Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  মূল রচনাবলীঃ  ||  ৯ম বর্ষ ৯ম সংখ্যা পৌষ ১৪১৬ •  9th  year  9th  issue  Dec 2009 - Jan 2010  পুরনো সংখ্যা
১৯৭১: ঘটনাপুঞ্জি Download PDF version
 

বিজয় দিবস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা

১৯৭১: ঘটনাপুঞ্জি

 

বেলাল চৌধুরী

 

     দীর্ঘ ৩২ বছরের মধ্যে শুধু সিকি শতাব্দই নয় পুরো একটি শতাব্দ যেমন কালপ্রবাহে গলধঃকরণ হয়ে, নতুন শতাব্দীতে গিয়ে পড়েছে তেমনই প্রবহমান ২য় সহস্রাব্দ ও দুস্তর ও ঘটনাবহুল পথ পাড়ি জমিয়ে ৩য়র ঘরে এসে কালের যাত্রা শুরু করে দিয়েছেএই সময়ের ভেতর বিশ্বের শতসহস্র নদীগুলির সঙ্গে বাংলাদেশের নদীগুলি দিয়েও যেমন বয়ে গেছে অনেক জল, তেমনই আকাশেও চলেছে ঘনকালো মেঘ তার দুর্যোগের ঘনঘটাকখনও রাজনৈতিক, কখনও ষড়যন্ত্র আর চক্রান্তেরতখন থাকি আমি কলকাতায়পার্ক সার্কাসে ৪ নম্বর সোহরাওয়ার্দি এভেনিউর চার তলার ফ্ল্যাট বাড়িতে যার মালিক ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের ঘনিষ্ট সহচর কলকাতা কর্পোরেশনের প্রথম মুসলমান নির্বাহী আবদুল রশীদ খান

     সেই বাড়িরই চার তলার ফ্ল্যাটে থাকতেন কর্পোরেশনের স্কুলের মধ্য ষাটোত্তীর্ণ মিসেস মোদক যাকে আমরা সবাই নানী বলে সম্বোধন করতামসবকিছু ছাপিয়ে নানীর বড় পরিচয়, পঞ্চাশের দশকে বাংলার সাংস্কৃতিক জগতে প্রথমে রশীদ আহমদ চৌধুরী নামে যে সুদর্শন যুবা পুরুষটির উত্থান সবাইতে চমকে দিয়েছিল পরবর্তী সময়ে সেই তিনিই বুলবুল চৌধুরীতে রূপান্তরিত হয়ে চমৎকৃত করেছিল তিনি ছিলেন তারই শ্মশ্রুমাতাতারই জ্যেষ্ঠ কন্যা প্রথমে প্রতিভা মোদক পরে বুলবুল চৌধুরীর সঙ্গে পরিণয় সূত্রে তার মর্মসঙ্গিনী হয়ে আফরোজা বুলবুল হয়েছিলেননজরুলের পর এমন বর্ণাঢ্য চরিত্র বাংলাদেশে আর দুটি দেখা যায় নিবুলবুল চৌধুরী প্রথমে সাহিত্যের পরে গতিপথ বদলে নৃত্যে আবির্ভূত হয়েই যে এলেন দেখলেন জয় করলেন সে কথা তো আজ ইতিহাসের অন্তর্গতদুই বাংলাতেই সমান লোকপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন তিনিতার উত্থান এবং প্রস্থান ছিল ধুমকেতুর মতোইঅকালমৃত্যু এসে মাঝপথে যতি না টানতো আজ শুধু তার নামের স্মৃতিবহনকারী ঢাকার বুলবুল একাডেমী শিবরাত্রির সলতের মত একমাত্র অভিধায় টিমটিম করে জ্বলত না

