Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  মূল রচনাবলীঃ  ||  ৯ম বর্ষ ৯ম সংখ্যা পৌষ ১৪১৬ •  9th  year  9th  issue  Dec 2009 - Jan 2010  পুরনো সংখ্যা
বিজয়ের দিন Download PDF version
 

বিজয় দিবস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা

বিজয়ের দিন

ডঃ নুরুন নবী

     ১৬ই ডিসেম্বর। ভোর সাড়ে পাঁচটায় কাদের ভাই সার্কিট হাউসে পৌঁছুলেন। জেনারেল নাগরা সেখানে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন। ছয়টায় ময়মনসিংহ থেকে একটি ভারতীয় সামরিক হেলিকপ্টার এসে সার্কিট হাউসের সামনে অবতরণ করল। জেনারেল নাগরা ও কাদের ভাই হেলিকপ্টারে বসলেন। সাড়ে ছয়টায় হেলিকপ্টারটি কড্ডার মৌচাকে ব্রিগেডিয়ার ক্লের-এর অস্থায়ী সদর-দফতরে এসে অবতরণ করল। ব্রিগেডিয়ার ক্লের ওঁদেরকে অভ্যর্থনা জানিয়ে উত্তেজিতভাবে জানালেন যে পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজী খুব সম্ভবত আত্মসমর্পণ করবে। ওদের বেতারে পাকিস্তানিদের যে কথাবার্তা ধরা পড়েছে- তা থেকেই অনুমান করা হচ্ছে। এছাড়া সকাল থেকে পাকিস্তানিদের কোনো তৎপরতা নেই। ব্রিগেডিয়ার ক্লের আরও বললেন যে আমরা শত্রুর নাকের ডগায় এসে বসে আছি, কিন্তু ওদের কোনো তৎপরতা নেই। এটা একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। কিন্তু মীরপুরের দিকে ব্রিগেডিয়ার সানৎ সিং এর সাথে সারারাত যুদ্ধ হয়েছে।

     এসব শুনে জেনারেল নাগরা ব্রিগেডিয়ার ক্লেরকে বললেন যে, চলো আমরা সানৎ সিং-এর খরব নিয়ে দেখি। হেলিকপ্টারটি জেনারেল নাগরা, ব্রিগেডিয়ার ক্লের এবং কাদের ভাইকে নিয়ে পশ্চিমে উড়ে চলল। সাভার ও মীরপুরের মাঝামাঝি ঢাকা-মানিকগঞ্জ রাস্তার উপরে হেলিকপ্টারটি অবতরণ করল। ওদের তিনজনকে নামিয়ে দিয়ে হেলিকপ্টারটি টাঙ্গাইলের দিকে উড়ে গেল সৈন্যদের জন্যে খাবার আনতে।

     জেনারেল নাগরা, ব্রিগেডিয়ার ক্লের, ব্রিগেডিয়ার সানৎ সিং এবং কাদের ভাই পাকা সড়কের একটি সেতুর উপর এসে দাঁড়ালেন। ওখান থেকে মীরপুরের দূরত্ব প্রায় দেড়মাইল। ব্রিগেডিয়ার সানৎ সিং ওঁদেরকে গতরাতে তাঁর যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলেন। যৌথবাহিনীর দুটি কোম্পানি রাস্তার দুপাশ দিয়ে ধীরে ধীরে মীরপুরের দিকে এগুচ্ছে। জেনারেল নাগরা তাঁর তিন সহকর্মী-ব্রিগেডিয়ার ক্লের, ব্রিগেডিয়ার সানৎ সিং এবং কাদের সিদ্দিকীসহ পায়ে হেঁটে ঢাকার দিকে এগুচ্ছেন।

     আধামাইল সামনে এগুতেই মীরপুরের দিক থেকে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা দৌড়ে এল। কাছে আসতেই দেখা গেল- সেই বিখ্যাত কমান্ডার সবুর। সঙ্গে কমান্ডার মোস্তফা এবং তিনজন সহযোদ্ধা। ওরা জানাল যে ওদের দল গতরাতে গ্রামের মধ্যদিয়ে মীরপুরের কাছে পৌঁছে গেছে। যৌথবাহিনী ওদের উপরে পিছন থেকে যেন গোলাবর্ষণ না করে সেটা জানাতে এসেছে ওরা। ওরা আরও জানাল যে কমান্ডার সবুর, কমান্ডার মোস্তফা, কমান্ডার বকুল ও কমান্ডার মোজাম্মেল হক-এর চার কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধা মীরপুর সেতুর বামপাশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।

     এ সংবাদ পেয়ে জেনারেল নাগরাসহ সবাই আনন্দিত এবং বিস্মিত হলেন। যৌথবাহিনীকে দ্রুত মীরপুর সেতু দখল করার জন্য নির্দেশ দিলেন।

