Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাহিত্য  ||  ৯ম বর্ষ ৯ম সংখ্যা পৌষ ১৪১৬ •  9th  year  9th  issue  Dec 2009 - Jan 2010  পুরনো সংখ্যা
ইউসেমেটি Download PDF version
 

সাহিত্য

নিবন্ধ

 

ইউসেমেটি

 

 মীজান রহমান

 

     প্রথমে মনে হয়েছিল কোন আদিম অরণ্যের অন্তঃপুরে প্রবেশ করেছি। ভুল ভাঙ্গল যখন গাড়ি এসে থামল এক বিশাল হোটেলের দরজায়। কাঠের ফলকে বড় বড় অক্ষরে লেখাঃ তানায়া লজ। হোটেল, মোটেল বা ইন্‌ নয়, লজ। বনবাদাড়ের সঙ্গে মানানসই নাম। লজের ভেতরে আবহাওয়া অনেকটা সেরকমই- বুনো বুনো ভাব। দেয়ালে মরা হরিণের মুখ, ভালুকের চামড়া, মহিষের মস্তক, ঈগল পাখির পালক। মেঝে দেয়াল দরজা, প্রায় পুরোটাই স্থানীয় সেকোয়া গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি। পরিবেশটি আরণ্যক সন্দেহ নেই। দুঃখের বিষয় আদিমতাটা মেকি। ওটা প্রকৃতিপ্রিয় অতিথিদের চিত্তবিনোদনের জন্য বিশেষ অর্ডার দিয়ে তৈরি করা হয়েছে।

     ইউসেমেটি ন্যাশনাল পার্ক। উত্তর আমেরিকার বৃহত্তম সরকার-সংরক্ষিত জাতীয় বনভূমি। এর প্রাকৃতিক তথ্যাবলীর খবর ছোটবেলার ভূগোলের বই থেকেই জানা। ক্যানাডায় আসার পর অনেকবারই ভেবেছিলাম একবার যাব সেখানে। ছেচল্লিশ বছর থাকা হল এই মহাদেশে। একবারও ঠিক সুযোগ হয়ে ওঠেনি। বড় ছেলের কর্মস্থান খুব দূরে নয় এখান থেকে। গাড়ি করে ঘন্টাখানেকের রাস্তা। ইচ্ছে করলে একই দিনে আসা-যাওয়া সেরে ফেলা যায়। সে-ইচ্ছেটা আমার ছিল, কিন্তু যে-বয়সে ইচ্ছা এবং কর্ম দুটো একই ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে সে বয়স আমার পার হয়ে গেছে। গত বছর ছেলের বাড়িতে গিয়েছিলাম এপ্রিল মাসে। বৌমা বলল, ইউসেমেটিতে যাবার সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। তানায়া লজে ঘর ভাড়া করা হয়েছে দুরাত্রির জন্যে।

  ইউসেমেটিতে গেলাম বটে, কিন্তু নাতি-নাতনিদের ভয়ে আমি নামটা উচ্চারণ করতে সাহস পাইনি। আমি উচ্চারণ করতাম শব্দের বানান অনুযায়ী। জায়গার নাম পরিস্কার ইংরাজিতে লেখা: Yosemite. এর উচ্চারণ তাহলে ইয়োসমাইট হওয়া উচিত। Hose যদি হোজ হয়, Rose  হয় রোজ, তাহলে Yose কে ইয়োজ বা ইয়োস হতে দোষ কি। বাকি রইল mite. kite হল কাইট, bite হল বাইট, তাহলে mite কে মাইট হতে বাধা কোথায়। সুতরাং Yosemite নিশ্চয়ই ইয়োসমাইট! কিন্তু না, এ নাকি ভুল। আমার উচ্চারণ শুনে অসভ্য নাতি নাতনি দুটিতে মিলে হেসে গড়াগড়ি। ছেলে বৌমাও মিটি মিটি হাসছিল। এই একটা দোষ এদেশে জন্মানো ছেলেমেয়েদের। ঠিক নিজেদের আঞ্চলিক উচ্চারণটি ছাড়া আর কোন উচ্চারণকেই তারা শুদ্ধ জ্ঞান করে না। ওরা আমাকে শুদ্ধ উচ্চারণটি শেখাবার চেষ্টা করল। পেরে উঠছিলাম না প্রথম প্রথম, সিলেবলে ভুল হচ্ছিল বারবার। বাঙ্গালের জিভে বাংলাই আসে না ভাল করে, আমেরিকান উচ্চারণ সহজে আসবে কেন। যাই হোক, অনেকদিন প্র্যাকটিস করে করে মনে হচ্ছে আয়ত্তে এনেছি। আমার বক্তব্য হল, ইয়োসকে যদি ইউসে বলতে হয়, আর মাইটকে মেটি, তাহলে বানানটা Eusemette না হয়ে Yosemite হল কোন যুক্তিতে।

  আমাকে নিয়ে মোটমাট পাঁচজন মানুষ আমাদের দলে। অনুমান করেছিলাম রুম ভাড়া করা হয়েছে দুটি। একটি আমার, সম্ভবত একবিছানার ছোটখাট একটি ঘর। আরেকটি ওদের চারজনের জন্যে। আমার বয়সী লোকেদের সঙ্গে এক ঘরে থাকতে সবাই পছন্দ করে না। সঙ্গত কারণেই। প্রথমতঃ ওরা সব কথা খোলাখুলি বলতে সঙ্কোচ করবে। দ্বিতীয়ত আমরা বুড়োরা ঘনঘন বাথরুমে যাই, ঘনঘন বায়ুনিষ্ক্রমণ হয় আমাদের, এবং রাতের বেলা নাসিকাধ্বনি করি তুমুল গর্জনসহকারে। পুত্র-পৌত্রের সঙ্গে কিঞ্চিত্ স্থূলত্ব তবুও চলে, কিন্তু পুত্রবধূ আর কিশোরী বয়সের পৌত্রির উপস্থিতিতে সেটা খুব মার্জিত ব্যবহার বলে গণ্য হবে না। তথাপি দেখা গেল একই রুমে সবার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। একেই বলে মধ্যবিত্তের মিতব্যয়িতা। ইউসেমেটির হোটেলভাড়া কত জানিনা, তবে অনুমান করি সেটা আমার প্রথম জীবনের মাসিক বেতনের চেয়ে কম না হয়ে বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। সুতরাং খরচপত্রের ব্যাপারে সাবধান থাকাই ভাল। ঠিক হল ওপাশের বড় বিছানাটিতে শোবে ছেলেবৌমা আর আট বছরের নাতনি লায়লা। আর এদিকের ছোট বিছানাটিতে গোঁজাগুঁজি করে থাকব আমি আর আমার বারো বছরের নাতি মীজান। তৃতীয় প্রজন্মের সাথে ঘনিষ্ঠতা স্থাপনের এর চেয়ে বড় সুযোগ আর কি হতে পারে। যদিও সকালবেলা কার ঠ্যাং কার ঘাড়ে সওয়ার হবে, বা কার ধাক্কায় কে খাটচ্যুত হয়ে ধরাতলে গড়াগড়ি যাবে ঘুমের ঘোরে সেবিষয়ে দুজনের মধ্যে আগে থেকে কোনও ফায়সালা হয়নি। সৌভাগ্যবশতঃ আমরা দুজনই অক্ষত অবস্থায় স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করতে সক্ষম হয়েছিলাম।