     এখানে অবশ্য অন্য প্রসঙ্গঐ যে নানীর কথা বলছিলাম তিনি চার তলার দুই ঘরের ফ্ল্যাটে একা থাকতেন বলে কলকাতার রীতি অনুযায়ী একটি ঘর সাবলেট দিয়েছিলেনতাতেই ছিল তখনকার আমার আশ্রয়ী ডেরাআর মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে, ঘরের পাশের আর্শিনগর কলকাতা সম্পর্কে যাদের সামান্যতম ধ্যান-ধারণা আছে তারাই জানেন একেবারে গায়ে লাগা বাড়িটি ছিল খোদ সোহরাওয়ার্দি সাহেবদেরপরে বাড়িটি ভাড়া নেয় পাকিস্তান সরকার কলকাতায় তাদের উপ-হাইকমিশনারের বাসস্থান হিসেবেরীতি অনুযায়ী বাড়িটিতে সে দেশের পতাকা ওড়ানো হত প্রতিদিনআমার ঘরের জানালা দুটি ছিল বেশ বড়সড় এবং দুই পাল্লারসেখানে থেকে দেখা যেত লাগোয়া বাড়িটির অর্থাৎ পাশের বাড়ির দুটি চিলেকোঠাসহ বেশ প্রশস্ত একটি ছাদযেখানে আমি মুক্তিযুদ্ধের নমাস ধরে কত যে মানুষ কত যে ঘটনা ও দৃশ্যের অবতারণা হতে দেখেছি সবিস্তারে লিখলে রুদ্ধশ্বাস নাটককেও হার মানাতে বাধ্য

     কলকাতা পর্বে আমার বদলে আমাদের বলাই ভাল অর্থাৎ কাজ তো খই ভাজাঅলাদের একটা প্রধান আড্ডাস্থল ছিল কলেজ স্ট্রীট মানে লেখাপড়ার পাড়ার কফি হাউসকফি হাউস খুলত সকাল নটায় আর বন্ধ হত রাত নটায়এমনও দিন গেছে সিঁড়ির গোড়ায় বসা দেখতে বিহারী মনে হলেও আসলে কিন্তু খাস নোয়াখাইল্যা ইসমাইলের কাছে দুই কি তিন প্যাকেট চার্মিনার অবশ্যই বাকিতে নিয়ে সেই যে সকালে একবার ঢুকেছি তারপর সারাদিন যে কিভাবে কেটে গেছে বলা বেশ কঠিনকফির পর কফি, তাও আবার ইনফিউশন অর্থাৎ কালো কফি, পাকোড়া, চার্মিনার আর অফুরন্ত তর্ক-বিতর্ক, এ টেবিল থেকে ও টেবিলে শুধু শিল্পী, সাহিত্যিক, লেখকই নয় সিনেমার নায়ক থেকে পাড়ার উঠতি কচি মাস্তান, আড্ডাবাজ, নাটকপাগল, রেসুড়ে, জ্ঞানপাপী তাপী কত যে লোকের সঙ্গে কারণে-অকারণে বকর হত তার কোনও সীমা সরহদ্দর নেই

     এরকমই একদিন ১৯৭১-এর মার্চের গোড়ার দিকে সেই কফি হাউসে গিয়ে দেখি কিছু নতুন মুখের ভিড়কি রকম যেন ভয়ার্ত আর হকচকানো ভাবসাবকফি হাউসের বেয়ারাদের সঙ্গেও আমাদের এমন একটা হার্দিক সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল যে, তারাও ছিল আমাদের পকেটের জোয়ার-ভাটার নিত্য সহচরতাদের আবদার নালিশ, পারিপার্শ্বিক খবরা-খবর সবই অকুণ্ঠচিত্তে আমাদের সঙ্গে বিনিময় বা আদান-প্রদান হতসাধারণত প্রতি শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই নতুন নতুন মুখের আমদানী দেখা যেতইউনিভার্সিটি, প্রেসিডেন্সী কলেজ, হিন্দু কলেজ সবই তো এই একই পাড়ায়এছাড়া বিদ্যাসাগর, সুরেন্দ্রনাথ তো বলতে গেলে ঢিল ছোঁড়ে দূরত্বেনতুন মুখের সমাগম ঘটত আসলে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, শুভেন্দু, শমিত ভক্তদের টানেওদের কৌতূহলী চোখ দেখলেই টের পাওয়া যেত ব্যাপারটাবাহাদুর, রামু, শাহাব উদ্দিনদের মুখেই শোনা গেল এরা এসেছে পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রাণ ভয়ে পালিয়েপঁচিশ তারিখ রাত্রে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে অতর্কিত বর্বর হামলা চালিয়েছে তা নাকি ইহুদী নাৎসীবাদের নৃশংসতাকেও হার মানায়দিশাহারা মানুষ যেদিকে দুচোখ যায় সেদিকেই ছুটতে শুরু করেছে  সীমান্তবর্তী মানুষদেরই সুবিধা বেশিক্যাচকলে আটকেছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর অভ্যন্তরস্থ মানুষেরাসে এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় দিন কেটেছে কোটি কোটি মানুষেরযত দিন গেছে আগরতলা, ত্রিপুরার প্রত্যন্ত অঞ্চল, আসাম, মেঘালয়, পশ্চিমবঙ্গ ভর্তি হয়ে গিয়েছিলএখানে আরও দুটি ব্যাপারের উল্লেখ নিশ্চয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না

