Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাহিত্য  ||  ৯ম বর্ষ ৯ম সংখ্যা পৌষ ১৪১৬ •  9th  year  9th  issue  Dec 2009 - Jan 2010  পুরনো সংখ্যা
ষড়যন্ত্র Download PDF version
 

সাহিত্য

ছোটগল্প

ষড়যন্ত্র

তপন দেবনাথ

     কবির সাহেব ঘরে ঢুকলেই ষড়যন্ত্রের একটা গন্ধ পান। এ গন্ধটা প্রকট আকার ধারন করেছে তাঁর দল ক্ষমতায় না আসতে পারার পর থেকেই। সুচতুর হরিণের মত তিনি এখন সতর্ক। চতুর্দিকে কড়া নজর রাখেন কোন দিক দিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। ষড়যন্ত্রের গ্যারাকলে তিনি এখন অনেকটা পেরেশান। এমন বৈরী সময়ে স্ত্রীর পক্ষ থেকে কোন সাড়া না পেয়ে বলতে গেলে নিজগৃহে পরবাসী জীবন কাটাচ্ছেন কবির সাহেব।

     পার্টির অফিস থেকে অনেক রাত করে কবির সাহেবকে বাসায় ফিরতে হয়। বাসায় ফিরে দেখেন স্ত্রী ঘুমে বিভোর। টেবিলে সাজানো খাবার তাঁকেই গরম করে খেতে হয়। পার্টটাইম কাজের বুয়া রাত দশটার পরেই বাসায় চলে যায়। বাসার কাজের লোকটা ঘুমে এমন অচেতন হয়ে থাকে যে তাকে জাগাতে যাওয়া মানে একটা হুলস্থুল কান্ড বাঁধানো আর কি। এরচেয়ে অনেক ভালো নিজের কাজ নিজে করা। সবকিছু ঠিক আছে কিন্তু একটা জায়গায় ঠিক নেই। স্ত্রী বকুল বেগম কবির সাহেবকে স্বামী হিসেবে পাত্তা দেন ঠিকই কিন্তু যখনই পার্টির কথা উঠে বকুল বেগম মুখে ভেংচি কাটেন। অগ্নিমূর্তি ধারন করেন সময় সময়। কবির সাহেবের পার্টি যেন কোন পার্টিই নয়। ষড়যন্ত্রের গন্ধ পান কবির সাহেব। গভীর ষড়যন্ত্র। স্ত্রীকে বাইরে থেকে কেউ না কেউ কু-পরামর্শ দেয়। তা না হলে স্বামীর কাজে স্ত্রীর সায় থাকবে না কেন?

     কনকনে শীতের রাত। ডিসেম্বর মাসে এত শীত গত কয়েক বছর আগে দেখা যায়নি। এই শীত যে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকেই আসে সে ব্যাপারে পার্টির পক্ষ থেকে একটা বিবৃতি তিনি কয়েকদিন আগেই দিয়েছিলেন। বেহায়া শীত। বিবৃতিতেও ধরায় না। অবশ্য একটা প্রাচীর তুলতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু তাতে যে আবার গরু আসা বন্ধ হয়ে যায়। মাংসের অভাব দেখা দিবে। গরু তো আর প্রাচীর অতিক্রম করতে পারবে না।

     বাসায় ফিরতে ফিরতে শীতে প্রায় জমে যাচ্ছিলেন কবির সাহেব। শোবার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলেন বকুল বেগম ঘুমে বিভোর। তাকে টেনে এখন বাইরে ফেলে দিলেও বোধহয় টের পাবে না। এমন শীতের রাতে কোন স্ত্রী তার স্বামীর খাবারটা গরম করে না দিবে? স্বামী একটি পার্টি করে, মানুষ খুন তো করে না। বকুল বেগমের দিকে কড়া নজরে একবার তাকিয়ে কবির সাহেব বাথরুমে চলে গেলেন। বালতির পানি এতটাই ঠান্ডা হয়ে আছে যে মনে হয় বরফ জমতে বাকী নেই। এটাও স্ত্রীর কোন একটা ষড়যন্ত্র হতে পারে। তা না হলে পানি এত ঠান্ডা হবে কেন? এটা সোনার বাংলা, অস্ট্রেলিয়া বা দক্ষিণ মেরু তো নয়। কোন রকমে একটু হাত মুখ ধূয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি। কোন রাজনীতিকের কপালে কি এক বালতি গরম পানি জুটে না? রাজনীতি কি এতই খারাপ জিনিস?