     দুপুরের খাবার ব্যাগে করে নিয়ে এসেছিল সোফিয়া। হোটেলের রুমে বসেই সেগুলোর সদ্ব্যবহার হয়ে গেল। খেয়েদেয়ে আমরা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলাম আধুনিক পর্যটকরা যেভাবে বেরোয়। দুরূহ ও দুর্গম পথের জন্যে সুপ্রস্তুত। ডিজিটাল ক্যামেরা, ভিডিও, দূরবীন (দূর থেকে পাহাড় প্রপাত ইত্যাদি যাতে দেখা যায় ভাল করে), একাধিক সেলফোন যাতে টেক্সট মেসেজ প্রেরণ-প্রাপন দুয়েরই ব্যবস্থা আছে; এক ঝাঁকা আহার্যসামগ্রী (স্ন্যাক খাবার ইচ্ছে তো সবারই হতে পারে রাস্তায়), গুটিকয়েক পানির বোতল, হাতমুখ প্রক্ষালনের জন্যে স্যানিটাইজারের শিশি, ফার্স্ট এইড কিটস্, গোটাদুই ভাঁজকরা প্লাস্টিকের চেয়ার (প্রধানতঃ আমার জন্যে, হাঁটতে হাঁটতে যদি পা ধরে আসে কখনো), সর্বোপরি গাড়ির আভ্যন্তরীন যন্ত্রপাতির সঙ্গে সংলগ্ন এক অত্যাশ্চর্য যন্ত্র যার নাম জিপিএস। লায়লার কাছ থেকে শিখলাম যে এটা হল গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমের সংক্ষিপ্ত নাম, যেটি ছাড়া এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা একেবারেই হেল্পলেস। গাড়িতে যথেষ্ট তেল আছে কিনা সেটাও ভাল করে দেখে নেওয়া হল। সাবধানের মার নেই। ইউসেমেটিতে যথেষ্ট তেল ছাড়া যাতায়াত করাটা শুধু ঝুঁকিপূর্ণ নয়, বেআইনিও। এটা সরকারি পার্ক, প্রমোদোদ্যান নয়। এখানে দৃষ্টির ত্রিসীমানায় কোন গ্যারাজ নেই। গাড়ি নষ্ট হয়ে গেলে সারাবার ব্যবস্থা নেই কোথাও। সুতরাং ভাঙ্গা গাড়ি নিয়ে কেউ যেন ইউসেমেটি দেখতে না যান।

     বলা বাহুল্য ইউসেমেটির রাস্তাঘাট বড় শহরের মত নয়। সেখানে ছয় লেন বা চার লেনের বিভক্ত রাজপথ আশা করা বোকামি। রাস্তা যে আছে আদৌ, এবং মসৃণ পীচঢালা রাস্তা তাই অনেক ভাগ্য। ইউসেমেটির উচ্চতা ৪ হাজার ফুটেরও বেশি। বেশির ভাগ রাস্তাই পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে, কিম্বা উঁচু উপত্যকার ওপর। অনেক জায়গায় পাহাড়ের ধারে সরু রাস্তায় এমন দৃশ্য যে গাড়ি থেকে নিচে খাদের দিকে তাকালে মাথা ঘুরে যাবার অবস্থা হয়। একটু উনিশবিশ হলে সোজা পাতালপুরি- দুই আড়াই হাজার ফুট খাড়া পর্বতের গাছগাছারি আর ঝোপজঙ্গলের মধ্য দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে গিরিদেবের পাদমূলে উপনীত হওয়া রক্তমাংসের সদ্যনির্মিত কোপ্তাতে পরিণত হয়ে। কোন কোন জায়গায় দেখা যাচ্ছিল আগুনে পোড়ার লক্ষণ। শত শত একর জমি পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে- হাজার হাজার পোড়া গাছ কয়লার শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের গায়ে। সোফিয়ার কাছ থেকে জানলাম, এই পোড়াটা মানুষের কাজ নয়, প্রকৃতির। প্রতি বছরই গ্রীষ্ম আর হেমন্তে মেঘ ডাকে এখানে, বজ্রপাত হয়, সেই বজ্রের অগ্নিশিখা থেকে সৃষ্টি হয় অগ্নোৎপাত। মাইলের পর মাইল গাছপালা বনলতা পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। তারপর সেই ভস্মের ওপর জন্ম নেয় নতুন জীবন, দ্বিগুন ত্রিগুন তেজের সঙ্গে কাজে লেগে যায় বন। গাছেরা পাতারা ভোরের পাখিদের মত নবজীবনের উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে নিসর্গ জুড়ে। বাগানের মালী যেমন করে কাঁচি দিয়ে নিড়ায় তার মাটিকে, তারপর সার ফেলে জল ঢেলে করে তোলে প্রাণবন্ত, প্রকৃতির বনেরাও তেমনি আকাশের আগুন দিয়ে প্রথমে পোড়ায় নিজেদের, পরে সেই আকাশেরই পানি দিয়ে পুণ্য উর্বরতায় চাঙ্গা করে তোলে শরীরকে। ইউসেমেটির এখানে ওখানে পাহাড়ের গায়ে গায়ে পোড়া বনের দৃশ্য দেখে প্রকৃতির এই বিচিত্র জীবনধারার স্বরূপ জানবার সুযোগ পেলাম। আগে ভাবতাম আগুন মানেই ধ্বংস। সেটা যে সত্য নয় তা বলছিনা। যে আগুন মানুষ ধরায় সেটা আসলেই কেবল ধ্বংস করে। কিন্তু যে আগুন প্রকৃতি ধরায় তাতে থাকে সৃষ্টির বীজ।

     আবহাওয়া বেশ ভাল ছিল সেদিন। পরিস্কার নীল আকাশ। যদিও ঠাণ্ডা। বেশ ঠাণ্ডা পাহাড়ের ওপর। এপ্রিলের শেষ, ক্যানাডার বরফ গলে স্রোতস্বিনী হতে শুরু করেছে, কিন্তু ইউসেমেটির সব বরফ গলেনি তখনো। এখানে ওখানে গাছেদের গায়ে গায়ে থাক থাক বরফ জমা হয়ে ছিল। বিরাট বিরাট গাছ সেখানে, প্রধানত সেকোয়া গাছ। অধিকাংশ গাছের বয়স একশ দেড়শ বছর। বেশ কিছু তার চেয়েও পুরনো, পাঁচশ ছয়শ বছরের গাছও আছে সেখানে। উচ্চতায় এদের একেকটি দেড়শ দুশ ফুট ছাড়িয়ে যাবে অনায়াসে। দুয়েকটি এতই বিশাল যে গোড়ার কাণ্ডতে তাদের পরিধি হবে আশি নব্বুই ফুট। গাড়ির ভেতর থেকে গাছগুলোকে মনে হচ্ছিল আদিঅন্তহীন। পাহাড়ের তলা থেকে উঠে এসে আকাশকে স্পর্শ করতে উদ্যত। ওপরে উঠে তারা যেন একে অন্যের গা জড়িয়ে সৃষ্টি করেছে এক বিচিত্র চাঁদোয়া। পাতায় পাতায় ঢেকে দিয়েছে আকাশের আলোপথ। একটা প্রাচীন সেকোয়ার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে কেবল অকিঞ্চিৎকরই মনে হয় না, মনে হয় একেবারে অবান্তর। এই গাছগুলো ইউসেমেটিকে একটা চিরন্তন অবিনশ্বরতার রূপ দিয়েছে।

