Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাহিত্য  ||  ১০ম বর্ষ ১ম সংখ্যা বৈশাখ ১৪১৭ •  10th  year  1st  issue  Apr - May  2010 পুরনো সংখ্যা
সকল বিশ্বের সেরা বিশ্ব আমাদেরই মহাবিশ্ব Download PDF version
  সাহিত্য

 

সকল বিশ্বের সেরা বিশ্ব আমাদেরই মহাবিশ্ব

 

মীজান রহমান

 

(গত সংখ্যার পর)

 

২.

  প্রকৃতির গতিবিধি নিয়ে যখন দুই দলের দুই অবস্থান, তখন মাঝখান থেকে ফোড়ন কাটতে এলেন পিয়ের মরো মোপার্তুই (১৬৯৮-১৭৫৯) নামক আরেক ফরাসী ভদ্রলোক। তিনি বললেনঃ আপনারা দুজনই ভুল। সোজা রাস্তা, সময় বাঁচানো, কোনটারই ধার ধারে না প্রকৃতি। প্রকৃতি হল অলস-জাতকুঁড়ে বলতে পারেন- যেদিকে সবচেয়ে কম পরিশ্রম সেদিকেই তার চোখ। এর নাম দিলে তিনি Principle of Least Action- ন্যূনতম শ্রমতত্ব।

  কে এই ভদ্রলোক? প্রকৃতি যে বেশি খাটাখুটি পছন্দ করে না সেকথা কে বলল তাঁকে?

  পিয়ের মোপার্তুই কোনও বড় বিজ্ঞানী বা গাণিতিক ছিলেন তা নয়। এমনকি দর্শনশাস্ত্রেও কোন উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল না তাঁর। তাঁর বড় কৃতিত্ব ছিল যে ফরাসী নাগরিক হয়েও ব্রিটিশ বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটনের  অন্ধ ভক্ত ছিলেন। সেযুগে সেটা ছিল একরকমের বিশ্বাসঘাতকতা, দুই দেশেতে এতটাই শত্রুতার সম্পর্ক তখন। বিশেষ করে বিজ্ঞান আর দর্শন জগতে। একদিকে ফ্রান্সের কট্টর ডেকার্টপন্থীদের একটা ভারি দল।ওদিকে সাগরপারের নিউটন সাহেব বড় বড় তত্ব আওড়ে যাচ্ছেন যার অনেকগুলোর সঙ্গেই ডেকার্টিয়ানদের মতবৈষম্য। বড় তর্কটা বাঁধে পৃথিবীর আকৃতি নিয়ে। এটা যে গোলাকার তাতে কোন বিতর্ক ছিল না, কিন্তু এটা কি কমলালেবুর মত গোল না বাতাবিলেবুর মত, বিরোধটা ছিল সেটা নিয়ে। নিউটনের মতানুসারে পৃথিবী একসময় পুরোপুরি জলীয় বস্তু ছিল, পরে ঠাণ্ডা হতে হতে শক্ত রূপ ধারণ করে। কিন্তু জলীয় অবস্থায় নিজের অক্ষরেখায় ক্রমাগত ঘূর্ণনের কারণে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে খানিক চ্যাপ্টা হয়ে গেছে। ওদিকে ডেকার্টপন্থী জ্যোতির্বিদ ক্যাসিনির ধারণা ছিল ঠিক বিপরীতঃ চ্যাপ্টা নয়, লম্বা, অনেকটা বাতাবিলেবুর মত। প্রশ্ন দাঁড়ালোঃ কোন্‌টা ঠিক? চ্যাপ্টা না লম্বা? নিউটনের কমলা না ক্যাসিনির লেবু?

