Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  প্রযুক্তি বন্ধন  ||  ১০ম বর্ষ ১ম সংখ্যা বৈশাখ ১৪১৭ •  10th  year  1st  issue  Apr - May  2010 পুরনো সংখ্যা
হার্ট বাইপাস Download PDF version
 

প্রযুক্তি বন্ধন

হার্ট বাইপাস

শাশ্বতী ঘোষাল

 

চিরস্থির কবে নীর হায় রে জীবন নদে...

 

জীবনের শান্ত ছবি দেখার সুযোগ খুব একটা আমার হয়নি, তবে জীবনে সব কিছুই খারাপ হয়েছে তাও বলতে পারি না।  কিন্তু বাবাকে হঠাৎ স্ট্রোকে হারানোটা এখনো যেন মেনে নিতে পারিনা।  তাই মা যখন সেবার রাত আড়াইটার সময় ফোন করে শান্ত গলায় জানালেন যে বুকে ব্যাথা করছে, বাঁ হাত ঝিনঝিন করছে, এবং নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, এবং তখনি হাসপাতালে যাচ্ছেন, ভাবলাম যাঃ তাহলে এবার সব শেষ হয়ে গেল।  চারদিনের মাথায় বিমানপথে পাড়ি দিয়ে দেশে পৌঁছলাম এবং তার চারদিনের মাথায় মায়ের ওপ্‌ন্‌-হার্ট বাইপাস সার্জারী (করোনারী আর্টারী বাইপাস গ্রাফট - সিএবিজি) হলো। কলকাতায় ডাক্তার অজয় কল-এর তত্ত্বাবধানে নয় ঘণ্টা ধরে হয়েছিল অস্ত্রোপচার - দুপুর বারোটা থেকে রাত নয়টা অবধি।  সত্যিই মনে হয়েছিল ডাক্তারের বেশে উনি দেবতা।  রাত সাড়ে দশটার সময় দূর থেকে মাকে একবার দেখে এলাম। আমার একার পক্ষে অসাধ্য ছিল অন্যান্য সবকিছু সামলানো। দেবদূতের মতো এক ছোট্ট বন্ধু পেয়েছিলাম সঙ্গে - তাছাড়া যেভাবে সাহায্য পেয়েছি আত্মীয়-বন্ধু-প্রতিবেশী সবার থেকে, তা বলে ফুরোবে না।

 

এবার আসি ব্যাধিটা নিয়ে একটু ব্যাখ্যার পিছনে।  বক্ষপঞ্জরের মধ্যে বসে আমাদের মুঠির মাপের হৃদযন্ত্র বা হার্টটি অবিরাম দেহের মধ্যে একটি পাম্পের কাজ করে চলেছে সেই আমাদের ভ্রূণাবস্থা থেকে - একটু থামলেই মুশকিল। তার কাজ ফুস্‌ফুস ও সারা শরীরে সুস্থ রক্ত পৌঁছে দেওয়া।  ডানদিক (ছবিতে নীল রঙের) ও বামদিকে (ছবিতে লাল রঙের) সে দুই ভাগে ভাগ করা, তারা আবার দুভাগে ভাগ যাদের নাম এট্রিয়াম ও ভেন্ট্রিক্‌ল্‌।  রক্তের হিমোগ্লোবিন থেকে আমাদের শরীর সব অক্সিজেন শুষে নেয় ও কার্বণ ডাই অক্সাইড ভর্তি রক্তকে হার্টে ফেরত পাঠায় ডান এট্রিয়ামের মধ্যে দিয়ে, সেখান থেকে রক্ত পৌঁছয় ডান ভেন্ট্রিক্‌লে ও সে তখন পাঠায় ফুস্‌ফুসে। 

 

ফুস্‌ফুস এই রক্তের থেকে কার্বণ ডাই অক্সাইড গ্যাস বার করে নিয়ে তখনি ঐ রক্তের মধ্যে অক্সিজেন ভর্তি করে পাঠায় হার্টের বাঁ দিকের এট্রিয়ামে। সে আবার সেই রক্ত পাম্প করে দেয় বাঁদিকের ভেন্ট্রিক্‌লে, সেখান থেকে সেই অক্সিজেন ভর্তি রক্ত ছড়িয়ে পড়ে আমাদের সব শরীরটাতে আয়োর্টার মাধ্যমে। এই গোটা ব্যাপারটা পড়তে অনেক সময় লাগলো হয়ত, কিন্তু সাধারণভাবে প্রতি মিনিটে মোটামুটি প্রায় আশিবার (মিনিটে নাড়ি যতবার চলে -বা পাল্‌স্‌রেট্‌) এই প্রক্রিয়াটি হয়ে চলেছে আমাদের প্রায় অজ্ঞাতসারে। অন্ততঃ যতক্ষণ না আমরা পরীক্ষা করছি নাড়ী গুনে, স্টেথোস্কোপ দিয়ে বা অন্য কোনভাবে।

