Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  মূল রচনাবলীঃ  ||  ৯ম বর্ষ ৯ম সংখ্যা পৌষ ১৪১৬ •  9th  year  9th  issue  Dec 2009 - Jan 2010  পুরনো সংখ্যা
একাত্তরেরই মুক্তিযোদ্ধা Download PDF version
 

বিজয় দিবস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা

একাত্তরেরই মুক্তিযোদ্ধা

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত

এক.

            জলে-জঙ্গলে, অন্ধকারে বারুদ আর আগুনে ভরা লড়াইয়ের মাঠে জীবন বাজি রাখা সেই মুক্তিযোদ্ধাদের ঠিক পাশে আসলেই তো আমরা দাঁড়াতে পারিনিআমরা, যারা একাত্তরে বিদেশে ছিলাম, এবং সেখানে থেকেই মুক্তিযুদ্ধে সাফল্যের জন্যে, বাংলাদেশ সম্ভব করার জন্যে যা পারা যায় করেছি, একথা মনে রাখি এবং আমরাও মুক্তিযোদ্ধাসগৌরবে বলা যায় কিনা এ নিয়েও ভাবিযদিও প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধাএ-রকম একটি পরিচয়ে কখনো কখনো চিহ্নিতও হয়েছি আমরাতবুও বারবার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রস্তুতকালে আমাদের কথা কারো মনে পড়ে কিনা এমন সন্দেহ মন থেকে সরে নাবিশেষত, যখন দেখি, বাংলাদেশের সীমানার ঠিক বাইরে থেকে যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছেন, ঠিক লড়াইয়ের আসল ময়দানেও নয়, তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা বলে বিবেচিত হনতখন আমাদের দিকে নজর না- পরার কারণ ঠিক বুঝি না

এজন্যেই একাত্তর সালের কিছু কথা, বিদেশে, আমার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্যে আমাদের কর্মকাণ্ডর কিছু কথা আর একবার বলা যাক যাতে আমরাও মুক্তিযোদ্ধা এ-কথা যেনো সগৌরবেই বলতে পারি

 

দুই.

            একাত্তরের সেই মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আমরা ফিলাডেলফিয়া শহরে ছিলামযদিও এইখানে আমি বলতে পারি যে, আসলে কেউ আমরা তখন ঐ স্থানে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐ শহরে আবদ্ধ ছিলাম নাসমস্ত বোধ ও অস্তিত্ব নিয়ে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে অন্য জনপদের অযুত মানুষের সঙ্গে জন্মভূমি স্বাধীন করার মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত ছিলামকিন্তু হায়, ওয়াশিংটনে ক্যাপিটলের সামনে মৌন সমাবেশ, ফিলাডেলফিয়ার জাহাজঘাটে পিকেটিং, বাল্টিমোর বন্দরে পাকিস্তানী সামুদ্রিক পোত অবরোধ অথবা নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সামনে বিক্ষোভ কি মিছিলে শতঘণ্টা খরচ করলেও কেউ আমরা জলে-জঙ্গলে, অন্ধকারে, অনাহারে, শৈত্য-তাপেপীড়িত সেই মুক্তিসেনার মৃত্যুযন্ত্রণার অংশভাক তো আসলেই হতে পারিনিতবুও মনে হয়, রাত্রির অন্ধকারে পথ চলার উপায় না-থাকলে অনেক দূরের ক্ষীণপ্রভ তারা রাত্তিরে যেমন যথাসাধ্য আলো দেয়ার চেষ্টা করে, আমরাও তেমনি করেছিলাম

