Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাহিত্য  ||  ৯ম বর্ষ ১০ম সংখ্যা মাঘ ১৪১৬ •  9th  year  10th  issue  Jan - Feb  2010 পুরনো সংখ্যা
গোয়েন Download PDF version
 

সাহিত্য

 

নিবন্ধ

গোয়েন

 

মীজান রহমান

 

  গোয়েনকে দেখতে যাব যাব করে যাওয়া হচ্ছে না। কোনদিন কি যাওয়া হবে? কে জানে। এমনও তো হতে পারে যে তার আগে আমাকেই দেখতে আসার কারন সৃষ্টি হয়ে যাবে।

  গোয়েন আমার বন্ধু টেড নরমিন্টনের স্ত্রী। টেড আর আমি একই সময় কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দিই ৬৫ সালে। সদ্য পি.এইচ.ডি. ডিগ্রিপ্রাপ্ত আপাতদিগগজ পণ্ডিত আমরা দুজনই। দুজনই ফলিত গণিতের ছাত্র- আমার বিশেষত্ব প্লাজমা কাইনেটিক থিওরীতে, ওর ফ্লুইড মেকানিক্সে। বিদ্যাবুদ্ধিতে প্রায় সমান সমান হলেও বয়সে আমি পাঁচ বছরের বড়, সেটা আমি ওকে মনে করিয়ে দিতাম সুযোগ পেলেই। শেয়ানে শেয়ানে কথা বলার চেষ্টা করলে কপট গাম্ভীর্যের সাথে শাসাতাম যে আমার সঙ্গে বুঝেশুনে কথা বলা উচিত, কারণ আমি ওর জ্যষ্ঠ ভ্রাতার মত, আমাদের কালচারে সম্মান করে কথা বলার নিয়ম। ভীষণ সরল, অমায়িক, মৃদুভাষী মানুষ একটি। এবং এদেশের তুলনায় অস্বাভাবিকরকম লাজুক। সেকালে আমিও খুব লাজুক ছিলাম, হয়ত এখনো তাই ( যদিও বয়সের ভারে লজ্জার বহিঃপ্রকাশটি খানিক চাপা পড়ে গেছে), কিন্তু টেডের লজ্জা আমাকে অনায়াসে হার মানায়। গোয়েন আদর করে স্বামীর গালে আলতো করে চুমু দিয়ে বলত, ও আমার শাই বেবি।

  ৬৫ সালে কার্ল্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে দালানকোঠার খুব অভাব থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ করেই ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াতে শিক্ষক এবং অধ্যাপকসংখ্যাও বিপুল হারে বেড়ে গেল। গণিত বিভাগের অধ্যাপক পাড়াতে অফিস ছিল মাত্র দশটি, কারণ তখন পর্যন্ত অধ্যাপক সংখ্যাও ছিল ঠিক দশজন। কিন্তু ৬৫ তে টেড আর আমিসহ মোটমাট ৬ জন প্রভাষক নিযুক্ত হলেন গণিতে। অর্থাৎ ১৬ জনের ১০টা অফিস। ফলে বছরখানেকের জন্যে নবনিযুক্ত প্রভাষকদের দুচারজনকে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় অফিস দেওয়া হল। গণিতের মূল দপ্তর ছিল প্যাটার্সন বিল্ডিংএ, কিন্তু আমাদের দুজনকে পাঠানো হল রসায়নের স্টেসি ভবনে। এবং আলাদা অফিস নয়, একই অফিসের দুটি পাশাপাশি ডেস্কে। এতে আমাদের বন্ধুত্ব আরো ঘন হয়ে উঠার সুযোগ পেল। টেডের পরামর্শে আমরা একটা বাসা ভাড়া করলাম সেসময়কার সম্ভ্রান্ত মধ্যবিত্ত পাড়া বলে খ্যাত পার্কউড হিল্‌স্‌ এলাকায়। টেড-গোয়েন ভাড়াটাড়ার ধার ধারেনি, অটোয়ায় এসেই সোজা কিনে ফেলেছিল একটা ছোটখাটো একতলা বাড়ি। ঠিক আমাদের এলাকাতেই।

