধনায় আয়ত্ত নয়, আকস্মিক দৈবদুর্বিপাকে বা অ্যাক্ সিডেন্ট বা ঘটনাচক্র এঁদেরই মতো উত্তম উত্তম ছবি আঁকতে পারে, শ্রেষ্ঠ গান গাইতে পারে, সার্থক কবিতা রচনা করতে পারে-এতদিন যা শুধু সরস্বতীর বরপুত্রেরাই বহু সাধনার পর করতে পারতেন?

এই প্রশ্নটি শুধিয়েছেন এক সরলচিত্ত, দিশেহারা সাধারণ লোক-সুইডেনের কাগজে।

উত্তরে আমরা বলি, কেন হবে না? এক কোটি বাঁদরকে যদি এক কোটি পিয়ানোর পাশে বসিয়ে দেওয়া হয়, এবং তারা যদি এক কোটি বংশ-পরম্পরা ওগুলোর রাগিণী বাজানো হয়ে যাবে না? সেও তো অ্যাক্ সিডেন্ট!

আমার ব্যক্তিগত কোনো টীকা বা টিপ্পনী নেই। মডার্ণ কবিতা পড়ে আমি বুঝি না, রস পাই না। সে নিয়ে আমার কোনো খেদ নেই। পৃথিবীতে যে অতশত ভালো জিনিস রয়েছে যার রসাস্বাদন আমি এখনো করে উঠতে পারি নি, ওগুলো আমার না হলেও চলবে।

(সৈয়দ মুজতবা আলীর চতুরঙ্গ বই থেকে।)

 

ফ্লেমিংটন, নিউ জার্সী।

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.