Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  মূল রচনাবলীঃ  ||  ৯ম বর্ষ ৯ম সংখ্যা পৌষ ১৪১৬ •  9th  year  9th  issue  Dec 2009 - Jan 2010  পুরনো সংখ্যা
বিজয় দিবসঃ স্মৃতি–বিস্মৃতির মুক্তিযুদ্ধ Download PDF version
 

বিজয় দিবস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা

বিজয় দিবসঃ   স্মৃতিবিস্মৃতির মুক্তিযুদ্ধ

আলী আনোয়ার

     বিজয় দিবস বললেই স্মৃতি আমাকে তাড়া করে। মুক্তিযুদ্ধে স্মৃতি। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের, উত্তেজনার, বেদনার, কষ্টের স্মৃতি। কিন্তু হায় একদা মুক্তিযুদ্ধে যাদের সহযাত্রী হয়েছিলাম, মিছিলে সভায়, সংকটে হাতে হাত দিয়ে চলেছি, একান্ত যাত্রী পথের মাঝে কতজন যে হারিয়ে গেল এখন তাদের নাম মনে করতে পারিনা, এটাও ত কষ্টের। ষোলই ডিসেম্বর আমার জন্য তাই সাল তামামির দিন। নিজের মনের মুখোমুখি হয়ে ভাবতে চাই কারা গেল, কারা নেই, কিভাবে এখানে পৌঁছুলাম।