  গোয়েনের সঙ্গে আমাদের প্রথম সাক্ষাত্‌ এক পার্টিতে। গণিতবিভাগের অধ্যক্ষ ছিলেন প্রফেসার ডগলাস ডেইল। সেকালে আমাদের ডিপার্টমেন্টে একটা রেওয়াজ ছিল প্রতিটি শিক্ষাবর্ষ আরম্ভ হবার দুতিন সপ্তাহের মধ্যে বিভাগীয় অধ্যাপকদের চাচক্রে নিমন্ত্রণ করা চেয়ারম্যানের বাসগৃহে। গোয়েনের সঙ্গে সেখানেই পরিচয়। আমার স্ত্রী পারুল ফ্রেডারিকটনে তিনবছর বাঙ্গালিহীন পরিবেশের মধ্যে থেকে থেকে ক্যানাডিয়ানদের সঙ্গে আলাপচারিতার ব্যাপারে বেশ স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠেছিল, যদিও দারুন মিশুক প্রকৃতির মেয়ে সে কস্মিনকালেও ছিল না। নিজের রুচিবিরুদ্ধ কারো সঙ্গে সে একেবারেই খাপ খাওয়াতে পারত না, এমনকি বাইরের ভদ্রতাটুকু বজায় রেখে চলার যে একটা সামাজিক দায়িত্ব তারও থোরাই পরোয়া করত। কিন্তু গোয়েনকে তার তৎক্ষণাৎ ভাল লেগে গেল। বলতে গেলে ঝড়ের বেগে গলায় গলায় বন্ধুত্ব হয়ে গেল দুটিতে। রোজ টেলিফোনে কথা বলা চাই। ঘন ঘন পরস্পরের বাড়ি যাওয়া চাই। ঘন ঘন একসাথে বাজার করা, একসাথে পার্টিতে যাওয়া, একসাথে গাড়ি করে ঘুরতে যাওয়া। পারুলের পেটে তখন আমাদের প্রথম সন্তান বাবু। গোয়েন ওকে বেছে বেছে ভাল ভাল দোকানে নিয়ে যেত বাচ্চার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে। গোয়েনের নিজেরই বাচ্চাকাচ্চা ছিল না সেসময়- ওদের প্রথম সন্তান আমাদেরটির একবছর পরে জন্মায়। গোয়েন আর টেড দুজনই ছিল প্রচণ্ডরকম ধার্মিক, প্রতি রোববারই তারা সেজেগুজে চার্চে যেত। মজার ব্যাপার যে ওরা আমাদের ওপর ধর্মের বুলি ঝাড়বার চেষ্টা করেনি কোনদিনই। বরং ধৈর্য এবং আগ্রহের সঙ্গে আমাদের ধর্মের কথা জানতে ও বুঝতে চেষ্টা করেছে। গোয়েনের এক দূরাত্মীয় বিয়ে করেছে এক ভারতীয় মেয়েকে, সেটা সে গর্বের সঙ্গে প্রচার করত। আমাদের সঙ্গে বসে বাংলাদেশি খাবার খেয়েছে। আমরা একসঙ্গে পিকনিকে গিয়েছি, একসঙ্গে মুভিতে গিয়েছি, কনসার্টে গিয়েছি, মিউজিয়ামে গিয়েছি।

  ৬৬ সালের ৫ই মার্চ। অনেক রাত তখন। পারুলের প্রসববেদনা শুরু হয়েছিল বিকেল চারটের দিকে। রাত বারোটায় পানি ভাঙ্গার লক্ষ্ণণ দেখা দিল। দেরি করা ঠিক হবেনা ভেবে ডক্টর শ্যুটকে ফোন করে ঘুম থেকে জাগালাম। দাইডাক্তারদের কপালটাই ওরকম- দিনেরাতে যখন তখন টেলিফোন ধরতে হয়। উনি উপদেশ দিলেন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্যে অনতিবিলম্বে। এরপর আমি ডাকলাম গোয়েনকে। আগেই বলে রেখেছিল ওরা যেন বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে ওদের ডাকা হয় যখন হাসপাতালে যাওয়ার সময় এসে যায়। বেচারিরা তখন গভীর নিদ্রায়। ডাক পেয়ে তৎক্ষনাৎ তৈরি হয়ে গেল হাসপাতালে যাওয়ার জন্যে। ওয়ার্ডে এসে গোয়েন গেল পারুলের কাছে, টেড রইল আমাকে পাহারা দেবার জন্যে। বাড়িয়ে বলছিনা- প্রথম সন্তানের বাবারা সবসময়ই মায়েদের চেয়ে বেশি ঘাবড়ে যায়, সেটা দেশে-বিদেশে সবখানেই সত্য। আমি কল্পনা করছিলাম মেয়েটার না জানি কি অবর্ণনীয় কষ্ট হচ্ছে, না জানি সে বাংলাদেশের গ্রামের মেয়েদের মত বাচ্চা প্রসব করতে গিয়ে একেবারে মরেই যায়। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল সে মুহূর্তে। এর জন্যে তো আমিই দায়ী- আমি, এই নিষ্ঠুর বর্বর আদিমানব‌, যে নিজেকে সভ্য পুরুষ বলে চালিয়ে দিতে লজ্জা পাইনা। আরো কত কি উদ্ভট ভাবনা দোল খাচ্ছিল মনে, আর আমি উদ্ভ্রান্ত পাগলের মত ক্রমাগত পায়চারি করছিলাম ওয়াটিং রুমের মসৃণ মেঝেতে। এদিকে পাশের চেয়ারে আরাম করে বসে টেড পত্রিকায় চোখ বুলানোর ছলে আমার দিকে অপাঙ্গে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসচ্ছিল। মজার ব্যাপার হল এই যে একবছর পর যখন ওদের প্রথম ছেলে টেডি জন্মালো তখন দুজনের পালা বদল হয় গেল- আমি চেয়ারে বসে বিজ্ঞের মত হাসছি, আর টেড বেচারি অস্থির পায়ে সারা হাসপাতাল চষে বেড়াচ্ছে।

