Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাহিত্য  ||  ৯ম বর্ষ ১১তম সংখ্যা ফাল্গুন ১৪১৬ •  9th  year  11th  issue  Feb - Mar  2010 পুরনো সংখ্যা
শুনতে পাচ্ছেন তো? Download PDF version
 

সাহিত্য

 

নিবন্ধ

শুনতে পাচ্ছেন তো?

 

মীজান রহমান

 

এক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হল অনেকদিন পর, সুইমিং পুলের লকারে। ওর দুটি মেয়ে একসময় আমার ছাত্রী ছিল। জিজ্ঞেস করলামঃ মেয়েরা কেমন আছে? বললঃ তাই নাকি? সন্দেহ হল বোধ হয় বন্ধুর কান দুটি গেছে। গলার স্বরে একটু জোর দিয়ে বললামঃ জিজ্ঞেস করছিলাম মারিয়া আর উটা কেমন আছে। ও হেসে জবাব দিলঃ তাই বল। আমি ভাবলাম তুমি বললে তোমার ছেলের বিয়ে হয়ে গেছে। না ভাই, খুব ভাল নেই। শরীরটা তেমন ভাল যাচ্ছে না আজকাল।

      বুঝলাম বন্ধুর কানদুটি একেবারেই গেছে। হিয়ারিং এইড পরা দরকার।

      আমার ছেলেদের মতে আমারও পরা উচিত। মুখে বলতে সাহস পায় না, আমি রেগে যাব বলে। আকারে ইঙ্গিতে বলে। ওদের বলার ভঙ্গিটা এরকম।

  আব্বু, তুমি নিয়মিত চেক আপ করাও তো?


  ব্লাডপ্রেসার ঠিক আছে?

  মোটামুটি।

  মোটামুটি মানে?

  কখনো বেশি কখনো কম। গড়ে ঠিকই আছে। আমার বয়সে এর চেয়ে বেশি আশা করা যায়না। রক্ত যে চলাচল করে তাই যথেষ্ট।

  হার্ট ঠিক আছে?

  বাইপাসের দশ বছর পর যতটা ঠিক থাকা সম্ভব ততটা আছে।

  স্ট্রেস টেস্ট হয়?

  স্ট্রেস আবার টেস্ট করাতে হবে কেন? জীবনটাই তো স্ট্রেস।

  আব্বু তুমি কথা এড়িয়ে যাচ্ছ।

  হ্যাঁ হয়, ডাক্তার যখন চায়।

  ট্রেডমিল কর তো ঠিকমত?

  ট্রেডমিল যখন ঠিক থাকে তখন করি।

  আব্বু তুমি খালি কথা ঘোরাও।

  হ্যাঁ করি। হল তো?

  কলোন পরীক্ষা করাচ্ছো নিয়মিত?

  ঐ জঘন্য ব্যাপারটা তো? না করিয়ে উপায় আছে? যতবার যাই ডাক্তারের অফিসে ততবারই বেটা পাছায় আঙ্গুল ঢোকায়। লজ্জা, লজ্জা। ছিঃ।

  লিভার টেস্ট হয়?

  সে আবার কি জিনিস?

  জানোনা বুঝি? লিভার এনজাইম? এই যে এত এত ওষুধ খাচ্ছ রোজ, লিভারের ওপর তো ভীষণ চাপ পড়ে তাতে। তখন এক বিপদ সারাতে গিয়ে পড়বে আরেক বিপদে।

  সে তো জানিনা বাবা। ডাক্তার সাহেব নিশ্চয়ই পরীক্ষা করান মাঝে মাঝে।

  জানিনা বললে হবে না। ডাক্তার সাহেবকে মনে করিয়ে দেবে যে লিভারটা যেন চেক করা হয় ঘন ঘন।

  বেশ বেশ করব।

  কিডনি ফাংশন কিরকম?

  আরে বাবা এত জেরা হচ্ছে কেন? আমার কিডনি আমার চিন্তা। তোমাদের এত মাথাব্যথা কেন?

  সেটা তুমি বুঝবে কি? তোমার মা তো কিডনির রোগে মরেনি, আমাদের মা মরেছে। আমরা বুঝি।

  আমি চুপ করে থাকি। মায়ের বকুনি খাওয়া ছেলের মত। কিন্তু ওদের প্রশ্ন থামে না।

  চিনির লেভেল কত?

  যতদূর জানি লেভেল এখনো লেভেলে আছে।

 তার মানে?

 মানে টায়ে টায়ে। বর্ডার লাইন। টপকালেই নাকি N থেকে D তে চলে যাবে।

 সর্বনাশ, বল কি? তার পরও তুমি রসগোল্লা খেয়ে যাচ্ছ?