     কলকাতা, সেপ্টেম্বর ৭১। ভোর বেলায় খলিল সাহেব এসে হাজির। আমি বেশ অবাকই হয়েছি: আসুন আসুন বেলে ঘাটার ঠিকানা কোথায় পেলেন? জুলাই থেকে আছি। খলিল সাহেবের জবাবে বোঝা গেল ও খুরশিদের কাছ থেকে ঠিকানা জোগাড় করেছেন। দুজনেই পার্ক সার্কাসে থাকেন দশ মিনিটের ব্যবধানে। খুরশিদ জাস্টিস মাসুদের এপার্টমেন্টে থাকেন। জাস্টিস মাসুদ থাকেন পাশের বিল্ডিংটাতে সেটিও ওর। শওকত ওসমান সাহেব তার যৌবনের বন্ধু। তিনি ঐ বিল্ডিংটার ছাতের উপরে চিলেকোঠায় থাকেন। আমি সপরিবারে কলকাতায় পৌঁছেছি এপ্রিলের ২৮ তারিখে সকালে, রাজশাহীর বাঘা গ্রাম থেকে। পকেটে একটি মাত্র ঠিকানা খুরশিদের। শিয়ালদা স্টেশনে বসে রইলাম আর সব বাংলাদেশ থেকে আসা স্থানচ্যূত রেফিউজিদের মত। ছোটভাই বাচ্চুকে পাঠালাম খুরশিদদের কাছে, থাকার কোন ব্যবস্থা করা যায় কিনা। খুরশিদ সাহেব তার ওখানেই ডাকলেন। স্বস্তির নিঃস্বাস ফেললাম- পরিচিত জনের কাছে একটা আশ্রয় তো মিললো যত সাময়িকই হোকনা কেন। ঐখানে পৌছুতে বিকেল হয়ে গিয়েছিল। সন্ধ্যা বেলাতেই খলিল সাহেব এসে পৌছুলেন, তিনি কাছেই থাকেন। প্রায় রোজই একবার ঢুঁ মারেন। তার প্রথম কথাই হল: এসে তো পড়েছি মৃত্যুর পরিমন্ডল থেকে দুদিন আগেই বেরিয়ে এসেছি। তাঁর কথায় একটু ডিপ্রেসড হলাম। শংকিত আশা নিয়ে মন্তব্য করলামঃ কেন ই.পি.আর এবং পুলিশদের একটি গ্রুপ নাকি জয়দেবপুরের জঙ্গলে রিঅর্গানাইজড হচ্ছে? চকিতে ফেলে আসা রাজশাহীর কথা মনে এল। আধুনিক যুদ্ধ সম্পর্কে অনভিজ্ঞ যুবক সম্প্রদায় এবং ছাত্রদের মধ্যে প্রতিরোধের প্রস্তুতি চলছে। বিশেষ করে শহরে ঢোকার তিনটি রাস্তায় অসংখ্য ট্রেঞ্চ কাটা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করে দিয়েছেন, সেই স্বাধীনতা এখন রক্ষা করার দায়িত্ব সব বাঙালির। তাই পাড়ায় পাড়ায় প্রস্তুতি চলছে। ছোট ছোট গ্রুপে অস্ত্রহীন অস্ত্রচালনার প্রশিক্ষণ চলছে, প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন ছত্রভঙ্গ পুলিশের কেউ। ঘরে ঘরে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ছে। ৩রা এপ্রিল দুতিনটি ফাইটার প্লেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ওপর স্নেইকিং করেছে। কিন্তু যুবকরা দমেনি। আমরা পাঁচ তারিখে ক্যাম্পাস ছেড়ে গ্রামে আশ্রয় নেয়ার জন্য বেরিয়ে পড়েছি। আমরা রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক সহকর্মী গোলাম মোরশেদের সঙ্গে বাঘা গ্রামের দিকে চলেছি। সেখানে হাজী সাহেব তাদের আত্মীয়। মনে পড়ছে  সেখানে সারদা পুলিশ একাডেমির কাছে এক বটতলায় চার-পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা যুবক একটা রাইফেল হাতে নিয়ে রাস্তা পাহারা দিচ্ছে। তারা আমাদের থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করল। পরে আরো দুজায়গায় ঐ টহল দেখে খুব আস্থা হয় নি। কিশোররা যেমন যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা খেলে থাকে সেই রকম মনে হল। আধুনিক যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে তখনো কোন অভিজ্ঞতা হয়নি। খলিল সাহেবের প্রশ্নে একটু দমেই গেলাম। তারপর থেকে তিনচার মাস যেখানে দেখা হয়েছে সেখানেই তার নেতিবাচক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি। তিনি আবার বিশ্লেষণ করে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত করছেন যে ভারতবর্ষ তথা ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে চাইবেন না। অতএব আমাদের যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে সাহায্য বা স্বীকৃতি কোনটাই করবে না। খলিল সাহেবের নাম হয়ে গেল ভগ্নদূত। এদিকে বাংলাদেশ রেডিও চালু হয়ে গেছে। তাতে এম. আর. আখতার মুকুল চরমপত্র বলে একটি ব্যাঙ্গাত্মক প্রোগ্রাম চালু করেছেন। প্রত্যেকদিন বাংলাদেশে দখলদার পাকিস্তানী বাহিনী যে মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণের মুখে কি রকম নাজেহাল হচ্ছে তার বিবরণ থাকতো। আমরা সবাই কি পশ্চিম বাংলায় কি বাংলাদেশের ভেতরে, মুগ্ধ আবেগ ও নির্ভরতা নিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার শুনতাম এবং মুক্তিযুদ্ধের ক্রমাগত সাফল্য সংক্রান্ত খবর থেকে যোগ বিয়োগ করেও বিজয় যে অবশ্যম্ভাবী এরকম বিশ্বাস করতাম। সংশয় যে ছিলনা তা নয় তবে প্রায়ই দেখতাম বা জানতাম যে আমাদের যুবকরা গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং নেওয়ার জন্য দেরাদুন বা অন্য কোথাও চলে যাচ্ছে। অকুতোভয়, দৃপ্ত, উজ্জল সব মুখ। লে. কর্নেল ওসমানী বাংলাদেশ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিয়োজিত হয়েছেন। এ হেন পরিস্থিতিতে খলিল সাহেবের আগমনে একটু অস্বস্তি ও শংকার চকিত ছায়া মনের ওপর দিয়ে বয়ে গেল। তবে তাকে দেখে একেবারে যে খুশী হলাম না তাও নায়। কতদিন দেখিনা। আজকাল সকাল-বিকাল উল্টা পাল্টা খবর পাই। খলিল সাহেবের সঙ্গে নোট মিলিয়ে নেওয়া যাবে। কিছুদিন হয় পার্ক-সার্কাস যাওয়ার সময় পাইনা। গৃহহারা যে নব্বুই লক্ষ লোক ভারতে শরনার্থী শিবিরগুলিতে স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের পুনর্বাসন সংক্রান্ত একটি প্রকল্পে কাজ করছি তখন। ফলে রাজশাহীর সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ কমে গেছে। কিন্তু প্রত্যেকেরই কিছু  কন্ট্যাক্ট পয়েন্ট দেশের অভ্যন্তরে রয়ে গেছে। আমাদের ছাত্রদের মধ্যে কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধের ক্যুরিয়ার হিসেবে দেশের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। ঢাকা পর্যন্ত চলে যাচ্ছে। খবরাখবর নিয়ে ফিরে আসছে। আমার সহকর্মী বন্ধুদের কারো কারো সাথে অসমসাহসী ছেলেদের কারো না কারো যোগাযোগ হয়ে যাচ্ছে। কাজেই মুক্তিযুদ্ধে জড়িত প্রায় প্রত্যেকেই কিছুনা কিছু তাজা খবর পাচ্ছে দেশের বাস্তব পরিস্থিতির ওপর। খলিল সাহেবের বিশ্লেষণপ্রবণ মন চিরকালের মত এবারও সে সব সিদ্ধান্ত তুলে ধরলেন তাকে আশাব্যঞ্জক বলা যাবে না তার মতে,  বেটি বাংলাদেশকে রিকগনাইজ করবে না। আমাদেরকে নিয়ে ও রাজনৈতিক খেলা খেলছে। তাছাড়া ভারতীয় জনগণের সহানুভূতিও থাকবে না। এই অর্থসাহায্যও থাকবে না। আমি শুনতে পেয়েছি বাংলাদেশের জীবনযাত্রা নর্ম্যাল হয়ে এসেছে। ওরাও আমাদের অস্তিত্ব ভুলে যাচ্ছে। আপাতভাবে মনে হয় তিনি ঠিকই বলছেন। আসলে পরিস্থিতি তখনই বদলাতে শুরু করেছে। ভারতীয় ট্রেনিং প্রাপ্ত বাংলাদেশী মুক্তিযোদ্ধারা অনেকগুলি অঞ্চলে এই প্রথম সাফল্যজনক অপারেশন করেছে। তবে  সহকর্মীদের সকলের মন মুক্তিযুদ্ধে নিমজ্জিত ছিলনা। একজনকে দেখলাম সর্বদাই সাদা শার্ক স্কিনের স্যুট পরে ঘুরে বেরাচ্ছেন। আমরা প্রায় সবাই যখন বাসে চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে একজায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাচ্ছি তিনি ট্যাক্সি ছাড়া আর কিছুতে চড়েন নি। আরো দুচারজনের কথা জানি যারা প্রতি সন্ধ্যেতে মদ্যপান না করে থাকতে পারতেননা। একজন বামপন্থী নেতার কথা শুনেছি যে তিনি অসুস্থ হয়ে পরলে কলকাতায় সি.পি.এম তাদের খরচে তাকে পার্কসার্কাসের একটি ক্লিনিকে ভর্তি করে দিলেন। তিনি না কি একবেলার পরই অভিযোগ করেছেন যে তিনি বালাম চালের ভাত না হলে খেতে পারেন না। এ রকম আরো তিন চারটি লজ্জাজনক ব্যবহারের কথা মূহূর্তের মধ্যে মনে এল। যদি আঞ্চলিক সহানুভূতি হারাই তবে এই জন্যই হারাবো এ কথাও খলিল সাহেবকে বললাম। তবে খলিল সাহেবের আপাত তিক্ততার একটা পটভূমি ছিল। পার্টিশনের সময়ে খলিল সাহেবের আত্মীয়বর্গের একটা অংশ ভারতে থেকে গিয়েছিল তাঁরা পাকিস্তানে হিজরত করেননি। এবার তারা খলিল সাহেবকে দেখা হলে অভিযোগ করেছেন যে তোমরা পাকিস্তান ভেঙ্গে ফেললে? আমাদের একটা মানসিক আশ্রয় ছিল। যখন মুক্তিযুদ্ধ প্রলম্বিত বা ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিল তখন তারা অখন্ড দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। উত্তরাধিকারের নামে খলিল সাহেবদের পৌত্রিক সম্পত্তি তারা দখল করে ছিলেন তা অংশত হলেও এবার ফিরিয়ে দিতে হবে। এই হল খলিল সাহেবের ব্যক্তিগত সমস্যা। অন্যথায় স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নতো তিনিও দেখেছিলেন। লিবারেশনের পরে যখন রাজশাহী ফিরলাম তখন তাদের বাসায় স্বস্ত্রীক গিয়েছিলাম। ওর স্ত্রী অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আপ্যায়ন করলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সুখ দুঃখের অনেক গল্প করলেন। খলিল সাহেবও লক্ষ্য করলাম যুদ্ধকালীন হতাশার কথা সব ভুলে গেছেন।