  সকাল ২টা ২০মিনিটে, সারা ভুবনজোড়া আলোর প্লাবন তুলে আমাদের প্রথম সন্তান ভূমিষ্ঠ হল অটোয়া সিভিক হাসপাতালের তিনতলাতে অবস্থিত মাতৃসদন শাখার এক প্রসবঘরে। ডক্টর শ্যুট প্রসবকক্ষ থেকে বের হয়ে আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে বললেন আমাদের ছেলে হয়েছে, এবং একটি সুস্থ সুদর্শন ছেলে। আরো বললেন যে শেষ পর্যন্ত তাঁকে অস্ত্রোপচারের আশ্রয় নিতে হয়েছিল, কারণ কিডনিঘটিত সমস্যার জন্যে স্বাভাবিক প্রসব ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছিল। আমিও তাঁকে ধন্যবাদ জানালাম এতগুলো মাস ধরে আমার স্ত্রীর গর্ভধারণের সূচনা থেকে শেষ অবধি এত ধৈর্য আর পিতৃসম মায়ামমতার সঙ্গে একটি সুস্থ স্বাভাবিক সন্তান আমাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্যে। ডক্টর শ্যুট আমাদের দ্বিতীয় সন্তানের বেলাতেও ছিলেন। এবং অবিকল একই নিষ্ঠা, যত্ন ও সতর্কতার সঙ্গে। তাঁর ঋণ অপরিশোধনীয়।

  বাচ্চাকে প্রিয়বন্ধু গোয়েনের কোলে দিয়ে আমার সরলপ্রাণ বৌটি এক অদ্ভূত কাণ্ড করে ফেলল। টেড আর গোয়েনের দিকে কোমল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললঃ

 তোমরা দুজন আমাদের ছেলের গডপ্যারেন্টস হতে রাজি আছো?

 ওর এই আকস্মিক প্রশ্ন শুনে ওরা তো বটেই, আমি নিজেও একমুহূর্ত বোবা হয়ে রইলাম। ওমা, একি কথা বলছে মেয়েটি? একবারও তো ঘূনাক্ষরে কোন আভাস দেয়নি যে এরকম একটা ইচ্ছা তার মনে ছিল। সম্ভবতঃ গোয়েনকেও দেয়নি। এরকমই ছিল আমার বৌটি। হঠাৎ হঠাৎ একটা কথা উথলে উঠত হৃদয়ের কোনও গহীন প্রকোষ্ঠ থেকে, মুহূর্তের জোনাকির মত তৎক্ষনাৎ তা জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠত। পরে অনেকবারই সে এধরনের তাৎক্ষনিকের আবেগ নিয়ে আক্ষেপ করেছে, তখন আর চাকা ঘোরাবার সময় থাকত না। কিন্তু এই আবেগটি নিয়ে সে কোনদিন আক্ষেপ করেনি। বরং আরো স্থিরত্ব অর্জন করেছে কালে কালে।

  গডপ্যারেন্ট ব্যাপারটি আমাদের কালচার থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন- তুলনীয় কিছু আছে বলেও আমার জানা নেই। গ্রামগঞ্জের মেয়েরা অনেকসময় বাচ্চা হলে প্রাণের সখীদের নিয়ে আনন্দ উৎসব করা কালে আবেগের বশে বলতঃ সখী, আমি যদি মরে যাই তুই কিন্তু আমার বাচ্চা পালবি। কিন্তু দুটো ঠিক এক জিনিস নয়। এটা পুরোপুরিই পশ্চিম থেকে শেখা। এবং বৌটি আমার ভাল করেই শিখে নিয়েছিল সেটা।

  যাই হোক, সৌভাগ্যবশতঃ গোয়েন নিজেও হয়ত প্রস্তুত ছিল এর জন্যে। এক মুহূর্ত চিন্তা না করে পারুলের গালে আলতো করে চুমু দিয়ে বললঃ এ আমাদের পরম ভাগ্য, পারুল। তোমাদের ছেলে তো আমাদেরও ছেলে। পাশে দাঁড়িয়ে পরম বন্ধু টেড স্মিত হাসিতে মাথা নেড়ে সায় দিল স্ত্রীর কথাতে। তিনবছর পর যখন আমাদের দ্বিতীয় ছেলে রাজা জন্মায় তখন সেও তাদের গডসান হয়ে যায়। তখন থেকে আজ অবধি কত উথাল পাতাল কত ঝড় তুফান কেটে গেল দুই পরিবারের মাথার ওপর দিয়ে, কত রোগ কত কষ্ট কত দুঃখ বয়ে গেল স্রোতের ধারায়, কিন্তু গোয়েন কখনোই ভোলেনি বাবু-রাজার জন্মদিনের কার্ড পাঠাতে। একবছর পর ওদের বড়ছেলে টেডি জন্মায়। তারও দুবছর পর দ্বিতীয় ছেলে জোয়ি। না, আমরা ওদের গডপ্যারেন্ট নই, তার জন্যে ওদেরই অনেক আত্মীয়স্বজন রয়েছে এদেশে। কিন্তু আমরা অনায়াসে জন্মদিনের কার্ড পাঠাতে পারতাম। প্রথম দুচারবছর হয়ত পাঠিয়েও ছিলাম, কিন্তু তারপর আস্তে আস্তে অভ্যাসটা ঢিলে হয়ে গেল। নিজেদের যাবতীয় সমস্যার ভারে কুঁজো হয়ে গেলাম। তাতে অবশ্য দুই পরিবারের মৌলিক সম্পর্কে চিড় ধরেনি বিন্দুমাত্র। বরং আরো দৃঢ়মূল হয়েছে। গডপ্যারেন্ট না হলেও আমরাও টেডি-জোয়িকে নিজেদের মত করেই ভালবাসতাম। ওরা একসঙ্গে স্কুলে যেত, একসঙ্গে সকার খেলতে যেত, একসঙ্গে পিকনিক করতে যেতাম দুই পরিবারে। আমরা পার্কউড হিলসে নতুন বাড়ি কিনে ওদের আরো কাছাকাছি এসে পড়াতে যাতায়াতের সুবিধা দ্বিগুন বেড়ে গেল। প্রায় রোজই দেখা হত গোয়েন আর পারুলে। হয় গোয়েন আমাদের বাসায়, নয় পারুল ওদের। টেড আর আমি ইউনিভার্সিটি চলে গেলে দুই বন্ধুতে মিলে দিনভর গপ্প করত। আমাদের দুই পরিবার, সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতিতে জন্ম নেওয়া পরিবার, ক্যানাডার বহুজাতিক সংস্কৃতি, উদার উন্মুক্ত মানবিক সংস্কৃতির মধ্যে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই আত্মার সম্পর্কে অভিন্নহৃদয় হয়ে গেলাম।

