Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাম্প্রতিক  ||  ৯ম বর্ষ ১১তম সংখ্যা ফাল্গুন ১৪১৬ •  9th  year  11th  issue  Feb - Mar  2010 পুরনো সংখ্যা
বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার,ভাঙা কাঁচ ও লাশের বাক্স Download PDF version
 

সাম্প্রতিক

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার,ভাঙা কাঁচ ও লাশের বাক্স

শুভ কিবরিয়া

১.

আইনের শাসন কথাটি শুনতে বেশ সুন্দর। Rule of Law বা সুশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টাটাই হয়ত রাষ্ট্র নামের সংগঠনটির বড় কাজ। পৃথিবীর যেসব রাষ্ট্র কাজটি যত সুচারুভাবে করতে পেরেছে সেসব রাষ্ট্র নিজেরা সংহত হয়েছে। নিজেদের জনগণের জন্য তত বেশি কল্যাণ নিশ্চিত করতে পেরেছে। ইতিহাসের একজন শিক্ষকের দাবি বঙ্গীয় ভূখন্ডে পুলিশকে শাসকরা সকল সময় ব্যবহার করেছে হাতিয়ার হিসেবে। তারা ছিল শাসকের লাঠিয়াল। অধিকন্তু এক সময় পুলিশের জীবিকা নির্বাহ করতে হতো প্রজা সম্পদ লুণ্ঠন করেই। Live on Earth- যাও, প্রজার জমিতে, বেছে নাও তোমার খাদ্য- এই ছিল মূলমন্ত্র।

পুলিশ প্রজাশাসনে বেরিয়ে ক্ষেতের লাউ-কুমড়ো পুকুরের মাছ আর ঘরের বউ কোনোটাই আস্ত রাখত না। সেই আদ্দিকালের পুলিশ বদলেছে পোশাক-অবয়বে,কিন্তু শাসন কায়দা বদলায়নি। পুলিশ থেকে রক্ষীবাহিনী,র‌্যাব,সোয়াত নানারূপী,নানাদর্শী বাহিনী জন্মেছে আর কাঁচকলা দেখিয়েছে Rule of Lawকে। পোশাক গায়ে বন্দুক হাতে পুলিশের বড় ভাইরা রাষ্ট্রক্ষমতাতেও হাত বসিয়েছে। নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে খুন করেছে। বাদ দেয়নি রাষ্ট্রপতির পরিবারকেও। বলাবাহুল্য, রাষ্ট্র,আইন,প্রশাসন বা সুশাসন তাতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। হত্যা,খুন, ক্যু,গায়ের জোর,বন্দুকের জোর সব সময় বড় হয়ে দেখা দিয়েছে বঙ্গদেশে। মাঝে মাঝে দল বেঁধে জনতা ভোটের বাক্স ভরেছে গণতন্ত্রের আশায় কিন্তু তাতে শেষ রক্ষা হয়নি। সুশাসন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পাওয়া বন্দুকহীন কর্তারা রাজনীতিবিদ অভিধা লাগিয়ে ফিরে গেছে Live on Earth- বা লুটপাট,গায়ের জোরের শাসনামলে। ফলে যা হবার তাই-ই হয়েছে। ১৯৭১ থেকে ২০১০,তফাত কি কিছু দেখা মিলছে?

এই প্রশ্নটা রেখেই সাধুবাদ জানাতে হয় শেখ হাসিনার সরকারকে। বাপের বেটি,নইলে ধৈর্য, শোক,যন্ত্রণা নীরবে বয়ে বছরের পর বছর অপেক্ষার নদী পেরিয়ে আইন মতে বিচারের স্বাভাবিক নিয়মে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার কাজটি শেষ করবার পথে এগুলেন কিভাবে?

ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা শেখ হাসিনাকে।

মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়েছে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের। যারা বাইরে আছেন, প্রথমত এক সময় না এক সময় আইনের হাতে ধরা পড়তেই হবে তাদের। বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার রায় কার্যকর হওয়ার ঘটনাটি এ দেশের ইতিহাসের এক বড় মাইলফলকও বটে।

কৃতজ্ঞতা জনগণকেও। কেননা তারাই ভোটের ক্ষমতায় শেখ হাসিনাকে সরকারে এনে এই বিচার কাজকে ত্বরান্বিত করতে সবচেয়ে বড় সমর্থন জুগিয়েছে।

২.

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের একজন পলাতক আজিজ পাশা। আইনের লম্বা হাত সে এড়িয়েছে। ২০০১ সালে জিম্বাবুয়েতে মারা গেছে। বঙ্গবন্ধুর পাঁচ খুনির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর সেই আজিজ পাশার আত্মীয় স্বজনদের ওপর চড়াও হয়েছে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা। ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জ সদরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের নেতৃত্বে কর্মীরা দল বেঁধে গিয়ে আজিজ পাশার ভাইয়ের বাড়িতে আগুন দিয়েছে। ভাংচুর, লুটতরাজ চালিয়েছে।

এরমধ্যে বাহাদুরির কি আছে কে জানে?

