Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  মূল রচনাবলীঃ  ||  ৯ম বর্ষ ৯ম সংখ্যা পৌষ ১৪১৬ •  9th  year  9th  issue  Dec 2009 - Jan 2010  পুরনো সংখ্যা
দোদেল বান্দা Download PDF version
 

বিজয় দিবস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা

দোদেল বান্দা

 

মুত্তালিব বিশ্বাস

 

     জন্মস্থান হিসেবে আমি মুর্শিদাবাদেরএখন আমার বয়স পঁচাত্তর বছর।যখন বার বছরের ছিলাম তখনকার কথা দিয়ে শুরু করা যাক।

     মধ্য-আগস্ট, উনিশ শ’ সাতচল্লিশ। বৃটিশ শাসন থেকে মুক্ত হল ভারত দুই ভাগে ভাগ হয়ে। এক ভাগের নাম হিন্দুস্তান, আরেক ভাগের পাকিস্তান। জানা গেল মুর্শিদাবাদ পড়েছে পাকিস্তানের ভাগে। স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপিত হল আমার গ্রামের প্রাইমারি ইস্কুল-সংলগ্ন মাঠে, চৌদ্দই আগস্ট। তড়ি-ঘড়ি তৈরি করা একটা পতাকা ওঠানো হল খাড়া-করে-পোঁতা এক বাঁশের ডগায়। পরবর্তীকালে পাকিস্তানের পতাকা দেখার পর বুঝেছিলাম ওটা ঠিক পাকিস্তানের পতাকা ছিল না, যদিও তাতে চাঁদ-তারা ছিল। ওই উদ্‌যাপন অনুষ্ঠানে আর কী-কী করা হয়েছিল মনে নেই, তবে মিষ্টি খাওয়া-খাওয়ি হয়েছিল আর একটা গান গাওয়া হয়েছিল সমবেত কণ্ঠে। গানটা, সাত তাড়াতাড়ি শিখিয়েছিলেন আমাদেরকে, গ্রামেরই বিনয় বিশ্বাস। ওটার রচনাও করেছিলেন সম্ভবত তিনিই। গানের স্থায়ীটা ছিল: ওঠ ওঠ অরে ভারতবাসী শুভদিন আজি তোর/জীবন-যাত্রায় চল একসাথে মুছিয়া-নয়ন লোর। গানটা-যে পাকিস্তানি চেতনার বিপরীত তা বোঝার মতো বুদ্ধি বা মানসিকতা তখন ছিল না, যদিও মুসলমানদের জন্যে হিন্দুস্তানের চেয়ে পাকিস্তান ভালো, এটা কেমন করে যেন মগজে ঢুকে গিয়েছিল। আর বেশ বুঝতে পেরেছিলাম: যে-হিন্দুদের যাবতীয় উদ্যমে ওই দিনটি উদ্‌যাপিত হল তাদের মনটা যেন খারাপ-খারাপ।

     দুদিন পরেই, ষোলই আগস্ট, রটে গেল, এবং সেটাই ঠিক, মুর্শিদাবাদ পাকিস্তানের নয়, হিন্দুস্তানের। আবার সাজ-সাজ রব পড়ে গেল নতুনভাবে স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপনের। সেই প্রাইমারি ইস্কুলের মাঠ, সেই লোকজন, সেই গান, সেই মিষ্টি বিতরণ; পতাকাটা শুধু ভিন্ন। আর মুসলমানদের মন ভারী, হিন্দুদের হাল্‌কা। যেহেতু মুসলমান, আমার মনটাও ভারীই হয়েছিল। কী বলা যাবে সেটাকে, সাম্প্রদায়িক মনোভাব, না-কি ধর্মীয় চেতনা? তবে হিন্দু বন্ধুরা যেন টের না-পায় সেই-মতো ভাব ধরেছিলাম। কিছুদিনের মধ্যেই ভুল হয়ে গেল ওই-সব ভাবা-ভাবি।

     লেখাপড়ায় ইতি টেনে উনিশ শ’ পঞ্চান্ন সালে চাকরিতে ঢুকলাম। চাকরিস্থলে মুসলমানেরা সংখ্যালঘু। তবু বেশ যেন হাসিমুখেই চাকরি করে যাচ্ছিলাম। একরকম হঠাৎ করেই, উনিশ শ’ উনষাট সনের শেষের দিকে এক উপরস্থ কর্মকর্তার আচরণে মনে হল হিন্দুস্থানে চাকরি করা মুসলমানদের ঠিক না; তা করতে হলে পাকিস্তানে গিয়ে করাই ভালো। মুসাবিদা খাটিয়ে তখনকার পূর্বপাকিস্তানে চলে এলাম। কিছুদিনের মধ্যে চাকরিও পেয়ে গেলাম।

     ঢাকায় এলাম উনিশ শ’ ষাট সনে। মুক্তি যুদ্ধ যখন শুরু হল তখন আমি চাকরি করি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট-এর) পুরকৌশল বিভাগে। আমি সপরিবার বাস করি নীলাম্বর শাহ রোডে, তদানীন্তন ই.পি.আর দুই নম্বর গেটের একেবারে কাছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছু আগে রাজনৈতিক মন্দাজনিত যে-টানা-পোড়েন ও রেষা-রেষি চলছিল তাতে আমার মনোভাব ছিল দোদুল্যমান। এমনই দোদুল্যমান যে, শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝেও বুঝতে পারতাম না। যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারতাম: পাকিস্তানি নাগপাশ থেকে মুক্তি পাওয়া দরকার।কিন্তু সেই চিন্তার মধ্যেই, এও বুঝতে পারতাম, কোথায় যেন একটা পাকিস্তান-প্রীতি লুকিয়ে আছে মনের মধ্যে। কেন একটা স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারতাম না, তা নিয়ে মনঃপীড়াও কম ছিল না। কিন্তু এমনভাবে চলতাম, যেন বাইরের কারো কাছে ধরা না-পড়ি।