 

১৯৭৫ সাল। আমাদের পারিবারিক জীবন একটা বিশেষ সন্ধিক্ষণে এসে পৌঁছালো। মার্চের ৫ তারিখ রাত্রিবেলায় খবর এল হাসপাতাল থেকে যে, একটি ডোনার কিডনি পাওয়া গেছে, পারুলকে যেন এক ঘন্টার ভেতরে এমার্জেন্সিতে নিয়ে যাই। পরের দিন বড় ছেলে বাবুর নবম জন্মদিন- ওর বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে একটা ছোটখাটো পার্টির আয়োজন করে রাখা হয়েছিল। ছোট ছেলে রাজার বয়স ৬। সৌভাগ্যবশতঃ আমার ছোটভাই মাহফুজ তখন আমাদের বাসায় থেকে কার্লটনে পি.এইচ.ডি.করছিল। ও ছিল বলে রক্ষে, নইলে ছেলেদুটিকে নিয়ে সমস্যা  হতে পারত, যদিও গোয়েন বলে রেখেছিল এসব অবস্থায় ওদের বাসায় ফোন করতে যেন কখনোই দ্বিধা বোধ না করি। নিজের ভাইটি থাকাতে এতরাতে অনর্থক ওদের জ্বালাতন করার প্রয়োজন হলনা।

  হাসপাতালে মোটমাট আড়াইমাস থাকতে হয়েছিল পারুলের। সবকিছু ভালোয় ভালোয় গেলে ১০ দিনের বেশি থাকার প্রয়োজন হত না, কিন্তু সবকিছু ভালোয় ভালোয় যায়নি আমার স্ত্রীর। প্রতিস্থাপিত কিডনিকে শরীর কখনও নিজের বলে মেনে নেয়, কখনও নেয় না। এই না নেওয়ার সম্ভাবনাটিকেই যমের মত ভয় পেত পারুল। না নেওয়া মানে কিডনি ফেলে দিয়ে নতুন কিডনির জন্যে আবার অপেক্ষা করে থাকা, এবং ইত্যবসরে রুটিন করে সপ্তাহে তিনবার হাসপাতালে রোগীর শয্যায় সূঁচবেঁধা অবস্থায় ছসাত ঘন্টা ঠায় শুয়ে থাকা। ডায়েলেসিসের ধক্কল অনেকের সয় অনেকের সয় না। আমার স্ত্রীর একেবারেই সইত না। ডাক্তার জিণ্ডাল, পাঞ্জাবী বৃক্কবিশেষজ্ঞ, ডাক্তার হিসেবে যাঁর প্রচণ্ড সুনাম এ অঞ্চলে, দুমাস ধরে ধৈর্য ধরে বসে থাকলেন ওর ট্রান্সপ্ল্যান্ট সুষ্ঠুভাবে রক্তপরিশোধনক্রিয়া শুরু করার আশাতে। অবশেষে তাঁর ধৈর্য ফলপ্রসূ হয়। নয় সপ্তাহের মাথায় একদিন হাসপাতালে গিয়ে দেখি ওর চোখেমুখের সেই মেঘটা যেন কেটে গেছে। অনেকদিন পর যেন রোদ উঠল আকাশে। কিডনি কাজ করতে শুরু করেছে, আমাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে বলল সে। কিন্তু তার জন্যে চড়া মাশুল দিতে হয়েছিল তাকে। অস্ত্রোপচারের আগে যে মুখটি নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিল সে, সে-মুখটি তখন আর নেই। ফুলে ঢাউস হয়ে গিয়েছিল, দিনের পর দিন উঁচু মাত্রায় কড়া ওষুধ খেয়ে খেয়ে। এত ফোলা যে রোজ দুবার করে ওকে দেখতে না গেলে আমিও হয়ত ভয় পেয়ে যেতাম প্রথম দেখায়। কিন্তু তখন চেহারা নিয়ে আমাদের কোন ভাবনা ছিল না, ভাবনা বেঁচে থাকা নিয়ে, সুস্থ হয়ে ওঠা নিয়ে। অকেজো কিডনি নিয়ে যাদের জীবন কাটাতে হয় তারাই শুধু বুঝবে আমি কি বলছি। ডায়েলেসিস একপ্রকার কারাবাস, সেটা আমার স্ত্রীকে দিয়ে বুঝেছি, আর বুঝেছি আমার প্রিয়বন্ধু শহীদ কাদরীকে দেখে।

