Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাহিত্য  ||  ৯ম বর্ষ ৫ম সংখ্যা ভাদ্র ১৪১৬ •  9th  year  5th  issue  Aug-Sept  2009 পুরনো সংখ্যা
শিরোনামহীন Download PDF version
 

সাহিত্য

ছোটগল্প

শিরোনামহীন

তপন দেবনাথ

সে দৃশ্যটি অজিত কুমার কিছুতেই ভুলতে পারেন নাশত চেষ্টা করেও মন থেকে তাড়াতে পারছেন নাযতবার ভুলে থাকার চেষ্টা করেন ততবারই তা আরো স্পষ্ট হয়ে ভেসে ওঠে চোখের সামনেএকটি মানসিক যাতনা তাকে দিন দিন নিঃশেষ করে দিচ্ছেএকই দৃশ্য সকালে-বিকালে তাকে দেখতে হচ্ছেপ্রতিদিন অফিসে যাবার প্রাক্কালে ভাবেন আজ আর মন খারাপ করব না কিন্তু ফার্মগেট দ্বিতীয় ওভারব্রীজের গোড়ায় গেলেই তার মন খারাপ হয়ে যায়সুন্দর সকালটা তার পন্ড হয়ে যায়আকাশের দিকে তাকিয়ে লম্বা নিঃশ্বাস ত্যাগ করে ভাবেন অজিত কুমার আর কতকাল, আর কতকাল এ দৃশ্য দেখতে হবে? অফিস থেকে ফেরার পথে ভাবেন আর যেন সে ছবি দেখতে না হয়এ দুপুরের মধ্যে যদি তার মৃত্যু হয়ে থাকে তবে খুবই ভালোমৃত্যু তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে তবে আর কেন বৃথা কষ্ট পাওয়া? না, তার মৃত্যু হয়নিসে কংকালসার দেহটি মানুষের করুনা লাভের জন্য এখনো বেঁচে আছে

ফার্মগেট দ্বিতীয় ওভারব্রীজের পূর্বগোড়ায় বসে একটি মেয়ে ভিক্ষে করছেতার বয়স চার বছররের বেশি হবে নাঅতি শীর্ণকায় তার দেহমনে হয় জন্মের পর পুষ্টিকর কোন খাবার তার পেটে পড়েনিশরীর শুকাতে শুকাতে এখন হাড্ডিসারপ্রাণ বায়ুটুকু অনেক কষ্টে সচল আছেযে কোন মুহূর্তে দেহ ছেড়ে গিয়ে স্বস্তি লাভ করবেদম নিতে তার খুবই কষ্ট হয়সামনে একটি টিনের থালা নিয়ে সে বসে থাকে নির্বাকএদিক সেদিক তাকায় মাঝে মাঝেকেউ ভিক্ষে দিবে বুঝতে পারলে ডান হাতটা সে একটু উপরের দিকে তুলেস্বস্থান থেকে ডান হাতটা একটু উপরে তুলতে তার কি পরিমাণ কষ্ট হয় তা বর্ণনাতীতভিক্ষে দিবে বুঝলেই সে হাতটা উপরে তুলতে চেষ্টা করেঅনেক সময়ই সে তা পারে নাপথিক, যিনি ভিক্ষে দেবেন তিনি থালায় রেখে চলে যানমেয়েটি নেড়েচেড়ে দেখে টাকার পরশ কেমনতার চেহারা এতটাই করুণার দৃষ্টি আকর্ষণ করে যে কম সংখ্যক পথিকই তাকে ভিক্ষে না দিয়ে পারেএক দুপুরের মধ্যে তার থালাটি টাকায় ভরে যায়