 ধরা পড়ে যাওয়া অপরাধীর মত কাচ্যমাচু হয়ে বললাম, এমনিতে খাই না বাবা। কোথাও গেলে লোকের দেখাদেখি একটা দুটো মুখে দিয়ে ফেলি। তাও শুধু গোল্লাটা খাই রসটা ফেলে দিয়ে।

 এখন থেকে গোল্লাও খাবে না, বুঝলে? তুমি তো দশ বছরের খোকা নও যে তোমাকে বোঝাতে হবে।

 হ্যাঁ বুঝলাম। আর খাব না। মনে মনে বললাম, দশ বছরের খোকা নই, তবে তোমরা তো সেভাবেই কথা বলছ আমার সঙ্গে।

 এবার বল তোমার কোমরের ব্যথাটার কি অবস্থা।

 আয়ত্তাধীন।

 মানে?

 মানে আয়ত্তের অধীন। ডাক্তার বলছেন এটা সারবে না, তবে আয়ত্তে রাখা যাবে নিয়মিত ব্যায়াম করলে।

 নিয়মিত ব্যায়াম কর তো? আলসেমি করে ফাঁকি দাওনা তো?

 আমি আলসেমি করি না, তোরা জানিস না সেটা?

রেগে যাচ্ছ কেন? তোমার ভালোর জন্যেই তো বলছি। এবার বল তোমার চোখের খবর কি।

 চোখের আবার খবর কি? চোখ কি রয়টার না সিএনএন যে খবর সাপ্লাই করবে। চোখ চোখের জায়গাতেই আছে।

 কথা ঘোরাচ্ছ আবার। জানতে চাইছি ভাল দেখতে পাচ্ছ তো?

 পারব না কেন? এই না সেদিন ক্যাটারাক্ট সার্জারী হল। বাইফোকাল চশমাও পরছি। তার পরও সমস্যা থাকবে কেন?

 যাক আশ্বস্ত হলাম। এবার শুনি তোমার কানপরীক্ষার কথা উল্লেখ করেছেন কিনা ডাক্তার সাহেব।

 কিরকম চালাক দেখেছেন? কানের কথাটা একেবারে শেষ তোলা, যাতে টের না পাই ওদের আসল মতলবটা কি। নানারকম দানাইপানাই করে শেষে কানের প্রসঙ্গে আসা। যেন প্রসঙ্গক্রমে মনে পড়ে গেল। তোমাদের পেটের কথা যেন বুঝিনা আমি। তোমরা আমার সন্তান, না আমি তোমাদের?

 এবং ঠিক এই প্রশ্নটাই যেন আমাদের বুড়োদের গায়ে লাগে সবচেয়ে বেশি।

 কেন, কানের কথা বলব কেন? আমার কানের কি হয়েছে?

 না, হয়নি কিছু, তবে ভবিষ্যতে যেন না হয় তার জন্যে সাবধান থাকা উচিত, তাই না?

 সাবধান থাকা উচিত আমার নয়, তোমাদের। তোমরা সারাদিন সারারাত কানের ভেতরে শিঙ্গা ঢুকিয়ে রাখ। এক কানে আইপড, আরেক কানে আইফোন। ভবিষ্যতে কানে কালা হলে তোমরা হবে, আমি হব না।

 আহা তুমি রেগে যাচ্ছ কেন বাবা। আমরা কি বলেছি তুমি কালা হয়ে যাচ্ছ?

 তাহলে কি বলতে চাচ্ছ?

 না, থাক তাহলে। আর বলব না।

 হ্যাঁ বলো না। আমার কানে কোন দোষ নেই, দোষ তোমাদের জিভে। পরিস্কার করে কথা বলতে শেখোনি, তাই আমাকে বারবার কি বললে কি বললে করতে হয়। বুঝলে?

 হ্যাঁ বুঝলাম।

 আসলে কিন্তু ওরা বোঝেনি। এবং আমি জানি ওরা কি ভাবে। ভাবে যে বাবাও কিছু বোঝেনি। বাবার বোঝার বয়স চলে গেছে। বাইরে স্বীকার না করলেও আমি মনে মনে জানি হয়ত ওরাই ঠিক। কান নিয়ে আমাদের বুড়োদের সত্যি একটা সমস্যা আছে। চোখে কম দেখলে আমরা অনায়াসে স্বীকার করি, সোজা হয়ে হাঁটতে না পারলে লজ্জা পাই না, নিজের দাঁত হারিয়ে নকল দাঁত পরতে হলে অকপটে মেনে নিই, কিন্তু কানে টান দিলেই আমরা ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ি। যেন কান গেল তো সব গেল। যদিও জরিপে দেখা গেছে যে সত্তুর-পার-হওয়া অধিকাংশ বৃদ্ধেরই শ্রবনেন্দ্রিয়ের সমস্যা।