     ঘন্টাখানেক পর হঠাৎ করেই আকাশ যেন তার রাজ্য পুনরুদ্ধার করে পূর্ণ গৌরবে উপস্থিত হল আমাদের সামনে। অরণ্য অন্তরালে গিয়ে ঠাঁই করে দিল আলোকে। একটা খোলামেলা জায়গা, যেখানে ইঁটের বাঁধ দিয়ে ঘেরাও করা হয়েছে পাহাড়ের পার্শ্বস্থল, স্পষ্টতই ভ্রমণকারীদের নিরাপত্তা ও সুবিধার্থে বিশেষভাবে তৈরি করা পরিবেশ, যাকে বলা হয় অবজারভেশন পয়েন্ট বা বীক্ষণ মঞ্চ। সেখানে গাড়ি থামিয়ে মানুষ সামনের পাহাড় দেখে, দূরের ঝর্না দেখে দূরবীন দিয়ে, ছবি তোলে পরস্পরের, পাহাড়কে পশ্চাতে রেখে। প্রকৃতি সেখানে আপন রূপেতে আপনি মুগ্ধ, আপনি আবিষ্ট। সেখানে আকাশ আর পর্বত পরস্পরের সীমানা লঙ্ঘন করে কোথায় কোথায় চলে যাচ্ছে যেন। সেখানে নিসর্গ নিশ্চল হয়েও চলমান। নির্বাক হয়েও প্রগলভতায় লাস্যময়। ওদের দূরবীন দিয়ে আমি দেখলাম চারিদিক। দূর থেকে দুরন্ত প্রপাত, ভার্নাল ফল্‌স্‌ যার নাম, যাকে পরের দিন কাছে থেকে দেখতে যাবার কথা, সে দূরবীনের কাচে এসে অভিবাদন জানাল আমাকে। ওরা ছবি তুলল অনেক। বাচ্চাদের, নিজেদের। নানা ভঙ্গিতে, নানা হাসিতে, নানা মুগ্ধতায়। ছবি তুলল আমারও। তেমন দূর তো আর নয় সেই দিনটি যখন এই ছবিগুলোই আমাকে এখানে নিয়ে আসার কথা মনে করিয়ে দেবে ওদের।

ইউসেমেটির একটা ভৌগোলিক কাহিনী আছে। একটা ঐতিহাসিক কাহিনীও। দুটোই বিশাল। বলতে গেলে এবেলা ফুরিয়ে আরো অনেক বেলা গড়াবে। সবটা আমার জানাও নয়। যা জানার তার একাংশও আসলে জানা নেই আমার। যেটুকু জানি তারই সারাংশ বলব এখানে, একটা ধারাবাহিকতা রক্ষার খাতিরে।

     ইউসেমেটির মানচৈত্রিক অবস্থান স্যানফ্রান্সিস্কো শহর থেকে প্রায় দুশ মাইল পূর্বে সিয়েরা নেভাদা পর্বতমালার অঙ্কে উপবিষ্ট ১,১৮৯ বর্গমাইল ব্যাপী এক সুবিশাল বনভূমি, যদিও মূল উপত্যকাটি, যা ভ্রমণামোদীদের গম্যসীমার অন্তর্গত বলে গণ্য করা হয়,  তার আয়তন ৭ বর্গমাইলের বেশি হবে কিনা সন্দেহ। দুটি বড় বড় নদী প্রবাহিত হয় পার্কটির এলাকা দিয়ে- মার্সেড এবং তুলাম্নি। মার্সেড ইউসেমেটি উপত্যকার ভেতর দিয়েই যায় বলে পর্যটকদের চোখে সহজেই দৃষ্টিগোচর। তুলাম্নির গতিপথ পর্বতরাশির কন্দরে কন্দরে, যা উপত্যকার পথচারিদের দৃষ্টিসীমার বাইরে। উপত্যকাটি পার্ক এলাকার প্রায় মধ্যস্থলেই অবস্থিত বলা যায়।

      গোটা পার্কে ষাটোর্ধ প্রজাতির প্রাণী বাস করে, আর বাস করে দুশ প্রকারের পাখি। বেশির ভাগের চারণক্ষেত্র ঘন অরণ্য আর পর্বতগাত্র। ইউসেমেটি পার্কে ত্রিশ রকমের বৃক্ষ এবং তেরোশ প্রকারের উদ্ভিদ আছে বলে বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস।

     ভূতাত্বিকদের মতানুসারে, বহু লক্ষ বছর আগে ক্যালিফোর্নিয়ার সিয়েরা নেভাদা পর্বতমালার উত্থান ঘটেছিল ভূপৃষ্ঠের দীর্ঘকালীন ও ক্রমিক আন্দোলন এবং উৎক্ষেপণের কারণে। পর্বত যত উর্ধগামী হতে থাকে পশ্চিমস্রোতা মার্সেড নদীর গতিবেগ ততই তীব্রতা অর্জন করতে থাকে, যার ফলে কালে কালে জন্ম নেয় এক কোনাকৃতি গিরিখাত। তারপর আসে মহা হিমবাহ। প্রলয়ঙ্কর হিমের স্রোত তীব্রবেগে, তীক্ষ্ণধারে, বইতে শুরু করে গিরি-গুহা-গহ্বর বিদ্ধ করে, চূর্ণ করে। তার স্রোতধারা পাহাড়ের গা কেটে কেটে, নিপুণ ভাস্কর যেমন করে অসীম ধৈর্যের সাথে পাথর কেটে নির্মাণ করে তার কল্পনার মূর্তি, তেমনি করে প্রকৃতির সেই অনবদ্য ভাস্করও রচনা করে গেছে তার অমর কারুকার্য, যার সুস্পষ্ট স্বাক্ষর এখনো গাঁথা রয়েছে ইউসেমেটির পাহাড়ে পাহাড়ে, পাথরে পাথরে। আজকে ইউসেমেটির পর্বতশিলাতে দাঁড়িয়ে আমরা যখন গ্র্যানাইট পাথরের উল্লম্ব দেয়ালের অঙ্গ স্পর্শ করি তখন আমাদের মন দেহ যেন আপনা থেকেই হিমায়িত হয়ে প্রবলবেগে ছুটতে শুরু করে সেই হিমবাহের পদরেখা অনুসরণ করে। যেন লক্ষ কোটি বছরের অশরীরি আত্মারা এখনো বিরাজমান সেখানে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিশাল, সবচেয়ে উঁচু (৩,৫৯৩ ফুট যার উচ্চতা), পৃথিবীর বৃহত্তম একশিলাবিশিষ্ট গ্র্যানাইট পর্বত, তার নাম এল্‌ ক্যাপিটান। পর্বতারোহীদের স্বপ্নগিরি, পর্বতপূজারীদের মহত্তম দেবালয়, পর্বতপ্রেমিকদের প্রাণেশ্বরী। আরেকটি পাহাড়ের নাম আধা গম্বুজ। উচ্চতায় ৫,০০০ ফুট, দূরবীন দিয়ে দেখলে সত্যি সত্যি মনে হয় যেন কোন খেয়ালি স্থপতি অর্ধেকটা করোটি স্থাপন করেই কি ভেবে স্থগিত রেখেছিলেন তার কাজ, তারপর তিনি আর কখনো ফিরে আসেননি সে-কাজ সম্পন্ন করতে। ওই রহস্য যুগ যুগ ধরে হাফ ডোমের অপরূপ করোটিকে ঘিরে রচনা করে রেখেছে এক সম্মোহনী মায়াজাল। কে জানে কি ছিল সেই খেয়ালি শিল্পীর মনে। কে জানে কোনও নিগূঢ় সংকেত আছে কিনা প্রকৃতির এই আপাত অসমাপ্ত কাজের মধ্যে। সমাপ্তি আর অসমাপ্তির মাঝে ব্যবধানই বা কোথায়, কোন্‌ সূক্ষ্ণ রেখাতে তারা বিভক্ত হয়ে যায়, সেই ধাঁধাটিই কি প্রশ্নের মত করে খোদাই করা হয়েছে আধা গম্বুজের কঠিন পাথরের গায়ে?