            আরও কিছু বলার থাকেযুক্তরাষ্ট্রের এক শহর থেকে আর এক শহরে ছুটে বেড়ানো; সভাসমিতি, মিছিল, অর্থসংগ্রহ, সেদেশে জনমত গঠন, রাজনৈতিক নেতাদের সমর্থন আদায়ের জন্যে তাদের সঙ্গে দেখা করা; স্কুলে, কমিউনিটি সেন্টারে, পথসভায় স্বাধীন বাংলাদেশের কথা বলা; এমনি করে মার্চ থেকে ডিসেম্বর নমাস কেটেছিল আমাদেরতখন মনে হয়েছিল অনন্তকাল যেনো কোন এক ঘোরের মধ্যে, দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে হেঁটে চলেছিআমরা যারা ছাত্র ছিলাম তখন, ক্লাসে যাইনি; চাকুরিজীবী যারা, কর্তৃপক্ষের করুণা প্রার্থণা করে অফিস কামাই করেছিআমি নিজে মাস্টার্স ডিগ্রীর থিসিস লেখা ঠিক নমাসই পিছিয়ে দিয়েছিলাম; সেই সব কথা খুব নীচু স্বরে হলেও বলার দরকার আছে বোধ হয়

            আমি তখন ফিলাডেলফিয়ার টেম্পল ইউনিভার্সিটিতে আমার স্ত্রী পূরবী মেডিক্যাল কলেজ অব পেনসিলভ্যানিয়াতে মাস্টার্স শেষ করার মুখেসুলতান আহমদ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভ্যানিয়াতে পি.এইচডি-র ডিসার্টেশন লেখায় ব্যস্ত; তাঁর স্ত্রী সুফিয়াও ছাত্রী ছিলেন মনে পড়ে; সুলতানের ভাই আজাহার টেম্পলএ পড়তে এসেছিলেন; আমাদের নেতা মজহারুল হক, পেশায় ইঞ্জিনিয়ার এবং তাঁর স্ত্রী ফরিদা হক থাকতেন ফিলাডেলফিরার পাশেই নদীর ওপারে; মোনায়েম চৌধুরি টেম্পল-এ পি.এইচডির পাঠ্যক্রম শেষ করছিলেন, তাঁর স্ত্রী রওশন আরা সদ্য চাকুরি শুরু করেছিলেন; মমতাজউদ্দিন আহমদও ছিলেন টেম্পল ইউনিভার্সিটির ছাত্রতিনিও সস্ত্রীক থাকতেন ফিলাডেলফিয়ায় আর ছিলেন নূরুল ইসলাম ভূঁইয়াতাঁর পি.এইচডি ঐ সময়ে প্রায় শেষদেশে ফিরবেন বলে গাড়ি কিনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেনঢাকার বিখ্যাত চিকিৎসক ড. আলমের কন্যাদ্বয় সুলতানা ও নাজমা আলমও তখন ফিলাডেলফিয়ায়আরও একজন দুজন বাঙালী ছাত্রও তখন ছিলেন শহরে অল্প সময়ের জন্যেউনিশ শো একাত্তরে ফিলাডেলফিয়ায় এই তো আমরা কজন, এবং আমাদের একটি দুটি পুত্রকন্যাআর পশ্চিম বাংলার নূরুল ইসলাম সরকার ও বাবেয়া সরকার, ড. বিশ্বনাথ মুখার্জী ও মনীষা মুখার্জীর মত কিছু সহানুভূতিশীল বন্ধুবান্ধবপর্বত নড়ানো আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না, তবুও তাই আমরা করতে চেয়েছিলাম

            পঁচিশে মার্চের সেই কালরাত্রির কথা প্রথম বহির্বিশ্বে পৌঁছার সময়েই আমি শুনেছিলামটেম্পল-এর সাংবাদিকতা বিভাগে গ্র্যাজুয়েট এ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে দিনের প্রথম কাজ আমার ছিল নিউজ ল্যাবোরেটরিতে ঢুকে টেলিপ্রিন্টারটি চালিয়ে দেয়াছাব্বিশে মার্চের সকালে আমি তাই করেছিলামসেটি চালিয়ে দিয়ে বেরিয়ে আসছি যখন ঠিক তখন টেলিপ্রিন্টারের ঘন্টার অনবরত শব্দে দ্রুত ফিরে গেলাম মেশিনের সামনেখটখট শব্দে ক্রমাগত ছাপা হতে থাকা হলুদ কাগজের মাথায় ফেলে আসা প্রিয় শহরের নাম দেখে বিস্মিত ও পরমুহূর্তে চমকে উঠেছিলামএ অভাবিত খবর কি বিশ্বাস হয়! রাতের অন্ধকারে দেশের বাইরে পালিয়ে আসা বাঙালি প্রতিবেদকের বয়ানে যে খবর আসছিল তখন, খণ্ডে খণ্ডে, সে খবর স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে পড়া সম্ভব ছিল নাশহরের বিভিন্ন স্থানে আগুনের আভা, গুলির শব্দ, সাঁজোয়া গাড়ীর যাতায়াত কি করে বিশ্বাস করা যায় যখন ভেবেছি আর কদিন পরেই বাঙালী তার বিজয় পতাকা ওড়াবে?