     খাবার টেবিলে গিয়ে মেজাজটা বিগড়ে গেল কবির সাহেবের। তরকারির বাটির ঢাকনা ইঁদুর বা বিড়াল সরিয়ে মাছের অংশ বিশেষ খুটেখুটে খেয়ে গেছে। মাছের কিছু অংশ বাটিতে আছে, কিছু অংশ টেবিলে পড়ে আছে। ভাতের প্লেটের ঢাকনা অংশ বিশেষ সরানো।

-বলি, এটা কি আমার খাবার নাকি কুকুর বেড়ালের?

কোন সাড়া পেলেন না কবির সাহেব। চেয়ারে কয়েক সেকেন্ড বসে আবার উঠে দাঁড়ালেন। এদিক-সেদিক তাকালেন কেউ সাড়া দেয়  কিনা। কোন সাড়া নেই।

-এই বাড়িতে কি কেউ আছে, নাকি আল্লাহ বেহেশত নসীব করেছে?

এবার গলার স্বর একটু বাড়ানো সত্ত্বেও শব্দ নেই। সাড়া শব্দ যদি কেউ দেয় সে বকুল বেগম। বকুল তো ঘুমে অচেতন।

কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে কবির সাহেব শয়নকক্ষে গেলেন। বকুল বেগম আগের মতোই ঘুমাচ্ছেন।

-বকুল! বকুল! আমার খাবারের এই অবস্থা কেন?

জোরে জোরে কথা বললেন কবির সাহেব। বকুল বেগমের ঘুম ভেঙ্গে গেল।

-কে এতরাতে জোরে জোরে কথা বলে? ডাকাত পড়েছে নাকি?

-কেন, আমি ছাড়া কি অন্য কারো আসার কথা ছিল নাকি?

-যে আসার কথা ছিল সে অনেক আগেই এসে গেছে।সব কাজ সেরে গেছে। এত চেচামেচি কেন?

দুহাত দিয়ে দুচোখ কচলালেন বকুল বেগম। উঠে বসলেন তিনি।

-আমার খাবারের এ অবস্থা কেন?

-কী অবস্থা? খাবারে বিষ দিয়েছে কেউ?

-বকুল, সব সময় ত্যাড়ামো কথা বলবে না।

-আচ্ছা, দেখি আগে।

বকুল বেগম উঠে খাবার টেবিলের কাছে গিয়ে দেখলেন খাবারগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। তিনি এভাবে খাবার রাখেননি। ইঁদুর বা বিড়ালের কাজ এটি। এ খাবার তিনি স্বামীকে খেতে বলতে পারেন না। সেটা হবে অবিচার, ঘোরতর অবিচার। খাবারের এ অবস্থা দেখে বকুল বেগম কিছুটা বিচলিত হলেন। আরো ভারী ঢাকনা দেয়া উচিত ছিল।

-আপনি একটু বসুন, আমি খাবার গরম করে দিচ্ছি।

বকুল বেগম ফ্রীজ থেকে খাবার বের করে চুলোয় গরম করছেন। কবির সাহেব রাগতঃ দৃষ্টিতে স্ত্রীর কাজকর্ম দেখছেন। মধ্যরাত পার হয়ে গেছে। চারিদিকে পিনপতন নিরবতা। কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে গোটা শহর।

-নেন, শুরু করেন। আমি বাকীগুলো গরম করছি।

কবির সাহেব খাওয়া শুরু করলেন। বকুল বেগম বাকী তরকারি গরম করে বাটিতে করে স্বামীর সামনে রেখে একটা চেয়ার টেনে বসলেন।

নিচের দিকে মাথা দিয়ে নীরবে খাচ্ছেন কবির সাহেব। পাশে যে তাঁর স্ত্রী বসে আছেন এ ব্যাপারে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।বকুল বেগমও কিছু না বলে স্বামীর খাওয়া দেখছেন।

-প্রতিরাতে কি এভাবে খাবার গরম করে দেয়া যায় না? মুখ খুললেন কবির সাহেব।

মুখে ভেংচি কেটে বকুল বেগম জবাব দিলেন- যায়, যাবে না কেন?

