Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাহিত্য  ||  ৯ম বর্ষ ৫ম সংখ্যা ভাদ্র ১৪১৬ •  9th  year  5th  issue  Aug-Sept  2009 পুরনো সংখ্যা
জ্বী মহারানী Download PDF version
 

সাহিত্য

নিবন্ধ

জ্বী মহারানী

মীজান রহমান

            এক আজব দেশের আজব গল্প পড়লাম জার্মানীর স্পিগেল পত্রিকার অনলাইন ম্যাগাজিনে। এমনই দুনিয়া ছাড়া গল্প যে আমার পাঠককে তার অংশ দেবার লোভ সামলাতে পারলাম না।

দেশটা ঠিক আজব নয়, জাতিটাই শুধু। দক্ষিণ পূর্ব চীনের ইউনান প্রদেশের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস করে মসৌ নামক এক প্রজাতি, যাদের সঙ্গে বাংলাদেশের চাকমা, সাঁওতাল, আর উত্তর আমেরিকার রেড ইণ্ডিয়ানদের খানিক তুলনা চলে। অর্থাৎ ওদের চেহারানমুনা চালচলন বেশভূষা মূল জাতি থেকে আলাদা। রাজনৈতিকভাবে তারা একেবারে স্বাধীন তা বলা যাবে না, কিন্তু কতগুলো মৌলিক ব্যাপারে তাদের নাগরিক অধিকার অন্যান্য চাইনিজদের তুলনায় একটু বেশি। যেমন সন্তানসংখ্যা। সাধারণ চাইনিজ যারা শহরে-বন্দরে থাকে তাদের পরিবারে একটির বেশি সন্তান থাকা বেআইনি। গ্রামের কৃষিজীবিদের জন্যে দুজন, কিন্তু মসৌদের বেলায় সংখ্যা বাড়িয়ে তিনজন করা হয়েছে। তার কারণ আছে। প্রথমত নারীশাসিত সমাজ পৃথিবী থেকে প্রায় বিলুপ্ত হবার উপক্রম, চীনের মসৌরাই কোনরকমে টিকে আছে এখনো। তাদের সংখ্যা এমুহূর্তে ২৫,০০০ এর বেশি নয়। আধুনিক জগতের যান্ত্রিক সভ্যতার প্রভাব তাদের জীবনেও রেখাপাত করতে শুরু করেছে। সুতরাং পুরোপুরি বিলুপ্ত হবার সম্ভাবনা রোধ করতে চাইলে সন্তান উৎপাদনের ক্ষেত্রে খানিক ছাড় দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

নারীশাসিত সমাজ সম্বন্ধে আমাদের হয়ত কোন ধারণাই নেই। ঠাট্টা করে বলতে পারেন যে আপনার অন্দরমহল তো এমনিতেই নারীশাসিত, মহারানীর অনুমতি ছাড়া একটি পোকমাকড়েরও নড়বার সাহস নেই। কিন্তু আপনি আমি ভাল করেই জানি যে গিন্নির হাতে কেবল হেঁসেল আর আলমিরার চাবিটাই, আসল চাবিটা আমাদেরই কাছে। আমরা বলতে কি বলছি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন? আমরা মানে বাবা আদমের বংশধর, মহাশক্তিমান পুরুষজাতি। সমাজ-সংসার দেশজাতি সবকিছুরই কলকব্জা আমাদের হাতে। আমরাই সিদ্ধান্ত নিই কখন কোন অপরাধে কার কি শাস্তি হবে, কোন মেয়ের বিয়ে হবে কার সঙ্গে, কত হবে তার দীনমোহর। আমরাই আইন বানাই, আইন রক্ষা করি, ইচ্ছে হলে আইন ভঙ্গ করি, ভঙ্গ করে কাউকে পাঠাই জেলখানায়, কাউকে পাঠাই নির্বাসনে, কাউকেবা পদোন্নতি দিয়ে পুরস্কৃত করি। আরো একটা ভাল জিনিস তৈরি করেছি আমরা, অত্যন্ত সুবিধার জিনিস- ধর্ম। ধর্মের অস্ত্র দিয়ে আমরা মেয়েজাতিকে ঘরে ঢুকিয়েছি। ধর্ম দিয়ে ওদের বুঝিয়েছি যে স্বর্গে যেতে চাইলে বেশি কষ্ট করবার প্রয়োজন নেই, কারণ ওদের স্বর্গ তো স্বামীর পায়ের তলাতেই। স্বামীর সুখস্বাচ্ছন্দ্য সেবাশুষ্রুসা নিয়ে জীবন কাটাতে পারলেই তাদের স্বর্গলাভ অবধারিত। অর্থাৎ ওদের ওপর আধিপত্য স্থাপনের উদ্দেশ্যে আমরা সৃষ্টিকর্তাকেও আমাদের মিত্রশক্তিতে পরিণত করেছি। এমনই চমৎকার আমাদের বুদ্ধিশক্তি।

জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এরকম সমাজে বাস করেই আমরা অভ্যস্ত। এর থেকে আলাদা কোনরকম সমাজের অস্তিত্ব থাকতে পারে সেটা কল্পনা করাও সম্ভব নয় আমাদের পক্ষে। সম্ভব নয় বলেই মসৌদের কথা পড়ে আমার চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল। এমন সমাজ কি আছে কোথাও?

মসৌ পরিবারের কোন নারী বাড়ির কোন পুরুষকে কর্তা বলে সম্বোধন করে না, কারণ পরিবারের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা তিনি নিজেই। তিনি যা বলবেন তাই মানতে হবে সবাইকে। সংসারের বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো সব তাঁর। পুরুষের কাজ শুধু তাঁর আজ্ঞা পালন করা, তাঁর নির্দেশে সংসারের দৈনন্দিন কাজগুলো চটপট সেরে ফেলা কোনরকম গড়িমসি না করে, বিশেষ করে যে কাজগুলোতে প্রচুর কায়িক পরিশ্রমের প্রয়োজন। কোন জটিল সমস্যা দাঁড়ালে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মতামত হয়ত নেবেন, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি তাঁর।

মসৌদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য, শ্বশুরবাড়ি বলে কোন জিনিস নেই । শাশুড়ির অত্যাচার কাকে বলে তারা জানেনা কারণ তাদের মেয়েরা কখনো শ্বশুরবাড়ি যায় না। বরং ছেলেরাই থাকে শ্বশুরবাড়িতে। শুধু থাকেই না, সব পুরুষ গোঁজাগুজি করে থাকে নিচের তলার একটি ঘরে, আর মেয়েরা থাকে ওপরতলার প্রাইভেট কোয়াটারে।

মসৌদের বাড়িঘরগুলো দেখতেও একটু ভিন্নরকম। একটা বাড়িতে সাধারণত চারটে কি পাঁচটা ঘর যার দুটি ওপরতলায়, বাকি সব নিচের তলায়। ঘরগুলো চারকুনো,সাদাসিধে, ব্যবহারিক। বাড়িতে বড় উঠান, কিন্তু কোন বেড়া বলতে কিছু নেই। গৃহপালিত জন্তু-জানোয়ারের জন্য কোন আলাদা ব্যবস্থা নেই। পশুপক্ষি মানুষজন সব একসঙ্গে বসবাস করে। গরু-ছাগলকে দড়ি দিয়ে বাঁধবারও কোন প্রয়োজন বোধ করে না তারা, ওরা যদৃচ্ছ ঘুরে বেড়ায় সারা উঠানব্যাপী। রান্নাবান্না খানাপিনা সাধারণত নিচের তলায়, খাবার সময় হলে সবার ডাক পড়ে টেবিলে বসার জন্যে। তারপর সবাই মিলে একসঙ্গে খায়। খাওয়া হয়ে গেলে মেয়েরা যায় মেয়েদের ঘরে, ছেলেরা ছেলেদের।