 এই যে এতবড় একটা ধকল গেল আমাদের গোটা পরিবারের ওপর তার সবটা সময়ই টেড আর গোয়েন আমাদের পাশে থেকে আমাদের হাত ধরে রেখেছে, আমাদের অভয় দিয়েছে, পারুলকে দেখতে গেছে, নিজেদের বাড়িতে নিয়ে বাবু-রাজাকে খাইয়েছে, নাইয়েছে, ঘুম পাড়িয়েছে, গল্প করেছে, টেডিজোয়ির সঙ্গে খেলায় মাতিয়ে রেখেছে। তারা শুধু সুদিনের বন্ধু নয় আমাদের, দুর্দিনেরও।

  গোয়েন খুব সংসারী মেয়ে। লেখাপড়া সে যথেষ্টই করেছিল। টেড যখন পি.এইচ.ডি. করে ওর তখন এম.এস.সি. শেষ হয়, একই বিভাগে। সেকালে চাকরির বাজারে কোনও মন্দা ছিল না আজকের মত। একটু আধটু লেখাপরা জানা থাকলেই চাকরি পাওয়া যেত অনায়াসে, সে যেই হোক। সেভাবেই তখনকার যুগের মানুষ আমাদের দেশ থেকে যে কোন ডিগ্রি নিয়েও চাকরি পেতে কোন অসুবিধা হত না। কিন্তু গোয়েন কোনদিনই ৯টা ৫টার চাকরি নেয় নি। বাঁধাধরা নিয়মের মধ্যে আটকা থেকে সংসারের কাজে অবহেলা করা---সেটা গোয়েনের চরিত্রে ছিল না। উচ্চশিক্ষিত হলেও সেযুগের মেয়েদের অনেকেই গোয়েনের মত সেকেলে প্রকৃতির ছিল। চাকরি একটা করত সে ঠিকই, কিন্তু নিয়মিত নয়, খণ্ডকালীন। হাই স্কুলের সাপ্লাই টিচার---গণিতের শিক্ষক কোন কারণে অনুপস্থিত থাকলে ওর ডাক পড়ত। বাড়িতে থেকে রান্নাবান্না করা, ঘরদোর গুছানো, বাচ্চাদের বাসায় ফেরার অপেক্ষায় দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা, স্বামীর পথ চেয়ে থাকা, এই ছিল গোয়েনের আনন্দ। অনেকটা আমার বোকা বৌটিরই মত। বলা বাহুল্য যে আমার স্ত্রীও কোনদিন চাকরি বাকরি করেনি, এবং করেনি বলেনি কোন আক্ষেপও ছিল না তার। ফলে দুবন্ধুতে মনের মিল ছিল যেমন, ওদের জীবনধারাও ছিল প্রায় একই রকম। সেকারণেই ওদের অন্তহীন টেলিফোন আলাপ আমার কাছে খুব অস্বাভাবিক মনে হত না, বরং না হলেই দুশ্চিন্তা হত। এমনিতে কিন্তু আলাপী বা মিশুক জাতীয় সুনাম ছিল না আমার স্ত্রীর, শুধু গোয়েনের সাথে সে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ।

  কিন্তু রোগের ঘনায়িত ছায়া আর দৈনন্দিন জীবনের অবিরাম ঘাতপ্রতিঘাত, সব মিলে একসময় দুই হৃদয়ের এই যে গভীর মিলনবন্ধন তাতে, অলক্ষ্যে অজ্ঞাতে, ক্ষয়ের চিহ্ন দেখা দিতে লাগল ধীরে ধীরে। টেলিফোন আর তেমন ঘন ঘন হয়না, হলেও আলাপ চলে না দীর্ঘ সময় নিয়ে। যেন দুজনের ভীষণ তাড়া জীবনের, ভীষণ জরুরি ডাক পড়েছে কোথাও। আগের মত ঘন তারা বাজার যায় না একসাথে, খেতে ডাকে এত ঘন ঘন। এদিকে আমারও ক্রমে সময়ের অভাব, ক্রমেই উর্ধমুখে উর্ধশ্বাসে ধাবিত হবার নেশা রক্তের ভেতরে ঢুকে গেছে। নিজেদের অজান্তে আমরা সবাই নিজেদেরই উচ্চাকাঙ্খার আগুনে দগ্ধ হয়ে চলেছি। প্রেম প্রীতি ভালবাসা আত্মীয়তাবন্ধন সবই যেন নেপথ্যে নির্বাসিত হতে লাগল।