 এ-প্রশ্নের সমাধানের একটাই উপায়ঃ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাপজোক করা। পৃথিবী যদি নিখুঁত গোলাকার হয় তাহলে একই দ্রাঘিমা এবং একই জ্যার ব্যবধানে অবস্থিত দুটি বিন্দুর কেন্দ্রিক দূরত্ব বিষুবরেখায় যেমন, মেরু অঞ্চলেও একই হওয়া উচিত। এক না হয়ে যদি কম হয় মেরুতে তাহলে নিউটন ঠিক, বেশি হলে ক্যাসিনি। কোন্‌টা ঠিক সেটা পরীক্ষা করার জন্যে প্যারিসের বিজ্ঞানপরিষদের পক্ষ থেকে দুই বিশিষ্ট নাগরিককে পাঠিয়ে দেওয়া হল দুটি ভিন্ন ভিন্ন পথে। একজন গেলেন পেরুর পথে, নিরক্ষীয় অঞ্চলের মাপজোকের দায়িত্ব নিয়ে, আরেকজন, আমাদের মোপার্তুই সাহেব, রওয়ানা হলেন ল্যাপল্যাণ্ডের দিকে, উত্তরমেরুর অভিযান পরিচালনার ভার নিয়ে। বিজ্ঞানজগতের শ্রেষ্ঠ মণীষীদের একজন বলে গণ্য করা যায়না মোপার্তুইকে, কিন্তু এই অভিযানটির দায়িত্বগ্রহণের যোগ্যতা তিনি নিজের গুণেই অর্জন করেছিলেন।  নিউটনের গবেষণার কাজ প্রকাশিত হবার স্বল্পকালের মধ্যেই অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ ও সুচিন্তিত একটি নিবন্ধ রচনা করেছিলেন বিষয়টির ওপর, যা প্যারিসের তৎকালীন বুদ্ধিজীবি মহলে বেশ একটা সাড়া সৃষ্টি করে। যেহেতু অভিকর্ষ তত্বই তখন পরীক্ষাসাপেক্ষ, এবং বিষয়টির ওপর তিনিই বিশেষ জ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন সেহেতু অভিযানটির জন্যে তাঁর নির্বাচনই স্বাভাবিক মনে হয় সবার কাছে। কিন্তু আজকের বিচারে যা স্বাভাবিক সেকালের বিচারে অত স্বাভাবিক ছিল না তা। প্যারিসের বুদ্ধিজীবি সমাজে সেসময় প্রচণ্ড সৃষ্টিশীলতা থাকলেও সাথে সাথে ব্যক্তিগত রেষারেষিও ছিল প্রচণ্ডরকম। কেও কাউকে সহ্য করতে পারতেন না যেন। কে কাকে ঘায়েল করবেন সেদিকেই যেন নজর সবার। তখনকার মহারথীদের মধ্যে ছিলেন ইতিহাসের অনেক স্মরণীয় ব্যক্তি-ভল্টেয়ার, রুসো, ডালাম্বার্ট, দিদারেট, প্রমুখ শিল্পী-দার্শনিক-গবেষক। প্রকাশ্যে এঁদের মুখে স্তুতিবাক্যের অভাব ছিল না পরস্পরের প্রতি, কিন্তু আড়ালে হত নিয়মিত বিষোদ্গার। সোজা কথায়, ঘোর শত্রু না হলেও একে অন্যের প্রতিপক্ষ। কি কারণে যেন ভল্টেয়ার সাহেবের সবচেয়ে বেশি রাগ ছিল মোপার্তুইর প্রতি। লোকটার কোনকিছুই তাঁর পছন্দ হত না। গোটা দেশব্যাপী বেচারাকে একটা ব্যঙ্গচিত্র বানানোটাই যেন ছিল তাঁর সঙ্কল্প।

  যাই হোক, ল্যাপল্যাণ্ডের দুরূহ সফর মাত্র ষোল মাসের মধ্যে সমাপ্ত করে পিয়ের দ্য মোপার্তুই তাঁর সঙ্গীসাথীসহ বিজয়গর্বে প্রত্যাবর্তন করলেন প্যারিসে, ১৭৩৭ খৃষ্টাব্দে। ওদিকে নিরক্ষীয় অঞ্চলে পাঠানো হয়েছিল যে দলটিকে তাদের ফিরে আসতে লেগে গেল দীর্ঘ সাত বছর। কিন্তু মোপার্তুইর সফর এতটাই সফল হয়েছিল যে দ্বিতীয় দলটির কোনও প্রয়োজনই হয়নি। মোপার্তুই যেসব তথ্য পরিবেশন করলেন তাতে পরিষ্কার প্রমাণ হয়ে গেল যে পৃথিবী আসলেই দেখতে কমলালেবুর মত-অর্থাৎ ব্রিটেনের আইজ্যাক নিউটনই ঠিক, ক্যাসিনির ধারণা ভুল।