     ভিডিও এবং ক্যামেরাভক্ত সাধারণ পর্যটকদের জন্যে ইউসেমেটির বড় আকর্ষণ হল তার চিত্তাকর্ষক জলপ্রপাতগুলো। ভ্রমন এলাকার প্রথমদিকে যে প্রপাতটির মুখোমুখি হয় মানুষ, যেমন আমরা হয়েছিলাম প্রথমদিন, তার নাম ব্রাইডেলভেইল ফল্‌স। বাংলায় একটা সুন্দর শব্দ খুঁজতে প্রলুব্ধ হচ্ছি- পাচ্ছিনা বলে ভাবছি নবোঢ়াবরণ প্রপাত বললে কেমন শোনায়। নাহ, বাজে, কি বলেন। এর উচ্চতা ৬২০ ফুট। উপত্যকার দক্ষিণপার্শ্বের পর্বতশিখরে তার জন্ম। স্থানীয় আদিম অধিবাসীরা, আহুয়ানিঢ়ি সম্প্রদায়ের আমেরিকানরা, একে বলে স্পিরিট অফ দ্য পাফিং উইণ্ড- হাঁপি হাওয়ার আত্মা। কাছাকাছি আরেকটা প্রপাত্ যার নাম ইলিলুটি ফল্‌স্‌। তবে ইউসেমেটি উপত্যকার সবচেয়ে চমকপ্রদ, সবচেয়ে রাজসিক যে প্রপাত তার নাম ইউসেমেটি ফল্‌স্‌। উচ্চতায় (২,৪২৫ ফুট) সে সবার সেরা, বিস্তার আর ব্যাপ্তিতে সে সবার সম্রাট। নিচে থেকে উপরের দিকে তাকালে তার উৎস দেখা যায়না, প্রায় আধ মাইল ওপর থেকে তার পতন, সে যেন নিজেই নিজের উত্স, নভোদেবতার আপন সন্তান, কালের পদধ্বনিকে স্তব্ধ করে দিয়ে সে বইছে, বইছে, নিরন্তর সে ঝরছে অঝোরধারে। ইউসেমেটি প্রপাত আসলে একটি প্রপাত নয়, দুটি, যার একটির নাম আপার ফল্‌স্‌, আরেকটি লোয়ার, সঙ্গত কারণেই, এবং দুটিকে সংযুক্ত করে রেখেছে ৬৭৫ ফুট উচ্চতা থেকে আছড়ে পড়া এক ক্ষুব্ধ ক্রুদ্ধ জলধারা।

     ভার্নাল ফল্‌স্‌, একটু আগেই যার উল্লেখ করা হল, আর নেভাদা ফল্‌স্‌- তারা যে পাথরের ওপর থেকে গড়িয়ে পড়ে নিচে তারা সরাসরি হিমবাহ দ্বারা সৃষ্ট পাথর। খাড়া পর্বত, খাড়া প্রপাত। নেভাদা ফল্‌স্‌ (৫৯৪ ফুট) এতই তীব্র, এতই ক্ষিপ্ত তার গতিবেগ যে ইণ্ডিয়ানরা তার নামকরণ করেছে, ইও-ওয়াইপি, বা দ্য টুইস্টেড ফল্- বিকৃত প্রপাত।

     এবার আসা যাক ইউসেমেটির ইতিহাসপ্রসঙ্গে। বলা বাহুল্য ভূগোলের চেয়ে ইতিহাস অনেক শক্ত, কারণ ভূগোলে দ্বিমতের অবকাশ নেই, ইতিহাসে আছে। অন্তত দুটি মত তো থাকবেই- একটা বিজেতার, একটা বিজিতের। এবং একটা দেশ বা একটা জাতির ইতিহাস বলতে সাধারণত তাই বোঝায়- হয় কারো জয়, নয় কারো পরাজয়। ইউসেমেটিও তার ব্যতিক্রম নয়। দুঃখের বিষয় যে উত্তর আমেরিকার বিজিত জাতিরা এমন নিদারুণ এবং নির্মমভাবে পরাজিত যে তারা মাথা খাড়া করে নিজেদের ইতিহাস লিখবারও সুযোগ পায়নি। তাদের ইতিহাস বয়ে বেড়ায় বাতাস, বন আর ঈগল পাখিরা, হয়তবা তাদের রুদ্ধ রুষ্ট দেবতারাও। আমি সে ইতিহাস জানিনা, তবে অনুমান করতে পারি আজ থেকে সোয়াশ দেড়শ বছর আগে কি ঘটেছিল এখানে। কিছুটা যা জানি, বিজয়ীর লিপিবদ্ধ ইতিহাস থেকে তারই ছিটেফোঁটা জানাচ্ছি পাঠককে।