     গোড়ার কথায় ফিরে যাই। আমার থাকার ব্যবস্থা হল কি করে? পৌঁছানোর পরের দিন বিকেলেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বুদ্ধিজীবী সহায়ক সমিতির দুই কর্মকর্তা প্রফেসর অনিল সরকার ও ইসলামিক ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর অনিরুদ্ধ রায় চলে এলেন জাস্টিস মাসুদ সাহেবের রাসায়, আমাদের সন্ধানে। খুরশিদ সকালেই এদেরকে আমাদের খরব জানিয়েছিলেন। তাঁরা জানালেন যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বাংলাদেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বাস্তু শিক্ষক ও তাদের পরিবারবর্গের থাকার জন্য সীমিত ব্যবস্থা করেছে। বিভিন্ন সহানুভূতিশীল ব্যাক্তি স্বেচ্ছায় অন্তত: একটি রূম ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তবে প্রথমে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে নিবন্ধিত করতে হবে। পরের দিন সকালে অনিরুদ্ধ রায় আগে থেকেই সেখানে ছিলেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপিকা ড. গায়ত্রী গুহরায়ের বাসায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা হল। অনিল সরকার সেই বিকেলেই আমাদের ঐ বাসায় নিয়ে গেলেন। দেখা হল গায়ত্রী গুহরায় বাবা মায়ের সঙ্গে। তার বাবা রিটায়ার্ড জাস্টিস। আই সি এম জুডিসিয়ারী। বাড়ির সাহেবী কেতা কানুন। খাওয়া দাওয়ার সংস্কার থাকতে পারে মনে মনে এসব দুশ্চিন্তা ছিল। দেখলাম বাড়ীতে একজন মুসলমান বাবুর্চি, একজন নেপালী কুক এবং একজন বর্ষিয়ান কাজের লোক। আমার স্ত্রী অত্যন্ত সংকুচিত বোধ করছিলেন কারণ তার পরনে একটি আঠার টাকা দামের তাঁতের শাড়ি (বাঘার হাট থেকে কেনা) এবং পায়ে আমার একজোড়া বেঢপ সাইজের স্যান্ডেল। কিন্তু তাঁদের আন্তরিকতার কারণে একদিনের মধ্যে সব সংকোচ কেটে গেল। আমাদের মেয়ে চার বৎসরের সুস্মি ও ছেলে দুই বৎসরের যামী দুজনই বাড়ির সকলের প্রিয় হয়ে উঠল। দ্বিতীয় দিন সকালেই আমার পুর্বপরিচিত ড. অরুন দাশ গুপ্ত এসে হাজির। অরুন দাশগুপ্ত বা অরুনদার সঙ্গে আমার পরিচয় ও ঘনিষ্টতা বিলেত থেকে ফিরতি জাহাজে। অরুনদা আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া থেকে, আমি লিভারপুল থেকে। অরুনদা ইতিহাসে পি.এইচ.ডি.। অরুনদার স্ত্রী মানসী দাশগুপ্ত মনোবিজ্ঞানে পি.এইচ.ডি. করেছেন। অরুনদা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে পড়ান এবং মানসী দাশ গুপ্ত শ্রী শিক্ষায়তন কলেজের প্রিন্সিপাল। অরুনদা সহায়ক সমিতির কাছে খবর পেয়েই সেই সকালে চলে এসছেন আমাদেরকে তার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমি যেমন খুশী তেমনি একটু বিব্রতও। শেষ পর্যন্ত গায়েত্রী গুহরায় এবং অরুনদা দুজনে আলাপ করে ঠিক করলেন যে আমরা জাস্টিস গুহ রায়ের বাসায় সাতদিন থাকব তারপরে অরুনদা এসে নিয়ে যাবে। অরুনদা আর মানসীদের বাসায় দুমাস ছিলাম এবং এরাই আমাদের intellectual হিসেবে অধ্যাপক সতীন্দ্র নাথ চক্রবর্তী ও অমিতা দি, আবু সাইয়িদ আইয়ুব ও গৌরী আইয়ুব, অম্লান দত্ত, পান্নালাল দাশগুপ্ত, ডাক্তার সুনীল দত্ত ও গায়ত্রী দত্ত, মৈত্রেয়ী দেবী, নরেশ গুহ, শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। মুক্তিযুদ্ধের অনিশ্চয়তা সংক্রান্ত উৎকন্ঠা ও হতাশার মধ্যে এঁদের সান্নিধ্য আমার মনকে সতেজ ও মানুষের লক্ষ্যাভিমুখীনতা ও ক্ষমতায় বিশ্বাসকে জাগরুক রেখেছিল। আমাদের পারতেই হবে।

     বিশ্ববিদ্যালয় সহায়ক সমিতির মাধ্যমে প্রাপ্ত বন্ধুরাও কম তাৎপর্যপূর্ণ ছিলেন না। অনিরুদ্ধ রায়, অনিল সরকার, শংখ ঘোষ, আনন্দ বাজারের গৌর কিশোর ঘোষ প্রমুখ মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে অনেক বেশী ফোকাস্ ছিলেন। এবং উদ্বাস্ত সহায়হীন শিক্ষকদের জীবনে শৃংখলা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে অসাধারণ পরিশ্রমও করেছেন। গৌরী আইয়ুব, মৈত্রেয়ী দেবী যেমন মহিলাদের ও শিশুদের ব্যাপারে তাদের সমস্ত মনোযোগ ও সময় ব্যয় করেছেন। এমনি আরো অসংখ্যজন মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক হিসেবে কাজ করেছেন। তাদের অধিকাংশের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি। যাদের সঙ্গে হয়েছিল তাদের প্রায় সকলের নাম ভুলে গেছি। তাদের কারো চোখে যদি লেখাটি পরে তবে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কারণ এই সব উদারহৃদয় সংবেদনশীল উপচিকীর্ষু ব্যক্তিদের নিন্দুকেরও অভাব ছিল না।

     মে মাসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আমিনুর রহমান মল্লিক আগরতলা হয়ে কলকাতা পৌছুলেন। আনিসুজ্জামান প্রমুখ আগেই এসেছিলেন। বন্ধুবর ওসমান জামাল আগরতলা থেকে এলেন মের শেষ দিকে। ওসমান জামাল মাত্র কিছুকাল আগে লীড্ স্ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এমএ করে ফিরে চট্টগ্রামে চাকুরি নিয়েছিলেন। ওসমান জামানের স্ত্রী এখনো আগর তলায়। আমরা দুজনে মিলে একটি বাসা খুঁজছিলাম ভাড়া নেওয়ার জন্য। বেলে ঘাটার বাড়িটা দুজনে মিলে নেব বলে ঠিক হল। কিন্তু তিনি অকস্মাৎ পার্ক সার্কাসে একটি পছন্দসই বাড়ি পেয়ে সেটা ভাড়া নিয়ে ফেললো। অন্য একটা কারণও অনুমান করি। বেলেঘাটায় তখন বেশ কিছুদিন ধরে নক্সাল নিয়ন্ত্রনাধীন এলাকাটি রক্তাক্ত অঞ্চল। সিআই রোডের ওপরে সমস্ত এ্যাপার্টমেন্ট হাউস জনশুন্য খাঁ খাঁ করছে। মে-জুন নাগাদ পুলিশ সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে নক্সালদের নির্মুল করেছে। আবার ছোট খাট দুটো একটা বোমা মাঝে মধ্যে ফুটতো। জামাল হয়তো খুব স্বস্তি বোধ করে নি। থাকগে মরীয়া হয়ে আমি বেলেঘাটার বাড়িটাতে উঠলাম। কিছুদিন পরই জামাল বিলেতে তার বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ করে লীডসে ফিরে গেল। আমার স্ত্রী আমাদের বন্ধু গণিতের অধ্যাপক ড. রশীদুল হক সাহেবের শ্বশুরবাড়ি কুশুম গ্রামে মাস দুয়েক থেকে বেলে ঘাটা চলে এলেন। সেটা জুলাই মাস। কলকাতা ফিরে আসার অবশ্য একটা জরুরী কারণ ছিল। অক্টোবরের দশ তারিখে আমার স্ত্রীর একটি পুত্রসন্তান লাভ ঘটল, আমাদের তৃতীয় সন্তান ওবিন। কিছু কমপ্লিকেশান ছিল, তাই কুসুমগ্রামে প্রসব করানো যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি।