            আমি পূরবীকে ঘরে ফোন করে পেলাম নাল্যাবোরেটরিতে খবর দিয়ে তাকে স্তম্ভিত করে রেখে টেলিফোন করেছিলাম সুলতান আহমদকেএকবার নয় কয়েকবারের চেষ্টার পর তাঁকে পেয়েছিলামযে খবর তখনো রেডিও-টেলিভিশনে যায়নি, সে খবর শুনে সুলতানের পক্ষেও বিশ্বাস করা কঠিন হয়েছিল

            বিকেলে আমি ও পূরবী সুলতানের বাসায় গিয়েছিলামততোক্ষণে অন্ধকারে মোড়া আগুনে ঝলসানো ঢাকার খবর সবাই জানতে শুরু করেছেনসুলতান আহমদ, মজহারুল হক, মোনায়েম চৌধুরি ও অন্যান্যদের সঙ্গে কথা বলে ওয়াশিংটনে টেলিফোন করেছিলাম এনায়েতুর রহিমকেসম্ভবত তার দুদিন পরেই ওয়াশিংটনে যাই আমরা ক্যাপিটল হিলে বাংলাভাষী এক জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রথম সমাবেশে যোগ দিতে

            নিউইয়র্কে পাকিস্তান কনস্যুলেটের সামনে বিক্ষোভ ও মিছিল করে জাতিসংঘে যাওয়া তার পরেই ঘটেসেদিন সকালে নিউইয়র্ক টাইমস্’-এ কি লিখেছিল তখনও পড়িনিফারুকুল ইসলাম আমায় বলেছিলেনঢাকা ছাড়ার পরে সেই প্রথম তাঁর সঙ্গে দেখাপিতৃস্নেহে যিনি আমাকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন সেই ড. গোবিন্দচন্দ্র দেবও যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিহত অধ্যাপকদের তালিকায় আছেন এই খবর সত্য না-ও হতে পারে, শচীদুলাল ধর এ কথা বলেছিলেন সম্ভবত আমার মুখ দেখেই

            পূরবী দূর থেকেই আমাকে দেখে কিছু বুঝেছিল নিশ্চয়ই! হয়তো তাই সেই মুহূর্তে আমার ফিলাডেলফিয়রা ফিরে যাওয়ার ইচ্ছায় সে বাধা দেয়নিমমতাজউদ্দীনের সঙ্গে ফিলাডেলফিয়া ফিরে আসার পথে আমি নিউইয়র্ক টাইমস্-এ কি লিখেছে বলেছিলাম

            পাকিস্তানী এক মালবাহী জাহাজ থেকে নেমে ফিলাডেলফিয়া শহরে ঢুকে পড়েছিলেন কয়েকজন বাঙালী নাবিকআর জাহাজে ফিরে যাবেন না বলে ইমিগ্রেশনের শরণাপন্ন হয়েছিলেন তাঁরা। (পাকিস্তানী ঐ জাহাজ সামরিক উপকরণ নিয়ে যাচ্ছিল বলে খবর ছিল।) কিন্তু ব্যাপারটি অতো সহজে ঘটেনিঐ জাহাজীরা শহরে নেমেছিল আমাদেরই ভরসায়মোনায়েম চৌধুরি নিজের বাসায় তাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন বেশ কিছুদিন