-তবে দাওনা কেন?

-দেইনা আপনার স্বভাবের জন্য।

মাথা তুলে স্ত্রীর দিকে তাকালেন কবির সাহেব।

-আমার স্বভাব!

-হ্যাঁ, আপনার স্বভাব। আপনি রাজনীতি ছাড়েন। আপনার রাজনীতি ঘরের কেউ পছন্দ করে না। আমরা আপনার কারণে সমাজে একঘরে হয়ে আছি।

হুংকার ছাড়লেন কবির সাহেব। রাগে তার গা জ্বলে যাচ্ছে। ইচ্ছে করছে ভাতের প্লেট ছুঁড়ে ফেলে উঠে যান।

-কে, কি বলেছে তোমাদেরকে?

-কে আবার কি বলবে? আমরা কি অবুঝ মনে করেছেন?

-এই যে বললে আমার জন্য মুখ দেখাতে পারছো না? আমি চোর না ডাকাত?

-চোর, ডাকাত হলেও ভালো ছিল। যা করেছেন চোর-ডাকাতরাও তাতে শরম পায়।

-খোলসা করে বলো বকুল বেগম।

-খোলসা করে কি বলবো? খোলসা তো করেই রেখেছেন।

-আমি বুঝতে পারছি না। পরিস্কার করে বলো।

-ন্যাকা সাজবেন না। ন্যাকামো আমার একদম সহ্য হয়না।

-বকুল বেগম! জোরে চিৎকার দিলেন কবির সাহেব।

-চিৎকার দিবেন না। সবাই ঘুমিয়েছে। আপনি পত্রিকায় বিবৃতি দেননি বর্তমানে যে শীত পড়ছে তা পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আসছে। তারাই শীত ঠেলে এদেশে পাঠাচ্ছে। শীতের কি পাখা আছে যে উড়ে এদেশে এসেছে, নাকি পা আছে যে হেঁটে হেঁটে এদেশে এসেছে?

রাগ হজম করার চেষ্টা করছেন কবির সাহেব। খাবার এখন আস্তে আস্তে চিবুচ্ছেন তিনি। পত্রিকায় যে বিবৃতি দিয়েছেন সে কথা সত্য। স্ত্রীর মুখ থেকে আরো কথা বের করতে হবে। কৌশল অবলম্বন করলেন তিনি।

-আর কি কি করেছি আমি?

-কি কি করেন নি? মানুষ আপনাকে নিয়ে এখন হাসাহাসি করে।

-কি কারণে হাসাহাসি করে সেটাই তো জানতে চাই। আমাকে কি চিড়িয়াখানার কোন অদ্ভুত প্রাণীর মতো দেখায়?

-হাসে আপনার উল্টা-পাল্টা কথার জন্য। দেশে যা কিছু ঘটুক তার জন্য দেশের একটি রাজনৈতিক দল ও পার্শ্ববর্তী দেশকে দোষারোপ করা যেন আপনাদের স্বভাবে পরিণত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত দেখা যায় আপনারাই সে কাজ করেছেন। এখন জনগণ ধরে নেয় যে যখনই আপনারা পার্শ্ববর্তী একটি দেশের উপর কোন কারণে দোষ চাপান সেটি আপনাদেরই কাজ।

-চারটি উদাহরণ দাও।

- ন্যাকামী করবেন না। ন্যাকামী আমার একদম পছন্দ না। দচারটি কেন দুচারশো উদাহরণ দেয়া যাবে। চরম শত্রর বিরুদ্ধেও মিথ্যাচার করতে নেই।উত্থাপিত অভিযোগ প্রমাণ না করতে পারলে নিজের মর্যাদারই হানি ঘটে। রাখাল বালকের গল্পটি জানেন না?

খাবার মুখে দিয়ে কবির সাহেব বললেন-

-তুমি কি আমাকে রাখাল বালকের সাথে তুলনা করছো?