  তারপর একদিন। লেকচার শেষ করে ক্লাস থেকে বেরুচ্ছি। দেখি টেড দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। পরের ক্লাসটি তার। আমি চিরাচরিত অভ্যাস অনুযায়ী হাসিমুখে হ্যালো বললাম। সেও হ্যালো বলল কিন্তু মুখের হাসিটা যেন বুঁজে গেছে। কেমন যেন মনমরা। বললামঃ সবকিছু ঠিক আছে তো টেড ? ক্লাসে ঢোকার সময় হয়ে গেছে ওর। শুধু বললঃ না সবকিছু ঠিক নেই। গোয়েন হাসপাতালে। পরে বলব।

  ওর পরে বলার অপেক্ষায় বসে থাকলাম আমার অফিসে। টেডের মত হাসিখুশি আর অমায়িক মানুষ সংসারে আর হয় না। সেই লোকটার সারা মুখ যেন আষাঢ়ের মেঘে ছেয়ে গেছে। কি হতে পারে, যার সামান্যতম ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি এতদিন, দুই স্ত্রীর মধ্যে গলায় গলায় ভাব থাকা সত্বেও? অবশ্য এটাও ঠিক যে কিছুদিন থেকে লক্ষ্য করেছি গোয়েন সম্বন্ধে পারুলকে কিছু জিজ্ঞেস করলে সে আগের মত উৎসাহ নিয়ে কিছু বলতে চাইত না, কেমন যেন এড়ানো এড়ানো ভাব। আমি নিজের কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত তখন যে অন্য কোন কিছু নিয়ে ভাববার স্পৃহা থাকত না। ভাবলাম, ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে মান অভিমান হয় মাঝে মাঝে, সেটা সাময়িক। সেটা কেটে যাবে। কিন্তু কেটে যায়নি। পরে ও বলেছিল আমাকে। গোয়েনের কথাবার্তায় একটু অসঙ্গতির ভাব লক্ষ্য করছিল সে কিছুদিন থেকে। একটু যেন অসহিষ্ণুতাও। অল্পতেই উত্তেজিত হয়ে ওঠার প্রবণতা। উদাহরণঃ ছেলেদের নিয়ে কথা হচ্ছিল। আমাদের ছেলেরা দুজনই তখন হাই স্কুলে, টেডিও। জোয়ির আরো একবছর দেরি। কথায় কখায় পারুল জিজ্ঞেস করে গোয়েনকে ছেলেদের নিয়ে কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা। সমস্যার বয়সই তো ওটা। কিন্তু গোয়েন প্রশ্নটা সহজভাবে নেয়নি। কেন? সমস্যা হবে কেন? আমার ছেলেরা কি তোমার ছেলেদের চাইতে কম? ওমা, পারুল তো একেবার স্তম্ভিত। বলে কি এসব? পারুল ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে গেল গোয়েনের এরকম আকস্মিক উত্তেজিত হয়ে ওঠা দেখে। কোন্‌ কথার কি মানে হয়ে গেল, তাও ঘনিষ্ঠতম বব্ধুর সঙ্গে। ও আমতা আমতা করে বলবার চেষ্টা করল যে, না, হ্যাঁ। এবয়সে তো আজকাল মেয়েসমস্যা, ড্রাগসমস্যা, আরো কত রকম সমস্যাই দাঁড়াতে পারে, আমার ছেলেই হোক আর তোমার ছেলেই হোক। গোয়েন বোধ হয় নিজেকে সামলে নিয়েছে ততক্ষণে। কথা কাটিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে যাবার চেষ্টা করে। কিন্তু পারুলের মনের ঘা শুকায় না সহজে।

  রহস্য খানিকটা পরিষ্কার হল টেডের সঙ্গে কথা বলবার পর। গোয়েনের হাসপাতালে যাওয়ার কারণ জানলাম। তখনই বুঝলাম পারুলের সঙ্গে ওরকম রহস্যজনক ব্যবহারের পেছনে কি ছিল। সাধারণ হাসপাতালে যায়নি গোয়েন যেখানে মায়েদের সন্তান জন্ম নেয়, গুরুতর রোগীদের অস্ত্রোপচার হয়। গোয়েনকে যেতে হয়েছিল মানসিক হাসপাতালে যেখানে মনের চিকিৎসা হয়। ওর রোগ শরীর থেকে মনে ঢোকেনি, মন থেকে শরীরে প্রবেশ করেছিল। মানসিক রোগের ইতিহাস গোয়েনের পরিবারে ছিল, সেটা টেড জানত। কিন্তু রোগের খবর মানুষ তো প্রেমে পড়ার আগে নেয় না, এবং প্রেমে পড়ার পর তা জানলেও তার গুরুত্ব দেয় না কেউ। অনেকদিন থেকেই নাকি চলছিল তাদের এই শয্যাঘরের নিভৃত সংগ্রাম। মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলেনি দুজনের কেউই, কাউকে কিছু বলবার মত মানুষই নয় তারা। কিন্তু হাসপাতালে যাবার অবস্থা যখন দাঁড়িয়ে যায় তখন মুখ ফুটে কিছু বলতে না পারলেও বুক ফেটে কথা বেরিয়ে যায় মাঝে মাঝে। আমার বন্ধুটি তার সেই বুকফাটা কথাগুলো আমার কাছে বলতে পেরে কিছুটা আরাম পাচ্ছে ভেতরে সেটা বুঝতে পারছিলাম। আমি ওকে থামাতে চেষ্টা করিনি কথার মাঝে। জমাট অশ্রু তার ঝরছে অঝোরে, ঝরুক। মেয়েরা শুনেছি কথা বলে চোখের জলে, ছেলেরা তা পারেনা। তারা চোখের জল ফেলে কথার ধারাতে । কথা শেষ হলে ও আমাকে অনুরোধ করল যাতে কারো কাছে ঘূনাক্ষরেও কিছু না বলি। গোয়েন জানতে পারলে খুব মন খারাপ করবে। অন্যদের বলা হবে, অতিরিক্ত মানসিক চাপের জন্যে হঠাৎ করে সহ্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। ইংরেজিতে এর চলতি নাম স্ট্রেস। আজকাল শব্দটা যেন অত্যাধুনিকতার একপ্রকার প্রতিশব্দতে পরিণত হয়েছে। আধুনিকতা আর স্ট্রেস যেন একে অন্যের যমজ ভ্রাতা। অনেক গুরুতর অসুস্থতাকেও স্ট্রেস বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।