আগস্ট মাস নাগাদ অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা আগরতলা, মেঘালয় হয়ে ঘুরতে ঘুরতে বেলেঘাটায় আবির্ভূত হলেন। আমাদের আনন্দের অবধি নেই। তবে তার স্ত্রী দেবী সঙ্গে না থাকাতে একটু থমকে গেলাম। দ্বিজেন্দ্র বলল, তারা ঝালকাঠি ক্ষেত্রপাড়া প্রভৃতি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে বেড়াচ্ছে। ছোট্ট টুটু এবং সদ্যাজাত মুন্নিকে নিয়ে। দেবীর ভাই তপনের সঙ্গে আমার একাদশ বাসে দেখা হয়েছিল, দ্বিজেন তার কাছেই আমার বেলেঘাটার ঠিকানা পেয়েছে। তারপর থেকে বিজয় দিবস পর্যন্ত আমার এখানেই ছিল। সংসারের নানা কাজে দ্বিজেন যেরকম সহযোগিতা করতে পারত আমি ততটা পারতাম না। আমার স্ত্রী দ্বিজেনকে দাদা সম্বোধন করত এবং ভালবাসত তা আমার ঈর্ষাই উৎপন্ন করতো।

     বেলেঘাটায় সংসার পত্তন ও স্ত্রীর পরিচর্যায় যথা দুর্লভ দুধের টিন যোগাড় করে দেওয়া শাড়ি কিনে দেওয়া একটি কাজের মেয়ে ঠিক করে দেওয়ায় মানসীদির নিরলস মনোযোগ আমার সবসময় অভিভুত করেছে। সংসারের কাজ এবং শরনার্থী পুনর্বাসন প্রকল্পের কাজ করে মুক্তিযুদ্ধের হাল হকিকত জানার খুব সময় পাইনি কিছুকাল। তবে মুক্তিযুদ্ধের নিয়ন্ত্রন নিয়ে সরকার এবং নবোদ্ভুত ছাত্র নেতাদের মধ্যে মত বিরোধের কথা শুনতে পাচ্ছিলাম। প্রত্যক্ষ যুদ্ধে লিপ্ত সেক্টর কম্যান্ডার রাও কর্তৃত্বের পরিধি এ ব্যাপারে নিরাসক্ত ছিলেন না। তবে মুক্তিযোদ্ধারা নিজ বুদ্ধি ও কৌশল প্রয়োগ করে বিস্ময়কর একেকটি ঘটনা ঘটাচ্ছিলেন। যদিও অতিরিক্ত মূল্যে। আধুনিক সমরাস্ত্র নিয়ে যুদ্ধের কোন অভিজ্ঞতা না থাকায় একটা বিরাজমান বিশৃংখলা রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিভেদ ও নেতৃত্বের অনৈক্য দুশ্চিন্তা উদ্রেক করলেও একটি আশার রেখা দেখা যাচ্ছিল সেটি হল জাতিসংঘের সেপ্টেম্বর / অক্টোবর সাধারণ সভাতে বাংলাদেশ প্রবাসী সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে এগারোজনের একটি দল পাঠানো হয়। এখন বিলেতে অবস্থানরত ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী যিনি মুক্তিযুদ্ধের যথার্থতা প্রতিপাদন করার জন্য প্রচারণায় স্বনিযুক্ত হয়েছিলেন ঐ প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে সরকারী সমর্থক যোগদান করেন। পররাস্ট্র মন্ত্রী মুশতাক এই দলে ছিলেন না। জাতিসংঘের ঐ সভায় পাকিস্তানের প্রতিনিধি প্রাণপনে বলার চেষ্টা করলো পূর্বপাকিস্তানের গোলযোগ পাকিস্তানের আভ্যন্তরীন ব্যাপার এবং এই গোলযোগ ভারত কতৃক প্ররোচিত। ফলত বাংলাদেশ নামক কল্পিত রাষ্ট্রের কোন অস্তিত্বই নেই এবং তাদের স্বীকৃতি দেওয়া বা ত্রান সাহায্য দেওয়া পাকিস্তানের আভ্যন্তরিন ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার সামিল হবে। ভারতের প্রতিনিধি সমর সেন ভারত সরকারের নীতি ব্যাখা করতে গিয়ে বাংলাদেশ পরিস্থিতির পক্ষে জোরালো বক্তব্য্য দেন এবং রেফিউজি সমস্যা যে পাকিস্তানের দমন নির্যাতন ও ব্যাপক হত্যার ফলাফল বলে তুলে ধরেন। এই প্রথম বাংলাদেশের বিদ্রোহ যে একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার ও সর্বোপরি সামরিক বিক্ষুব্ধতার ফল সেটি বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন ফোরামে ও মিডিয়ায় বলার সুযোগ পেলেন। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাঙালীরা স্বাধীনতার স্বপক্ষে যে প্রচার চালাচ্ছিলেন তারাও এদের সহায়তা করেন। বিশ্ববাসী এই প্রথম বাংলাদেশ নামক একটি রাজনৈতিক সমস্যার অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত হল। ফ্রান্সের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত লেখক আন্দ্রে মালরো, মার্কিন জনপ্রিয় গায়িকা জোয়ান বায়েস, গায়ক জর্জ হ্যারিসন বিবৃতি দানের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন জানালেন। স্বাধীনতার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য প্রফেসর সারওয়ার মুর্শিদ আন্দ্রে মালরোকে আমাদের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আমন্ত্রণ জানান ও বিশেষ সমাবর্তন করে তাকে ডি. লিট উপাধিতে ভূষিত করা হল।

     জাতিসংঘ অধিবেশনে কি হয় তা জানার জন্য আমরা রূদ্ধ নিঃশ্বাসে অপেক্ষা করছিলাম। আমরা ভেবেছিলাম যে জাতিসংঘে নিশ্চয়ই স্বাধীন বাংলাদেশ নামক উপদ্রুত অঞ্চলটিকে স্বীকৃতি দেবে। অন্ততঃ পাকিস্তানকে গণহত্যা থেকে বিরত থাকতে এবং সিভিলিয়ান সেক্টর থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে বলবে। এবং শরনার্থীদের সাহায্য করতে আবেদন জানাবে। তার কিছুই পাওয়া গেলনা, তবু জাতিসংঘ ফোরামে যে বাংলাদেশ সমস্যা বলে একটি সমস্যা দেখা দিয়েছে সে সম্পর্কে সচেতনতার সুত্রপাত হল তাই বা কম কিসে? তা ছাড়া  আগষ্টের মাঝামাঝি পাকিস্তানি সামরিক গোষ্ঠীর হাতে শেখ মুজিবের বিচার নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোড়ন উপস্থিত হয় এবং জাতিসংঘের মহাসচিব ইউ থান্ট যে এ বিষয়ে উৎকন্ঠা প্রকাশ করেন।