মসৌ সমাজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল নরনারীর যৌনসম্পর্ক। এমন খোলামেলা সম্পর্ক যে সাধারণ পুরুষশাসিত সমাজে বাস করে যারা অভ্যস্ত তাদের কাছে এটা অবিশ্বাস্য, অভাবনীয় এবং অবাস্তব মনে হবে। আমরা যেমন আহারনিদ্রা, হাসিকান্না, গালগল্প এসব নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়গুলোকে অত্যন্ত স্বাভাবিক জিনিস বলে মনে করি,  যৌনজীবন জিনিসটাও ওদের কাছে তেমনি এক সাধারণ স্বাভাবিক ব্যাপার। ওদের সমাজে সতীত্ব শব্দটা অর্থহীন, কুমারিত্ব কোন গর্বের বিষয় নয়, লজ্জার। সাবালক হবার পর যখন যৌনচেতনা সৃষ্টি হয় শরীরে তখন থেকেই শুরু হয় তাদের যৌনজীবন। অবশ্য এমন নয় যে যখন যার ইচ্ছে তখনই তাকে ধরে বিছানায় শোয়াবে। না, সেটি হবার নয়। দুজন দুজনকে পছন্দ করতে হবে, যদিও পছন্দের অধিকারটা ওদের ক্ষেত্রে ছেলেদের নয়, মেয়েদের। কোন ছেলের প্রতি আকৃষ্ট বোধ করলে মেয়ে তাকে চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দেবে তার মনের কথা। ছেলে তাতে সাড়া দিলে সে লাজুক অভিসারিনীর মত লজ্জাবনত নয়নে প্রেমিকের আহবানে সাড়া দেবে। তারপর দুজনে ওপরতলায় গিয়ে দরজায় খিড়কি লাগিয়ে দেবে।  আকর্ষণ সৃষ্টির জন্যে যুবতীরা অনেক সময় রংবেরঙ্গের পোশাক পরে, অলংকার পরে সাজায় নিজেদের। আমাদের সমাজে বিয়ের আগে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনের চেয়ে জঘন্য পাপ আর কিছু হতে পারেনা। । ওদের সমাজে ওসব পাপপুন্যের বালাই নেই। পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হলে অবশ্যই তাদের মিলন হবে, এতে ভালমন্দের কি আছে, এই হল তাদের মনোভাব। আবার সে আকর্ষণ যখন থিতিয়ে যাবে তখন তারা পরস্পরকে বিদায় জানিয়ে অন্য জুড়ি খুঁজবে। পরিস্কার ব্যাপার। বিরহবিচ্ছেদ দুঃখকষ্ট আহাজারি হাহুতাশ এসব আবেগের বিষয়গুলো ওদের জীবনে প্রশ্রয় পায়না। একজন আরেকজনের অভাবে মন খারাপ করে আহারনিদ্রা ত্যাগ করে ঘরে বসে থাকবে সারাদিন সেটি হবার উপায় নেই।