 

ছবিতে যেরকম দেখছেন যে এই আয়োর্টা বেশ স্বাস্থ্যবান মোটাসোটা একটি নল। যন্ত্রের মাধ্যমে তার ছবি দেখলে ও ছলাত্‌ ছলাত্‌ শব্দ শুনলে প্রথমে বেশ অবাক লাগে যে তার মধ্যেও সাধারণ জলের পাইপের মতো ময়লা জমতে পারে। সুতরাং তাতেও যদি ময়লা জমতে পারে... তাহলে একদম শেষ প্রান্তের সরু ঝিরিঝিরি রক্তনালীগুলোর কথা একবার ভাবুন! রক্তে বেশী কোলেস্টেরল বা চর্বি (যাকে প্লাক বলে) থাকলে তারা আমাদের রান্নাঘরের জল সরার জায়গাটার মতো প্রথমে হড়হড়ে করে দেয়, ও তার ওপর দিয়ে যা যায় তাই ধরে রাখার চেষ্টা করে, যদি পরিষ্কারের ব্যবস্থা না করা হয়!  তার ফলে নালীটি বন্ধ হয়ে যেতে থাকে, রক্ত চলাচল সেই অংশে বন্ধ হয়ে যায় ও রক্তনালীটি ঐ অংশে ক্রমশঃ ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।

 

এইভাবে রক্তপ্রবাহ ব্যাহত হলে হার্টে চাপের সৃষ্টি হয়, ও হার্ট আয়তনে বাড়তে থাকে, তার ফলে বুকে ব্যাথা হতে পারে ও তার থেকে আস্তে আস্তে ঘাড় ও হাতে সেই ব্যাথা নামতে থাকে - সাধারণতঃ বাম দিকে, একটা ঝিনঝিনে ব্যাথা! অনেক কারণেই এই ব্যাথা শুরু হতে পারে - যেমন অনভ্যাসের পর কোন কারণে দৌড়তে হলে, কিছু অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে ভালমন্দ খাওয়া হলে, তাপমাত্রার কোনভাবে পরিবর্তন ঘটলে, কোন কারণে রাগ বা দুঃখ হলে, কিম্বা আপাতঃদৃষ্টিতে কোন কারণ ছাড়াই আমাদের হৃদযন্ত্রটি জানান দিতে পারে।

 

এই অবস্থায় যদি হার্ট ঠিকভাবে কাজ করতে না পারে, তাহলে হার্টের পক্ষে মস্তিষ্কে রক্ত পাঠানো সম্ভব হয় না।  সুতরাং প্রতিটি মানুষের কার্ডিওপাল্‌মোনারি রিসাসিটেশন (সি পি আর) অতি অবশ্য শিক্ষা নেওয়া উচিত।  হাসপাতালে পৌঁছবার আগেই না হলে কাছের মানুষটি কোমায় চলে যেতে পারেন।  প্রথমে দেখতে হবে মানুষটি নিঃশ্বাস নিচ্ছেন কি না - না নিলে, চিত্‌ করে শুইয়ে, থুতনি একটু উঁচু রেখে, রুগীর নাক টিপে বন্ধ করে, মুখে মুখ লাগিয়ে অক্সিজেন সরবরাহ করতে হবে, যতক্ষণ না বুকের ওঠানামা দৃশ্যতঃ গোচরে আসে।  নাড়ী দেখে যদি পাল্‌স্‌ পাওয়া না যায়, তবে সি পি আর করা প্রয়োজন।  দুই হাতের চেটোর গোড়া দিয়ে হার্টের ওপর বার দশেক ক্ষিপ্র কিন্তু জোরালো চাপ দেওয়া প্রয়োজন।  রুগীর মুখের ওপর নজর রেখে, মুখে নিঃশ্বাস (বার তিনেক) ও হার্টের ওপর চাপ (বার দশেক), এই দুটি পরের পর কয়েকবার করলে, মিনিট দশের মধ্যে রুগীর জ্ঞান ফেরা উচিত।  আমেরিকান রেড ক্রস থেকে এ শিক্ষাটি দেওয়া হয় বলে জানি।  শুধু বই পড়ে এর শিক্ষা নেওয়া উচিত না। এখন অনেক ডিভিডিও পাওয়া যায় সি পি আর শেখার জন্য।