            পাকিস্তানী ঐ জাহাজের সঙ্গে আমরা প্রথম মুখোমুখি বাল্টিমোর বন্দরেঐ জাহাজীদের সঙ্গে দেখাও হয় সেখানে, সাময়িক বিশ্রামের জন্য মাটিতে নেমে এলে ফিলাডেলফিয়ায় একেবারে নেমে আসার জন্যে তখনই তাঁদের বলা হয়আমরা বাল্টিমোরে গিয়েছিলাম ঐ জাহাজকে বন্দরে ভিড়তে দেবো না বলেএই ব্যাপারটি কি করে সম্ভব হতে পারে ঠিক না-বুঝলেও যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল ঐ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তার অভিনবত্বের কথা আজ ভাবলেও অবাক লাগেসত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সামান্য প্রতিবাদও যে আমিত শক্তিময় হতে পারে অমন আগে কখনও বুঝিনি

            বাল্টিমোরে পাকিস্তানী জাহাজ অবরোধের মূল ভূমিকায় আমাদের সঙ্গে ছিলেন ফিলাডেলফিয়ার কোয়েকার সম্প্রদায়ের শান্তিবাদীরাপেনসিলভ্যানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক চার্লস কান (বর্তমান বাংলাদেশ সংসদ ভবনের স্থপতি লুই কান-এর ভ্রাতুষ্পুত্র) তাদের অন্যতম নেতা, একটি ছোট ডিঙ্গীনৌকা বেঁধে নিয়েছিলেন তাঁর গাড়ীর মাথায়কোয়েকারদের অন্যান্য নেতারাও  ছিলেন, ছিলেন অনেক কর্মী, ডিক টেইলর (এই বাল্টিমোর অবরোধের ওপরেই তাঁর লেখা ব্লকেডনামে গ্রন্থটি পরে প্রকাশিত হয়) ও বিল ময়্যারতাঁদের সঙ্গে ছিল একটি রাবারের ভেলাসেই ডিঙ্গি আর ভেলা নিয়ে সমুদ্রগামী জাহাজ থামানোর চেষ্টা কেবল হাস্যকরই নয়, বিপদজনকও নিশ্চয়ই ছিলপোতাশ্রয়ের জলে নেমে বেশিদূর যেতে পারেন নি তাঁরাকোস্টগার্ড তাঁদের গ্রেফতার করেছিলেনবাল্টিমোরের সেই জাহাজকে আমরা আবার আটকে দিয়েছিলাম ফিলাডেলফিয়াতে লংশোরম্যানদের সাহায্য নিয়েইফিলাডেলফিয়ার ডক শ্রমিকরা আমাদের পিকেট লাইন পার হয়ে জাহাজে মাল তুলতে যখন অস্বীকার করেন তখন আমাদের মনে হয়েছিল বিজয় বুঝি আর দূরে নেইচার্লস কান তাঁর সম্প্রদায়ের উৎসাহী কর্মী ও নিজের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে নিয়ে আমাদের আন্দোলনে যোগ দেন

ফিলাডেলফিয়ার কোয়েকার সম্প্রদায়ের কর্মীরা আমাদের সঙ্গে যোগ দেন ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের মানুষের ওপরে পাকিস্তানী নৃশংসতার প্রতিবাদেএই উদ্দেশে তাঁরা যে সমিতি গঠন করেছিলেন তার নাম দিয়েছিলেন ফ্রেন্ডস্ অব ইস্টবেংগলসত্যাগ্রহে তাঁদের বিশ্বাস, শান্তি প্রতিবাদে তাঁদের আস্থা যে আদৌ অবহেলার নয় বুঝেছিলাম যখন ডিঙ্গি আর ভেলা নিয়ে জাহাজ আটকানোর সচিত্র খবর ছাপা হয়েছিল বাল্টিমোর সান’-এর মতো খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায়ছাপা হয়েছিল আরো অনেক কাগজেওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসের সামনে, লাফিয়েত স্কোয়্যারে সিমেন্টের পাইপের মধ্যে বাস করে তাঁরা পূর্ববাংলার উদ্বাস্তুদের দুর্দশার কথা বলতে চেয়েছিলেনসেই সিমেন্টের পাইপ দিয়ে তৈরি নকল উদ্বাস্তুদের গ্রামের ছবি সারা পৃথিবীর কাগজে ছাপা হয়েছিল, টেলিভিশনে দেখানো হয়েছিল