     মুশতাক আহমদ যে ঐ জাতিসংঘে প্রেরিত হননি তাতে আমাদের মধ্যে বিস্ময়ের অবতারনা হয়েছিল। কিছুদিন আগে থেকেই প্রবাসী সরকারের মধ্যে পাকিস্তান সমর্থক কাউকে সনাক্ত করা হয়েছে এ রকম একটি গুজব বাজারে চালু হয়ে যায়। তবে রোজই কোন না কোন গুজব তৈরি হত এবং আমাদের মনে গুজবের বিরুদ্ধে একটা মানসিক প্রতিরোধ বা ইমিউনিটি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মন্ত্রীসভার অভ্যন্তরে পাকিস্তানী চরের উপস্থিতি এমত গুজব আমাদের খুব বিচলিত করেছিল। কিছুদিনের মধ্যে জানতে পারলাম যে মুশতাক গোপনে পাকিস্তানি কোন কূটনৈতিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন এবং সেই কারণে মন্ত্রীসভা থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের একটা নাজুক অবস্থা চলছে সেই সময় সরকারের মধ্যে আন্তবিভক্তি বা অন্তবিরোধের সুযোগ প্রতিরোধ যুদ্ধকে বিভ্রান্ত ও দূর্বল করে ফেলবে এমন বিবেচনা তাজউদ্দিনকে সংযত হতে বাধ্য করে। ফলে মুশতাক থেকে গেলেন। মুক্তিযুদ্ধ একটি সর্বদলীয় ব্যাপার তাতে ফ্যাকশন হতে পারে এমন কিছু করলে প্ররোচিত করলে শুধু মুক্তিযুদ্ধে তো পরাজয়ই হবেনা তারচেয়ে বড় ক্ষতি চিরকালের মত বাঙালী সত্ত্বা পরিচয় হারিয়ে যাবে। ইয়াহিয়া খান নিযুক্ত সংবিধান কমিটি যেমন আরবী হরফে বাংলা লেখার প্রচেষ্টা করেছিল। এবং দেশও উপনিবেশিক দাসত্বের পর্যবাসিত হবে। আত্মপরিচয়ে প্রতি শ্রদ্ধা না থাকলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন হয় না। কাজেই পাকিস্তানের সঙ্গে কোন সমঝোতার প্রশ্নই উঠেনা। মু্ক্তিযুদ্ধে পরাজয় বা প্রত্যাহার ঘটলে পাকিস্তানের নিষ্ঠুর শাসকশ্রেনীর কাছে নতজানু হয়েই যেতে হবে। এ সব সংক্রান্ত অপপ্রচার থেকে আমাদের নিজেদের মধ্যেও নিরন্তর তর্কবিতর্ক চলতো। তাই সংযম ও বিচক্ষণতার  তাজউদ্দিনের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

     সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে আরেকটি ঘটনা ঘটনা ঘটে। উদ্বাস্তু জীবনের গোড়া থেকেই আমরা ভাবছিলাম যে মুক্তিযুদ্ধে যেহেতু দলমত নির্বিশেষে সকলেই অংশগ্রহণ করেছে কাজেই প্রবাসে সরকার ঘোষনা ও মন্ডলী থাকলে ভাল হত। কিন্তু ২৫ মার্চের নির্বিচার গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের পরে যেহেতু সবাই ছত্রখান হয়ে পড়ে এবং এপ্রিলের শেষ সময় নাগাদ বিভিন্ন অনির্ধারিত সীমান্ত অঞ্চল দিয়ে দেশত্যাগ করে ভারতে প্রবেশ করে। কেউ অবশ্য তাদের জন্য অভ্যর্থনা কমিটি করে তাদের গ্রহণ করেনি। রাস্তাঘাটের অপ্রতুলতা ও যোগাযোগের অপ্রস্তুত অবস্থার কারণে মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রীয় পরিচালকদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। তাজউদ্দিনকে যেমন মন্ত্রী পরিষদ গঠনের লক্ষ্যে মানদন্ড, বালুরঘাট, শিলিগুড়ি প্রভৃতিস্থানে নিজে এসে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী প্রমুখের যোগাযোগ করেন। কর্নেল ওসমানী ও মুশতাক আহমদ ছিলেন আগরতলায়। অন্যান্য স্বাধীনতা সমর্থক দলগুলির নেতৃবৃন্দ ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছিলেন। ফলে তাদের সম্মতির জন্যে তো যুদ্ধ স্থগিত থাকতে পারে না। জুন মাস থেকেই যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের সুষ্ঠু প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হয়।

     যাই হোক সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কলকাতায় একটি সর্বদলীয় জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠনের লক্ষ্যে এক সভা আহুত হয়। ঐ সভায় ন্যাপের মুজাফ্ফর আহমদ, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টির মনি সিং, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মনিরঞ্জন ধর এবং আওয়ামী লীগের মন্ত্রী পরিষদের প্রতিনিধিবৃন্দ ঐ সভায় উপস্থিত ছিলেন। খন্দকার মুশতাকের প্রস্তাবনুযায়ী আটজনের উপদেস্টা কমিটি গঠিত হয়। সদস্যবৃন্দ হলেন- তাজউদ্দিন, খন্দকার মুশতাক, মুজাফ্ফর আহমদ, মনি সিং, আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, মনোরঞ্জন ধর। কমিটি গঠিত হল। কিন্তু জনগনের মধ্যে প্রচারিত হল না। ফলে যে ব্যাপক সম্পুরক কর্মকান্ডে নারীপুরুষ সকলে অংশগ্রহণ করতে পারতেন তা আর হল না। তাতে সাধারন পার্টি কর্মীদের যে বিচিত্র অভিজ্ঞতার সঞ্চয় হতে পারত এবং মধ্যবিত্ত অভিমান থেকে বেরিয়ে দারিদ্র অসহায় নিরক্ষর জনসাধারনের সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে একাত্মতা বোধ করার প্রয়োজন অনুভব করতে পারত তা আর হল না। এ সবই স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্ত মানসিকতা বিকাশের জন্য প্রয়োজন ছিল। তা না হয়ে আত্মাভিমানী মধ্যবিত্ত পুন উচ্চবিত্ত হওয়ার দিকে ধাবমান হলেন। এবং সেই লক্ষ্যে ক্ষমতাসীন পার্টি যতই গণবিরোধী ও প্রতিক্রিয়াশীল হোকনা কেন তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফেলল। এরাই হল নতুন নাগরিক বিত্তশালী শ্রেনী। ভূমিহীন লোক ভূমি ফিরে পেলনা, গৃহহীনরা পেলনা গৃহ। দারিদ্র বাড়তেই লাগলো।