     স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলাম নিমেষেই, ২৫শে মার্চের সেই কালরাতে। পরের দিনই বাধ্যতামূলকভাবে অফিস (বুয়েট) যেতে হয়েছিল। যাওয়ার পথে পলাশী-ব্যারাকের রক্তাক্ত ফায়ার ব্রিগেড ক্যাম্প দেখার পর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে গেল: আর দ্বিধা নয়, মুক্ত বাংলাদেশ চাই। দিনে দিনে বাংলাদেশ যত বেশি রক্তাক্ত হতে থকল, আমার সেই সিদ্ধান্তও তত দৃঢ় হতে থাকল। ভিতর থেকে একটা সত্যিকারের ঘৃণা জন্মাল পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে। কিন্তু দৈনন্দিন আচার-আচরণে তা সম্পূর্ণত প্রকাশ করতে পারতাম না। ঘরের কোণে, অফিসের পরিবেশে স্বাধীন বাংলাদেশকামী, আর বাসার বাইরের মহল্লায় কট্টর পাকিস্তানপন্থী।

     প্রাগুক্ত, আমার বাসা ছিল ঢাকার নবাবগঞ্জ এলাকায় নীলাম্বর শাহ রোডে। ছাব্বিশে মার্চের পর থেকেই অধিকাংশ বাঙালি বাসিন্দা ওই মহল্লা ছেড়ে অন্যত্র (কেরাণিগঞ্জ, আটি, ইত্যাদি স্থানে) চলে যায়। যারা ছিল তাদের অধিকাংশই ঢাকার আদি অধিবাসী, দ্বিভাষী হলেও, যাদের পারিবারিক ভাষা উর্দু। আমি অনুমান করতে পারতাম না তারা কোন্‌পন্থী। আর আমার বাসার চারিপাশে যারা ছিল তাদের অনেকেই বিহারি, যাদের মাতৃভাষা উর্দু। এরা অবধারিতভাবেই পাকিস্তানপন্থী।পরিচয়সূত্রে বিহারিরা জানত আমি পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগত, যাওয়ার কোনো জায়গা না-থাকায়, বাংলাভাষী হয়েও নিরুপায় আমি রয়ে গেছি মহল্লায়। তারা ধরেই নিয়েছিল আমিও তাদেরই দলে। অভয় দিয়ে আমাকে বলেও রেখেছিল, ডরিয়ে মাত্, হামলোগ আপকা জিম্মাদার হ্যাঁয়। তাই প্রাণের ভয়ে, পারিবারিক নিরাপত্তার তাগিদে, আমাকেও দিন কাটাতে হয়েছিল তাদের একজন হয়ে, ভাঙা-ভাঙা উর্দুতে কথা বলে। তাদের সেই আস্থাকে বলবৎ রাখতে, মনোরঞ্জন করে, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ধরে, তাদেরকে শুনিয়ে-শুনিয়ে কত-যে জঘন্য গাল-মন্দ করতাম আমি মুক্তিযোদ্ধা-সহ স্বাধীনতাকামী নেতা ও প্রবক্তাদের, তা শোনাতে গেলে কানে আঙ্গুল দেবেন সবাই।মোটকথা তাদের চোখ ও মনকে ফাঁকি দিতে আমি কৃতকার্য হয়েছিলাম তাৎক্ষণিকভাবে। সে-সব কথা মনে হলে এখনও এক ধরনের গ্লানিবোধ হয়। কিন্তু প্রায় একই প্রকারের গ্লানিবোধে আমি ভুগেছি তারপরেও, ভুগছি আজও।

     দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে মুজিব-সরকার, জিয়া-সরকার, এরশাদ-সরকার, খালেদা-সরকার, হাসিনা-সরকার, খালেদা-সরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার এল। অতঃপর চলছে হাসিনা-সরকার।নানাবিধ কারণে, হয়-তো-বা নিজের বোঝার ভুলেই, কোনো সরকারের আমলকেই আমি সুনজরে দেখতে পারিনি। অথচ মুখ ফুটে তা প্রকাশ না-করে, রূপকথার সেই মন-পবনের নাও-এর মতোই, যখন যার হয়ে থাকার দরকার তার হয়ে থেকেছি, সরকারি চাকরি করতাম বলে। সেও-তো ছিল এক ভণ্ডের আনুগত্য।

     সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছি উনিশ শ তিরানব্বই-এর অক্টোবর থেকে। অর্থাৎ এখন আমি সরকারি চাকুরে নই। তবু-তো ভণ্ডামি আমাকে ছাড়েনি; উচিত কথাটা বলতে না-পেরে, গদ্দিনশীনদের স্তাবকতা করেই চলেছি। যাকে বলে মনে এক মুখে আর’… তবে কি আমি সেই দোদেল বান্দা যার মনে এক মুখে আর-এর শুরু হয়েছিল বার বছর বয়সে, উনিশ শ সাতচল্লিশের ষোলই আগস্ট থেকে?
 

মন্তব্য:
মুত্তালিব বিশ্বাস   December 29, 2009
ধন্যবাদ। যৎসামান্য মুদ্রণ-প্রমাদ আছে।
nazim   December 22, 2009
likhata khubi sundor .. ekdom hridoy chuye gelo ..
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.