  মোপার্তুইর এই অভূতপূর্ব সাফল্যের সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে। প্যারিসের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ল রাস্তায়, তাদের বীরপুরুষটিকে এক নজর দেখবার আশায়। ল্যাপল্যাণ্ড অভিযানের আগে লোকটার নামই প্রায় জানত না কেউ, বিজ্ঞানজগতের একটা মুষ্টিমেয় গোষ্ঠীর বাইরে। সেই অজ্ঞাতনামা মানুষ রাতারাতি ফরাসীজাতির হিরো হয়ে গেলেন, অন্তত জনগণের দৃষ্টিতে। শুধু ফ্রান্স নয়, সারা ইউরোপেই। প্রুসিয়ার রাজা ফ্রেডারিক দ্য গ্রেট, জ্ঞানচর্চার একনিষ্ঠ সাধক ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে যাঁর খ্যাতি ছিল সর্বত্র, তিনি আমন্ত্রণ জানালেন মোপার্তুইকে তাঁর সদ্যপ্রতিষ্ঠিত বার্লিন বিজ্ঞান পরিষদের সর্বাধিনায়কের পদ গ্রহণ করার জন্যে। মোপার্তুই অত্যন্ত উচ্চাকাংখী পুরুষ, সেটা কারুর অজানা ছিল না। বার্লিনের বিজ্ঞান পরিষদের প্রধান পদ পায়ে ঠেলে দেবেন সেরকম মানুষ তিনি ছিলেন না। সানন্দে আমন্ত্রণ গ্রহণ করে তিনি বার্লিনের পথে রওয়ানা হলেন ১৭৪৫ সালে। সেই পদেই তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন ১৭৫৯ সালে পরলোকগমনের আগ পর্যন্ত। ইতিহাসসৃষ্টিকারী প্রতিভা নিয়ে হয়ত জন্মাননি তিনি, কিন্তু সারাজীবন বিজ্ঞানের চর্চাতেই কাটিয়েছেন সেটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। বড় চিন্তার ক্ষমতা তাঁর থাক বা না থাক, নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার করলে দেখা যাবে যে মৌলিক বিজ্ঞানে তাঁর অবদান একেবারে ছিল না তা নয়। যথেষ্টই ছিল। সমস্যা যা ছিল সেটা তাঁর চরিত্রে, ব্যক্তিত্বে- একটু হামবরা, একটু দেমাগী। খানিক রগচটাও ছিলেন হয়ত। মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলার একটা বিশ্রি অভ্যাস ছিল তাঁর, যার ফলে বিজ্ঞানজগতেও তিনি যথেষ্ট শত্রু তৈরি করেছিলেন। দুঃখের বিষয় যে তাঁর শত্রুদের অধিকাংশই ছিলেন সেকালের সেরা বুদ্ধিজীবি। ফ্রাঁসোয়া ভল্টেয়ারের(১৬৯৪-১৭৭৮) কথা তো একটু আগেই বললাম। তাঁর মত শক্তিশালী শত্রু একজনই যথেষ্ট। ভল্টেয়ারের কলমের জোরে পৃথিবীর যে-কোন মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এবং আমাদের হতভাগ্য মোপার্তুই প্রায় হয়েও ছিলেন। ল্যাপল্যাণ্ড থেকে ফেরার পর যখন তাঁর জনপ্রিয়তা প্রায় আকাশচুম্বী তখনও ভল্টেয়ারের ধারালো কলম চুপ করে থাকেনিঃ

 দ্যুলোকে ভূলোকে নিরালা মুলুকে খুঁজিতে গেলে হে মূর্খ

                               এমন তথ্য

  আপন গৃহেতে বসিয়া মহামতি নিউটন জানিতেন যাহা

                               পরম সত্য।

(লেখকের বঙ্গানুবাদ)

অর্থাৎ সত্যিকারের মাথাওয়ালারা ঘরে বসে যা দেখেন সেই একই জিনিস দেখার জন্যে গর্ধভদের যেতে হয় উত্তরমেরুতে। উচ্ছসিত প্রশংসার ভাষা এটা নয়।