এসব শুনে মনে মনে আমরা হাজারবার তৌবা পড়তে পারি, ভাবতে পারি ছিঃ এরা বেশ্যার জাতি, ছেলেমেয়েদের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারি যাতে তারা ঘূনাক্ষরেও মসৌদের সম্বন্ধে কৌতূহল প্রকাশ না করে, কিন্তু এটা যেন কেও না ভাবেন যে ওদের যৌনজীবনে কোন শৃংখলা নেই, কোন বাচবাছাই নেই, কোন রীতিনীতি নেই। অবশ্যই আছে।  অন্যান্য সমাজের মত মসৌদের পারস্পরিক সম্পর্কে কোন জোরজবরদস্তির ব্যাপার নেই, কেও কারো ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিছানায় শোয়াবে কাউকে এটা তারা ভাবতেই পারে না, তাই ওদের সমাজে কোন ধর্ষণ নেই, কোন অরুচিকর বা বিকৃত যৌনাচার নেই। ভাইবোন, মা খালা চাচা মামার মধ্যে যৌনমিলন একেবারেই নিষিদ্ধ।  ওদের কোন পতিতালয় নেই, কোন অবৈধ মিলন নেই, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নেই। থাকবেই বা কেন। যে সমাজে বিয়ে নেই সে সমাজে বিয়ের বাইরে সম্পর্কই বা থাকবে কেন। বিয়ে যে একেবারে নেই তা নয়, তবে খুব বিরল। ওদের বিয়ে মানে ঢাকঢোল বাজিয়ে বরকন্যা সেজে একে অন্যের বাড়িতে যাওয়া নয়, বিয়ে মানে একসঙ্গে বাস করা। সারাজীবনের জন্যে না হলেও যতদিন ভাল লাগে ততদিন। কোন কোন যুগল হয়ত সারাজীবনই কাটিয়ে দিল একসঙ্গে, তবে তা সামাজিক কারণে নয়, পরস্পরকে ভাল লাগার কারণে। একসঙ্গে থাকার ব্যাপারে সমাজের কোন চাপ নেই, চাপ যদি থাকে তা নিজেদেরই, অন্য কারো নয়। সুতরাং মসৌ সমাজে কখনো ছাড়াছাড়ি হয়না, পারিবাবারিক অশান্তি বা ঝগড়াঝাটি হয়না। কেও কারো ওপর হাত তোলা, রাগ করে কথা বলা, গালাগাল করা, এগুলোও মসৌ সমাজে অজানা। যৌনসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কোন সামাজিক অপরাধ প্রায় অশ্রুতপূর্ব । শুধু যৌন অপরাধই নয়, কোনরকম অপরাধই অত্যন্ত বিরল মসৌদের নারীশাসিত সমাজে। জমিজমা নিয়ে স্বামীস্ত্রী বা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মনোমালিন্য, সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে কোন্দল, এগুলোও নেই ওদের সমাজে। তার প্রধান কারণ হল যে কেও কখনো পরিবারের বাইরে থাকেনা, জমিজমার কোন ব্যক্তিগত মালিকানা নেই, সবই পরিবারের, যা কখনোই পরিবারের আয়ত্তের বাইরে যায়না, সম্পত্তির ভাগাভাগি হয় কি করে তাও তারা জানে না। এমন সমাজে সম্পত্তি নিয়ে কোন ঝগড়া হবে কেন। বিষয় সম্পত্তি আর নারী এদুটিই তো অপরাধের সবচেয়ে বড় উপকরণ। এগুলো নিয়ে যে সমাজে কোন সমস্যা নেই সেগুলো নিয়ে কোন অপরাধ থাকবে কেন সে সমাজে। তাছাড়া পরিবারে তো একজনই সবকিছুর বিচারক, প্রবীনতম নারী। ওঁর কথাই সবার শিরোধার্য। উনি যা বলবেন সেটাই শেষ বলা। এবং তাতে যদি কিন্তুর প্রশ্রয় নেই।

ছোটদের কেও কখনো কোনরকম অবাধ্যতা করলে তাকে মৃদুভাষায় তিরস্কার করা হয়, এবং দ্বিতীয়বার কথা অমান্য করলে তাকে বিয়ে দেওয়া হবে বলে ভয় দেখানো হয়। হ্যাঁ, বিয়ে জিনিসটা ওদের কাছে একটা গুরুতর শাস্তির মত। বিয়ে মানে কারাবন্দী, ওদের বিচারে। বাচ্চাদের গায়ে হাত তুলে মারধোর করা কোন নারীশাসিত সমাজেই বোধ হয় নেই। যেহেতু সনাতন কোন ধর্ম তারা পালন করেনা, যেহেতু কোন মোল্লা মৌলবি পাদ্রী পুরোহিতের উপদ্রব নেই মসৌ সমাজে সেহেতু নারীর ওপর কোনরকম বিধিনিষেধ আরোপ করারও প্রশ্ন ওঠেনা। বিধিনিষেধ যেটুকু আরোপ হয় তা মেয়েরাই করে। এবং তা তারা করে নিজেদের স্বার্থে নয়, (বৈষয়িক লোভ জিনিসটা তো সব সমাজেই প্রধানত পুরুষের চরিত্র) পরিবার বা বৃহত্তর সমাজের স্বার্থে। রাজিনীতি পছন্দ করে না মসৌ মেয়েরা, তাই নগরপালের দায়িত্বটা সাধারণত পুরুষেরই এক্তিয়ারভুক্ত, যদিও আসল চাবিকাঠিটা থাকে মেয়েদের হাতে।