     ওই একই সময় ভারত সরকার নকশাল আন্দোলন নিয়ে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছিলবিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে নকশাল আন্দোলনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে তৎকালীন ক্ষমতাসীন কংগ্রেস সরকার আধা-সামরিক বাহিনী দিয়ে এলাকা ধরে ধরে বাড়ি বাড়ি চিরুনি তল্লাশী চালিয়ে তাদের ভাষায় বিপথগামী তরুণ সম্প্রদায়কে অভিভাবকদের চোখের সামনে হাত-পা চোখ বেঁধে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলউপায়ান্তরহীন বাংলাদেশের শরণার্থীরা অযাচিতভাবে গিয়ে উপস্থিত হওয়াতে ইন্দিরা গান্ধী সরকার দারুণ এক বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে বেঁচে গিয়েছিলেনই বলতে হবেঅন্য ব্যাপারটা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে তখন নিদারুণভাবে খাদ্য ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও ঘটনাচক্রে বাংলাদেশের শতসহস্র শরণার্থীদের সাহায্যার্থে শুধু সরকারই নয় সাধারণ মানুষও যেরকম স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল যে কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে নাশরণার্থী শিবিরে শিবিরে যে যার সাধ্যমত ত্রাণকার্যে যেভাবে নেমেছিল তা ছিল অভূতপূর্বসেই সময় কলকাতার বেলা আটার রুটিভেতো বাঙালির জন্য এটা যে কতটা নিষ্করুণ অবস্থা সহজেই অনুমেয়এছাড়াও শরণার্থীদের এই চাপ বহন করতে বিদেশ থেকে প্রভূত সাহায্য-সহযোগিতা পেলেও তৎকালীন ভারত সরকার যে আন্তরিকতা প্রদর্শন করেছিল নিঃসন্দেহে তা উল্লেখনীয়নয় মাস ব্যাপী মুক্তিযুদ্ধ শেষেও গোটা ভারতবাসীকে এর জের হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পাঁচ পয়সার অতিরিক্ত ডাক টিকেট সাঁটতে হয়েছে চিঠিপত্রে

     বিদেশের মাটিতে মেহেরপুরের মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার পর নমাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত এবং পরিচালনা করতে গিয়ে বাংলাদেশ সরকারে প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদকে ঘরের এবং বাইরের ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্তজালের সঙ্গে বিচক্ষণতার সাথে সব দিক সামলে যে লড়াই করতে হয়েছিল তার কোনও তুলনা হয় নাএ ব্যাপারে তিনি যে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ও কৃচ্ছসাধনার স্বাক্ষর রেখে গেছেন তা বিশ্বের যে কোনও স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে বিরল বললেও কমই বলা হবে

     তা ঐ সময়েই হঠাৎ কলকাতায় কনজান্টিভাইটিস এক ধরনের চোখের পীড়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়যার জন্য বাংলাদেশের মানুষদের মর্মবাণী জয় বাংলাধ্বনিটি ঐ রোগের সমর্থক হয়ে গিয়েছিল  সেদিনবাংলাদেশের সঙ্গেও একই ব্যাপার হয়েছিলসে সময়ে কলকাতার পাকিস্তানের উপহাইকমিশনার ছিলেন মরহুম হোসেন আলী সাহেব, সম্ভবত এপ্রিল কি মে মাসেই হবে হোসেন আলী বাংলাদেশীদের পক্ষে আনুগত্য ঘোষণা করলেনঅবশ্য তার আগে দিল্লিতে আমজাদ হোসেন এবং শাহাব উদ্দিনরাই এ ব্যাপারে প্রথম হওয়ার দাবিদারএরপর পাকিস্তানি পতাকার বদলে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা

     একদিন সকালে বাসা থেকে বেরিয়েছি সকাল নটা নাগাদপ্রথমে গেলাম কাছাকাছি ওয়েস্ট রেঞ্জ-এ তরুণ কবি শামসের আনোয়ারের বাসায়এরই কাছাকাছি একটা সামনের খোলা চাতালে শুনেছি নেয়ারের খাটিছয়া পেতে এককালে না কি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন থাকতেনশামসেরের সঙ্গে কথা সেরে দশটা নাগাদ ধর্মতলায় যাব বলে একুশ নম্বর ট্রামে চেপেছি, হঠাৎ বেলাল বলে একটা ডাক শুনে পেছনে তাকিয়ে দেখি আল-মাহমুদ আর তার পাশে আবদুল গাফফার চৌধুরী। আমার বাড়ি থেকে পালানো জীবনের এক পর্যায়ে ফজলুল হক হলে গাফফারের ঘরে যেতাম মাঝে মাঝেগাফফার তখন গল্প কবিতা লিখছেনআমি তার লেখার ভক্তদের একজনএক সময় মেঘনানামে একটা পত্রিকাও বের করেছিলেনদৈনিক মিল্লাতের সাহিত্য পাতা দেখতেননিয়মিত না হলে আমিও সে পত্রিকায় স্বনামে বেনামে কিছু অপরিণত লেখালিখির চর্চা করেছিআর আল মাহমুদকে তো ঢাকায় পদার্পণের মুহূর্ত থেকেই চিনতামতখন একটা সময় ছিল যখন ওমর আলী, মাহমুদ আর সেবাব্রত চৌধুরীর নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হতদেশ ছাড়ার সময় আল মাহমুদ ইত্তেফাকে কর্মরত ছিলেনদুজনের মধ্যে বহুদিনের ব্যবধানে দেখা হওয়ায় বিস্ময় বিহ্বলতা আর উচ্ছ্বাস কাটিয়ে কুশলাদি বিনিময়ের পর কোথায় যাবেন সুধোতে যখন জানালেন তাদের তেমন নির্দিষ্ট কোনও গন্তব্য নেই, তবে পরে কয়েকটা জায়গায় যাবার ইচ্ছে রয়েছেআমি তখন প্রস্তাব রাখলাম চলুন আনন্দ বাজারে যাওয়া যাকযদিও পত্রিকা অফিস তবুও এখনো এত সকালে কেউ এসেছেন কি না কে জানে! তবে চলুন যাই দেখিএসপ্লানেডে নেমে হেঁটে স্টেটম্যানের গলি দিয়ে আনন্দবাজারে পৌঁছে রিসিপসনিস্ট শান্তিবাবুর মুখে শুনলাম বড় সাহেব সন্তোষ দা মানে সন্তোষ কুমার ঘোষ এসে গেছেনঘরেই আছেনআমি আল মাহমুদ আর গাফফার চৌধুরীকে নিযে তার ঘরে ঢুকতেই সম্পূর্ণ অনিশ্চিত সন্তোষ দাকে দেখলাম বেশ খোশ মেজাজেই রয়েছেনপরিচয় করিয়ে দিতেই আর থামায় কেএকবার আমাকে যা নয় তা বলছেন, আবার ওদের সঙ্গে নানান কথায় মেতে উঠছেন প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে

কিছুক্ষণের মধ্যেই তার স্বভাবসুলভ হাঁকাহাঁকিতে একে একে এসে উপস্থিত হলেন নীরেন দা, নিরঞ্জন দাসহ আরও কে কে যেনআল মাহমুদকে দেখেই নীরেন দার চোখে-মুখে কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিমপঙক্তির উদাত্ত আবেশ বিহ্বল মুগ্ধতাহঠাৎ এসে হাজির হলেন আমার বাংলার ভাসমান লেখক ও পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়খানিকক্ষণ কথাবার্তা সেরে বললেন চলো কলেজ স্ট্রীটের দিকে যাওয়া যাকসব শুনে আল মাহমুদকে বললেন মনে থাকতে থাকতে এই বেলা সব লিখে ফেলোএই মুহূর্তে নিশ্চয় তোমার টাকা-পয়সার দরকার, চল দেখি কি করা যায়গাফফারের অন্য কোথাও যাওয়ার ছিলঅল্প কিছুদিনের মধ্যে গাফফারের আসল পরিচয় পেয়ে গেলেন আনন্দবাজার কর্তৃপক্ষ অননুকরণীয় প্রাঞ্জল লেখার সুবাদেঅল্প সময়ের মধ্যে গাফফার-এর বাংলাদেশ বিষয়ে পর্যবেক্ষণঋদ্ধ বিশ্লেষণী লেখাগুলো শুধু পাঠক প্রিয় তাই নয় মাত্র পাখি ওড়া তিনশমাইল দূরত্বের অপর বাংলা সম্পর্কে অনেক ভ্রান্ত ধারণার নিরসন ঘটাতে সহায়তা হয়ে উঠল