 

এর ফাঁকেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রুগীকে হাসপাতালে দেওয়া উচিত সে অ্যাম্বুলেন্স ডেকেই হোক বা নিজেরা গাড়ীর ব্যবস্থা করেই হোক বা সবাই মিলে রুগীকে পাঁজাকোলা করেই হোক।  ডাক্তারদের তখন কি করণীয়?  বিভিন্ন পরীক্ষা করার পরে সাধারণতঃ ডাক্তাররা ঠিক করেন যে অ্যাঞ্জিওগ্রাফি করার মতো শরীরের অবস্থা কি না।  ফিমোরাল আর্টারীর মধ্যে দিয়ে এক্স-রেতে ধরা পড়ে এমন কিছু রঙ পাঠিয়ে দেওয়া হয় হার্টের রক্তনালীর মধ্যে।  তাতে ধরা পড়ে ঠিক কোনখানে এবং কতখানি বাধার সৃষ্টি হয়েছে রক্ত সঞ্চালনে।  এর পরে তাঁরা বিবেচনা করে ঠিক করেন রোগীর পক্ষে কোন ধরণের চিকিৎসা প্রয়োগ করা সম্ভব হবে।  আমার মায়ের ক্ষেত্রে তাঁরা সিএবিজি-র সিদ্ধান্ত নেন।  হার্টের রক্তনালীর যেখানে বাধা আছে সেটা না সরিয়ে ফেলে তাঁরা আমার মায়ের দুই পায়ের দুটি রক্তনালী কেটে নিয়ে হার্টের দুই জায়গায় জুড়ে দেন।  শহরের ঘিঞ্জি অঞ্চলের বাইরে দিয়ে যেভাবে বাইপাস করে তাড়াতাড়ি গাড়ী যাবার ব্যবস্থা করা হয়।  তাই সাধারণের ভাষায় এর নাম বাইপাস সার্জারী।  পাশের ছবিটির থেকে ধারণাটি হয়ত আরও পরিষ্কার হতে পারে।  ওপ্‌ন্‌-হার্ট সার্জারী বলতে এখানে হার্টটিকে ঠিক খোলা হয় না, তবে বুকের খাঁচার হাড়গুলিকে কেটে হার্টের কাছে যাবার রাস্তা করে নেওয়া হয়।

 

যতক্ষণ ডাক্তাররা হার্টের ওপরে কাজ করেন, ততক্ষণ একটি বিশাল যন্ত্র চালিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্ত চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়।  একে বলা হয় হার্ট-লাং মেশিন উইথ সেল সেভার।  যে টেকনিশিয়ান এটি চালনা করেন, তাঁকে পারফিউশনিস্ট বলা হয়।  যন্ত্র চলাকালীন যাতে রক্ত জমাট বেঁধে না যায় তার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়।  সেল সেভার রুগীর রক্ত নষ্ট হতে দেয় না।  তার ফলে অস্ত্রোপচার চলাকালীন বাইরে থেকে খুব বেশী রক্ত দেবার প্রয়োজন হয় না।  এই হার্ট-লাং মেশিনটি একটি বেশ বড়ো মাপের যন্ত্র।  এই যন্ত্রে থাকে সমস্ত ব্যবস্থা যাতে রুগীর রক্ত চলাচলের সঙ্গে তার শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি না পড়ে, তাপমাত্রা এমন থাকে যাতে শরীর ঠাণ্ডা না হয়ে যায় আবার বেশী তাপমাত্রা পেয়ে শরীরের বাইরে থাকাকালীন রক্তের গুণ না নষ্ট হয়ে যায়, রক্তে ইলেক্ট্রোলাইটের ঘাটতি না হয়, ইত্যাদি।  পারফিউশনিস্ট এই যন্ত্রটি সামাল দেবার ফলে ডাক্তার ও তাঁর দল সুযোগ পান শুধুই হার্ট ও রক্তনালী নিয়ে ভাবনার ও তার ওপরেই কাজ করার। 