            চার্লস কান বাঙালী নাবিকদের জন্যে, অবিশ্বাস্য পরিশ্রম করেছিলেন তাদের এ্যাসাইলাম-এর ব্যবস্থা করতেফিলাডেলফিয়ায় লন্ডন থেকে প্লেনে লুকিয়ে থাকা এক বাঙালী তরুণ ধরা পড়েছিল, চার্লস কান অপত্যস্নেহে তাকে নিজগৃহে আশ্রয় দেনঐ সময় ফিলাডেলফিয়ায় আমরা তাঁর মতো অনেক শান্তিবাদীকে পাশে পেয়েছিলাম বলেই অনেক কিছু করা সম্ভব হয়েছিল কিন্তু ঐ সামান্য কজন বাঙালীর চোখে প্রতিজ্ঞার আগুনও যে , কোয়োকারদের চোখে এড়ায়নি এও তো নিশ্চিতফিলাডেলফিয়ার কাগজে, রেডিওতে, টেলিভিশনে আমাদের কর্মকাণ্ডের কথা যে নিয়মিত বলা হত তা দেশের ঘটনার বিশালতার জন্য নিশ্চয়ই, কিন্তু কর্মীদের কর্তব্যনিষ্ঠাও সেখানে গৌণ ছিল নাআমি নিজেও একবার ফিলাডেলফিয়ার সিবিএস টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলাম

            সভা-সমিতি, বিক্ষোভ, মিছিল, সেনেটর-কংগ্রেসম্যানদের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের সমর্থন আদায়, তাঁদের কাছে চিঠি লেখা, এই সবই আমরা করেছিকিন্তু তখনই আমরা জানতাম দেশের জন্যে আরো বেশি কিছু চাইঅর্থও চাইবিচিত্রানুষ্ঠান করে টাকা তোলা, জর্জ হ্যারিসনের কনসার্ট ফর বাংলাদেশের টিকেট বিক্রি, বিভিন্ন শপিং সেন্টারে স্টল বানিয়ে নানারকম ঘরে তৈরি খাবার আর বাংলার উপহার সামগ্রী বিক্রি করা, ছোট ছোট স্মারকের বিনিময়ে টাকা তোলা সবই করেছিফিলাডেলফিয়া শহর ও তার কাছাকাছি নানা স্কুলে কমিউনিটি সেন্টারে স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে বলেছি বাংলাদেশ-এর কথা

            চার্লস কান-এর ছাত্রী জুডি বার্নস্টাইনের সঙ্গে আমি গিয়েছিলাম ওয়াশিংটনে যে কজন কংগ্রেসম্যন সেনেটরদের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব, করতেবঙ্গপ্রেমিক ডেভিড নলিন-এর একটি অফিস ছিল ওয়াশিংটনেনলিন সিয়াটোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, ঢাকার কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরির সুবাদেতাঁর অফিসে বসেই খবর পেয়েছিলাম কজন বুদ্ধিজীবী এসেছেন ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানে সব ঠিক আছে,’ এই কথা বলার জন্যেহামিদুল হক চৌধুরীও ছিলেন সেই দলেআমি অবজার্ভার-এর প্রাক্তন সাংবাদিক এই সুবাদে তিনি যদি আমার সংগে দেখা করেন আশায় পাকিস্তান দূতাবাসে টেলিফোন করেছিলাম নিউইয়র্কে তাঁর ঠিকানার জন্যে তখনো দূতাবাসে কর্মরত বর্তমান অর্থমন্ত্রী এ.এম.এ. মুহিতকেতাঁর সঙ্গে বাক্যালাপকালে কোন পরামর্শের জন্য টেলিফোনের মূখ ঢেকে আমি জুডি ও নলিনের সঙ্গে বাংলায় কথা বলতে শুরু করিআমি যে কোন্ ঘোরের মধ্যে আছি তাঁরা হয়তো বুঝেছিলেন