     যে অসংখ্য শরনার্থী শিবির বাংলাদেশের সীমান্তের চারধারে গড়ে উঠেছিল তাতে আশি থেকে নব্বুই লাখ লোক জায়গা পেয়েছিল। তারা আট মাস অসহনীয় দারিদ্রে রেশনের ওপরে নির্ভর করে এক দীর্ঘ অমানবিক জীবন কাটিয়েছিল। এটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে প্রায় একমাইল দূর থেকে ঐ সব শিবিরের জমাট বাধা বাতাসে ভাসমান দুর্গন্ধ টের পাওয়া যেত। এখনো যদি আমি ঢাকার কোন বাসার পাশ দিয়ে যাই ঐ গন্ধের কথা মনে পড়ে। যখনই ভাবি ঐ সব উদ্ধাস্তু কি সত্যিই পুনর্বাসিত হয়েছিল? কি জানি। তারা সব তাদের কান্না মিশ্রিত দুঃখের স্মৃতি নিয়ে হারিয়ে গেছে। তাদের শূন্যস্থান পূরণ করেছে- ঢাকা চট্রগ্রাম প্রভৃতি শহরের নতুন বস্তিগুলোর নতুন দরিদ্ররা।

     অক্টোবর নভেম্বর মাসে আমাদের প্রধান চিন্তা হল ইন্দিরা গান্ধী এখনো তো স্বীকৃতি দিলেননা। একটি খবরে আমরা খুব দমে গিয়েছিলাম সেটা হল এই যে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রী নাকি ভারতকে সতর্ক করেছেন যে ভারত যদি বাংলাদেশ (তথা পূর্ব পাকিস্তান) আক্রমন করে তবে চীনও ভারতবর্ষ আক্রমন করতে বাধ্য হবে। যুক্তরাষ্ট্রের নাকি এই ব্যাপারে সম্মতি আছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব হেনরী কিসিঞ্জার গোপনে পাকিস্তান হয়ে চীনে গিয়েছিলেন পাকিস্তানের পক্ষে দৌত্যগিরি করতে। সেটাই কি তবে ইন্দিরা গান্ধীর দ্বিধার কারণ? অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র যদি পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করে তবে স্বভাবতই সোভিয়েট রাশিয়া নিজের নিরাপত্তার স্বার্থেও ভারতের প্রতিরক্ষায় অংশ নেবে। কিন্তু কি যে আসলে ঘটছে তা আমরা কেউ জানিনা। আবার অন্যদিকে বাংলাদেশকে একটি পৃথক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে মু্ক্তিযুদ্ধের সহযোগী হিসেবে বাংলাদেশ আক্রমন করতে পারে না। আবার স্বীকৃতি দিলে তাকে যুদ্ধে অবতীর্ন হতেই হবে।

     ইন্দিরা গান্ধী তিনমাস ধরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং যু্ক্তরাষ্ট্রের ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাপারে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়েছেন। তিনি অবশ্য বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ উল্লেখ ততটা করেন নি যতটা ভারতের শরনার্থী সমস্যাকে ফোকাসে রেখে আলোচনা করেছেন কিন্তু তাতে খুব ফললাভ হচ্ছিল এসব মনে হয়নি একমাত্র রাশিয়ার সহানুভূতি ছাড়া। ৩রা নভেম্বর অকস্মাৎ ইন্দিরা গান্ধী কলকাতায় এলেন। মুখে মুখে আমাদের মহলে খবর জারি হয়ে গেছে তিনি রবীন্দ্রসদনের সামনের মাঠটিতে একটি জনসভায় ভাষণ দেবেন। সঙ্গে সঙ্গে হাতের কাজ ফেলে রেখে আমাদের অনেকেই রবীন্দ্রসদনের দিকে দুপুর একটার সময় চললাম। আমার সঙ্গে আছে বন্ধুবর দ্বিজেন। কী আশ্চর্য রবীন্দ্রসদনের চারদিকের রাস্তা দিয়ে গাড়ি ঘোড়া চলছে বোঝার উপায় নেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী এখান দিয়ে যাবেন। রবীন্দ্রসদনের মাঠ বললাম বটে তবে সত্যি সত্যি তো কোন মাঠ নেই। বিশফুট উচুঁ মঞ্চের ওপর সামিয়ানা টানানো হয়েছে। সদন সংলগ্ন রাস্তা জুড়ে। ইন্দিরা গান্ধীর মোটর কেউ জানা না থাকলে চট্ করে বোঝা যেত না। তিনি ঠিক চারটের সময় এলেন। তিনিই বক্তা একমাত্র বক্তা। উন্নয়নের কথা বললেন, শরনার্থীদের প্রতি ভারতের নৈতিক দায়িত্বের কথা বললেন। ঘনায়মান দুঃসময়ের কথা বললেন। কিন্তু আমরা যে কথা শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছি সেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বীকৃতির কথা বললেন না। মিনিট চল্লিশেক ধরে তিনি বক্তৃতা দিচ্ছিলেন এমন সময় পররাষ্ট্র বিভাগ অথবা সেনা বাহিনীর কেউ দৌড়ে দৌড়ে সিড়িঁ দিয়ে মঞ্চে উঠে ইন্দিরা গান্ধীর কাছে কিছু বলার জন্য দাড়ালেন। ইন্দিরা গান্ধী বক্তৃতা বন্ধ করে তাকালেন।  দু মিনিটের বেশী নয়। ইন্দিরা গান্ধী জনতার দিকে ফিরে কয়েক সেকেন্ড সময় নিলেন যেন ভাষনের ছিন্ন সূত্রগুলি ভেবে নিলেন। কিন্তু তা নয় তিনি গম্ভীর ভাবে বললেন: প্রিয় দেশবাসী একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা এখন আপনাদেরকে বলতে হবে। বার্তাবাহক এক্ষুণি আমায় খবর দিলেন যে পাকিস্তান সরকার কোন ঘোষণা ছাড়াই আমাদের উত্তর পশ্চিম অঞ্চলের পাঁচটি ভারতীয় বিমান ঘাটির উপর আকাশ পথে হামলা চালিয়েছে। আমি এক্ষুনি রাজধানীতে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছি। পাকিস্তানি হামলার যথাযোগ্য প্রত্যুত্তর দিতে হবে। আমাদের সকলকে এখন দৃঢ় এবং একতাবদ্ধ থাকতে হবে। একথা বলেই তিনি সিড়ি দিয়ে দ্রুতগতিতে নামলেন এবং প্রদেশ পালের গাড়িতে তার বাসার দিকে চলে গেলেন। আমরা স্তম্ভিত হয়ে শুনলাম এবং ভারাক্রান্ত মনে বাসে বেলে ঘাটায় ভাবতে ভাবতে ফিরলাম: তিনি তো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের কথা কিছুই বললেন না। রাত নটার সময় আকাশ বাণী দিল্লীর খবরে যুদ্ধ পরিস্থিতির বিভিন্ন খবরাখবরের সঙ্গে জানালো ভারত সরকার বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আমাদের আনন্দ আর দেখে কে? পরের দিন সকালে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় পরিচিত অপরিচিত লোক বাংলাদেশী মাত্রকেই অভিনন্দন জানিয়েছে। পরিচিতরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেছে। সকলের মনের কথা আপনারা বাংলাদেশের মুখোজ্জ্বল করেছেন। আপনারা আপনাদের মুক্তিযোগ্ধারা বাংলাদেশের গৌরব। কেউ সহর্ষ চিৎকারে বলেছেন এসব কথা কেউবা স্মিত হেসে দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করেছেন।

