Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  মূল রচনাবলীঃ  ||  ৯ম বর্ষ ৯ম সংখ্যা পৌষ ১৪১৬ •  9th  year  9th  issue  Dec 2009 - Jan 2010  পুরনো সংখ্যা
আমার মুক্তিযুদ্ধ,আমার অহংকার Download PDF version
 

বিজয় দিবস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা

আমার মুক্তিযুদ্ধ, আমার অহংকার

আকবর হায়দার কিরন

   মাঝে মাঝে আমার খুব আক্ষেপ হয়, কেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমি যোগ দিতে পারলাম না। আমার মোহন দাদা (বর্তমানে ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি মাহবুবুল হায়দার মোহন) যখন যুদ্ধে চলে যান তখন কাজী জাফর ভাই অবশ্য বলেছিলেন, 'কিরনকে কেন যুদ্ধে পাঠিয়ে দিচ্ছোনা। কিন্তু আমার মা তার ছোট্ট ছেলেটিকে পাঠাতে কিছুতেই সাহস পাননি।
     মোহন দাদা ছাড়াও শুরু থেকেই যুদ্ধে অংশ নেন আমার ছোট দুলাভাই সৈয়দ ওয়ায়েজ উদ্দিন। বিয়ের বছর খানেক পরেই আমার ছোট বুবু মারা যান। কিন্তু আমরা সবাই ছিলাম দুলাভাই অন্ত প্রা। সৈয়দ ওয়ায়েজ উদ্দিন ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সহ সভাপতি। আপাদমস্তক মাওবাদী আমার দুলাভাইকে কাজী জাফর আহমেদ, রাশেদ খান মেনন সহ আরো অনেক নেতাই 'হুজুর' বলে ভাবতেন, কার তিনি কলেজে শিক্ষার পাশাপাশি টাইটেল পাশও ছিলেন। মাও সে তুঙ্গের বাণী সংকলিত লাল বই এবং মাকর্সবাদের বইপত্র দুলাভাইয়ের কাছেই প্রম দেখেছি।
     সৈয়দ ওয়ায়েজ উদ্দিন দুলাভাই ছিলেন ফেনী তাকিয়া বাড়ির পীর বংশের সন্তান। পাগলা মিয়ার মাজারের পাশেই তাঁর জন্ম এবং বৃদ্ধ হলেও তিনি ছিলেন অন্য এক জগতের মানুষ। তাকিয়া বাড়ী থেকে পায়ে হেটে ট্রাঙ্ক রোড হয়ে ফেনীর ষ্টশন রোডে পৌছাতে তাঁর লেগে যেত দীর্ঘ সময়। কার সর্বজন শ্রদ্ধেয় এই মানুষটির সাথে অগুনতি মানুষ কুশল বিনিময় করতেন, সালাম জানাতেন। পাশাপাশি একই বয়সের হলেও জয়নাল হাজারীকে দেখা যেত নীরবে রাস্তার আরেক পাশ দিয়ে হেটে যেতে।
     আমাদের বোন বেচেঁ না থাকলেও ওয়ায়েজ উদ্দিন দুলাভাই ছিলেন সবার সবচেয়ে প্রিয়জন। ছোট বুবুর অকালমৃত
্যুর পর আমার আপা ও ভাইদের অনেক চেষ্টা চরিত্রের পর হুসনা আপা নামের এক আত্মীয়ার সাথে দুলাভাইয়ের বিয়ে হয় মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে। পরম দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, হুসনা আপা কখনো আর তার স্বামীকে ফিরে পাননি। এবং যুদ্ধের শেষে জন্ম নেয়া তার সন্তান এ্যানি কোনদিন তার বাবাকে দেখেনি।
