Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাম্প্রতিক  ||  ৯ম বর্ষ ৫ম সংখ্যা ভাদ্র ১৪১৬ •  9th  year  5th  issue  Aug-Sept  2009 পুরনো সংখ্যা
একজন কিংবদন্তীর গল্প Download PDF version
 

সাম্প্রতিক


 

 

একজন কিংবদন্তীর গল্প

শ্যামল নাথ

ছোটবেলায় যেভাবে বড় হয়েছি, সাধারণ বাঙালি মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে, জীবনের ফোকাস একদিকেই, ভাল করে পড়াশুনা করে মানুষের মত মানুষ হতে হবে। তখনও গান বলতে শুধুই জানতান বাংলা গান, মূলত শুনতাম রবীন্দ্রনাথের গান, ছিটেফোটা নজরুল গীতি, একটু আধটু লোকগীতি, আর বাংলা সিনেমার গান। গান শুনবার একমাত্র মাধ্যম ছিল রেডিও বাংলাদেশ। পাশ্চাত্য সংগীত সম্পর্কে বলতে গেলে তখন তেমন কোন ধারনাই ছিল না আমার। রেডিও বাংলাদেশে অবশ্য তখন প্রতি রবিবার দুপুর বেলা আন্তর্জাতিক সংগীতের আধঘন্টার একটা অনুষ্ঠান প্রচার করত, যেটি আমার সমবয়সী একটা গ্রুপে বেশ জনপ্রিয় ছিল। আমি অবশ্য এর খবর পেয়েছি অনেক অনেক পরে। আরেকটা ব্যাপার, সে সময়ে পাশ্চাত্য সংগীত সম্পর্কে এমন একটা ধারনা ছিল যেন এটি শুধু উচ্চবিত্ত বখাটেদেরই মানায়। সেই সময়ের ঘটনা।

আমরা তখন যে বাড়ীতে ভাড়া থাকতাম, পাড়ার ভেতরেই আমাদের সেই বাড়ী থেকে রাস্তার ঠিক উল্টোদিকের বাড়ী থেকে মাঝে মাঝে আমরা পাশ্চাত্য সংগীত শুনতে পেতাম। আমার এখনো মনে পড়ে, ওরা যখন ছুটির দিনে সকালে উচ্চগ্রামে রক বা পপ সংগীত শুনত, আমাদের পাড়ার সর্বত্র থেকে সেই গান শুনা যেত। ওরা তখন কি কি গান শুনত, তার কোনোটাই আমি এখন মনে করতে পারব না। এমনকি, পাশ্চাত্য সংগীত সম্পর্কে আমার নেতিবাচক মনোভাবের ফলস্বরূপ তখনও আমি ওদের রেকর্ড প্লেয়ার থেকে শুনে একটা গান থেকে আর একটা গানকে আলাদা করতে পারতাম বলে মনে পড়ছে না। কিন্তু শুধু একটা গান, হয়তোবা গানটি অনেক বেশি বারে বারে শুনতে পেয়েছিলাম বলে, অথবা গানটির স্বকীয়তার জন্যেই, এখনও স্মরণ করতে পারি- বিট ইট বিট ইট....

সেই সময়টা ১৯৮২-৮৩ সালের কোন একটা সময় হবে। আমাদের ঘরে তখনও টেলিভিশন আসেনি, ভিডিও প্লেয়ার আসার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু মনে পড়ে, হয়তোবা পাশের বাড়ীতে, নাহয় কোন এক বন্ধুর বাড়ীতে হয় টেলিভিশনে নাহয় ভিডিও প্লেয়ারে বিট ইট বিট ইট গানটির ভিডিও-ও দেখেছিলাম। মুগ্ধ হয়েছিলাম.... যতটা না গান শুনে তার চাইতেও বেশী মুগ্ধ হয়েছিলাম নাচ দেখে। আমরা তখন ঢাকা শহরে মুগদাপাড়ায় থাকি। ঈদের দিনে পাড়া জুড়ে উৎসবের আমেজ থাকতো। এবাড়ী ওবাড়ী ঘুরতে ঘুরতে চোখে পড়েছিল পাড়ার এক রাস্তার মাঝে গোল করে বিপুল জনতা ব্রেক ড্যান্স দেখছে এক তরুণের, সঙ্গে ক্যাসেট বাজছে..... বিট ইট।

জানি যে ভূমিকাটা বেশ বড় হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আরও একটু ভূমিকা না দিয়ে পারছি না। ১৯৮৫ কি ৮৬ সালে আমাদের ঘরে প্রথম ক্যাসেট প্লেয়ার এসেছিল। আমি তো মহা উৎসাহে ক্যাসেট কিনছি। একটা দোকানে ঢুকে আমার ভাই দোকানদারকে জিজ্ঞেস করছিল, আচ্ছা ভাই, আপনার কাছে কি ওই ক্যাসেটটা আছে, পিরে, পিরে। ওই যে বলছিলাম পাশ্চাত্য সংগীত সম্পর্কে  আমাদের নির্লিপ্ততার কথা, গানের কথাটিও আমরা ভাল করে জানতাম না, আমার ভাই আসলে খুঁজছিল, বিট ইট।