     আমি সুভাষদা আর আল মাহমুদের পিছু পিছু গেলাম কলেজ স্ট্রীটের মনীষা হয়ে ভারবিতেআল মাহমুদের হয়ে সুভাষদাই গোটা তিন-চার প্রকাশকের সঙ্গে কথা বলে ফেললেনএদিকে দুপুর প্রায় ঢলে পড়েছেআমরা রাস্তায় নেমে আসতেই ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের সামনে দেখলাম পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি বর্বরতাকে ধিক্কার জানিয়ে সিপিআই একটা শোভাযাত্রা বের করেছেআমরা সুভাষদার পেছনে পেছনে সেই শোভাযাত্রায় সামিল হয়ে গেলামরাস্তা দিয়ে যাচ্ছিদুএকজন চেনাজানা কমিউনিস্ট পার্টিরই কর্মী আমাকে দেখে অবাক মানছেনমেডিক্যাল কলেজ, বৌবাজার ওয়েলিংটন পেরিয়ে ধর্মতলার পথ ধরতে আমাকে দেখে খালাসিটোলার খদ্দেরদের চোখ কপালে ওঠার দশামনে হল হয়তো ওরা ভাবছে বেলাল দার হলটা কিআজ এই ভর দিন-দুপুরেই নিশ্চয় অনেকটা হয়ে গেছে, না হলে কি করে নাড়া লাগাচ্ছে তাও আবার মিছিল মেধর্মতলার মোড়ে ছোট ব্রিস্টলের সামনে গিয়ে সুযোগ বুঝে মানে মানে কেটে পড়লাম

     এরপর কয়েক মাস ধরে আল মাহমুদের সঙ্গে প্রায় রোজই দেখা হততিনি ভোর সকালেই চলে আসতেন আমার ডেরায়শামসের আসতআরও কয়েকজন তরুণ কবি, সাহিত্যিক আসতক্রমশ একে একে দেখা হতে লাগল এখানে-ওখানে কবি নির্মলেন্দু গুণ, তার বন্ধু মুজিব বিন, মাহবুব তালুকদার, আমার ছোট ভাই জিয়াউদ্দিনের সূত্রে খেলাঘরের সক্রিয় সদস্য দুই প্রায়, কিশোর আলতাফ আলী হাসু এখন প্রয়াত ও আবদুল মোহিত, চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যাপক শামসুল সাইদতারও আগে দেখা হয়েছে পূর্ব পরিচিত এম.আর. আখতার মুকুল-এর সঙ্গে কোথায় যেনবললেন কি মিয়া, মন্টু লোহানীর সঙ্গে দেখা হয়েছে? মুকুল ভাই যে এতদিন আমাকে মনে রেখেছেন এতেই আমি অবাকএর পরপরই লোহানী ভাইর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল আকস্মিকদীর্ঘ আঠারো বছরের ব্যবধানে দেখে ভালই লাগলসেই অগত্যা পর্বে ১০৫, তাঁতি বাজার, ২১ই আজিমপুর মোটর বাইকে চেপে গেলেন বিশ্ব পর্যটক হয়েপ্রথমে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য পরে আফগানিস্তান, খাইবার পাস, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ পাড়ি দিযে সোজা ইয়োরোপছেলেবেলায় আমি ফজলে লোহানীর অন্ধ অনুরাগী ছিলামজীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দের সাহিত্যকৃতীর কথা আমি প্রথম তার মুখেই শুনিইসলামিয়া কলেজে বিষ্ণুদের সরাসরি ছাত্র ছিলেনশেষ একটা রঙিন পিকচার পোস্টকার্ড পেয়েছিলাম কাফে মোরব্বাতে বসে টাইগ্রিস নদীতে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে লেখাতারপর এই কলকাতায়লোহানী ভাইর সঙ্গে কয়েকদিন বেশ চমৎকার কাটল এখানে-ওখানে ঘুরে আড্ডা দিয়েএর মধ্যে ষাটের দশকে ঢাকা থেকে আমার অনুপস্থিতিতে ঢাকার রাজনীতি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন খবরাখবর