পরের দিনই খবর পাওয়া গেল ঝিকরগাছর যশোহর থেকে পাকিস্তানি বাহিনী পলায়ন পর এবং ভারতীয় বাহিনী ঐ সব অঞ্চলে ঢুকে পড়েছে। পাঁচ তারিখ নাগাদ মুক্তিবাহিনী যশোহরের দখল নিয়ে ফেলেছে পাকিস্তানি বাহিনী যশোর ক্যান্টনমেন্টে অবরূদ্ধ অবস্থায় আত্মসমর্পণ করেছে।

     এদিকে বাসায় একটা ছোটখাটো বিদ্রোহের সূচনা হয়েছে। ছোট ভাই বাচ্চু (আলী আহসান) গোঁ ধরেছে সে তক্ষুনি ঢাকায় চলে যাবে। সবাই দেশে ফিরে যাচ্ছে অতএব। পথঘাট তখনো নির্বিঘ্ন নিরাপদ হয় নি। বহু জায়গায় নিশ্চয়ই যুদ্ধ হচ্ছে। তাছাড়া ফেরী চলছে কিনা কে জানে!

     রাস্তাঘাট ভাঙ্গা, গাড়ি প্রায় চলছেনা কারণ মফস্বলে পেট্রলের অভাব তাছাড়া আইন ও শৃংখলা কতটা আছে কে জানে। বাচ্চু কাঁদতে বসল। ওকে যেতে দিতে পারলাম না বলে দুঃখই হল। গত আটমাস ওর ওপর দিয়ে ঝড়ঝাপ্টা কম যায়নি। প্রত্যেক সপ্তাহে একবার সল্টলেক ক্যাম্প সংলগ্ন রেশনের কেন্দ্র থেকে চাল, ডাল, নুন, তেল পেয়াজ আলু এই সমস্ত আনার কর্ম সারাদিন প্রচন্ড গরম, বৃষ্টি, ঝড় ও কাঁদার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। তারপরে আবার যাত্রী বোঝাই বাসে ঠেলাঠুলি করে উঠা, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝাকুনি খেতে খেতে আসতে হয়েছে। আসতে আসতে অধিকাংশ দিনই বিকেল গড়িয়ে গেছে। ওর বন্ধু বলে কেউ ছিলনা, বিনোদন বলে কিছু ছিল না। এর স্বাস্থ্যগত বিপর্যয়ও গেছে। কলকাতা পৌছিয়েই চোখের ইনফেকশন হল। এটা মহামারীর আকার নেয়। এটাকে স্থানীয় জনসাধারন কৌতুক করে নাম দেয় জয় বাংলা। কয়েক মাস পরে জলবসন্ত দ্বারা আক্রান্ত হল। ও তখন অনিল সরকারের সুপারিশ ক্রমে সায়েন্স কলেজের হোস্টেলে থাকত। সংক্রামক ব্যাধি বিধায় ওকে বেলেঘাটা সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হল। তাতেও কম কষ্ট পায়নি। শেষ পর্যন্ত ওকে ছেড়েই দিতে হল। ষোলই ডিসেম্বর রমনার মাঠে অনুষ্ঠান করে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পন করল। আবুল বলে আমার শ্বশুর বাড়ির পাঠানো একটি লোকের সঙ্গে বাচ্চু সতের তারিখে ঢাকার পথে রওয়ানা হল।

     স্বীকৃতির দুতিনদিন পরই আমার বিভাগের সহকর্মী অমিত রায় চৌধুরীর ছোট বোনের স্বামী তুলসি এক হাড়ি মিস্টি নিয়ে এস হাজির। তুলসী দ্বিজেনেরও এককালীন ছাত্র। তুলসী বাচ্চাদের সঙ্গে বেশ মিশতে পারে। আড়াই বছরের শমীর সঙ্গে তার বেশ খাতির হয়ে গেল, তুলসী যখন শমীকে মিষ্টির মুখ ঢাকা হাড়িটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল: বলতো এর মধ্যে কি আছে? শমী খুব দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করে খুব গম্ভীরভাবে বলল: রসগোল্লা হলেও হতে পারে। প্রতীকি অর্থে খুবই বিচক্ষণ ভবিষ্যৎ বাণী।

     স্বাধীনতার পরে স্রোতের মতো লোক বাংলাদেশ থেকে কলকাতা দেখার জন্য আসতে লাগল। আমার স্ত্রীর ছোটভাই কামার খালি থেকে গিয়ে হাজির। ওর বড় ভাই শহীদ (প্রকৌশলী শহীদুল ইসলাম) তখন আমাদের বাসাতেই। মুক্তিযুদ্ধের সময়টা ওয়াহিদুল ভাই এর নেতৃত্বে পরিচালিত মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী দলে ভিড়ে গিয়ে সারা ভারতবর্ষে মুক্তির গান শুনিয়ে লোকজনদেরকে উজ্জীবিত করেছে। মুক্তির গান নামক তারেক মাসুদের ছবিতে তাকে মুহূর্তের জন্য দেখা যায়।

     বেলেঘাটার বাড়ি যা গত একমাস আনন্দ উচ্ছল ছিল, আত্মীয় স্বজন এবং বন্ধুবর্গের আসা যাওয়া হাস্য পরিহাসে ঝংকৃত হচ্ছিল তা হঠাৎ শূন্য এবং নীরব হয়ে গেল। শহীদ, তৌহিদ, বাচ্চু রশীদুল হক সাহেব, দ্বিজেন সবাই চলে গেছে। আমরা পড়ে আছি।

     যশোর পাঁচ তারিখেই মুক্ত হয়েছিল। কলকাতা থেকে শতশত কিশোর, যুবক, প্রৌড় নির্বিশেষে স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশ মাটি জল আপনফুল দেখতে যশোর যাচ্ছিল। কলকাতা থেকে প্রধানত বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে একটা দল পনেরই ডিসেম্বর তারিখে একটি বাস ভাড়া করে যাওয়ার ব্যাবস্থা করা হল। আমার পরিচিত বন্ধুবর্গ এবং শুভানুধ্যায়ীদের প্রায় সবাই তাতে অংশগ্রহণ করলেন। প্রফেসর অরুন দাশ গুপ্ত, মানসী দাশগুপ্ত, গৌরী আইয়ুব, নবনীতা দেবসেন, ডাক্তার সুনীল দত্ত, গায়ত্রী দত্ত অনেকেই ছিলেন। অনেকের নাম ভুলে গিয়েছি। অর্থনীতিবিদ প্রফেসর আনিসুর রহমান ন্যাপনেতা মুজফফর আহমদ সার্কিট হাউস মাঠে একটি তাৎক্ষণিক জনসভায় বক্তৃতাও করলেন। ভোরবেলা বেরিয়েছি ফিরতে রাত হল। সেই অনুপম নির্ভার আনন্দমাখা স্মৃতি এখনো মনে অনুরণন তোলে বিগত দশমাসের উৎকন্ঠা, ভয়, দুঃখ ও কষ্টের স্মৃতি এক সন্ধ্যায় যেন মন থেকে মুছে গেল।