  সম্পর্কটা আরো তিক্ত হয়ে ওঠে প্রুসিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডারিকের সঙ্গে ভল্টেয়ারের একটা মতবিরোধ ঘটবার পর। মনোমালিন্যটা ছিল একটা বৈজ্ঞানিক বিষয়ের ওপর, অথচ মোপার্তুই নিজে বিজ্ঞানী হয়েও ভল্টেয়ারের পক্ষ না নিয়ে নিয়েছিলেন ফ্রেডারিকের পক্ষ। রাগটা চরমে ওঠে সেকারণে। তারপর যখন অস্ট্রিয়া-প্রুসিয়াতে যুদ্ধ বেধে যায়, ইতিহাসে যা সপ্তবর্ষ সমর নামে অভিহিত, তখন ঘটনাক্রমে বিপক্ষদলের হাতে ধরা পড়ে যান মোপার্তুই সাহেব। যাদের হাতে ধরা পড়েন তারা কোনও সরকারি সৈন্যসামন্ত বা কর্মচারি ছিলেন না, ছিলেন সাধারণ কৃষকশ্রেনীর মানুষ। পরে তাঁর পরিচয় পেয়ে তারা ছেড়ে দেয় তাঁকে, কিন্তু ভল্টেয়ার সাহেব একটা টিপ্পনি কাটার সুযোগ ছেড়ে দিলেন নাঃ মেরোভিয়ার একদল চাষী তাঁকে পাকড়াও করে প্রথমে কাপড় খুলে লেংটা করে ফেলল। তারপর পকেট থেকে টাকাপয়সা খুঁজতে গিয়ে না পেয়ে পেল গোটা পঞ্চাশ উপপাদ্য। (ইংরেজিতে যাকে থিওরেম বলা হয়)

  লোকের চোখে লোকটাকে যতই হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করুন ভল্টেয়ার, তাঁর মাথায় যে বুদ্ধিশুদ্ধি একেবারে ছিল না তা নয়। বিবর্তনতত্বের ওপর দুচারটে মন্তব্য করেছিলেন তিনি যার সত্যতা প্রমাণ হয়েছিল একশ বছর পর- চার্লস ডারউইনের যুগান্তকারী গ্রন্থ অরিজিন অব স্পিসিজ যখন প্রকাশ হয় ১৮৫৯ খৃষ্টাব্দে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে প্রানীজগতে মিউটেশন, অর্থাত মৌলিক পরিবর্তন বলে একটা ঘটনা প্রাকৃতিক নিয়মেই ঘটতে পারে। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের জন্যে সে এক অসামান্য দূরদৃষ্টিসম্পন্ন উক্তি। তবে বিজ্ঞানের যে বিষয়টির সঙ্গে মোপার্তুইর নাম অবিচ্ছ্দ্যভাবে সংযুক্ত তা জীবজগত সম্পর্কিত নয়, জড়জগত সম্পর্কিত। তাঁর নাম পদার্থবিদ্যার পাঠ্যপুস্তকে পাওয়া যাবে প্রিন্সিপ্যাল অব লিস্ট একশন বা ন্যূনতম ক্রিয়া প্রসঙ্গে।তাঁর চিন্তায় বিষয়টি কিভাবে ধীরে ধীরে দানা বাঁধে তার একটা লম্বা কাহিনী আছে। তার একটা সারাংশ দিচ্ছি এখানে।