     একসময় ইউসেমেটি এলাকাটি ছিল পুরোপুরি ইণ্ডিয়ানদের দখলে। হাজার হাজার বছর ধরে তারা বসবাস করেছে সেখানে। সাদারা ক্যালিফোর্নিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে বসতি স্থাপন করছিল ঠিকই, কিন্তু ইউসেমেটির প্রতি মনোযোগ দেয়নি, হয়ত দূরধিগম্য পর্বত আর বনজঙ্গলের কথা ভেবেই তারা পিছিয়ে থেকেছে। ১৮৩০ সাল পর্যন্ত ইউসেমেটি ছিল সম্পূর্ণ সাদামুক্ত। তারপর বোধ হয় কোনভাবে খবর পৌঁছালো তাদের কানে যে বনজঙ্গল আর জন্তুজানোয়ার যাই থাক, ইউসেমেটির নদীনালা খালখন্দরে প্রচুর স্বর্ণ আছে। সেটা ছিল ক্যালিফোর্নিয়ার বিখ্যাত স্বর্ণযুগ। সভ্যতার স্বর্ণযুগ হয়ত বলা ঠিক হবে না, বরং অসভ্যতার স্বর্ণযুগ বললে খুব অত্যুক্তি হয়না। সব সাদাই তখন সোনার পেছনে ছুটছে। সেটাকে সাদা ইতিহাসে বলা হয় গোল্ড রাশ। সেই রাশের হাওয়া শেষ পর্যন্ত ইউসেমেটির দিকেও বইতে শুরু করে। সাদারা ছোট ছোট দলে প্রবেশ করতে থাকে ইউসেমেটি এলাকাতে, খুঁজতে থাকে কোথায় সোনা আছে। স্থানীয় ইণ্ডিয়ানরা স্বভাবতঃই তাদের এই অনধিকার প্রবেশকে খুব ভাল চোখে দেখেনি। তারা ওদের বাধা দেবার চেষ্টা করে। দুদলে হাতাহাতি মারামারি হয়, খুনজখম হয় কিছু। সাদারা তাতে রেগে যায় খুব। তারা আরো লোক নিয়ে ঢোকে এলাকাতে। আরো অস্ত্র আসে। ঘাতপ্রতিঘাতের মাত্রা কেবলই বৃদ্ধি পেতে থাকে। ইউসেমেটির ইণ্ডিয়ানদের বেশ খ্যাতি ছিল দুর্ধর্ষ যোদ্ধা হিসেবে। তারা একের পর এক আক্রমণকে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। একবার এমন অবস্থা  দাঁড়ায় যে বিপুল সংখ্যা হওয়া সত্বেও সাদাদল দারুণভাবে মার খায় ইণ্ডিয়ানদের হাতে। প্রচুর লোকক্ষয়ও হয়ত হয়েছিল তখন। সেযুগে তো আন্তর্জাতিক আইনকানুন মেনে চলার বালাই ছিল না কোন পক্ষেই। সুতরাং হিংস্রতা পাশবিকতা ইত্যাদি ভারি ভারি শব্দ নিয়ে কেউ মাথা ঘামাতো না যুদ্ধক্ষেত্রে। শত্রু পেয়েছি হাতের কবলে, তাকে কতল কর- এই ছিল মন্ত্র। সাদারা এই পরাজয়, এই অপমান সহজভাবে নেয়নি, সেটা সহজবোধ্য। তারপর তারা ১৮৫১ সালে প্রতিশোধের যে পন্থা নিয়ে ফিরে আসে সেখানে তাতেই ঘুরে যায় ইতিহাসের চাকা। ছোটখাট দল নয়, ম্যারিপোসা অঞ্চল থেকে পুরো একটা বাহিনী এসে যুদ্ধে নেমে গেল প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র আর রসদসহকারে। ইণ্ডিয়ানদের ক্ষমতা ছিল না এত বড় আক্রমণকে রোধ করা। তারা বাধ্য হয় পরাজয় স্বীকার করতে। কিন্তু সাদারা তখন প্রতিহিংসায় অন্ধ, রক্তপিপাসায় উন্মত্ত। কথিত আছে (এবং এ তথ্যটি বোধ হয় ইণ্ডিয়ানবর্ণিত ইতিহাস থেকে কেউ ভুলে তুলে নিয়েছে অসাবধানতাবশতঃ) যে তারা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে পরাস্তই করেনি শত্রুপক্ষকে, বর্বরভাবে, অমানুষিক নিষ্ঠুরতার সঙ্গে কচুকাটা করেছে- ছেলেমেয়েশিশুবৃদ্ধ নির্বিশেষে। সেই গণহত্যার পর ইণ্ডিয়ান সম্প্রদায় এমনই দুর্বল, হতাশ আর ভগ্নদশা হয়ে পড়ল যে তারা কোনদিনই আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। বলতে গেলে তারা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ইউসেমেটি এলাকা থেকে। আজকের সুশীল সুসভ্য প্রকৃতিপ্রেমিক পর্যটক ইউসেমেটিতে গিয়ে দেখবে প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি বন উপবন, প্রতিটি পাথর ইণ্ডিয়ান নাম দ্বারা অলংকৃত, কিন্তু সমস্ত সাত বর্গমাইল ব্যাপী এলাকা জুড়ে একটি জীবিত ইণ্ডিয়ান কারো চোখে পড়বে কিনা সন্দেহ। অন্ততঃ আমার চোখে পড়েনি। সভ্য জাতি অসভ্যদের কাছ থেকে সবকিছুই ছিনিয়ে নিয়েছে, কেবল তাদের নামগুলিই রেখে দিয়েছে পরম যত্ন ও সম্মানের সাথে।

     ইউসেমেটির বনসম্পদের প্রতি ঔপনিবেশিকদের লোভাতুর দৃষ্টি হয়ত গোটা বনভূমিকে পোড়োভূমি করে ফেলত একসময়, যদিনা তত্কালীন সরকার হস্তক্ষেপ করতেন যথাসময়ে। আব্রাহাম লিঙ্কন ছিলেন তখনকার প্রেসিডেন্ট। ১৮৬৪ সালে তাঁর লিখিত দানপত্র অনুযায়ী ইউসেমেটি এলাকাটির স্বত্বাধিকার হস্তান্তরিত হয়ে গেল ক্যালিফোর্নিয়ার অঙ্গরাজ্য সরকারের কাছে। সাধারণ সম্পত্তি হিসেবে নয়, সরকারি পার্ক এবং বিনোদনক্ষেত্র হিসেবে। প্রেসিডেন্ট লিঙ্কন যে অসম্ভবরকম প্রকৃতিপ্রেমিক ছিলেন তা নয়। যে-লোকটা ছিলেন এবং আমেরিকার বনসংরক্ষণের জন্যে যে লোকটা আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন তাঁর নাম জন মিউয়ের। তিনি নিজে, একা, বনপ্রকৃতির দুর্দমনীয় আকর্ষণ ও বনপ্রানীদের প্রতি সীমাহীন মমতায়, পদব্রজে ভ্রমণ করেছিলেন গোটা ইউসেমেটি অঞ্চল। অপেক্ষাকৃত সুগম উপত্যকা শুধু নয়, দুরূহ দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলও। উদ্ভিদজগত নিয়ে তিনি অনেক বই লিখে গেছেন, অনেক প্রামান্য তথ্য লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। রাজনীতির ক্ষমতাবানদের কাছে বনের স্বার্থ নিয়ে সলাসুপারিশ করতেও দ্বিধা করেননি। তাঁরই অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল ছিল লিঙ্কনস্বাক্ষরিত সনদ, বলা চলে। ১৮৯০ সালে আমেরিকান কংগ্রেস আইন পাস করে ইউসেমেটিকে জাতীয় পার্ক হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ত্তাধীন করে নেয়। তবে মূল উপত্যকা এবং ম্যারিপোসা গ্রোভ, জায়গাদুটি বাদ দিয়ে। শেষে ১৯০৬ সালে উপত্যকাসহ পুরো এলাকাটাই কেন্দ্রীয় সরকারের এক্তিয়ারে চলে আসে। উল্লেখ্য যে সেসময় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন থিওডোর রুজেভেল্ট, সম্ভবতঃ যুক্তরাষ্ট্রের সর্বপ্রথম অপেক্ষাকৃত মুক্তমনা, প্রগতিপন্থি ও পরিবেশ সচেতন প্রেসিডেন্ট। তাঁর শাসনকালে আমেরিকার সাধারণ মানুষদের স্বার্থে অনেক ভাল ভাল আইন পাস হয়। তিনি ছিলেন নরমের বন্ধু, শক্তের যম। জীবজগতের ক্ষেত্রেও তাঁর ছিল একইরকম উদার মনোভাব। কথিত আছে যে একবার শিকারে গিয়ে তিনি একটি শিশু ভালুককে গুলি করতে রাজি হননি। সেই ঘটনা নিয়ে সারা দেশ জুড়ে তখন তুমুল কল্পনা জল্পনা। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি, সম্পাদকীয় নিবন্ধাদি। এনিয়ে এক পত্রিকায় কার্টুন বের হল একটি। সেই কার্টুন দেখে এক ব্যবসায়ীর মাথায় ঢুকল এক বুদ্ধি। টেডি বেয়ার (থিওডোরের চলতি নাম হল টেডি) নাম দিয়ে একটা শিশুভালুক সদৃশ খেলনা ছেড়ে দিলেন বাজারে। সেই খেলনার ব্যবসা কতখানি সফল হয়েছে তা পৃথিবীর কারুরই অজানা নয়। গল্পটার সারমর্ম এই যে থিওডোর রুজেভেল্টের আমলেই যে সমগ্র ইউসেমেটি এলাকাটি জাতীয় পার্কে পরিণত হয়ে গেল সেটা কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়, কার্যকারণসম্পর্কিত ঘটনা।