এদের সামাজিক পরিচয়তেও পুরুষের চাইতে নারীর ভূমিকাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু কে কার বাবা সেটা মা নিজেও সঠিক বলতে পারবে না সবসময় সেহেতু মায়ের পরিচয়েই সাধারণত মানুষের পরিচয়। এটা শুধু নারীশাসিত সমাজে নয় অনেক পুরুষশাসিত সমাজেও ছিল পুরাকালে। গ্রীক ও রোমান যুগে পুরুষের আধিপত্য থাকা সত্বেও পরিচয়ের বেলায় মায়ের নাম, বাবার নয়। শোনা যায় যে তখনকার সমাজে বিবাহবহির্ভূত যৌনসম্পর্কের এতই ছড়াছড়ি ছিল যে গ্রীক আর রোমান পুরুষ কখনোই হলপ করে বলতে পারত না সে আসলেই তার ছেলেমেয়ের বাবা। গ্রীকরোমানদের চাইতে মসৌরা কম কি বেশি চরিত্রহীন সে বিচার আমি করবনা।

জিজ্ঞেস করতে পারেন মসৌ সমাজে চুরিচামারি, খুনোখুনি দাঙ্গাহাঙ্গামা এসব হয়না? না, হয়না। এসব তারা মোটেও সহ্য করবে না। এগুলোকে ওরা অত্যন্ত হীন কাজ বলে গণ্য করে। কেও কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করলে তাকে লোকের সামনে লজ্জায় ফেলা হয়, কড়া কথা শোনানো হয়, তাকে অনুতাপের সুযোগ দেওয়া হয়। ব্যস, তার বেশি শাস্তির কোন প্রয়োজন হয় না। সামাজিক লজ্জা জিনিসটাই তাদের জন্যে ঘোরতর শাস্তি।

প্রশ্ন তোলা যায় এই আপাত আদিম জাতির কাছ থেকে কিছু শিখবার আছে কিনা আমাদের গতানুগতিক সমাজের। আমার ব্যক্তিগত মতে, আছে, অবশ্যই আছে। সংসারে এমন কোন মানুষ নেই যার কাছে কারো শিখবার কিছু নেই। জীবনের এই যে এত আনন্দ, এত রূপ রস সৌন্দর্য্য তার প্রধান উৎসই তো প্রতিদিন ঘুম থেকে জাগার পর একটি নতুন দিনের সাক্ষাৎ পাওয়া। প্রতিটি নতুন দিন একটা নতুন কিছু শেখার সুযোগ, নতুন কিছু সাধা, জানা ও বোঝার সুযোগ। শিখে শিখে জেনে জেনে জীবনকে সুন্দর করে তোলা, বর্ণে গন্ধে আনন্দে ভরাট করে তোলা, এই তো জীবনের ধর্ম। আমি তাদের কথা বলছি না যারা জীবনকে তৈরি করে মৃত্যুর পরবর্তী জীবনটির জন্যে। আমার মত সাধারণ জীবনধর্মী মানুষ যারা আমি শুধু তাদেরই কথা বলছি। এই ইহজগতের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে গেলে মসৌ সম্প্রদায়ের জীবনে ঠিক কোন জিনিসটির অভাব যা আমাদের জীবনে আছে অঢেল পরিমাণে? সুখ, শান্তি, নিরাপত্তা, এর কোনকিছুরই তো ঘাটতি দেখছিনা ওদের। বরং ওদের যা আছে তার অনেককিছুই তো আমাদের সাধ্যের বাইরে। তাহলে কিসের মাপকাঠিতে বিচার করে আমরা দাবি করব যে ওদের চাইতে উন্নততর জাতি আমরা? কে কার চাইতে কত উন্নত কত অবনত তার কি কোন অকাট্য মানদণ্ড আছে? মসৌ জাতির কাছে আর কিছু না হোক অন্তত এই নম্রতাটুকু আমাদের শিখবার আছে বলেই আমার বিশ্বাস। নিজেদের দৃষ্টিকোন থেকে অন্য কোন সম্প্রদায়কে বিচার করতে নেই আজকে এই শিক্ষাটাই পেলাম ওদের কাছ থেকে।