-সে তো ছিল রাখাল বালক, আপনি তো ভন্ড রাজনীতিক, জ্ঞানপাপী। যা করেন তা বলেন না, যা বলেন তা করেন না। দেশশুদ্ধ জনগণকে ভাবছেন তারা বোধহয় ছাগল। আপনারা ডাক দিলেই তারা ভ্যা ভ্যা করবে। সে বছর বন্যার সময় আপনার দলের লোকেরা বলেছে এ পানি পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পাঠানো হয়েছে এদেশের মানুষকে কষ্ট দেয়ার জন্য। ঐ বিল্ডিং-এর নূরজাহান ভাবী সে পত্রিকা নিয়ে আমাদের বাসায় এলো। এই খবর পড়ে তিনি তো হাসতে হাসতে খুন।

-নূরজাহান ভাবীর হাসতে হাসতে খুন হবার কারণ?

-তিনি নাকি বাপের জন্মেও শোনেননি কোন নদী বা সাগরের পানি ঠেলে একদেশ থেকে আরেক দেশে পাঠানো যায়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ভূ-গোলে অনার্স মাস্টার্স করেছেন। তিনি আমাকে বোঝালেন বাংলাদেশ হচ্ছে ভাটির দেশ। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে ক্রমান্বয়ে ঢালুতে এদেশ অবস্থিত। এক ডজনের বেশি নদীর জন্মস্থান পার্শ্ববর্তী দেশে। সুতরাং পানিতো ঢালুর দিকেই গড়াবে, নাকি? নূরজাহান ভাবীকে বলতে হবে কেন আমরা কি জানিনা পানি নিচের দিকে গড়ায়?ভাবী যখন বললো তাহলে আপনারা বেড়িবাঁধ দিয়ে সে পানি আটকাচ্ছেন না কেন আমি লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিলাম আপনাদের মূর্খের মত কাজ কারবার দেখে।

বাম হাতে মুখ থেকে মাছের কাঁটা ফেলে সন্দেহের দৃষ্টিতে কবির সাহেব স্ত্রীর দিকে মাথা তুলে তাকালেন।

-তাহলে এই খবর? যা আমি সন্দেহ করেছিলাম।

-কি, আপনি কি সন্দেহ করেছিলেন?

-ষড়যন্ত্র। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।

-আপনি তো সবকিছুতেই ষড়যন্ত্রের গন্ধ পান। এটা আপনার একটা রোগ হয়ে গেছে। ডাক্তার দেখান।

-ষড়যন্ত্র না হলে পরের বাড়ির স্ত্রী এসে তোমাকে জ্ঞান দেয় কি করে? আমি কি রাজনীতি কম বুঝি?

-লক্ষ লক্ষ লোকের সামনে দাঁড়িয়ে অবলীলায় মিথ্যা কথা বলেন লজ্জা করে না আপনার? মিথ্যা বলার পরিণতি এবার নির্বাচনে দেখলেন তো?

-তাহলে তুমিও আমার দলকে ভোট দাওনি? গর্জে উঠলেন কবির সাহেব।

-চিল্লাইবেন না। আমার ভোট আমি দিয়েছি, যাকে খুশি তাকে দিয়েছি। আপনি জিজ্ঞাসা করার কে? এবার যে না ভোটের বিধান রেখেছে দেখেছেন?

-বিশ্বাস ঘাতক, বেঈমান, নেমক হারাম আমার দলকে ভোট দেয়নি। আমি তোমাকে...।

-কি করবেন? কি করবেন? তালাক দিবেন? আমাকে এক তালাক দিলে আমি দুই তালাক দিবো। কোন মিথ্যাবাদীর ঘর করার চেয়ে তালাক নেয়া অনেক সম্মানের।

-কি? তোমার এতবড় সাহস?

-সাহসের দেখছেন কি? ঘরে ছেলেমেয়ে-নাতীনাতনী কেন আপনাকে দেখতে পারে না? আপনার এই উদ্ভট মিথ্যাচারের জন্য। নিজেরা অপরাধ করে অন্যের ঘাড়ে দোষ আর কত চাপাবেন?

     ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেলেন কবির সাহেব। এদ্দুর? গত কয়েক বছর ধরেই কবির সাহেব লক্ষ্য করে আসছেন পরিবারের সদস্যরা তাকে যেন কেমন এড়িয়ে চলতে পারলেই বাঁচে। তিনি যেন সংসারে একটি বাড়তি ঝামেলা। নানাবিধ কাজের চাপে থাকাতে এ নিয়ে কারো সাথে কোন আলাপ হয়নি তাঁর। কোন প্রয়োজনও বোধ করেননি। নিজের ঘরেই বিদ্রোহের আগুন অথচ তিনি জানেন না? স্ত্রীর মুখ দিয়েই সত্যটি আজ বের হয়ে গেল। তাহলে আমার নিজ পরিবারের সদস্যরাই আমার দলকে ভোট দেয়নি? আমার নিজের ভোটটা আমার দলকে দিয়েছিলাম তো? নাকি আমিও...? মাথাটা কেমন যেন শূন্য শূন্য লাগছে কবির সাহেবের।

     মাথাটা ঝাড়া দিলেন কবির সাহেব। কৌশল। কৌশল হচ্ছে রাজনীতির বড় অস্ত্র। ক্ষেপে গেলে চলবে না। কৌশলে কথা বের করতে হবে।

-আপনাকে ভাত দিবো আর এক চামচ?

-দরকার নেই। তোমাকে জাগানোটাই ঠিক হয়নি। ইঁদুর, বিড়ালের খাবারটা খেয়ে নিতাম সেটাই ভালো ছিল।

-আমাকে না জাগালে কি হতো? আমি কি সারা জীবন ঘুমিয়ে থাকতাম?

বকুল বেগমের রাগ কমছে না। এমন একটি সুযোগের অপেক্ষায়ই যেন ছিলেন তিনি।

খাবার শেষ করে হাত-মুখ ধুয়ে চেয়ারে বসলেন কবির সাহেব। স্ত্রীর চোখে চোখ রাখলেন। ভিতরে ভিতরে তিনি জ্বলে যাচ্ছেন কিন্তু আচরণ করছেন যেন রাগেননি।

-ঐ পার্শ্ববর্তী দেশ আর ঐ দলটির প্রতি তোমার দুর্বলতা কেন বকুল বেগম?

-কোন দেশ, কোন দলের প্রতি আমার কোন দুর্বলতা নেই। আমি লক্ষ্য করেছি এ দুএর বাইরে আপনাদের রাজনীতি নেই।এ দুটিকে যদি সহ্য করতে না পারেন তাহলে এত বছর ক্ষমতায় থাকার পরও এরা স্ব-অবস্থানে থাকে কি করে? একটু ধাক্কা মেরে প্রতিবেশী দেশটাকে আর একটু দূরে সরিয়ে দিলে তো গাত্রদাহ একটু কমতো। ঐ দলটাকে দেশে নিষিদ্ধ করতে পারলেন না? তাহলে তো ক্ষমতা চিরদিন আপনাদের পায়ের তলায় লুটোপুটি করতো। যে মন-মানসিকতা নিয়ে রাজনীতি করেন তা গত হয়ে গেছে বহু বছর আগে। এখন আর ধুনপুনের দিন নাই।

অবোধ বালকের মত কবির সাহেব স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে কথা শুনছেন। তিনি কোন জবাব দিচ্ছেন না। কিছু বলতে চাইলেও গলা থেকে বের হবার আগেই যেন মিলিয়ে যাচ্ছে।

-থামলে কেন? বলে যাও। এখন তো তোমাদের বলার দিন।

-হয় রাজনীতি ছাড়েন, না হয় সত্য বলতে শুরু করেন। এর মাঝামাঝি কিছু নেই। এর মাঝামাঝি যদি কিছু চান আমরা সবাই আপনাকে ছেড়ে অন্যত্র চলে যাবো।

বকুল বেগমের হুমকি সত্য না মিথ্যা কবির সাহেব তা এখনই অনুমান করতে পারছেন না। তবে পরিবারে যে একটি বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে তা অনুমান করতে কষ্ট হয় না।

-আজকে রাতভর কি মিথ্যের বেসাতী বানিয়ে এসেছেন? পার্শবর্তী দেশ থেকে কোটি কোটি লোক এসে ঐ দলকে ভোট দিয়ে জিতিয়ে দিয়ে গেছে এমন বিবৃতি দেন নি? অমন করে তাকাচ্ছেন কেন? যদি ঐ দেশটার পা বিহীন পানি আসতে পারে, শীত আসতে পারে তবে দুপাওয়ালা মানুষ এসে ভোট দিয়ে হাওয়ার সাথে বিলীন হয়ে যাওয়াটা বেশী বিশ্বাসযোগ্য নয় কি?