 

চরমপত্র

     সকাল আটটায় জেনারেল নাগরা ও তার সঙ্গীরা শহরের প্রবেশপথে মীরপুর-ঢাকা সড়কের উপর হেমায়েতপুর সেতুর উপর পৌছে গেলেন। একটি জিপের বনেটে রেখে এক-টুকরো কাগজে তিনি পাকিস্তানি জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ নিয়াজীকে লিখলেন সেই ঐতিহাসিক চিঠি: প্রিয় আব্দুল্লাহ, আমরা এসে গেছি। ... আত্মসমর্পণ করো। ... আত্মসমর্পণ করলে তোমার জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়া হবে।--- তোমারই, মেজর জেনারেল নাগরা

     তিনজন মিত্রসেনা ও একজন মুক্তিসেনা জেনারেল নাগরার এই চিঠি নিয়ে একটি জিপে একটি শাদা জামা উড়িয়ে ঢাকা শহরের দিকে চলে গেলেন।

     এদিকে সকাল থেকে ভারতীয় সামরিকবাহিনীর প্রধান জেনারেল মানিকশ পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ করার জন্য আহবান জানিয়েছেন। আকাশবাণী থেকে বারবার সে আহবান প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু পাকিস্তানিদের প্রকৃত অবস্থা কী সেটা জেনারেল নাগরার সে-সময় জানা ছিল না। তিনি এত তাড়াতাড়ি ঢাকার উপকন্ঠে পৌছে শত্রুর তৎপরতা না-দেখে নিজ উদ্যোগে জেনারেল নিয়াজীকে আত্মসমর্পণের জন্য বার্তা পাঠান।

জে. নিয়াজীর আত্মসমর্পণ ও চুড়ান্ত বিজয়

     প্রায় সাড়ে নয়টার দিকে মীরপুর সেতুর দিক থেকে একটি জিপ মিত্রবাহিনীর দিকে আসতে দেখা গেল। কিন্তু দূর থেকে ঐ জিপে কোনো শাদা কাপড় না- থাকায় সম্মুখে অবস্থিত মিত্রবাহিনীর সৈনিকরা জিপটির উপর গুলিবর্ষণ করে। সর্বনাশ ঘটে যায়। আসলে জিপটি জেনারেল নিয়াজীর আত্মসমর্পণের বার্তা নিয়ে ফিরে আসছিল। খুব দ্রুত গাড়ি চালিয়ে আসাতে বাতাসে শাদা কাপড়টি উড়ে যায়- সেটা ওরা লক্ষ্য করেনি। মিত্রবাহিনী তাদেরকে শত্রু  মনে করে গুলিবর্ষণ করে। আমিনবাজারের কাছে ঘটনাস্থলে জেনারেল নাগরা, ব্রিগেডিয়ার ক্লের, ব্রিগেডিয়ার সানৎ সিং এবং কাদের ভাই পৌছে দেখতে পেলেন যে প্রতিনিধিদলের তিনজন নিহত এবং অপরজন আহত হয়েছেন। আহত মিত্রবাহিনীর সেনাটি জানাল যে জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ করবে এবং একজন পাকিস্তানি জেনারেল শিগগিরই জেনারেল নাগরার সাথে দেখা করার জন্যে আসছেন। নিহত ও আহত এই চারজন সৈনিককে মির্জাপুর হাসপাতালে হেলিকপ্টারে পাঠানোর ব্যবস্থা করার কয়েক মিনিট পরেই ঢাকার দিক থেকে একটি মার্সিডিজ বেন্জ গাড়ি ও দুটি জিপে পাকিস্তান বাহিনীর মেজর জেনারেল জামশেদ ও কয়েকজন অফিসার ওখানে এসে উপস্থিত হল। ওরা জেনারেল নাগরাকে জানাল যে জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ করবে এবং মিত্রবাহিনীকে এই বিষয়ে বিস্তারিত অবগত করার জন্যে তার অফিসে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

     জেনারেল জামশেদের গাড়িতে ওরা ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট-এর উদ্দেশে রওনা হলেন। গাড়ির সামনে চালকের পাশে জেনারেল জামশেদ এবং পিছনের সিটে বসেছেন জেনারেল নাগরা, ব্রিগেডিয়ার ক্লের, ব্রিগেডিয়ার সানৎ সিং এবং কাদের সিদ্দিকী। মীরপুর সেতু পার হবার পর টেলিফোনে জেনারেল নিয়াজীর সাথে জেনারেল নাগরা যোগাযোগ করার চেস্টা করে ব্যর্থ হলেন। আবার মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়িটি ছুটে চলল ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের দিকে।