     পরের দিন খুব সকাল সকাল বেরিয়ে গেলাম হোটেল থেকে। প্ল্যান ছিল সারাদিন ঘুরে ঘুরে যতটুকু দেখা যায় দেখব। কোথায় কোথায় না গেলেই নয় সেটা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল সোফিয়া। ইউসেমেটি ফল্‌স্‌, এল ক্যাপিটান, মিরর লেক, এগুলো সব পর্যটকেরই আবশ্যিক তালিকার অন্তর্ভুক্ত। এল ক্যাপিটানের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে না পারলে তো ইউসেমেটিতে যাওয়াই বৃথা, জানালো আমার প্রিয় পুত্রবধূ। সুভেনিয়রের দোকান থেকে কিছু-না-কিছু কিনতেই হয়, তা নাহলে বন্ধুবান্ধব জানবে কি করে আমরা ওখানে গিয়েছিলাম। সোফিয়ার তালিকাতে আরো দুয়েকটি জায়গা ছিল যা হয়ত অন্যান্য দর্শকদের কাছে তেমন আকর্ষণীয় নয়। ওগুলো তার ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে জড়িত। ছোটবেলায় ওর বাবা ওকে নিয়ে আসতেন এখানে- ওর জন্মস্থান ইউসেমেটির আড়াইশ মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে। দুএকবার নাকি স্কুল থেকেও বাসে করে নিয়ে আসা হয়েছিল ইউসেমেটিতে। শুধু যে দেখতে এসেছিল তাই নয়, ক্যাম্প করে একরাত থেকেও ছিল ছেলেরা মেয়েরা মিলে। এ জায়গাগুলোর সঙ্গে সোফিয়ার নাড়ির যোগ, গাঢ় আবেগের ব্যাপার আছে একটা, সেটা বুঝি। ওগুলো না দেখলেই নয়। কিন্তু এতসব কি দেখা যাবে একদিনে?

গাড়ি যখন ইউসেমেটি ফলসের পাদদেশে পৌঁছালো তখন বেলা দশটা। পার্কিং লট থেকে মনে হল, এই তো কয়েক পা এগুলেই ঝর্নার ধারে পৌঁছে যাব। এই তো চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল পর্বত, হাত বাড়ালেই তো ছোঁয়া যাবে তাকে। কিন্তু কি আশ্চর্য, এই কয়েকপা এগুনো, হাত-বাড়ানো দূরত্বটুকু পার হতেই প্রায় আধঘন্টা সময় কেটে গেল। ওরা হয়ত পনেরো মিনিটেই চলে যেতে পারত, কিন্তু আমার বুড়ো পায়ের জন্যে আধঘন্টাই জুলুম। হাঁপাতে হাঁপাতে শেষ পর্যন্ত পৌঁছুলাম যতটুকু কাছে যাওয়া সম্ভব। উঁচু পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্না আমি আগে দেখিনি কখনো। ছাত্রজীবনে একবার দেখেছিলাম ইংল্যাণ্ডের লেক ডিস্ট্রিক্টে বেড়াতে গিয়ে, অনেক ছোট আকারের ঝর্না ছিল সেটা; পরে ক্যানাডায় এসে দেখলাম নায়গ্রা ফল্‌স্‌ যা আদৌ পাহাড়ি ঝর্না নয়। বড় পাহাড়ের যে একটা বড় উপস্থিতি, তা এমনিতেই মানুষের চেতনাতে  স্থায়ী দাগ কেটে রাখে- সেই বিশালতার দর্পণে আমাদের ক্ষুদ্রতা প্রকটভাবে ফুটে ওঠার কারণেই হয়তবা। কিন্তু কেবল বস্তু, ভার আর আয়তন দ্বারাই যে অভিভূত হই আমরা তা নয়, সময় নামক এই যে একটা তরল ব্যাপার আছে সংসারে যা অন্ধ স্রোতের মত বয়েই যাচ্ছে বয়েই যাচ্ছে, বড় একটা পাহাড়ের সামনে দাঁড়ালে মনে হয় ওটাও যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। সময়কে তখন আর একমাত্রিক নিরাকার অস্তিত্ব বলে মনে হয়না। মনে হয় সে ছড়িয়ে পড়েছে চতুর্দিকে, আর তার বিস্তৃত পরিধির মধ্যে আবদ্ধ করতে চাইছে এই বিপুল দৈত্যসম পর্বতটিকে। সময়ের সত্যিকার স্বরূপ জানেন কেউ? তার শুরু কোথায়, শেষ কোথায়? এই অন্তহীন জিজ্ঞাসা যেন পাহাড়ের গায়ে বারবার ধাক্কা খায়।

