Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  মূল রচনাবলীঃ  ||  ৯ম বর্ষ ৯ম সংখ্যা পৌষ ১৪১৬ •  9th  year  9th  issue  Dec 2009 - Jan 2010  পুরনো সংখ্যা
একজন মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিচারণ ও আক্ষেপ Download PDF version
 

বিজয় দিবস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা

একজন মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিচারণ ও আক্ষেপ

ভজেন্দ্র বর্মন

     ১৯৭১ সনের মার্চ মাস ৩৮ বৎসর পেড়িয়ে গেছে। সেতো অনেক দিন আগেকার কথা।

     তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানে তখন থমথম ভাব। গভোটে বিজয়ী হয়েও বাঙালী নেতাদের কাছে পাকিস্থানী সামরিক শাসকরা ক্ষমতা হস্তান্তর করছিলো না! আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। রাজনৈতিক সভা ও মিছিলে যোগ দিলেও দেশের রাজনীতি নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতাম না। ঐসব জায়গায় যেতাম শুধুমাত্র দেশে কি হচ্ছে তা জানার জন্য। ৭ই মার্চ ঢাকার পল্টন ময়দানে বিরাট একটি ঘোষণা দেয়া হলো। বিজয়ী আওয়ামী লীগ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বললেন, বাংলাদেশে চলবে মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। বাঙালীদের দেশ হবে স্বাধীন বাংলাদেশ ! এরপর ঘূর্ণিঝড়ের আগে যেমন হয় সারা দেশে তেমনি গুমোট এক ভাব। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চলে এলাম গ্রামের বাড়িতে। এলো ২৫ শে মার্চ। জেনারেল ইয়াহিয়া খাঁন সামরিক আইন ঘোষণা করলো। সামরিক শাসকদের কাছে তখন প্রতিটি বাঙালী পাকিস্তানের শত্রু! প্রচুর ধরপাকড় চললো। পাকিস্তান সেনাবাহিনী হত্যাকান্ড শুরু করে দিলো। সারা দেশে অত্যাচার-ব্যাভিচার শুরু হলো এবং তা চলতে থাকলো। এসবের বিরুদ্ধে সংগঠিতভাবে কোন প্রস্তুতি নেয়া হয় নি, তাই কারো কিছুই করার ছিল না। ২৬ শে মার্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হলো। পাকিস্তানীদের অত্যাচারের মাত্রা তখন বহুগুণে বাড়লো। দেশের প্রায় সকল মানুষ মূলতঃ খালি হাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং তাদের সহচরদের অপকর্মের প্রতিরোধ শুরু করলো।

     প্রধানতঃ আবেগ ও ক্রোধের বশে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলাম। আমার ক্রোধ ছিল ঐসব বর্বরদের উপর যারা মানুষের দেহ নিয়ে জানোয়ারের মত বাঙালী সমাজের উপর অত্যাচার-অনাচারে লিপ্ত ছিল। যাদের ভয়ে জীবন রক্ষার জন্য অনেকের মত আমাকেও পালিয়ে পালিয়ে থাকতে হচ্ছিলো। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পালিয়ে গ্রামে এসেও স্বস্তি পাইনি। গ্রামে হানাদার ও রাজাকাররা ঘন ঘন আসছিলো ও আমাদের খুঁজছিলো। তাদের আসার কথা শুনলেই পালাতাম। গ্রামের পর গ্রাম পুড়ছিলো। মা-বোনদের পেলে ধরে নিয়ে যাচ্ছিলো। কিছুদিন পর তাঁদের আধমরা বা মৃত অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছিলো। পলায়নরত গ্রামবাসীদের পিছন থেকে গুলি করছিলো। অন্যায়-অত্যাচারের তো সীমা থাকে? এসব তো সীমাহীন বর্বরতা! ভারতে গেলাম। ট্রেনিং ক্যাম্পে যোগ দিলাম। ভয়-ভীতি তখন আমার এবং আমার সহযোগী মুক্তিযোদ্ধাদের একটুকুও ছিল না। যা করেছি তার জন্য কখনো আমার কোন দ্বিতীয় চিন্তা আসে না!