     একদিন দুপুরে লোহানী ভাই নিয়ে গেলেন ক্যামাক স্ট্রীটে এক পুরনো জমিদার বাড়িতে যেখানে দেখা হল লন্ডন প্রবাসী এক সিলেট নিবাসী ভদ্রলোকের সঙ্গেতারা আলোচনা করছিলেন বেতার বিষয়েকি করে যত শীগগীর সম্ভব একটা বেতার কেন্দ্র চালু করা যায়এরপরে লোহানী ভাই অতি উৎসাহে ভুলক্রমে সম্পূর্ণ অন্য এক সুনীল কুমার-এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলাতে আমাদের সুনীলদা বিরক্ত হয়ে উঠে গেলেনজমল না

     দুদিন বাদে লোহানী ভাইও কলকাতা ছাড়লেনবোম্বাই তখনও মুম্বাই হয়নি, লন্ডনে ফিরে যাবেনওখানে তার বিলিতি স্ত্রী এবং পুত্র কন্যারা থাকেনআমার দুঃখ হয় ফজলে লোহানী কেন যে আর লিখলেন নাআমার দৃঢ় বিশ্বাস লেখালিখির জগতে থাকলে আজ তার নাম সবার মুখে মুখে ফিরতকয়েকদিন বাদে বোম্বাই থেকে লোহানী ভাই আগের মতো আবার একটা রঙিন পিকচার পোস্টকার্ড লিখেছেন, লন্ডনে পৌঁছে বাংলাদেশের স্বপক্ষে কি কি কাজ করবেন তার একটা সংক্ষিপ্ত ফিরিস্তি  দিয়ে

     এমন সময় একটা নাটকীয় ঘটনা ঘটে গেলরাইটার্স বিল্ডিং-এ হোম মিনিস্ট্রিতে আমার এক বন্ধু কাজ করতসে আমাকে কয়েকদিন ধরে হন্যে হয়ে খুঁজে পেতে বের করে বলল আচ্ছা ফজলে লোহানীর সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কি বলতোপ্রথমে কেন সুধিয়ে সব খুলে বলতেই ও জানাল আসল ব্যাপারটা হচ্ছে ওদের কাছে গোয়েন্দা বিভাগের খবর আছে যে ইয়াহিয়া খান অবস্থাদৃষ্টে মরিয়া হয়ে যাবতীয় সম্পর্কের ছেঁড়া ফাঁটাফুটো বস্ত্রখণ্ড আবার নতুন করে রিফু কর্মের মাধ্যমে জোড়াতালি দেয়া যায় কিনা সে প্রচেষ্টায় যে কজন ব্যক্তি বিশেষ যাদের মধ্যে রাজনীতিক, লেখক, সাংবাদিক আছেন টাকা-পয়সা দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়েছেন তাদের মধ্যে লোহানী ভাইও নাকি একজন এবং কলকাতায় তাকে আমার সঙ্গে দেখা গেছে শুনে আমি একটু দমে গেলামপরে আনন্দবাজারেও এরকম একটা কিছু শোনা গেলততক্ষণে অবশ্য পাখি পগার পার

     ঐ আনন্দ বাজারেই সন্তোষ কুমার ঘোষের ঘরে এর পরে যাদের আমি দেখেছিলাম এবং যাদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম তাদের মধ্যে তাজউদ্দিন আহমদ, কামরুজ্জামান বা হেনা ভাইয়ের কথা মনে পড়েঅবশ্য সেসব আর এক প্রসঙ্গ

 

২.