বললাম বটে যে দুঃখের পর্যায় বুঝি শেষ হল। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথেই পথের মোড়ে দুঃখ দাঁড়িয়েছিল। রওয়ানা হবার মুহূর্তে শুনলাম চিত্রপরিচালক জহির রায়হান তাঁর হারিয়ে যাওয়া বড় ভাই প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক শহীদুল্লাহ কায়সার যাকে কয়েকমাস ধরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলনা তার খোঁজে মোহাম্মদপুর কলোনীতে প্রবেশ করলেন তারপর তিনিও হারিয়ে গেলেন। কে নাকি ফোনে জহীর রায়হানকে বলেছিলেন যে শহীদুল্লাহ কায়সারকে একটি বাড়িতে আটকে রাখা হয়েছে। মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। ড. গোবিন্দদেব, জোতির্ময় গুহঠাকুরতা, মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দর চৌধুরী, সন্তোষ ভটাচার্য, গিয়াস উদ্দিন আহমদ, মুনিরুজ্জামান, আনোয়ার পাশা, ডাক্তার মুর্তজা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হাবিবুর রহমান, আব্দুল কাইয়ুম, প্রফেসর সমাদ্দীর, আলতাফ মাহমুদ এদের কারো মৃত্যুই চোখের সামনে দেখিনি। কিন্তু তাদের মৃত্যু সংবাদ শেলের মত বুক ঝাঝরা করে দিয়েছে। ড. জোহার মৃত্যু চোখের সামনে ঘটেছে। সেই দিনটা ছিল চৈতালী ঘূর্নির ধুসর, রুক্ষ পিঙ্গল আকাশ, উম্মক্ত বিক্ষুদ্ধ বাতাস সারা দিন। সন্ধ্যায় জানাজা হল। রাত নাগাদ স্বাধিকার আন্দোলন বিদ্রোহ ও বিপ্লবের রূপ ধারণ করল।

     রাজশাহীতে ফিরেই খবর পেলাম আমার ছোটবোন ছায়ার স্বামী  জিনুভাইকে চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী হত্যা করেছে। ছায়া মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। ওকে দুইমেয়ে সহ রাজশাহী নিয়ে এলাম। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে এরকম একাধিক লোক  আমার আত্মীয় বৃত্তের মধ্যেই আছে। অসংখ্য মহিলা আছেন যারা পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও তার সহযোগী রাজাকার আল বদর গোষ্ঠীর সদস্যবৃন্দ। তারা সকলে সম্মান ও সহানুভূতির সঙ্গে গৃহীত হননি অথবা তাদের ফেরার কোন আশ্রয় ছিল না।

     বানী আপার ছেলেটির কথা মনে পড়ে অথবা বন্ধুবর হান্নানের স্ত্রীর কথা স্কিংম্ফোফ্লেনিয়ার গোলক ধাধায় হারিয়ে গেছে চিরকালের মতো। তারা কি জানে বিজয় দিবস কাকে বলে? আরো কতশত আছে হাহাকার তাদের তাড়া করে ফিরছে গত পয়ত্রিশ বছর ধরে।

     বিজয় দিবসে তাই আমার আবেগ অত্যন্ত মিশ্রিত। মুক্তিযুদ্ধের গৌরব বোধের উল্টো পিঠেই গভীর গ্লানি ও দুঃখের বোধ। আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহেই গুটিকয় কম্যান্ডোর অসমসাহসিক অভিযান এবং মঙ্গলা এবং চট্টগ্রামে একাধিক যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনার কথা এখনো যখনই মনে পড়ে গর্বে গৌরবে বুক ফুলে ওঠে। হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা যারা কামান গোলাবারুদ নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে এবং পাকিস্থানি সেনাদের নাজেহাল করে দিয়েছে এবং শেষপর্যায়ে ভীত, সন্ত্রস্ত ও পলায়ন পর। মুক্তিযোদ্ধাদের বুদ্ধি, কৌশল, উদ্ভাবনা ও সাহসের বর্ণনা যখন শুনতাম তখন অবাক হয়ে ভেবেছি কি করে এটা সম্ভব হল যারা ঐ সব অপারেশনে প্রাণ দিয়েছে তাদের সংখ্যাতো কম নয়। হাজার দশ বারোতে হবেই। কোন অফিসারের নির্দেশ মোতাবেক ওরা যুদ্ধ করেনি, অত অফিসার ছিলও না। তারা সবাই নিজস্ব মৌলিক উদ্ভাবনা অনুযায়ী আক্রমণের স্থান ও কৌশল নির্ধারণ করে শত্রুর মোকাবেলা করেছে। তাদের সহযোদ্ধারা অনেকেই তাঁদের কারণে জীবিত ফিরতে পেরেছে রণাঙ্গন থেকে। তাঁদের আর ফেরা হয়নি।

     মুক্তি যোদ্ধাদের মাতৃস্বরূপ জাহানারা ইমামের সন্তান রুমির কথা মনে পড়ে। রুমি এবং তার বন্ধুরা কী দুর্লভ মেধা ও প্রত্যয় কী অসমসাহসিক বীরত্বের প্রমাণ রেখে গেছে তাদের অনন্য অভিযানের মধ্যে। যখন কলকাতা বসে শুনলাম যে তারা অফিসার্স ক্লাবের সঙ্গে সন্নিহিত মগবাজার রোড়ের উপরে ইলেকট্রিকস ডিস্ট্রিবিউশন ও কন্ট্রোল রুমটি ধ্বংস করে দিয়েছে সেদিন ঐ অভিযানের দক্ষতা ও যুদ্ধক্ষমতায় হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু বাড়ির এত কাছে থেকেও তারা আর বাড়ি ফিরতে পারেনি। সমস্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মতো তাদেরও মনের পর্দায় চকিতে দেখা দিয়েছে প্রিয়জনের বেদনার্ত মুখ। ছেড়ে আস অপেক্ষমান মার সঙ্গে দেখা হবে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে, মা তাদের জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলবেন এই সব খন্ড খন্ড স্বপ্ন বুকে নিয়ে তারা মৃত্যুর উপত্যকা পার হয়ে গেছে দৃপ্ত পায়ে অপর পারের অন্ধকারের অতল স্তব্ধতায়। তারা ফেরে নাই এই হাহাকার ধ্বনিত হয়েছে হৃদয় থেকে হৃদয়ে, কাল থেকে কালে। তাদের স্বপ্ন স্পর্শিত মৃত্যুর বিনিময়ে তারা আমাদের জন্য রেখে গেছে এই স্বাধীন দেশ। সেই সব অনন্য যুবকদের, মহিলাদের আমরা ভুলে গেছি ভুলে গেছি তাদের আত্মদান, তাদের ভালবাসা, তাদের প্রিয়জনের সান্তনাহীন রোপণ।

নিউ ইয়র্ক।

 

মন্তব্য:
Bhajendra Barman   December 31, 2009
We are thankful to Professor Ali Anwar for writing this article. This is indeed a true reflection of our past.
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.