কিন্তু এই যন্ত্র ব্যবহারের সময় কিছু ছোট চর্বির কণা জাতীয় জিনিষ মস্তিষ্কে চলে যেতে পারে বলে ধরা হয়, তার ফলে সার্জারীর পরে কোনো কোনো রুগীর সাময়িকভাবে মানসিক অবস্থার কিছু অবনতি দেখা যায়।  আমার মায়ের ক্ষেত্রে সেটি হয়েছিল এবং সত্যি কথা বলতে কি বেশ ভয় পেয়েছিলাম হার্ট ঠিক করতে এসে মাথা খারাপ মানুষ নিয়ে যাব কিনা ভেবে।  কিন্তু ডাক্তার যেরকম বলেছিলেন, দুদিন পরে মা সেই সমস্ত আচরণ বন্ধ তো করেনই, এমনকি সঙ্গে সঙ্গে ভুলেও গিয়েছিলেন নার্সদের সঙ্গে কি ব্যবহার করেছিলেন। তখন নার্স ও আমরা সবাই মাকে নিয়ে হাসাহাসিতে মা খুব সুন্দরভাবেই যোগ দেন। 

 

মায়ের যে কষ্টটা তখন ধরা পড়েনি সেটা হলো খাবারের প্রচুর বাধ্যবাধকতা সত্ত্বেও কিড্‌নী আস্তে আস্তে খারাপ হওয়া।  ক্রিয়েটিনিন্‌ মাত্রা বাড়া কিড্‌নী খারাপ হওয়ার একটি সূচক হিসেবে ধরা হয়।  কিডনী কাজ না করলে নতুন পরিষ্কার রক্তও তৈরী হয় না।  নিয়মিত ইরিথ্রোপোয়েটিন নামে একটি হরমোন ইঞ্জেক্‌শন দেবার প্রয়োজন হয় রক্ত তৈরীর জন্য। 

 

প্রতিদিনই  চিকিৎসা বিজ্ঞান নতুন নতুন আবিষ্কার করে আমাদের চিরযৌবনের আস্বাদ দেবার পথে এগিয়ে চলেছে।  সুতরাং বাইপাসের এই পার্শ্বক্রিয়া হয়ত কিছুদিনের মধ্যেই আর মেনে নিতে নাও হতে পারে।  সাধারণভাবে মহিলাদের ক্ষেত্রে হর্মোনের ভিন্নতার জন্য হার্টের অসুবিধা দেখা দেয় পুরুষদের থেকে বেশ বছর দশেক বা তারও পরে।  তার ফলে সেই বয়সে মহিলাদের শরীর অনেক বেশী অশক্ত হয়ে পড়ে এত বড় একটি অস্ত্রোপচারের চাপ সহ্য করার পক্ষে।

 

আচ্ছা, একটা ছোট্ট গুণ করতে দিই? মিনিটে যদি আশীবার আমাদের হার্টটা পাম্প করে, তাহলে সে ৮০, ৬০, ২৪, ৩৬৫, ও ৫০ গুণ করলে যত হয় - ততবার পাম্প করছে আমাদের বয়েস যখন প্রায় ৫০!!! গুণফলটা দেখে আমারই হার্টের মধ্যে বেশ গুড়গুড় করছিল!  তাহলে আমাদের কি করা উচিত? যেভাবে তোড়ের মাথায় জল চালিয়ে কোন জলের নল পরিষ্কার করা সম্ভব, সেভাবে মাঝে মাঝে আমাদের উচিত হার্টটাকে বেশ দ্রুতবেগে চলতে দেওয়া। তার মানে, নিয়ম মেনে কিছু শারীরিক পরিশ্রম করা বা ব্যায়াম করা, দৌড়োনো, সাঁতার কাটা, নিয়মিত শাকসব্জি, ফল ইত্যাদি খাওয়া, মাংসের বদলে মাছ খাওয়া ইত্যাদি, ইত্যাদি।  মানে, অনেক তো খেলাম এই বয়েস অবধি, এবার সুস্থভাবে বাঁচতে যদি চাই তো জীবনযাত্রা পাল্টানোর দরকার হতে পারে।

 

ছবিগুলি ও কিছু তথ্য এই ওয়েবপেজগুলি থেকে নেওয়া হয়েছে...

http://www.cts.usc.edu

http://www.enotes.com/nursing-encyclopedia/heart-lung-machines

ড. শাশ্বতী ঘোষাল সিনিয়র মেডিক্যাল কেমিস্ট হিসেবে সুইডেনে কর্মরত।

 

 

মন্তব্য:
মামুন   May 21, 2010
ভাল লাগল লেখাটা পড়ে। আশা করি আপনার লেখা ভবিষ্যতে আরো দেখা যাবে।
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.