     সকাল ঠিক দশটা পাঁচ মিনিটে গাড়িটি জেনারেল নিয়াজীর সদর-দফতরের সামনে এসে থামল। জেনারেল জামশেদ নিয়াজীর অফিসে সরাসরি নিয়ে তাদেরকে বসতে বলে চলে গেলেন।

     সকাল দশটা দশ মিনিট। জেনারেল নিয়াজী তার অফিসকক্ষে এসেই মিত্রবাহিনীর প্রতিনিধিদের সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানালেন। জেনারেল নিয়াজী ও জেনারেল নাগরা উভয়েই পরস্পরের সাথে পূর্বপরিচিত। তারা দুজনেই ব্রিটিশ আর্মিতে একসাথে কমিশন পাওয়ার পর একই সামরিক একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। জেনারেল নাগরা প্রথমেই জেনারেল নিয়াজীকে আত্মসমর্পণ করার জন্যে ধন্যবাদ জানালেন এবং তার পরিবারের সদস্যদের কুশলাদি জানতে চাইলেন। তারপরই তিনি তার সাথীদের সঙ্গে জেনারেল নিয়াজীকে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

     আলাপ-আলোচনার পর স্থির হল বিকেল সাড়ে চারটায় মিত্রবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার জেনারেল অরোরা ঢাকায় আসবেন এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ পর্ব সম্পন্ন হবে। নিয়াজীর সাথে কথা শেষ করে কাদের ভাই কয়েকজন সহযোদ্ধাকে নিয়ে মীরপুর হয়ে টাঙ্গাইলের উদ্দেশে রওনা হলেন।

     এদিকে আমি ও শহীদ ভাই সকাল থেকে ওয়াপদা বাংলোতে বসে মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন কাজের সমন্বয় করছিলাম। কাদের ভাই সকালবেলায় কড্ডা থেকে নবীনগর হয়ে মীরপুরের কাছাকাছি চলে গেছেন- এ খবর আমাদের কাছে এসে পৌঁছল প্রায় দশটার দিকে। ইতিমধ্যে আমাদের সাথে এসে যোগ দিলেন লতিফ সিদ্দিকী ও বাছিত সিদ্দিকী। আমরা আকাশবাণী ও মুক্তিবাহিনীর বেতারে বিভিন্ন খবর পাচ্ছিলাম যে পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করতে পারে। কিন্তু কখন কীভাবে এই আত্মসমর্পণ হবে, কিংবা আত্মসমর্পণের আগে হানাদারবাহিনী ঢাকা শহর ধ্বংস করবে কিনা ইত্যাদি নানা বিষয়ে আমরা নানা মত ও নানা আশংকা প্রকাশ করে যাচ্ছিলাম। যদি পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ না করে এবং ঢাকাতে যুদ্ধ হয় তাহলে জানমালের যে ক্ষতি হবে তার পরিপ্রেক্ষিতে টাঙ্গাইলের কী করণীয় হবে তা নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা হচ্ছিল।

     দুপুরের দিকে আমাদের অফিসে কাদের ভাইয়ের ফোন এল। ঢাকা শহর মুক্ত। বাংলাদেশ স্বাধীন। হানাদারবাহিনীর প্রতিনিধি জেনারেল নিয়াজী আজ সকালে মিত্রবাহিনীর প্রতিনিধি জেনারেল নাগরা এবং মুক্তিবাহিনীর প্রতিনিধি কাদের সিদ্দিকীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। টাঙ্গাইল ক্যাডেট কলেজে অবস্থানরত দুই হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে তিনি আবার ঢাকা যাচ্ছেন বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়াজীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য। আমাদেরকে টাঙ্গাইল অবস্থান করে শাক্তিশৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে বললেন।

     এই খবরটির জন্য আমরা গত নয়টি মাস অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম। আমাদের অফিসে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। বেতার ও টেলিফোনে আমরা বিজয়ের বার্তা চারদিকে ছড়িয়ে দিলাম। টাঙ্গাইল শহরের চারদিকে জয় বাংলা জয়ধ্বনি স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠল। যে রণকৌশলের মাধ্যমে যৌথবাহিনীর মাত্র দুটি ব্রিগেড মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় ঢাকা শহরে প্রথম প্রবেশ করে- সে রণকৌশলের সাথে জড়িত থাকতে পেরে এবং যে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার এর কাছে নিয়াজী আত্মসমর্পণ করল- তাঁর বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা হতে পেরে নিজের জীবনকে ধন্য মনে করলাম। আনন্দ ও গৌরবে আমরা সবাই মিলে স্লোগান দিলাম: জয় বাংলা

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.