     প্রকাণ্ড দুটো পাথর সেই ঝর্নার পায়ের কাছে। একেকটি পাথরের আয়তন হবে আমার অটোয়ার বাড়ির সমান। ছোটরা, তরুণরা, প্রেমিকরা, হন হন করে উঠে গেল পাথর বেয়ে, ছোটবেলায় আমি যেমন ছাদে উঠে যেতাম ঘুড়ি ওড়াবার জন্যে। ঝর্নার উগরানো জলে পিচ্ছিল হয়ে ওঠা পাথরের গায়ে সাবধানে পা টিপে টিপে তারা প্রপাতের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। গা ভেজালো, পরস্পরের মুখে ছুঁড়ল, গালে মাখল, তারপর সেই ভেজা গাল মুছে দিল চুম্বনের উষ্ণতায়। আমি দাঁড়ালাম। ওরা ছবি তুলল। হাসিতে, লজ্জায়, ভালোলাগায়, চুল খুলে, চুল বেঁধে, প্রগলভতায়, নির্ভাবনায়। আমি দেখলাম। আমি ভাবলাম। আমার মনে ছবি ভাসল, অনেক অনেক পরিচিত পুরাতন ছবি। হা যৌবন, বিগত যৌবন! আমি কাছে যেতে সাহস পেলাম না। পা পিছলে পড়ে যেতে পারি। পানির ছিটাতে জামাকাপড় ভিজে ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে। ঠাণ্ডা ঝর্নার পানিতে, বৃষ্টির পানিতে, ছোটরা মজা করে খেলা করে, বুড়োরা কাঁপে, ঠাণ্ডায়, নিমোনিয়ার ভয়ে। আমি প্রকাণ্ড পাহাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে ক্ষুদ্র হয়ে থাকলাম, ওরা ওপরে দাঁড়িয়ে ভিজল, বৃহৎ হল। ছবি তুলল, একের পর এক, পরিপার্শ্বের, পাহাড়ের, ঝর্নার। ওদের ডিজিটাল ক্যামেরাতে সময়কে ধরে রাখার খেলা চলল সারাবেলা, রচিত হল মধ্যবিত্ত পরিবারের স্মৃতিচিহ্ন গেঁথে রাখার মূঢ় প্রয়াস।

     দেখতে দেখতে লাঞ্চের সময় হয়ে এল। রেস্টুরেন্ট খুঁজতে হয়। ততক্ষণে বেশ ভিড় হয়ে গেছে পার্কের পর্যটন এলাকায়। ইউসেমেটির মত নিরালা জায়গাতেও রীতিমত যানজট। ওরা ঠিক করল (ওরা মানে আমার ছেলে ও বৌমা), গাড়ি যেখানে পার্ক করা আছে সেখানেই থাকবে। রেস্টুরেন্ট বা অন্য কোথাও যেতে চাইলে গাড়ির ঝামেলায় না গিয়ে সরকারি টুরবাস ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তথাস্তু বলে আমরা বাসে উঠে গেলাম। ওরা যা ঠিক করেছে তাই পালন করা হবে, অবশ্যই। একসময় আমার স্ত্রী আর আমি সিদ্ধান্ত নিতাম, ওরা পালন করত। এখন তার উলটো। এখন ছোটরা সিদ্ধান্ত নেয়, আমরা পালন করি। এইতো সংসারের নিয়ম। তবুও বিষয়টি মনের কোনাতে দাঁড়িয়ে কি যেন ভাবল খানিকক্ষণ।

     রেস্টুরেন্ট এলাকাটি নেহাত্‌ হেলাফেলা করার মত নয়। ছোটখাট একটা হাটবাজারের মত- এদেশে বলে রেস্ট এরিয়া। পথিক আর ভ্রমণামোদীদের জন্যে যা যা দরকার প্রায় সবই আছে। পুরুষ আর মেয়েদের জন্যে আলাদা আলাদা রেস্টরুম ( বেশ পরিস্কারপরিচ্ছন্ন, আধুনিক, স্বয়ংক্রিয় ফ্লাশ, স্বয়ংক্রিয় সাবানের শিশি, কাগজের তোয়ালে, মিষ্টি পানির ফোয়ারা), ইনফরমেশন বুথ, মনোহারি দোকান, সুভেনিয়র শপ, রেস্টুরেন্ট, ক্যাফেটারিয়া, এমনকি আরাম করে হাতপা ছড়িয়ে বিশ্রাম করবার মত উষ্ণায়িত পরিসর- সবকিছুরই ব্যবস্থা আছে। আমরা বাথরুম থেকে সাফসুফো হয়ে ক্যাফেটারিয়াতে ঢুকলাম। আমাকে টেবিলে বসিয়ে ওরা খাবার নিতে লাইনে দাঁড়াল। বাচ্চাদুটিও রইলনা আমার সঙ্গে। হাসলাম মনে মনে। এখানেও প্রপাতের ধারা বয়ে যাচ্ছে অলক্ষ্যে, আমি নিচে বসে থাকলাম অনড় পাথর হয়ে। একটু পরে ওরা খাবার নিয়ে এল। খেতে খেতে আমি পরিপার্শ্বের নিশ্চল পৃথিবীর দিকে না তাকিয়ে পারলাম না। এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। মনে হল যেন আমাকে ঘিরে বড় বড় পাহাড়গুলো দেয়ালের মত আড়াল দিয়ে আছে। এই পাহাড়ের বেষ্টনিতে আমি বন্দী না মুক্ত তাও কেমন অস্পষ্ট মনে হতে লাগল। এই বিপুলতা আমাকে নিয়ে খেলা করে চলেছে নিত্য, না, আমার কল্যাণকামী প্রহরী সেজেছে তাই বা কে বলবে। তারা যেন একেকটি তপোমগ্ন সন্ন্যাসী। এবং আমি এক ব্যবচ্ছিন্ন জীব যে তার জীবত্বের গ্লানি নিয়ে সেই ধ্যানের বিঘ্নতা ঘটাচ্ছি।

     লাঞ্চের পর এল ক্যাপিটান। বাস থেকে নামলাম সবাই। অনেক লোক। চাপা উত্তেজনা সবার মুখে। এসে গেছি আমরা। ওই ওখানে। ওখানে। আসলে এল ক্যাপিটান কোন বিশেষ জায়াগাতে নয়। এল ক্যাপিটান সবখানে। সেখানকার তুচ্ছ ধূলিকনাও বুঝি জানে এল ক্যাপিটান কোথায়। বাস থেকে ভাবলাম এক মিনিটের রাস্তা। বিশ মিনিট একটানা হাঁটার পরও ঠিক তাই মনে হল। যত কাছে যাচ্ছি ততই যেন দূরে সরে যাচ্ছে সে, ততই যেন উঁচুতে উঠে যাচ্ছে। হয়ত একেই বলে উচ্চতার ধন্ধ। আমরা যারা সমতলে থাকি তাদের জন্যে এ এক অভিনব অভিজ্ঞতা। আধ ঘন্টা পর আমরা সেই ধ্যানমগ্ন মহাঋষির পাদমূলে এসে পৌঁছুলাম। বিকেলের সূর্য তখন জ্যামিতির সঠিক সূত্র ধরে কোনাকুনি রশ্মি ফেলেছে এল ক্যাপিটানের দীর্ঘ প্রলম্বিত দেহের ওপর। একটা অপার্থিব রঞ্জনাভায় ছেয়ে গেছে দিকবিদিক। ওরা ছবি তুলতে শুরু করল। বাচ্চারা উচ্চতার স্পর্শে উত্তেজিত হয়ে উঠল। মহাদেব যেন নিচে নেমে এসে ওদের সঙ্গে খেলায় মেতে গেলেন। আমি, মাঝসত্তরের এক তৃষিত পথিক, মুগ্ধ বিহ্বলতায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কান পেতে থাকলাম হিমবাহের মহাপ্রলয়ী স্রোতের দিকে। প্রকৃতির সেই বিচিত্র প্রদর্শনীতে স্থানকালের সম্বিত হারানো অস্বাভাবিক কিছু নয়। নিজেকে মনে হল তুষারযুগের পথভোলা পথিক- সহসা উপনীত হয়েছি বিশ্বপ্রভুর দরবারে। আমি অনুভব করছি আদিসৃষ্টির প্রলয়লীলা। মনে হল আমি নগ্ন, আমি বিধ্বস্ত বিলীন। আমি অস্তিত্ব হারিয়ে একবিন্দু কম্পমান তরঙ্গ হয়ে দণ্ডায়মান হয়েছি চির অস্তিত্বময়তার কাছে। হিমের নদী যেন ধেয়ে আসছে আমার দিকে। আমি শুনছি তার পদধ্বনি।