     মুক্তিযুদ্ধকালীন নমাসের ঘটনা নিয়ে এই স্বল্প পরিসরে কিন্তু লেখাটা আমার পক্ষে সাধ্যাতীতএর ভেতর কত লোকের যে কত রকম ভূমিকা ছিল তার ইয়ত্তা নেইসুদূর মুম্বাই অর্থাৎ আরব সাগরের তীর পর্যন্ত এই তরঙ্গের অভিঘাত নানাভাবে আছড়ে পড়েছিলসেখানে তখন আনন্দবাজারের প্রতিনিধি ছিলেন আমাদের সলিল দা মানে রবীন্দ্রনাথের বিশ্বস্ত এবং ঘনিষ্ট অনুচর শ্রী নিকেতন গড়ে তোমার কাছে নিবেদিতপ্রাণ কালীমোহন ঘোষের তৃতীয় পুত্র এবং স্বনামধন্য রবীন্দ্র সঙ্গীতজ্ঞ শান্তিদেব ঘোষ, বহুল পরিচিত দেশ সম্পাদক সাগরময় ঘোষ, আলাউদ্দিন খাঁর জীবনীকার অকাল প্রয়াত শুভময় ঘোষদের সহোদর সলিলময় ঘোষ বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি সম্পূর্ণ বিরূপ মনোভাবসম্পন্ন অবাঙালি এবং বোম্বাইয়া মুসলমানদের সাহায্য সহযোগিতালাভে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন তার খবর স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের কজন রাখেনতখন মহারাষ্ট্রের রাজ্যপাল ছিলেন খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ হায়দ্রাবাদের ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং পরবর্তীকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রাষ্ট্রদূত আলী ইয়ার জঙতার প্রত্যক্ষ সহায়তায় সলিল দা বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি ফিল্ড হসপিটাল সংগ্রহ করা ছাড়াও বোম্বাই চেম্বার অফ কমার্সের সদস্যদের প্রভাবিত করে বাংলাদেশে ব্যাপারটাকে তুলে ধরার জন্য দৈনিক পিপল সম্পাদক আবিদুর রহমানের ভাষণের প্রয়োজনীয় বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন

     কথাটা তোলার আর একটি কারণ সেই সময় আকাশবাণীর সংবাদ সমীক্ষা অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য দারুণ সহায়ক শক্তি হয়ে উঠেছিলতার পেছনে যে কজন মানুষের একান্ত আন্তরিক প্রচেষ্টা কাজ করেছিল তাদের মধ্যে আমাদের বন্ধু দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায় তার অনবদ্য কণ্ঠশৈলীর জন্য ভারত এবং বাংলাদেশে দুই সরকারের কাছেই যথোচিত সম্মাননা লাভ করলেও এর নেপথ্য প্রযোজক উপেন তরফতদার, মূল পাণ্ডুলিপিটি লেখক জন্মসূত্রে পাবনার ছেলে প্রণবেশ সেন ও নির্মল সেন গুপ্তের কথা কজন মনে রেখেছেনপ্রতিদিনের ঘটনাবলীর প্রেক্ষিতে দারুণ চাপের মুখে তাৎক্ষণিকভাবে যথোচিত বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে লেখার ব্যাপারটা এক্ষেত্রে যে কতটা ক্ষমতার পরিচায়ক সেকথাটা কেউই বুঝতে চাইলেন নাদুঃখটা এখানেইআর কেউ না বুঝুক অন্তত স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তি কথায় কথায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক বাহক শেখ হাসিনা সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদেও সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের অনেক বলে কয়েও কিছুই করা যায়নিকিছুই না, স্বাধীনতার পঁচিশ বছর উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানেও যদি তাদের এনে সম্মানিত করা হত তাহলে এমন কি ক্ষতি ছিল মাথায় আসে নাবহুবার বলা সত্ত্বেও কেউ কর্ণপাতই করলেন নাঅবশ্য এখন প্রণবেশ সেন তো সব প্রত্যাশার ঊর্ধ্বেঅন্যদের খবর তেমনভাবে জানা নেইএ প্রসঙ্গে স্বর্গত কমল কুমার মজুমদার-এর একটি কথা খুবই প্রণিধানযোগ্যএকদিকে দেবদুলালের গলা কাঁপানো কারিগরি শুনব না অন্যদিকে শতসহস্র নিপীড়িত নির্যাতিতদের বুকফাটা ক্রন্দন আর আহাজারিতে চোখের জলধারা নিরুদ্ধ করে রাখবকথাটা হয়ত হুবহু হল নাস্মৃতি এক্ষেত্রে বড়ই দুর্বলতবে প্রসঙ্গক্রমে এত বছর পরে কথাগুলো বলতে পেরে নিজেকে ভারমুক্ত মনে হচ্ছে