দূরে বসে এক মহিলা, সম্ভবত মেয়েটির নিকট আত্মীয়; এমন কি তার মা-ও হতে পারে সারাদিনই মুখে এটা সেটা চিবুতে থাকেতার সতর্ক দৃষ্টি সব সময় ঐ থালার দিকেকখন থালাটি ভরবে আর সে তা নিয়ে তার থলিতে পুড়বেপ্রতিদিন সে যা আয় করে তাতে করে প্রতিদিন পোলাও বিরিয়ানী খেলেও মেয়েটার টাকার অভাব হবার কথা নয়এ মেয়ে যতটুকু খেতে পারে তা ঢাকার একটি বড় মাপের ইঁদুর প্রতিদিন তার চেয়ে বেশি আহার গ্রহণ করেমেয়েটিকে দিয়ে আয়-রোজগার করার জন্যই মহিলা মেয়েটিকে খাবার দেয় নাখাবার পেলে মেয়েটি সুস্থ হয়ে যাবে আর সে পথিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে নাপ্রতিবাদ করতে পারে না বলেই তাকে ধূকে ধূকে মরতে হচ্ছেভিক্ষের অন্নও তার নিজ ভাগ্যে জুটছে নাঅবুঝ শিশু বলেই সে বঞ্চিত হবে? আগে এ এলাকায় একটি ওভারব্রীজ ছিলো, এখন দুটো হয়েছেস্কুল, কলেজ, সিনেমা হল, মার্কেট কী নেই এখানে? রাস্তার সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি পেয়েছে, ফুটপাতের উন্নতি সাধিত হয়েছে, রাস্তায় নানা দামের নতুন গাড়ি নেমেছেপদ্মা-মেঘনায় অনেক জল গড়িয়েছে এতদিনে কিন্তু এ মেয়েটার কোন পরিবর্তন হয়নিজন্ম হয়েছে তার অন্যের করুনা লাভের জন্যএকটি কংকালসার অবুঝ শিশুর ভিক্ষে করার দৃশ্য কি বলে যে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সত্যি এতটা শোচনীয়?

অজিত কুমার সব সময় মেয়েটার মৃত্যু কামনা করেনএছাড়া মেয়েটার জন্য কোন পথ খোলা নেইসে যতদিন বাঁচবে ততদিনই এভাবে না খেয়ে অপুষ্টিতে ভুগবে এবং অতিকায় শীর্ণ দেহ দেখিয়ে পথচারীর করুনা লাভ করতে হবেসে যা আয় করে তা চলে যায় অন্যের পেটেঅজিত কুমার যতই ভাবেন যে তার দিকে আর তাকাবেন না কিন্তু তাকে এমন জায়গায় বসানো হয় যে এ পথ ছাড়া অজিতের যাতায়াতের আর কোন পথ নেইএকজন শিশু, একজন ভিক্ষুক অজিত কুমারের ভিতরটাকে তোলপাড় করে দিচ্ছেতার সকল চেতনাকে জাগিয়ে তুলছে, তার সকল মানবিকতাকে পদধূলিত করছে কেন এ শিশুকে ভিক্ষে করতে হবে? রাষ্ট্রীয় কোষাগার কি সত্যি সত্যি শূণ্য হয়ে গেছে নাকি এটি শিশুটির গার্ডিয়ানের ব্যবসা?

থালার মধ্যে তার একটি তুন্দুল রুটিএপিট-ওপিঠে পোড়া দাগসম্ভবত কোন হোটেলের উচ্ছিষ্ট খাবারশক্ত হয়ে গেছে রুটিখানাঅনেক কষ্ট করে মেয়েটি রুটিখানা একবার তার মুখের কাছে নেয়এক কামড় না দিতে আবার তা থালায় পরে যায়সে অনুভব করে তার ক্ষিদে এবং বাঁচার জন্য খাবার চেষ্টা করে কিন্তু প্রতিবার সে ব্যর্থ হয়অদূরে মহিলা বসে চিবুচ্ছে সারাদিনপথচারী একবার তাকায় মেয়েটির দিকেদাঁড়াবার সময় কারো নেইঅসংখ্য গাড়ি ছুটে চলছে রাস্তা দিয়েমন্ত্রী-আমলা কে না যাচ্ছে এখান দিয়ে? বাঁচার আনন্দ কেমন তা এ শিশুটি জানে না

আবার সে মুখ, সে শিশুটি পথচারীর করুণা লাভের জন্য থালা নিয়ে বসে আছেশীতের সকালে কাঁপছে সেগায়ে ছেড়া জামাশীত মানছে না, তবু সে হাত তুলতে চাইছে উপরের দিকেআকাশ ছুঁতে সে চায় না, চায় না প্রজাপতির মত ডানা মেলে উড়ে বেড়াতেএকটি ফ্ল্যাট বাড়ি, সাদা রঙের নিশান কিংবা পাজেরো জীপ তার চাই নাসকালে ডিম, মাখনের নাস্তা, বিকেলে হরলিকসের দু:স্বপ্ন তার নেইদিবসের উদ্ভাসিত আলোতে সারা পৃথিবী ভরে গেলেও শিক্ষার আলো তাঁকে ছুঁবে না কোনদিনসে হাত তুলতে চায় ভিক্ষের জন্যকী দুর্ভাগ্য আমার, কী হতভাগ্য দেশের নাগরিক আমি একই দৃশ্য আমাকে প্রতিদিন দেখতে হয়অজিত দ্রুত অফিসের পথে ছুটে যায়তাড়া করে তাকে বিবেক, একটা কিছু করমরো, মরো তুমিতোমার মৃত্যু কামনা ছাড়া আমার কাছে আর কিছু নেইজীবন্ত কংকাল হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু তোমার জন্য অনেক ভালোতোমার মৃত্যু হলে আমি স্বস্থি পাইযদি তোমার কথা স্মরণ হয়, দুফোটা অশ্রু বিসর্জন দিয়ে বলব সত্যি আমার কিছু করার ছিল নাপরপারে তুমি গিয়ে বলো কোন শিশুকে যেন তোমার মত জন্মাতে না হয়গাড়ি এসে অফিসের পাশে থামেঅজিত কাজে মনোযোগ দেবার চেষ্টা করল