     এই গতি, এই খরস্রোতা ক্ষুরধার ঝর্না, উচ্চতার এই দুর্বার সার্বভৌমত্ব- আমি বুঝতে পারি কেন ইণ্ডিয়ানরা আত্মা বিশ্বাস করে। নগরের দালানকোঠার আরামকেদারায় বসে আমরা যেটাকে কুসংস্কার বলে ফুড়ুত্‌ করে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করি, ওদের কাছে সেটা জীবনমরণের প্রশ্ন। আত্মা নামক এক অশরীরি বস্তুর সঙ্গে নিত্য বসবাস করতে হয় বলেই তারা আত্মার করুণা ছাড়া বাঁচবার কথা ভাবতে পারেনা। ইউসেমেটির প্রতিটি বায়ুকনাতেই তারা আত্মার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পায়। তারা যে বেঁচে আছে সেটাই তাদের আত্মাদের পদক্ষেপের প্রমাণ। এল ক্যাপিটানের পায়ের নিচে দাঁড়িয়ে আমি নিজেও যেন তাদের  আত্মার উপস্থিতি অনুভব করলাম। আমি, ভ্রমণবিলাসী এক বহিরাগত আগন্তুক, তবু আমার শিরায় শিরায় অনুভব করলাম সৃষ্টির দামামা। এখানে বিশ্বাস ছাড়া কারো বাঁচবার উপায় নেই।

     ইউসেমেটির এল্‌ ক্যাপিটানের সামনে না দাঁড়ালে আমি বিশ্বসৃষ্টির সেই আদি মুহূর্তিটিকে কল্পনা করতে পারতাম কিনা সন্দেহ। এ এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা আমার। আমি হিমালয়ে যাইনি কোনদিন। হয়ত সেখানেও অনুরূপ অভিজ্ঞতা জন্মায় মানুষের মনে। কিন্তু সেখানে কি কোন খেয়ালি শিল্পী এমন নিখুঁতভাবে নির্মাণ করে গেছে এমন অনবদ্য মূর্তি, পুরো একটা পাহাড়কে তার স্টুডিওতে বসিয়ে? মনে হয় না। এল্‌ ক্যাপিটানকে আমি নিচে থেকে দেখেছি বটে। কিন্তু আমার মন জানল উচ্চতা কাকে বলে।

     হাঁটতে হাঁটতে দেখা গেল দুটি একটি পর্বতারোহী মানুষ পাহাড় বেয়ে চূড়ায় উঠবার চেষ্টা করছে এখানে ওখানে। হিংসে হল ওদের দেখে। স্বাস্থ্য আছে, যৌবন আছে, বড় কথা আকাঙ্ক্ষা আছে উচ্চতার। কিন্তু তারা জানেনা নিচের মানুষদের চোখে ওরা কত ছোট হয়ে গেছে, কত ক্ষুদ্র মনে হয় তাদের, কত তুচ্ছ। যেন এক বিরাট দৈত্যের গায়ে দুটো মাছি বসেছে, বা কোনও ক্ষুদ্র কীট। মানুষ পাহাড়ে ওঠে কেন? পাহাড়কে জয় করার জন্যে নিশ্চয়ই নয়। ওঠে তার নিজেরই কীটত্বের গ্লানি মোছার চেষ্টায়। সেই চেষ্টাটিকেই আমি সাধুবাদ জানাই। ওইটুকুই আমাদের সীমানা, ওখানেই আমাদের আকাশ। চেষ্টাই আমাদের এভারেস্ট। আমাদের এল্‌ ক্যাপিটান।

     ফেরার পথে আরো দুয়েক জায়গায় থামা হল। দেখা হল আরো একটি প্রপাত, আরো একটি পাহাড়। মিরর লেক দেখার শখ ছিল, দেখলাম। মিরর লেকের ধারে দাঁড়িয়ে পানিতে নিজের মুখ দেখলাম, বয়সের শত ভাঁজ পরিস্কার ফুটে উঠল হ্রদের জলে। মানুষের মনের ছবিটাও কি ফুটে উঠবে, ভাবলাম। কি জানি কেন মনটা ভার হয়ে ছিল এল্‌ ক্যাপিটান থেকে চলে আসার পর। চারদিকেই যেন ইণ্ডিয়ান আত্মাদের আনাগোনা। প্রতিটি প্রপাতের প্রতিটি বারিকনায়, প্রতিটি পাতায় গাছে ঝাড়ে, প্রতিটি পাহাড়ের প্রতিটি নুড়িতে তাদের স্পন্দন। আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাসী না হয়েও আমি জানিনা কেমন করে তা অনুভব করতে পারছি। আমি ভুলতে পারি না আজ থেকে দেড়শ বছর আগে এখানে একটা বড়রকমের গণহত্যা হয়ে গেছে। বসতির পর বসতি, গ্রামের পর গ্রাম, পুড়িয়ে ভস্ম করা হয়েছে। যাকে পেয়েছে সামনে তাকেই খুন করা হয়েছে অমানুষিক নিষ্ঠুরতার সঙ্গে। সেই রক্ত হয়ত মুছে সাফ করে ফেলেছে বিজয়ীরা, কিন্তু সেই আর্তনাদকে কি তারা মুছতে পেরেছে? ইউসেমেটির আত্মারা যেন সেই কান্নাকে বয়ে বেড়াচ্ছে দেড় শ বছর ধরে। কেন জানি মনে হতে লাগল আমার, সত্যি তো! বুকফাটা চিত্কারের শব্দগুলো কোথায় গেল? নিশ্চয়ই অন্তরীক্ষের কোন-না-কোন নীল সিন্দুকে জমা হয়ে আছে তারা।

ফ্রিমন্ট, ক্যালিফোর্নিয়া

ফেব্রুয়ারী ২১, ২০০৯ 
 

মন্তব্য:
Shafiq   December 23, 2009
Anoboddo. Aasadharan Lekha
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.