কিন্তু এ কথাটা প্রকাশ্য যে, আওয়ামী লীগ শাসনামলে দলীয় নেতাকর্মিদের যার তার বাড়িতে হামলা করলে স্থানীয় পুলিশ বা প্রশাসন তাদের কিছু করতে পারবে না।তারা আইনের ঊর্ধ্বে। সুশাসনের টিকিটিও তাদের ছুতে পারবে না।

বঙ্গবন্ধু হত্যার রায় কার্যকর হবার পর পর সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দিনাজপুর সরকারি কলেজে অধ্যক্ষকে দিনে দুপুরে অপহরণ করেছে। বগুড়া,কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ করেছে। রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে দেশের খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা কলেজে সম্মান শ্রেণীতে ৩ হাজার ৫০০ আসনের মধ্যে ৫০০ আসন নিজেদের দাবি করে কলেজ শিক্ষকদের লাঞ্চিত করে পুরো ভর্তি কার্যক্রমকে বন্ধ করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপ সংঘর্ষে বাধিয়েছে। তাদের সন্ত্রাস থামাতে পুলিশি হামলায় একজন মেধাবী নিরীহ ছাত্র আবু বকর প্রাণ হারিয়েছে।

সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের এই কর্মকান্ডের রাজনৈতিক এবং তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা কি?

এরা গায়ের জোরে, শক্তি প্রদর্শন করে Rule of Law ভাঙছে। সরকার নির্বিকার। প্রধানমন্ত্রী অভিমান করে ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে দেখা করছেন না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একে স্বাভাবিক ব্যাপার বলে মনে করছেন।

প্রিয় পাঠক,সেই আদিকালের পুলিশের চেহারাটার কথা ভাবুন।

Live on Earth-  মাঠে যাও,মাঠ থেকে খাবার বা জীবিকা আন।গোটা দেশেই এখন তাদের অবাধ বিচরণ। তারা যা ইচ্ছে তাই করবে,তাদের সুরক্ষা দেবে সরকার।সুতরাং ভয়ের কি,বাধার কি? সরকারি ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ তাই বাঁধভাঙা অন্যায় আচরণ অব্যাহত রেখেছে।

এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, মানিকগঞ্জ আওয়ামী লীগের জেলা নেতৃবৃন্দের সহিংস আচরণ,আজিজ পাশার ভাইয়ের বাড়িতে আগুন- এই আইন অমান্য আচরণকে রাষ্ট্র কি দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিবেচনা করছে? কোনো সরকার নির্বিকার? দোষীদের শাস্তি কেন হচ্ছে না? সরকারি দল,তার ছাত্র সংগঠন, সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মনোজগতের এই পরিবর্তনটা খুব বিবেচনার বিষয়।

আইন নয়,গায়ের জোর এই মনোভাবনা অতীতের শাসকরা দেখিয়েছেন।

জনরায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া আওয়ামী লীগ সেই একই ফাঁদে পা রাখছেন। প্রতিদিনের সংবাদপত্র খুললে তারই প্রমাণ মিলছে।

৩.

কাঁচ ভাঙবার প্রবণতা বাঙালির পুরনো। বিশেষত গাড়ির কাঁচ ভাঙার সুযোগ আমজনতা বাঙালির প্রাণের আনন্দ জোগায়। হরতালের সময় পিকেটিংয়ে গাড়ির কাঁচভাঙা,খুবই উৎসাহ ব্যাঞ্জক ঘটনা। ভুক্তভোগীরা জানেন এই ভাঙাভাঙি তাদের কতটা মনোবেদনার কারণ হয়। আমার এক বন্ধু বলতেন, গাড়ির কাঁচ ভাঙতে তারাই যায়, যাদের কখনো গাড়ি কেনার সামর্থ্য হবে না। তাই গাড়ির কাঁচ ভেঙে তারা তাদের মনোবিকৃতির উল্লাস পায়। এ মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা কতটা বাস্তাব তা বলতে পারব না। তবে ঢাকা শহরের কেন্দ্রস্থলে বাণিজ্য মেলায় কদিন আগে গাড়ির কাঁচ ভাঙার উৎসব চলেছে। র‌্যাব পুলিশ উপস্থিত থাকলেও থামানো যায়নি এই ভয়ানক বিকৃতিকর অন্যায় আচরণ।

জরুরি শাসনামলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় একবার ভাঙাভাঙির তোড়জাড় সংবাদ মাধ্যমে বড় জায়গা পেয়েছিল। র‌্যাংগ্স ভবন ভাঙতে সরকার তখন দীর্ঘ সময় নেয়। এ কাজে ১২ জন শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে। সে সব মৃত্যু গরিব মানুষের বলে,সুশাসন প্রতিষ্ঠার ঈশ্বর সাজা মঈন উ.বা ফকরুদ্দীন আ. কেউই তেমন গা লাগাননি। ফলে অপরিপক্বহাতে,আনাড়িভাবে ভাঙা র‌্যাংগস ভবনে শুটকি হয়ে দুর্গন্ধ ছড়ানো পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে গরিব মানুষের ওই মৃতদেহগুলোকে।