কাজে মন বসে না তারভিতরটা কেমন ছটফট করতে থাকেএকটি নিষ্পাপ শিশুর কংকালসার মুখাবয়ব তার সমস্ত অস্থিত্বকে ঝাকুনি দেয়মনে মনে সে আবার অজ্ঞাত শিশুটির মৃত্যু কামনা করেহ্যাঁ, মরে যাওয়াই হচ্ছে তোর জন্য সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা

চমক কাটে অজিতেরকি নিষ্ঠুর আমিএকটি অজ্ঞাত শিশুর করুণভাবে বেঁচে থাকা সহ্য করতে পারছি না বলে আমি তার মৃত্যু কামনা করছিযেন পথের কাঁটা সরে গেলেই বাঁচিআমি কি শিশুটিকে ভালোবাসি? না তা নয়সে আমার কেউ নয়আমি তাকে চিনি নাশুধু তার করুণভাবে ভিক্ষাবৃত্তি আমার সহ্য হয় নাকেন হয় না? আমি জানি নাশুধু জানি, ওকে দেখলেই আমার বিলাপ করে কাঁদতে ইচ্ছে করেনিজেকে বড় অসহায় মনে হয়ওকে যাতে দেখতে না হয় সে জন্য তো আমিও মরে যেতে পারি! পারি না? আমি কেন মরি না

অফিসের কাজের চাপ বেড়ে যায়মনের পর্দা থেকে সরে যায় অর্ধমৃত শিশুটির কংকালসার মুখশ্রী

অফিস ছুটির পর বাসে করে বাসায় রওয়ানা দিল অজিতমনে মনে ভাবে সে শিশুটির সাথে যেন আর দেখা না হয় তার

ফার্মগেট এসে নামে অজিতওভারব্রীজ পার হয়ে দক্ষিণ দিকে হাটতেই হোচট খেয়ে পরে যাচ্ছিল অজিতনিজেকে কোন রকমে সামলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই দেখে সেই মেয়েটিযে অজিতের প্যান্টের পায়ের গোড়ালীর কাছে ধরেছিল বলে অজিত পরে যাচ্ছিলঅসংখ্য মানুষের ভীড়ে শিশুটি ওভারব্রীজের নীচে পিলারের কাছে যে বসে আছে অজিত দেখতে পায়নি আগে

পাশে দেয়াল ঘেষে বসে অবিন্যস্ত একজন মধ্যবয়সী মহিলা অজিতের পরে যাওয়া দেখে মুচকি হাসছে

রাগ হয় না অজিতঅনুমান করে সে মহিলা শিশুটির কেউ হতে পারেধীরে পায়ে অজিত মহিলার কাছে এগিয়ে যায়আত্ম বিশ্বাসের সাথে জিজ্ঞাসা করে-

ও কি আপনার মেয়ে?”

আপনের কোন অসুবিধা আছে?” ধমকের সুরে জবাব দেয় মহিলা

না, আমার কোন অসুবিধা নেইওর যত্ন না নিলে ওতো মরে যাবে

মইরা গেলে আর একটা বানাইয়া নিমুপারলে কিছু দেন, না পারলে ফুটেন

বরফ খণ্ডের মতো যেন জমে যায় অজিতআর একটি বানিয়ে নেয়ার অর্থ কি তা সে বোঝেমহিলার রগচটা জবাবে সে কিছুটা স্থম্ভিত হয়তাকে আর কোন প্রশ্ন করা অবান্তরএ দৃশ্য হয়তো দেখতেই হবে

মেয়েটির থালায় পাঁচ টাকার একটি নোট রেখে উর্ধ্বশ্বাসে অজিত বাসার দিকে হাটতে থাকেমৃত্যুর কাছেই ছেড়ে দিলাম ফয়সালামৃত্যু কাকে নিলে ভালো হয়? তোমাকে, না আমাকে?

লস এঞ্জেলেস, ক্যালিফোর্নিয়া।

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.