     ১৯৭১ সনের ডিসেম্বর মাসে আমাদের দেশ স্বাধীন হলো। বাঙালীদের সমবেত চেষ্টায়, অনেক রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় বর্বর এক দেশী-বিদেশী গোষ্ঠীকে আমরা হারিয়ে দিলাম। আমাদের আওতায় তখন সবকিছুই এলো। আমাদের দেশকে নিজের ইচ্ছাতম সুন্দর করে গড়ার সুযোগ এলো। সাধারণ জনগণ তখন উৎসাহ-উদ্দীপনায় ভরপুর।

     স্বাধীনতা লাভের পর থেকে আজ পর্যন্ত কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনেক উন্নতি হয়েছে। খাদ্যে আমরা মোটামুটি স্বনির্ভর। দেশের রাস্তাঘাট-ঘরবাড়ির অনেক উন্নতি দেখছি। আমাদের অনেকের সামগ্রিক আর্থিক অবস্থা এখন অনেক গুণে ভালো। টেলিফোন যোগাযোগ ও বিদ্যুতিকরণে আমাদের এখন অনেক সাফল্য। এসব তো ভালো কথা। তবে আমরা অনেক কিছু দেখেছি এবং এখনো দেখছি তা ভীষণ দুঃখজনক। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাচক্র বেশীরভাগ ক্ষেত্রে অভাবনীয় ও বেদনাদায়ক। আমাদের প্রকট রাজনৈতিক কোন্দল, বেশ কিছু অকল্পনীয় রাজনৈতিক ও সামরিক হত্যাকান্ড, শাসনব্যবস্থায় প্রচন্ড দুর্নীতি-অনাচার, দেশের অর্থনৈতিক দুরাব্স্থা, সাধারণ মানুষের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষাব্যবস্থার অধ:পতন, বেকারত্ব, নিয়ম-শৃঙ্খলার অবনয়ন, ইত্যাদি আমাদের হতাশ করেছে এবং এখনো করছে। এসব বাংলাদেশকে দিনকে দিন পঙ্গু করে দিচ্ছে। যাঁরা ক্ষমতায় ছিলেন, তাঁরা যা খুশি তাই করেছেন, ন্যায়-অন্যায় বা নিয়ম-অনিয়মের মধ্যে তাঁরা তফাৎ খুঁজে পান নি। এখন যাঁরা ক্ষমতায় আছেন, তাঁরা যে অন্যধরণের এটা এখনও প্রমাণ সাপেক্ষ।

     আমাদের কি নেই? জাতি হিসেবে, শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, চিন্তা-ভাবনায় আমরা তো কারো চাইতে কম নই? আমরা কেন মুক্তিযুদ্ধকে পটভুমিকে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি নি বা করছি না? আমরা কি করছি, কেন করছি, সবার এবং দেশের জন্য আমরা কি করতে পারি- এরকম ভাবনা কেন আমাদের জাগে নি? কেন তা ভাবতে চাইছি না? আমরা স্বাধীনতা দিবস, ২১শে ফেব্রুয়ারী, বাংলা নববর্ষ, ইত্যাদি কত ঘটা করেই না পালন করি। এসব পালন করার পর আমরা কি যত তাড়াতাড়ি পারি এগুলোর ইতিহাস বা মর্মকথা ভুলতে চাই?

     অতীতে আমাদের যতগুলো ব্যর্থতা, তার মধ্যে প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনটি জিনিষ আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

(১) ১৯৭১ সনে আমাদের আপনজনদের যারা হত্যা করেছে বা হত্যা করতে সাহায্য করেছে, যারা আমাদের মা-বোনদের ইজ্জৎ নিয়েছে, যারা আমাদের গ্রাম-গঞ্জ পুড়িয়ে দিয়েছে তাদের সনাক্ত না করা, এবং বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বিচার করে তাদের উপযুক্ত শাস্তি দেয়ার চেষ্টা না করা।

(২) যাঁরা স্বাধীনতার দাবীতে সংগ্রাম করে বা সংগ্রামের কারণে হানাদারদের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁদের পূর্ণ একটি তালিকা প্রস্তুত না করা।

(৩) আমরা যাঁরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি, দেশ গড়ার কাজে আমাদের সবাইকে আহ্বান না করা এবং সুযোগ না দেয়া; বরং অনেক ক্ষেত্রে আমাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা।