সে সময় এই শ্রমিক হত্যার ঘটনাটিতে আমাদের ভদ্দরলোক সুশীল সমাজ, বিবেকবান বুদ্ধিজীবী এবং সক্রিয় মিডিয়া অদ্ভুত রকম নীরবতা পালন করে।

এই সব হতভাগ্য শ্রমিকের কথা মনে পড়ল নূরুল ইসলাম বাবুল নামের শক্তিমান ব্যবসায়ী মালিকানাধীন যমুনা ফিউচার পার্ক ভাঙবার অতি সাম্প্রতিক দৃশ্য দেখে। রাজউক সরকারি মদদে কথিত অবৈধ এই বিল্ডিং ভাঙতে যে যুদ্ধংদেহী মনোভাব দেখিয়েছে, তার অন্য কোনো কর্মকান্ডেই এই ক্ষীপ্রতা দেখা যায়নি। গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ক্রোধ,সরকারের বড় শক্তিমানদের পৃষ্ঠপোষকতায় যমুনা ফিউচার পার্কের কাঁচগুলোকে শাবলের খোঁচায় যেভাবে ভেঙেছে রাজউকের শ্রমিকরা তাতে মনে হয়েছে যেকোনো কারণেই হোক যমুনা গ্রুপের মালিকের ওপর খুব ক্রুব্ধ ও ক্ষুব্ধ গোটা সরকার। সরকারের এই তীব্র ক্ষুব্ধতা শ্রমিকের শাবলের এলোপাথাড়ি আঘাতে টের পাওয়া গেছে।

খুব ভালো লাগত, সরকার যদি বেগুনবাড়ি খাল দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ বিজিএমই বিল্ডিং ভাঙতে পারত। তাহলে বোঝা যেত নিয়মনীতি না মেনে গড়ে ওঠা সকল প্রকার অবৈধ বিল্ডিং ভাঙতে সরকার সত্যিই খুব আগ্রহী।

নইলে যমুনা ফিউচার পার্ক ভাঙার এই তড়িৎ উদ্যোগকে অচিরেই মনে হবে খুবই পক্ষপাতমূলক ও উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত।

৪.

শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতাবান ব্যক্তি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হালে বলেছেন, বেগম জিয়া অমানুষ এবং সাম্প্রদায়িক। তাই এমন সাম্প্রদায়িক ও অমানুষ বেগম জিয়ার সঙ্গে আসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি শেখ হাসিনার কোনো ঐক্য হতে পারে না।এই বক্তব্যের জন্য ধন্যবাদ পেতে পারেন সৈয়দ আশরাফ, মনের গহীনে রাখা কথাটি এমন সরল সোজাভাবে বলার জন্য।

এখন পাল্টা প্রশ্ন রাখা যেতে পারে, তাহলে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের সহযোগিতা চান কেন সরকার ও আওয়ামী লীগ? একজন অমানুষের সহযোগিতা কি মানুষরূপী আওয়ামী লীগ বা সরকারের প্রধানমন্ত্রী চাইতে পারেন?

সৈয়দ আশরাফের এই উচ্চারণ প্রমাণ করে সরকার অসম্ভব উত্তেজিত অবস্থায় আছে। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃতি খুনিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর সরকারের এই উত্তেজনা প্রকাশ পাচ্ছে দলের সর্বোচ্চ নেতা থেকে তৃণমূল পর্যন্ত। নইলে দায়িত্বশীল একজন মন্ত্রী এমন কথা বলেন কি করে?

অন্যদিকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবরে তার লাশ আছে না নেই সেই বিকৃতিকর করুচিপূর্ণ বিতর্কও হালে জাতীয় সংসদে তুলেছেন শেখ হাসিনা এবং তার জ্ঞাতি ভাই শেখ সেলিম। জিয়াউর রহমানের লাশ যদি কবরে থেকেই থাকে, তবে সেটা আদৌ তারই লাশ কি না সেটা প্রমাণের জন্য ডিএনএ টেস্টের দাবিও জানিয়েছেন শেখ সেলিম।

প্রিয় পাঠক, ক্ষমতার দম্ভ রাজনীতিতে কি বিভ্রান্তি এবং অশালীনতা আনতে পারে এই উক্তিগুলো তারই প্রমাণ।

৫.

সরকারের হাতে আছে অনেক কঠিন কাজ। দ্রবমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ বিদ্যুতের সুরাহা,দুর্নীতি বন্ধ এবং সুশাসন নিশ্চিত করার মতো সব কঠিন কাজ এখনো আলোর মুখ দেখেনি। মানুষ সরকারকে ভোট দিয়েছে এসব কাজ সমাধা করতে। সরকার যদি এসব কাজ করার চাইতে কাঁচ ভেঙে আর কবরের লাশ তুলে আনন্দ পায়,তবে সরকারকে বলতেই হয়,ইতিহাসের দিকে তাকান।দাম্ভিক ও ক্ষমতাবান সরকারগুলোর পরিণতির কথা ভাবুন।

ঢাকা

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.