            হামিদুল হক চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর হোটেলে দেখা করেছিলাম ড. পল সোয়ানসনকে সঙ্গে নিয়েড. সোয়ানসন এক সময়ে মিনিয়াপোলিস স্টার-ট্রিবিউন’-এর সম্পাদক ছিলেন, টেম্পল-এ ছিলেন আমার শিক্ষকঐ সময়ে তিনি টেম্পল ছেড়ে ইন্টারআমেরিকান প্রেস ইনস্টিটিউট পরিচালকের দায়িত্ব নিয়েছিলেনএখনও আমি জানি না, নলিন কেন আমাকে একা চৌধুরীর কাছে যেতে মানা করেছিলেন

            ঐ একই দিন সন্ধ্যায় চৌধুরীর সঙ্গে আবার দেখা হয়েছিলএবার সঙ্গে ছিলেন নিউইয়র্ক-এর দশ-পনেরোজন বাঙালীড. খোন্দকার আলমগীর ছিলেন আমাদের সামনেচৌধুরীর ঘর থেকে বেরিয়ে দুপুরে আমি বিটস অব বেঙ্গলরেস্তোঁরায় গিয়ে হামিদুল হক চৌধুরীর ঠিকানা দিয়ে এসেছিলামকোন সাহসে আপনারা এমন কাজ করতে এসেছেন?’ নিউইয়র্কের উত্তেজিত বাঙালী তরুণদের প্রশ্নের জবাবে চৌধুরী বলেছিলেন, ‘তোমরা কিছুই বুঝছো না, ভারত আমাদের নিয়ে নেবেসম্ভবত ঐ বছর সেই আমার শেষ নিউইয়র্ক যাওয়া

            অক্টোবরের শেষ দিকে জাস্টিস আবু সাঈদ চৌধুরী ফিলাডেলফিয়াতে এসেছিলেনতাঁর সঙ্গে এম. আর. সিদ্দিকীও ছিলেনমজহারুল হক-এর বাড়িতে ঘরোয়া বৈঠকে আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘ড. দেব আমেরিকা থেকে ফিরে যাবার এক মাসের মধ্যেই সব ঘটলোআপনারা কিছুই বুঝতে পারেননি?’ প্রায় কাছাকাছি সময়ে ড. এ. আর. মল্লিক এসেছিলেন ফিলাডেলফিয়ায়বাঙালীদের এক সভায় আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আমাদের এই অবস্থায় দেশ কবে স্বাধীন হবে? তিনি বলেছিলেন, ‘নভেম্বরের দিকে সেই আশ্চর্য ঘটনা ঘটবে, নিশ্চিত থাকুন

            নভেম্বরের শেষেই আমি শিকাগো চলে যাই, পূরবীকে ফিলাডেলফিয়ায় রেখেইইউনিভার্সিটি অব শিকাগো আমাকে যে বৃত্তি দিয়েছিল, তা শুরু হবার কথা ছিল সেপ্টেম্বরেইদুমাস দেরী করে ফেললেও ড. এডওয়ার্ড ডিমক ও ড. ক্লিন্ট সীলি আমাকে শিকাগো চলে আসতে বলেছিলেন

            শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কুল অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ ও বিশ্ববিখ্যাত বাঙালী স্থপতি এফ. আর. খানকে কেন্দ্র করে সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন দানা বেঁধেছিলঐ উদ্দেশ্যে যে সংগঠন তাঁরা করছিলেন শামসুল বারি ছিলেন তার সম্পাদকতৎকালে বাংলাদেশ আন্দোলনে যারা অংশ নিয়েছিলেন তাঁরা সবাই বারিকে চিনতেন তার কর্মক্ষমতার জন্যেডিসেম্বরের সেই যুদ্ধের খবর শিকাগোতে বসেই পড়েছিশামসুল বারি তখন শিকাগো ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন মিনিয়াপোলিসেছিলেন আইনুল হকহক সাহেবকে শিকাগোর লোকজনের বাইরে বড় কেউ চিনতো নাকিন্তু শুনেছি তাঁর বাসায় ঐ নয় মাসে কয়েকশত লোকের রাত্রিবাস ঘটেছিলহক সাহেবের মতই ছিলেন জগন্নাথ হলের ছাত্র ড. জ্ঞান ভট্টাচার্যআটষট্টি সন পর্যন্ত তিনি ফিলাডেলফিয়ায় ছিলেন, তার পর চলে যান ওহাইয়োর মায়ামি ইউনিভার্সিটিতেছোট শহর অক্সফোর্ডে তিনি প্রায় একাকী বাংলাদেশ আন্দোলনকে সেখানকার জনগণের কাছে তুলে ধরেছিলেন খবরের কাগজ, রেডিও-টেলিভিশনের মাধ্যমেকেবল মধ্য-আমেরিকা নয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব জায়গায় তিনি ছুটে গেছেন ঐ-সময় সভায় মিছিলেতাঁর স্ত্রী বলেছিলেন, সারা দিন গাড়ি চালিয়ে শিকাগো থেকে ফিরে এসে নিউইয়র্কে মিছিলের কথা শুনে তক্ষুণি বিছানা ছেড়ে তিনি রাস্তায় নামেনঅসুস্থ স্ত্রীকে ফেলে আসা যায় না বলে তাঁকেও সঙ্গে নিয়ে সারারাত গাড়ি চালিয়ে ভোরে তিনি নিউইয়র্ক পৌঁছেনঐ অবস্থায়ই একাত্তরের ষোলই ডিসেম্বর এসেছিল

            বহুকাল পরে মজহারুল হকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল ওয়াশিংটন, প্রথম বাংলাদেশ সম্মেলনে

            তাঁর স্ত্রী ফরিদা হক আজ প্রয়াতড. সুলতান আহমদ ও ড. ভুঁইয়া ওয়াশিংটনেই আছেন বলে জানিড. মোনায়েম চৌধুরি ও রওশন আরা চৌধুরিও থাকেন ফিলাডেলফিয়ার কাছেইড. এনায়েতুর রহিমও ছিলেন তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ওয়াশিংটনেআইনুল হক কয়েক বছর আগে দেশে এসেছিলেন বেড়াতে আর ফিরে যান নিদেশের মাটিতে মিশে গেছেনতাঁর সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল টেক্সাসের এক ছোট শহরে সেখানকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাতিনি আমাদের বাসায়ও এসেছিলেন যখন আমরা টেক্সাসের ফোর্টওয়ার্থ-ডালাস অঞ্চলে ছিলামশামসুল ও তাঁর স্ত্রী সুপ্রিয়া বহুকাল বিদেশে বাসের পরে ঢাকায় ফিরেছেনড. এফ. আর. খান লোকান্তরিতনাজমা আলম এখনো ফিলাডেলফিয়াতেসুলতানা আলম দেশে ফিরে ফরিদপুরের রাজবাড়িতে জনকল্যাণমুখী এক প্রতিষ্ঠান গড়ার কাজে মন দিয়েছেনতাঁর সঙ্গে মাস দুয়েক আগে নিউইয়র্কে দেখা হয়েছিল তিনি সেখানে বেড়াতে গেলেমমতাজউদ্দিন পেনসিলভ্যানিয়ার কোন এক কলেজে অধ্যাপনা করেন বলে শেষ শুনেছিড. জ্ঞান ভট্টাচার্য এখনো অক্সফোর্ডেআমি ও পূরবী গত প্রায় কুড়ি বছর ধরেই কখনো ঢাকা কখনো নিউইয়র্কে

            দেশপ্রেম অন্ধ, প্রতিদানের অপেক্ষাহীনস্বদেশের ছবি সব প্রবাসীর হৃদয়ে চিরউজ্জ্বলঐ একাত্তরে ফিলাডেলফিয়া, ওয়াশিংটন, শিকাগো, নিউইয়র্ক কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যখানে যে সব বাঙালী বাংলাদেশের স্বপ্নে অন্ধকারের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাঁদের প্রায় অধিকাংশই স্বাধীনতার পরে দেশে ফিরে আসেননি, একমাত্র বেড়াতে আসা ছাড়াকোন পুরস্কারে আশাও তাঁদের ছিল না, এখনও নেইকেবল তাঁরাও যে মুক্তিযোদ্ধা এটুকুই তাঁদের জানার আছে

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.