-তোমাকে দলের মুখপাত্র বানালে না খুব কাজ হতো।

-নিকুচি করি আমি রাজনীতি। সাবধানে চলাফেরা করবেন। জনগণের রোষানলে পড়লে মিথ্যাচার কাকে বলে দেখবেন। আমি ঘুমাতে গেলাম।

বকুল বেগম উঠে শোবার ঘরে চলে গেলেন।

চাদরটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে দুহাত পিছনে নিয়ে রান্না ঘরেই পায়চারী শুরু করলেন কবির সাহেব। এক কঠিন প্রশ্নবোধকের সামনে যেন তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। চারিদিকে অসংখ্য প্রশ্ন, জবাব নেই। জবাব আছে, বলার সাধ্য নেই। তাহলে কি সত্যি দিন বদলের পালা শুরু হয়ে গেছে? আমাদের কৌশল ধরে ফেলেছে মানুষ? আমাদের রাজনীতির দিন শেষ?

     ঘরের স্ত্রী সন্তানেরা আমার দলকে ভোট দেয়নি? আমার নিজের কাছেই যেন কেমন লাগছে। কোথায় যে ভোটটা দিলাম ভালো করে মনেই পড়ে না। এবার আবার না ভোটের বিধান রেখেছে। ঐখানেই সীল মারলাম কিনা কে জানে? আসলে কি আমি নিজের বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্র করছি? পরিবারের সদস্যরা আমার বিপক্ষে চলে গেছে অথচ আমার খবর নেই। তাই তো বলি এরা আমাকে এড়িয়ে চলতে চায় কেন? আমি কি দল থেকে পদত্যাগ করবো? সারা জীবনের মিথ্যাচারের জন্য তওবা করবো জনগণের কাছে? ভুল ত্রটির জন্য ক্ষমা চাইবো? বকুল বেগম যা বলেছে তা কি সত্যি নাকি আমরা কুয়ায় পড়েছি বলে তামাশা করছে? আমাদের বিরুদ্ধে জনগণের এত ক্ষোভ জমা হয়েছিল?

     কবির সাহেবের প্রেতাত্মাটা যেন কবির সাহেবের সামনে এসে দাঁড়ালো। লম্বা হাত দিয়ে তার গলাটা টিপে ধরতে চাইছে। চোখ বড় বড় করে দাঁত কটমটিয়ে যেন প্রেতাত্মাটা বলছে- খবরদার খন্দকার কবির হোসেন সত্য বলেছো তো মরেছো। সত্য প্রকাশ পেলে পিঠে ছাল থাকবে না।সাধু সাজার চেষ্টা করলে একেবারে ডুববে। কোথা থেকে তোমার সৃষ্টি সে কথা ভুলে যাও কেন? এ বিত্ত বৈভব কোথা থেকে এলো? সত্য প্রকাশ করলে থাকবে এসব কিছু? সারা জীবনে পারতে একটা ঘর করতে? এখন কটা বিল্ডিং এর মালিক? সব হারাবে সন্যাসীগিরি দেখাতে গেলে। বলো, রাজী আছো সব হারাতে? তাহলেই সত্যের দেখা পাবে।

     না-না। আমি কোন কিছু হারাতে রাজী নই। ঝাটা মারি সত্যের কপালে। আমি আরো মিথ্যে বলবো। সামনে মিথ্যে বলার আরো সুদিন আসছে।

ঠোঁট কাঁপছে কবির সাহেবের। অস্ফট স্বরে কথাগুলো মুখ দিয়ে বের হয়ে গেল।

-কার সাথে কথা বলছেন একা একা? বিছানা ছেড়ে উঠে এলেন বকুল বেগম।

সম্বিত ফিরে পেলেন কবির সাহেব।

-না, না কিছু না। চল ঘুমাতে যাই। তখনো কবির সাহেবের ঠোঁট কাঁপছে।

লস এঞ্জেলস

জানুয়ারী ০১, ২০০৯

 

মন্তব্য:
Ashraf   January 11, 2010
ভাল হয়েছে লেখাটি। পড়ে খুব মজা পেলাম।
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.