  চিন্তাটির সূচনা হয়েছিল সেই পুরনো প্রশ্নটির সূত্র ধরে- বায়ু থেকে পানিতে আলোর প্রতিসরণ- যা নিয়ে আল্‌ সাল হতে শুরু করে ফার্মা পর্যন্ত গোটা চারেক প্রসিদ্ধ নাম এরি মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে গত আটশ বছরে। মোপার্তুই সাহেব সিদ্ধান্ত নিলেন যে এবিষয়ে তাঁরও কিছু বক্তব্য আছে। এবং অত্যন্ত মৌলিক বক্তব্য। ডেকার্টের সঙ্গে তিনি একমত যে পানিতে আলো বেশি বেগবান বায়ুর চাইতে। কিন্তু সবসময় সরলরেখায় চলতে ভালবাসে বিলিয়ার্ড বলের মত সেটা মানতে রাজি হলেন না। অপরদিকে পিয়ের ফার্মার সবচেয়ে কম সময় এর তত্বও গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি তাঁর কাছে। সময় বাঁচানো কেন? কিসের এত তাড়া আলোর? তিনি ঠিক করলেন যে দুটি তত্বের কোনটাই ঠিক নয়। দুটোতে একই মৌলিক গলদ। গলদটা এই যে আলোর একটা নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার আছে, এটা যেন ধরেই নেওয়া হয়। যেন প্রকৃতির অন্যান্য ঘটনার তুলনায় আলোকরশ্নিকে একরকম স্বায়ত্বশাসনের অধিকার দেওয়া হয়েছে। সেটা কি করে সম্ভব? বিশ্বভুবনের এত সহস্রকোটি বস্তুকে অগ্রাহ্য করে আলোর প্রতি এতটা পক্ষপাতিত্ব- সেটা কি যুক্তিসঙ্গত মনে হয়? এভাবে যুক্তিতর্ক করে করে মোপার্তুই সাহেব নিজের মনে একটা মৌল এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তা দাঁড় করালেন। প্রকৃতির কোন ঘটনাই বিচ্ছিন্ন নয়- প্রতিটি ঘটনাই একটি মৌলিক শক্তির কোনও বৃহত্‌ পরকল্পনা দ্বারা সংযুক্ত। আলোই বলুন আর আঁধারই বলুন, পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে, তা গতিশীলই হোক আর স্থিতিশীলই হোক, সবকিছুর পেছনেই একটা বড় পরিকল্পনা আছে, একটা সুনির্দিষ্ট ধর্ম, যার উত্‌স কোনও পরমাত্মা- যাকে ঈশ্বর বলে জানি আমরা, বিশ্বব্রম্মাণ্ডের একচ্ছত্র অধিপতি, আমাদের সকলেরই সৃষ্টিকর্ত--তাঁরই অঙ্গুলিসঞ্চালনে ঘটনার উত্‌পত্তি হয়। অর্থাত্‌‌ প্রতিটি বস্তুরই দুটি সত্তা আছে- একটি তার বস্তুসত্তা, যা প্রতীয়মান, আরেকটি তার অধিসত্তা বা অন্তর্সত্তা যেখানে অধিষ্ঠিত সেই পরমাত্মা। তাঁর ইচ্ছা, তাঁর সুপরিকল্পিত নকশাই প্রতফলিত হয় বিশ্বজগতের সকল ঘটনাতে। প্রশ্ন হল সেই মহা পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্যটি কি। কেন তাঁর সাধ হল বিশ্বভুবন রচনা করার। কারণ তিনি চাইলেন তাঁরই প্রতিকৃতিতে একটা আদর্শ পৃথিবী সৃষ্টি হোক। সুতরাং যেখানে যা ঘটে সবই একটা মহত্‌ ও চূড়ান্ত কল্যাকে লক্ষ করে- সবকিছুরই একটা সুন্দর ও সুমহান পরিণতি আছে। কিন্তু সে-লক্ষে পৌঁছানোর জন্যে যে কর্মপন্থার প্রয়োজন তাতে আর যাই হোক অপব্যয় বা অমিতব্যয়ীতার প্রশ্রয় থাকতে পারে না- কারণ সৃষ্টিকর্তা শ্রমের অপচয় পছন্দ করেন না। অতএব সৃষ্টির মূলধর্ম হল ন্যূনতম শ্রম বা ন্যূনতম ক্রিয়া, যা নিসর্গের অন্যান্য ঘটনার মত আলোর প্রতিসরণেও পরলক্ষিত হতে বাধ্য। অর্থাত্‌ বায়ু থেকে যখন পানিতে প্রবেশ করে আলোরেখা তখন তা ন্যূনতম ক্রিয়ার নিয়ম পালন করেই চলে। এই ন্যূনতম ক্রিয়ার নিয়মচালিত যে পৃথিবী সে পৃথিবীকেই মোপার্তুই সাহেব সকল পৃথিবীর সেরা পৃথিবী আখ্যায়িত করেন। এই সেরাপৃথিবীতে জন্মগ্রহণ ও বসবাস করবার সৌভাগ্য হয়েছে সকল জীবজন্তু ও উদ্ভিদজগতের, এটাই তাঁর মত।