এই হচ্ছে মাইকেল জ্যাকসনের সাথে আমার পরিচিতির গল্প। আসলে, মাইকেল জ্যাকসন তো নয়, ওর গানের সাথে আমার পরিচিতির গল্প। সত্যিকার অর্থে পশ্চিমা গানের সাথে আমার পরিচিতির গল্প। একজন শিল্পীর শ্রেষ্ঠত্ত্বের পরিমাপক যদি হয় যে, তার সৃষ্ঠ কারুকলাটি কতজন মানুষকে ছুঁতে পেরেছে, বা কতজন মানুষকে আনুপ্রাণিত করতে পেরেছে, সেই পরিমাপে মাইকেল জ্যাকসন পৃথিবীর সবচাইতে বড় না হলেও একজন অন্যতম মহান শিল্পী। আমার মত পাশ্চাত্য সংগীতে নির্লিপ্ত একজনের কাছেও যত সহজে তার শিল্পকর্ম পৌঁছেছিল, এবং নাড়াতে পেরেছিল, সে জন্যেই আমার কাছে, মাইকেল জ্যাকসন একজন কিংবদন্তী।

মাইকেল জ্যাকসনের বিট ইট গানটি থ্রিলার এলবামের অংশ, যে এলবামটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৮২ সালে। থ্রিলার এলবামটি এযাবৎকালে মুক্তিপ্রাপ্ত সকল এলবামের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে সবচাইতে সফল। পৃথিবী জুড়ে আজ পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে থ্রিলারের ১১০ মিলিয়ন কপি। বলাই বাহুল্য যে, এই সংখ্যাটা শুধুমাত্র বৈধভাবে বানানো বিক্রিত কপির সংখ্যা। এশিয়া আর আফ্রিকাজুড়ে থ্রিলারের অবৈধ কপি তৈরী হয়েছিল কত কে জানে। থ্রিলার এলবামটি মুক্তি পাবার পরে একটানা ৮০ সপ্তাহ এলবামটি ছিল billboard এর প্রথম ১০-এ, যার মধ্যে ৩৭ সপ্তাহ তার দখলে ছিল শীর্ষ স্থানটি। থ্রিলার এলবামটির ৭-টি গান তখন billboard hot 100 singles এর প্রথম ১০-এ গিয়েছিল, যেটি আরও একটি রেকর্ড। ও হ্যাঁ, বিট ইট ছিল সেই সাতটি গানের একটি। থ্রিলারের বাণিজ্যিক সাফল্যকে বর্ণনা করা হয়েছিল এভাবে, থ্রিলার বিক্রি হচ্ছিল এমনভাবে যেন এটি টুথপেষ্ট বা সেরকম একটি নিত্য-ব্যবহার্য জিনিষ। শুধুমাত্র থ্রিলারই যদি মাইকেলের সারাজীবনের কাজের ফসল হত, আমি নিশ্চিত যে, মাইকেল তবুও পৃথিবীর সংগীত জগতে বড় একটা স্থান দখল করে রাখতে পারতো। আর বাস্তবে থ্রিলার মাইকেলের বিশাল কর্মজীবনের ছোট্ট একটা অংশ।

মাইকেলের শিল্পকর্ম যেমন মাইকেলকে করেছে মহান, তেমনি তার জীবনের অনেক ঘটনার জন্যে মাইকেল আজ অনেকের কাছে ধিক্কারও পাত্র। সবচাইতে দুঃখজনক যে, সেসব ঘটনার কতখানি সত্য আর কতখানি মিথ্যা তা সত্যি করে কেউই জানেনা। অবশ্যই মাইকেল নিশ্চয়ই জানত, কিন্তু মাইকেল আজ আর নেই। মাইকেলের শিল্পকর্মের বাইরে যে দুটো জিনিষ নিয়ে মাইকেল সবচাইতে আলোচিত ছিল তার একটি মাইকেলের গায়ের রঙ। একটি আফ্রিকান আমেরিকান ঘরে জন্ম নেয়া কৃষ্ঞকায় শিশু মাইকেল মারা যাবার আগে হয়ে গিয়েছিলেন পুরোপুরি শেতাংগ। মাইকেল বেঁচে থাকাকালীন তার ভাষ্যমতে তিনি চর্মরোগে ভুগছিলেন এবং তার শেতাংগ রুপান্তরের ব্যাপারটি সেই রোগেরই প্রতিফলন। মাইকেলের শরীরে অনেকবারই অস্ত্রপচারের চিহ্ন ছিল দৃশ্যমান। কিন্তু এই অস্ত্রপচারের কতগুলো রোগ সারাবার তাগিদে আর কতটুকু শখের বশে তা নিয়ে অনেকেরই রয়েছে অনেক সংশয়। আর দ্বিতীয় ব্যাপারটি আরও বেশী স্পর্শকাতর। মাইকেলের শিশু-কিশোরদের প্রতি ভালবাসার ব্যাপারটি সর্বজনবিদিত, এবং সেটি তার নিজের বাচ্চাদের সাথে তার আচরণ এবং তার সৃষ্ট শিশুপার্ক নেভারল্যান্ড থেকে অনুমেয়। কিন্তু কলংকের দাগ পড়েছে তার বিরুদ্ধে দু-দুটি কিশোরঘটিত যৌন অপরাধের মামলাতে। হ্যাঁ, ও দুটো মামলার কোনটিই তার বিরুদ্ধে প্রমানিত হয়নি। কিন্তু ব্যাপারটি স্পর্শকাতর বলেই অনেকের মনেই রয়ে গেছে সংশয়।

আমি আধুনিক বিশ্বের নাগরিক হিসাবে বিশ্বাস করি যে, অপরাধ প্রমাণিত না হলে সবাই নির্দোষ। আর তাই মাইকেল আমার কাছে শুধুই সংগীত জগতের একজন কিংবদন্তী।

আলবুকআরকি, নিউ মেক্সিকো

আগষ্ট ০৩, ২০০৯

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.