      যৌবনে প্রৌঢ়ত্বে পুরুষদের অনেকেই গিন্নির পেনপেনানি নিয়ে নানারকম রসিকতা করেন। পৃথিবীর সব দেশেই এটা আছে। ইংরেজিভাষী দেশগুলোতে একে বলে ন্যাগিং। সংসারে এমন স্বামী কি পাওয়া যাবে কোথাও যে তাসের আড্ডা থেকে গভীর রাতে বাড়ি ফেরার পর গিন্নির মধুকন্ঠের সুধাবর্ষণ থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টায় কানের সুইচ বন্ধ করে রাখেনি? কান যখন ভাল থাকে তখন না শোনার ভান করা যায় অনায়াসে। কিন্তু শ্রবনশক্তি যখন দুর্বল হয়ে যায় তখন ভান করতে হয় শুনতে পাওয়ার। এই তো জীবনের বিড়ম্বনা।

      যৌবনে এক বিখ্যাত অধ্যাপককে চিনতাম যিনি দাবি করতেন যে তিনি কানে শোনেন না ভাল। সাধারণ কথাবার্তায় একটু অমনোযোগী ছিলেন তা আমি নিজেও দেখেছি, কিন্তু তাঁর সামনে তাঁকে নিয়ে কিছু বলা খুব নিরাপদ ছিল না। কথিত ছিল যে ওগুলো তিনি ঠিকই শুনতেন। অর্থাৎ তাঁর ছিল যাকে বলে সিলেক্টিভ হিয়ারিং। যা শুনতে চাইতেন তা শুনতেন, বাকিটা ছেঁকে ফেলতেন কান থেকে। পলিসিটা মন্দ না। কান থাকলে তাও করা যায়। কিন্তু কান গেলে আর তা হয় না।

      কে যেন বলেছিলেন একবার যে আল্লাতালা মানুষকে কান দিয়েছেন দুটি, জিভ দিয়েছেন মাত্র একটি। অথচ অকৃতজ্ঞ মানুষ জিভটাকে ব্যবহার করে যত কানটাকে করে না তার একাংশও। কথাটি বর্ণে বর্ণে সত্য আমাদের বাঙ্গালিদের বেলায়। ফলে ব্যবহার না করে করে আমাদের কানদুটি অকেজো হয়ে পড়ে অকালে, ওদিকে জিভ থাকে সদাচঞ্চল। মজার জাতি আমরা।

      পশ্চিম বিশ্বের কথা অবশ্য আলাদা। এখানে জিভের ব্যবহার খুব কমই হয় বলা যায়, বাংলাদেশের তুলনায়, তবে কানের ব্যবহার একেবারে ননস্টপ। এদেশের গানবাজনার অনুষ্ঠানে গিয়েছেন কখনো? আমি গিয়েছি। শখ করে নয়, কৌতূহল মেটাতে। ক্লাসিক্যাল সিম্ফনি আর আধুনিক রক মিউজিক দুটোরই অভিজ্ঞতা আছে আমার। আমার কানের যদি সত্যি সত্যি শোনার শক্তি হ্রাস পেয়ে থাকে কিঞ্চিৎ তাহলে রক মিউজিকই তার জন্যে দায়ী। একবার শোনার পরই কানের ড্রামদুটি ফেটে চুরমার হয়ে যাবে আপনার। এবং এই কর্ণবিদারি মিউজিক আজকের প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা দিনেরাতে দশবারো ঘন্টা শুনে যাচ্ছে গভীর মনোযোগ সহকারে। এই প্রজন্মটি যখন পঞ্চাশ পার হবে তখন তাদের কানের কি দশা হবে ভেবে দেখুন। আমরা কান হারিয়েছি সত্তুর পার হবার পর, এরা হারাবে তার অনেক আগেই। এদের কানের ওপর অত্যাচার আসছে এক দিক থেকে নয়, চতুর্দিক থেকে। এযুগের সবকিছুই যেন হেভি মেটাল। সাত আট ডেসিবেলে না পৌঁছুলে এদের তৃপ্তি নেই। মজার ব্যাপার হল আমাদের অভিবাসী সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরাও সেই একই পথ ধরেছে। তাই বলি আপনার ছেলে বা মেয়ে যদি ডাক্তারি পড়তে চায় তাহলে তাকে বলুন যেন কানের চিকিৎসায় স্পেসালিস্ট হবার চেষ্টা করে। লালে লাল হয়ে যাবে অতি অল্প সময়ে।

অটোয়া, কানাডা

৪ঠা জুন, ২০০৯।

 

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.