  এভাবেই কাটতে থাকল সময়। দিন কেটে দিন, মাস কেটে মাস, বছর ঘুরে বছর। দুই পরিবারের দুই স্ত্রী কখনও সুস্থ, কখনও সুস্থ নয়, কখনও বাড়িতে, কখনও হাসপাতালে। কখনও রৌদ্রছড়ানো শস্যক্ষেত্রের মত জীবনের প্লাবনধারাতে উচ্ছল উদ্দাম, কখনোবা  শ্রাবনের ঘন মেঘের  মত আর্দ্র, বিষণ্ণ, বিধুর। ইতোমধ্যে ছেলেরা বড় হচ্ছে, লেখাপড়ায় ভাল করছে, ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে সর্বোচ্চ শিখরকে লক্ষ্য করে। এদিকে আমি ক্রমেই নিমজ্জিত হচ্ছি আমার কর্মজগতে। ডুবে যাচ্ছি আমার অধ্যাপনা আর গবেষণার জীবনে। ওদিকে টেড তার বাসগৃহের অন্তহীন যুদ্ধ নিয়ে ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে ভেতরে ভেতরে। আমরা আর আগের মত ঘন ঘন মিলিত হচ্ছি না দুই পরিবারে। ঘন ঘন বেড়াতে যাচ্ছি না গাড়ি করে কোনও সখের সমুদ্রসৈকতে। যাচ্ছি না কোনও রঙ্গালয়ের রঙ্গতামাশাতে। আমার স্ত্রী তার প্রতিস্থাপিত বৃক্কটিকে যথাস্থানে স্থিত রাখার জন্যে কড়া ওষুধ খেয়ে খেয়ে গাল মুখ অস্বাভাবিকরকম ফুলিয়ে ফেলেছে। ওদিকে গোয়েনেরও একই অবস্থা। ওর সমস্যা কোন প্রত্যঙ্গকে যথাস্থানে স্থির রাখা নয়, নিজের মনের ভারসাম্যটিকে যথাস্থানে আবদ্ধ রাখা। তার জন্যে ওকেও খেতে হচ্ছিল কড়া ডোজের স্নায়ুশল্যকর দ্রব্যাদি। ফলে ওর মুখাবয়বখানাও স্ফীত হয়ে ওঠেছিল অস্বাভাবিকভাবে। আমার স্ত্রীর তবুও শরীর ফোলেনি, শুধু মুখটাই। গোয়েনের পুরো শরীরটাই। রীতিমত স্ফীতকায় মহিলা। পা থেকে মস্তক অবধি সমস্তটাই। বিশাল এক মাংসপিণ্ড যেন কশাইর দোকান থেকে ছাড়া পেয়ে হাঁটতে শুরু করেছে।

দেখতে না দেখতেই ছেলেরা বড় হয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল নিজেদের জীবনে। দুজনই জন্মালো ক্যানাডায়, লেখাপড়া করে মানুষ হল ক্যানাডায়, কিন্তু জীবনের খোঁজে চলে গেল পার্শ্ববর্তি দেশ যুক্তরাষ্ট্রে। আমরা দুজন শূন্য নীড়ের শুকনো খড়কুটোর দীনতা নিয়ে ধুকে ধুকে এগুতে লাগলাম সূর্যাস্তের পথে। টেড-গোয়েনের দুই ছেলের ছোটটি চলে গেল সৈন্যবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্যে। বড়টি থাকল একই শহরে, ভিন্ন বাসা ভাড়া করে। আমি চাকরিজীবন থেকে অবসর নিলাম ৯৮ তে, টেড নিল আরো কিছু পরে। কিন্তু তার আগেই ঘটে গেল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা---টেড বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল গোয়েনকে একলা ফেলে।  নিশ্চয়ই আর নিতে পারছিল না বেচারি। আমরা মর্মাহত হয়ে গেলাম। এবার কি হবে ওদের। শুনলাম টেড আলাদা ঘর ভাড়া করেছে। গোয়েন সেই আগের বাড়িতেই। একা। অসুস্থ, অসহায়। কি