      দুঃখের বিষয় যে আধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রশকট মসৌদের ওপরও তার বুলডোজার নিয়ে উপস্থিত হবার উপক্রম। অনেক পরিবারে স্যাটেলাইট টিভির ডিশ এন্টেনা দেখা যাচ্ছে। তরুণরা একে একে শহরমুখো হচ্ছে। লেখাপড়া শিখে চাকরিবাকরি নিতে শুরু করেছে। আধুনিকতার আকর্ষণ, পণ্য ও প্রযুক্তির আকর্ষণ যে কত দুর্দমনীয় তা নতুন যুগের কারুরই অজানা নয়। হাজার বছর ধরে যারা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে সগর্বে নিজেদের জীবনধারা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছিল, ধর্মের মত প্রবল শক্তিশালী প্রতিপক্ষকেও প্রতিহত করতে পেরেছিল, তারা আর তরীখানি ভাসিয়ে রাখতে পারলনা নতুন যুগের প্লাবনধারাতে। ধর্মের চাইতে কম পরাক্রান্ত নয় এই পণ্য প্রযুক্তি।

সূত্রঃ

১. স্পিগেল পত্রিকার সাক্ষাৎকারক ইউরোগেন ফয়েটের সঙ্গে আর্জেন্টিনার লেখক রিকার্ডো কোলারের আলাপচারিতা।

২. আন্তর্জাল।

অটোয়া, কানাডা

জুন ২৪, ২০০৯।

 

মন্তব্য:
সৈয়দ আশরাফ উদ্দিন আহমেদ   August 21, 2009
নারীপ্রধান উন্নত এই সমাজটিকে আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়াতে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। একশত বছর আগে বেগম রোকেয়া কি এঁদের সম্পর্কে জানতেন? কিভাবে? ‘সুলতানা’স ড্রিম’ বা ‘নারীস্থান’ এ তো তখনই তিনি দেখিয়েছিলেন পুরুষ জাতি ঝগড়াটে, অলস ও বোকা। এছাড়াও অন্যত্র (গোলাম মুরশিদ এর এক লেখায় পড়েছি) তিনি বলেছিলেন “যেখানে ধর্মের বন্ধন অতিশয় দৃঢ় সেই খানে নারীর প্রতি অত্যাচার অধিক। যেখানে ধর্ম বন্ধন শিথিল, সেখানে রমনী প্রায় পুরুষের ন্যায় উন্নত অবস্থায় আছেন”। মসৌ প্রজাতির উদাহরনের মাধ্যমে আপনি সেটাকেই আবার প্রমাণ করলেন। অনেক সমাজবিদ ও নৃতত্ববিদরা মনে করেন প্রাচীন “অসভ্য সমাজ” ছিল মাতৃ প্রধান বা মাতৃ-কেন্দ্রিক, যখন মহিলারা চাষাবাদ আবিষ্কার করেন আর পুরুষরা তীর-ধনুক নিয়ে হিংস্র শিকারে মত্ত থাকত। গোত্রে গোত্রে যুদ্ধের ফলে স্থান ও জনবল সম্পদরূপে পরিগণিত হতে থাকে। পুরুষ শরীরের সম্ভবতঃ একটি উপাদান, টেষ্টোস্টেরোন, এর জন্য পেশীর গঠন শক্ত, ফলে শক্তিশালী হয়। সময়ের বিবর্তনে সেই শক্তিতে বলীয়ান হয়ে পুরুষ ধীরে ধীরে এক “সভ্য” সমাজ গড়ে তোলে যাতে স্ত্রী-জাতি পুরুষের সম্পত্তিতে পরিণত হয়। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ ও রক্ষার জন্য পুরুষ সৃষ্টিকর্তাকে সামনে হাযির করে ও স্ত্রী-জাতিকে নিম্ন শ্রেণীর প্রাণীতে পরিণত করে। হয়তো প্রতিবাদের মুখে আপেক্ষাকৃত নতুন ধর্ম গুলোয় নারীকে দেবী বা মহান মাতা বানিয়ে রাখা হয়েছে, কিন্তু ব্যাবহারিক দিক থেকে খাদ্য, সম্পদ, শিক্ষা, সবকিছুতেই কৌশলে নারীকে বঞ্ছিত করা হয়েছে। আপনি চমৎকার ভাবে এই সত্যগুলো তুলে ধরেছেন। আমার শুধু জানতে ইচ্ছা করে সেই ‘মহাপুরুষটিকে’ যার মাথায় এই ‘সভ্য’ সমাজ বানাবার বুদ্ধিটি প্রথম এবং কেন এসেছিল। আপনাকে আবারও কৃতজ্ঞতা জানাই।
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.