     আবার আমার জানালায় ফেরা যাকসেখানে একদিন দেখলাম একটি দম্পতি কিংবা প্রেমিক-প্রেমিকাও হতে পারে ছাদে বসে বিশ্ব সংসারকে ভুলে গভীরভাবে কথাবার্তায় মগ্নপরে জেনেছি তারা ছিলেন ছাত্রনেত্রী রাফিয়া আখতার ডলি আর তার স্বামী কি যেন নাম একদিন দেখলাম শেখ কামাল ও তার সমবয়সী সহযোদ্ধাদেরওদের দেখে আঁচ করা যেত ওদের ওপর দিয়ে কতটা মানসিক আর কতটা এক মহা অনিশ্চয়তার ধকল যাচ্ছে

     একদল যখন মাঠে ঘাটে দেশের অভ্যন্তরে নিজেদের জানবাজি রেখে এক অসম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে তখন অন্যদিকে একদলকে যখন দেখা যেত কোন দেশ কোন সাহায্য দ্রব্য বা তহবিল পাঠান হচ্ছে তার পিছু পিছু ধাওয়া করতে তখন মনটা দুঃসহ বেদনায় টনটন করে উঠতআরও অনাচার চোখে পড়েছে এতদিন বাদে সেসবে আর নাইবা গেলাম

     সবকিছুরই শেষ আছেকালরাত্রি বা দুর্যোগের পরেও ভোর হয়একদিন আমাদের মুক্তিযুদ্ধেরও শেষ হলবিজয়ী বেশে আমরা দেশে ফিরলামএসে কি দেখলামহানাদার বর্বরতা নির্বিচারে শেষ মরণ কামড় বসিয়ে আমাদের অনেক মেধা আর মননের উপর নিধনযজ্ঞ চালিয়ে গেছেনতুন বাক্যবন্ধ তৈরী হল শহীদ বুদ্ধিজীবীএরই মাঝে আবার অনেককে দেখা গেল তাদের বিচারে তাদের অনেক সাধের পাকিস্তানকে হেফাজত করার লক্ষ্যে তারা গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করতেও পিছপা হননিদেশে ফিরে এসে আর যাদের দেখা পাইনা, আমার স্বল্পবিত্ত জীবনের নানান বাঁকে যারা আমার মনে একটা স্থায়ী দাগ রেখে গেছেন তাদের মধ্যে আমার ছোটবেলার বন্ধু নুরুল আমিন খান, যিনি ছিলেন লোক প্রশাসক, ঢাকার পাতলা খান লেনের লক্ষ্মীট্যারা আখতার যে আমার অবর্তমানে গীতিকার হিসেবে লব্ধ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, মুনীর চৌধুরী, আলীম চৌধুরী, ঢাকা স্টেডিয়ামের মুশতাক, দূর থেকে দেখা দীক্ষাগুরু সিরাজউদ্দিন হোসেন, বন্ধু তপতী মিত্র যার গাত্রবর্ণকে মনে হত প্রবল জ্যোৎস্না, মৃণাল কান্তি, রতন এরকম আরও কতজনের নাম করব বা করা যায়

     একটা প্রশ্ন কেন জানি আমাকে নিরন্তর নাড়া দিয়ে যায় বন্ধবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে চরম দুর্দিনের হাল ধরা যে মানুষটির সুদক্ষ দিক নির্দেশনায় মুক্তিযুদ্ধ পর্বটি যথাযথভাবেই সমাধা হয়েছিল তার নাম উচ্চারণ কতে শুধু আমরা কেন তারই অমানুষিক শ্রম, ঘাম আর মেধায় গড়ে তোলা দেশের সর্ববৃহৎ তৃণমূল পর্যন্ত যাদের বিস্তৃতি তাদের ভেতরে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখলে একবারও মনে হয়নি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সার্থক রূপায়ণ সম্ভব এদেশে, একালেবা কোনও কালে? অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম ঢের কঠিনধর্মান্ধতার কথা না হয় নাই বা তোলা গেলসাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প থেকে আমাদের মুক্তির একমাত্র উপায় শিক্ষা আর শিক্ষা আর শিক্ষাএমনকি জনসংখ্যার বিস্ফোরণ থাকতেও ওই শিক্ষারই শরণাপন্ন হতে হবে

ঢাকা।

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.