বিচিত্র গতি এই জীবনের। কি আশ্চর্য বিড়ম্বনায় ভরা মানুষের চলার পথ। এ দুটি মানুষ, খুব বেশিদিন নয়, একেবারে অবিচ্ছেদ্য ছিল পরস্পর থেকে, দুজনের দুহাতের পাঁচ আঙ্গুল একসাথে মুষ্ঠিবদ্ধ না হলে তারা হাঁটতে পারত না পাশাপাশি---আজকে তারা একে অন্যকে সহ্য করতে পারছেনা। সৌভাগ্যবশতঃ আমাদের দুটিতে ঠিক সে অবস্থাটি এসে পৌঁছাতে পারেনি। যমদূত তো প্রায় সারাক্ষণই গর্জন করে যাচ্ছিল আঙ্গিনাতে। একসময় বৌটি আর ঠেকিয়ে রাখতে পারল না পাষাণ মৃত্যুকে। টুপ করে চলে গেল একদিন। আমি নিরাকার শূন্যতার মধ্যে ভাসমান হয়ে থাকলাম। ইতোমধ্যে গোয়েন উঠে গেল এক বৃদ্ধাশ্রমে। এ শরীর নিয়ে কতদিন্ আর একা একা টিকে থাকবে বেচারি। মনে মনে একটু ক্ষুন্নই হয়েছিলাম টেডের ওপর। হয়ত একটু স্বার্থপরতাই হয়ে গেল ওর। এতদিন নিঃস্বার্থভাবে সেবা শুশ্রূষা করার পর এমন কি ঘটতে পারে যে তুমি কিছুতেই নিতে পারলে না জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মানুষটির অসুস্থতাজনিত দুর্ব্যবহার? এ কিরকমের আত্মত্যাগ জীবনসঙ্গিনীর জন্যে? আমি নিজের দিকে তাকাই। আমি হলে কি করতাম। সত্যি তো, আমি কি করতাম। এক হিসেবে সে পরীক্ষায় আমি যে পড়িনি তা নয়। পাস করেছি কি করিনি তার বিচার আমি করব না। ছেলেদের ওপর ছেড়ে দিয়েছি। একদিন ওদের বিচার আমি করতাম। আজকে ওরাই করুক আমার বিচার।

 মাঝে মাঝে খবর নিতাম গোয়েনের। কেমন আছে সে? রোগটা কি ছাড় দিয়েছে খানিক, নাকি আরো বেগবান হয়েছে? সব খবর সংগ্রহ করা যায়নি, তবে ওদের বিয়ে পুরোপুরি ভাঙ্গেনি সেখবর টেড নিজেই দিল আমাকে। এবং সে আশ্বাস দিল আমাকে যে যতদিন গোয়েন বেঁচে থাকবে ততদিন ভাঙ্গবেও না। দূর থেকে যত্ন নেবে গোয়েনের, যতটুকু সম্ভব তার পক্ষে। শুনে ভাল লাগল। ওর ওপর আমার অভিমান যেটুকু ছিল তার অনেকটাই কেটে গেল। বুঝলাম যে এতকিছুর মঝেও লোকটা তার মৌলিক মনুষ্যত্বটুকু হারায়নি। পশ্চিমের অন্যান্য স্বামীদের অতটুকু মমত্ববোধ থাকে না সচরাচর।

 এর মাঝে একবার দুবার দেখা হয়েছে আমার, গোয়েনের সাথে। আশ্রম থেকে হয়ত নিয়ে গেছে কোন শপিং মলে, যেখানে আমি গিয়েছিলাম। সেই মিষ্টি করে হাসা আমাকে দেখে, গালে আলতো করে চুমু খাওয়া, বাবু-রাজার কথা জিজ্ঞেস করা। মনে হল একেবারে সুস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু একেবারে সুস্থ কখনোই হয়নি সে। দুদিন ভাল থাকে, তারপর যে কি সেই। এটাই হল মনোরোগের ধারা। ভাদ্রের আকাশের মত---এই বৃষ্টি এই রোদ।

  শেষ খবর পেলাম আমার এক বাঙ্গালি বন্ধুর কাছ থেকে। ও গিয়েছিল সত্তরোত্তর রোগীদের জন্যে সংরক্ষিত এক স্থানীয় হাসপাতালে। সেখানে পরিচয় হয় গোয়েনের সঙ্গে। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু শুনে গোয়েন নাকি খুব খুশি হয়ে আমাদের সবার কথা জানতে চায়, নিজের জীবনকাহিনীও খানিকটা শুনিয়ে দেয় বন্ধুটিকে। এমনকি এও নাকি বলেছে ওকে যে টেড এখনও গোয়েনকে ভীষণ ভালবাসে, এবং ভালবাসে বলেই প্রতি সপ্তাহে একদিন ওকে দেখতে আসে। আলাদা থাকলেও মনে মনে নাকি কোনদিনও আলাদা হয়নি ওরা, গর্বের সাথে সে জানায় আমার বন্ধুকে। শুনে ভাল লাগল, কষ্টও লাগল বড়। হায়রে মূর্খ মন।

  নাহ্‌, এবার সত্যি সত্যি যেতে হয় একদিন।

  অটোয়া, কানাডা

  ২০শে নভেম্বর, ২০০৯।

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.