     ওয়ায়েজ উদ্দিন দুলাভাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে, নিজেকে সীমান্তের ওপারে নিজেকে নিরাপদে রাখতে ব্যস্ত ছিলেন না আরো অনেকের মতো। একজন মহান সংগঠক হিসেবে তিনি জীবনের ঝুকি নিয়ে প্রায়ই দেশের ভিতরে আসতেন। জাফর ভাই সহ আরো অনেকের সর্তকবাণী তিনি প্রায়ই উপেক্ষা করতেন। তখন চট্টগ্রামে থাকতেন আমার বড় দুলাভাই ও সিঙ্গারের বিভাগীয় জেনারেল ম্যানেজার জুলফিকার হায়দার চৌধুরি। আগষ্ট মাসের দিকে ছদ্মবেশে গিয়ে আমার জ্যোৎস্না বুবুর বাসাতেই ওঠেন তিনি।
     সেদিন আমার বোন ও দুলাভাইয়ের একান্ত অনুরোধ উপেক্ষা করে, বিশেষ ও জরুরী কাজের অজুহাতে বাইরে যান সৈয়দ ওয়ায়েজ উদ্দিন। সেই যে গেলেন, আর তিনি ফিরে এলেননা আমাদের জীবনে। চট্টগ্রামে ঠিক কোথায় তাঁকে হত্যা করা হয় তার সঠিক কোন হদিস মেলেনি। তাঁকে হত্যার পেছনে ফেনীর হাজারী বাড়ীর ইলিয়াস হাজারী সহ অন্যান্য নেতৃস্থানীয় রাজাকার ও স্বাধীনতা বিরোধীদের হাত ছিলো, এটা অবশ্য নিশ্চিত করে বলা যায়। ফেনী যেদিন শত্রু মুক্ত হয় সেদিন ট্রাঙ্ক রোডের মোড়ে বৈদ্যুতিক পিলারের সাথে ইলিয়াস রাজাকারের মৃতদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়। ছোট্ট বেলায় দেখা সেই দৃশ্য এখনো আমার স্মৃতিতে উজ্জ্ব যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জীবন হাতে নিয়ে একবার মোহনদাদা ফেনীতে আসেন। এখানে বলে রাখা ভালো আমাদের গ্রামের বাড়ী কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার আম্মা সহ আমরা ফেনীতেই ছিলাম বেশীর ভাগ সময়। মোহনদাদাকে প্রচুর ওষুধ পত্র ও পয়সা কড়ি দিয়ে দ্রুত ফেরত পাঠানো হয় সীমান্তের ওপারে। আমার দুলাভাই জুলফিকার হায়দার চৌধুরি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বেশ ক'বার প্রচুর পরিমা ওষুধ পাঠান।
     পাক বাহিনীর পতনের পর আমরা ফেনী হতে ফিরে আসি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে আমাদের গ্রামের বাড়ীতে, কদিন পর মোহনদাদা ফিরে আসেন কাধেঁ বন্দুক নিয়ে। তখন তাঁর ছিলো অনেক লম্বা চুল। মোহন দাদার ষ্টেনগানটি হাতে নিয়ে আমি গাছের ডালের দিকে একটি গুলী ছুড়েছিলাম। জীবনে এর আগে অবশ্য আরেকটি বন্দুক দেখেছিলাম। সেটি ছিলো আমার আব্বার শিকারের বন্দুক।
     বাংলাদেশ স্বাধীন হলো এবং ধীরে ধীরে সবাই ফিরে এলো। কিন্তু ফিরে এলেননা আমাদের প্রিয় দুলাভাই সৈয়দ ওয়ায়েজ উদ্দিন। আমরা বছরের পর বছর তাঁর অপেক্ষায় ছিলাম। ছোট্ট মেয়ে এ্যানি ভেবেছে একদিন হয়তো হুট করে তার বাবা এসে হাজির হবে। কত্তো পীর ফকির ধরা হলো, জীন হাজির করা হলো, কিন্তু আমাদের আশা পূর্ণ হলো না। আমাদের
হৃদয়ের সবগুলো জানালা তাঁর অপেক্ষায় নিশিদিন খোলা থাকলো। কিন্তু তিনি আর কোনদিন ফিরে এলেননা। 7


নিউ ইয়র্ক

অক্টোবর ১৯, ২০০৯।

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.