     আগেও শুনেছি, এখনো মাঝে মাঝে শুনতে পাই- যেহেতু মুক্তিযোদ্ধারা শহর-গ্রামে এসেছিলো সেজন্য নাকি পাকিস্তানীরা ও তাদের বাঙালী দালালরা সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার করেছে। তাঁদের হত্যা করেছে। আমাদের মা-বোনদের ধর্ষণ করেছে। নতুবা সবকিছুই নাকি ঠিক থাকতো! এখনও কেউ কেউ বুঝতে চায় না, আর আমরাও বোঝাতে পারি নি যে দূর্ধর্ষ ও সংগঠিত পাকিস্তান সেনাবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের ছোট ছোট সার্থক আক্রমণ, এবং তাঁদের সারা দেশব্যাপী অবস্থান থাকার জন্য ঘোড়পাক খাচ্ছিলো। আমার মতে, দেশের আপামর জনসাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়ে তাঁরাও মুক্তিযুদ্ধের বীর সৈনিক হিসেবে স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। এমতাবস্থায়, শেষের দিকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বাঙালীদের বিদ্রোহ দমনের চিন্তা হয়তো করছিলো না। তখন দলে দলে আত্মসমর্পণ করার মাধ্যমে প্রাণ নিয়ে বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়া ছাড়া তাদের জন্য বিকল্প কিছু ছিল না।

     এখন পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধারা প্রশংসা পাবে কি ধিক্কার পাবে তা নির্ভর করে কোন সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। যার ফলে আমরা যারা মুক্তিযোদ্ধা তারা অনেকেই চুপচাপ থাকাটাকে উত্তম নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছি, এখনও তা করছি। এটা বিরাট ভুল তবু আমরা এটা করেছি এবং এখনও করে যাচ্ছি তা ভয়ের কারণে নয়, তা হলো দেশের স্বার্থপর ও অকৃতজ্ঞ ক্ষমতাসীনরা আমাদের কোন কথার মূল্য দিবে না বলে। তাদের কাছে আমাদের শহীদ সহযোগীদের অবদান এবং আমাদের ত্যাগের স্বীকৃতি পাওয়ার দাবী করা অনর্থক বলে !

     আমরা মুক্তিযোদ্ধারাও খুব একটা নির্দোষ নই! আমরা আমাদের সংগঠন মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে যতটুকু রাজনীতির উর্দ্ধে রাখা উচিত ছিল তা রাখতে সক্ষম হইনি। আমাদের নিজস্ব নীতিমালা অনুসরণ করে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রাখা একান্ত প্রয়োজন।

     অনেক দেরী হলেও বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাদের যে স্বীকৃতি দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে- এটা প্রশংসাযোগ্য। যাঁরা দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন বা যাঁরা নিজের বাঁচা-নাবাঁচার চিন্তা না করে সংগ্রাম করেছেন তাঁদের ত্যাগকে স্বীকার করাতে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কেন থাকবে? এ বিষয়টি কেনই বা বিতর্কিত হবে?

      ১৯৭১ সনে আমার সহ-মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স ছিল আনুমানিক ১৬ থেকে ৫০ বৎসর। আমরা যারা বেঁচে আছি, তাদের বেশীরভাগ এখন অবসর-প্রাপ্ত। আমাদের কি আর চাওয়ার আছে? এখন যা চাইতে পারি তা যেন না চাইলেই নয়। বাংলাদেশে যারা বর্বর ছিল, যারা বিবেকহীন ছিল, যারা বিদেশীদের সংগী হয়ে নিজের সমাজের ধ্বংস চেয়েছিলো, যারা নিজের দেশের মা-বোনদেরকে পশুদের হাতে তুলে দিয়েছিলো, যারা নিজেদের বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করেছে বা করাতে সাহায্য করেছিলো, তাদের সনাক্ত করা হোক। এরা কারা, আমরা তা জানতাম, এখনও জানি। মানবতার শত্রুদের বিচারের জন্য কোন সময়সীমা নেই। স্বাধীনতার চল্লিশ বৎসর পরে হোক আর ষাট বৎসর পরেই হোক, তাদের কুকর্মের জন্য তারা যেন উপযুক্ত শাস্তি পায় এটাই আমরা চাই।

ড. ভজেন্দ্র বর্মন ৬ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।

হিউষ্টন, জুলাই ২০০৯।

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.