  সৃষ্টিবাদী ও ধর্মবিশ্বাসীদের জন্যে এর চেয়ে সুখবর আর কি হতে পারে। ধর্মযাজকরা তো চিরকালই বলে আসছেনঃ সংসারে কিছুই ঘটেনা করুণাময়ের ইচ্ছার বাইরে-সবকিছুতেই তাঁর অলক্ষ্য হাত আছে। সেই অলক্ষ্য হাতের কথাই বুঝি প্রকাশ পাচ্ছে মোপার্তুইর ক্রিয়াতত্বে। তবে যারা জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চায় জীবন কাটাচ্ছেন, যারা মুক্তবুদ্ধির সাধনা পছন্দ করেন তাদের পক্ষে যুক্তিতর্ক আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া এধরণের মৌলিক মতবাদ চট করে গ্রহণ করে নেওয়া সম্ভব নয়। ন্যূনতম ক্রিয়াতত্বের বিপক্ষে সাধারণ বুদ্ধিতেও অন্তত তিনটি প্রশ্ন দাঁড় করানো যেতে পারে। এক, সকল সম্ভাব্য পৃথিবী বলতে কি বোঝায়? পৃথিবী তো একটাই-এছাড়া অন্য কোন পৃথিবীর অস্তিত্ব আমাদের জানা নেই। তাহলে কোন সেই পৃথিবী যার সঙ্গে আমাদেরটির তুলনা করে নিশ্চিতভাবে রায় দিতে পারব কোন্‌টি শ্রেষ্ঠ। দুই, ক্রিয়া বলতে কি বোঝায়? এর সংজ্ঞা কি? তিন, সৃষ্টিকর্তার মনের কথা জানলেন কি করে মোপার্তুই সাহেব, যদি তর্কের খাতিরে মেনেই নেওয়া হয় যে সৃষ্টিকর্তা বলে সত্যি সত্যি একজন আছে, এবং একটি শ্রেষ্ঠমানের বিশ্বসৃষ্টির বাসনাতেই তিনি রচনা করেছিলেন আমাদের এই পৃথিবী।

  প্রশ্নগুলির মাঝে দ্বিতীয়টিই বোধ হয় সবচেয়ে সহজ, কারণ এটা দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গেই সম্পর্কিত। মোপার্তুই সংজ্ঞা দিয়েছিলেন এভাবেঃ একটা বস্তুকে এক বিন্দু থেকে আরেক বিন্দুতে নিতে যে খাটুনি লাগে তা নির্ভর করে বস্তুটির ভর, ওটাকে কতটা দূরত্বে সরাতে হবে, এবং কতটা বেগে- এই তিনটি রাশির গুণফলই হল সেই ক্রিয়া। স্থানান্তরকরণের প্রক্রিয়াতে একাধিক ক্রিয়ার প্রয়োজন হলে সবগুলোর যোগফল নিয়ে তা গণনা করতে হবে। এই নিয়ম অনুসারে অঙ্ক কষে মোপার্তুই সাহেব যে ফলাফল পেলেন তা সত্যি সত্যি মিলে গেল স্নেলসূত্রের সঙ্গে। তাহলে কি নির্ভুলভাবে বলা যায় যে তাঁর প্রদত্ত সংজ্ঞাই সঠিক সংজ্ঞা, বা তাঁর তত্বই সঠিক তত্ব? ডেকার্ট সাহেবও তো একই ফল পেয়েছিলেন, কিন্তু পানিতে আলো বেশি গতিশীল তাঁর এই বিশ্বাস যে ভ্রান্ত তার প্রমান তো আগেই দেখলাম আমরা। তাহলে মোপার্তুইর কথাই ঠিক সেটা আমরা হলপ করে বলব কিভাবে। নিশ্চয়ই বিষয়টি আরো তলিয়ে দেখা দরকার।

  উপরোক্ত প্রশ্নত্রয়ের তৃতীয়টির জবাব কোনও পদার্থবিদ বা গাণিতিকের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়, বিশেষ করে যারা সৃষ্টিবাদে বিশ্বাসী নন। এটা দার্শনিক যুক্তিতর্কের আওতায় পড়ে। এবং শেষমেষ একান্তই বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল। মোপার্তুই সাহেবের বিশ্বাসের পাল্লাটি কোনদিকে বেশি ভারি ছিল সেটা নিশ্চয়ই পরিষ্কার হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। কিন্তু যাদের সেই পাল্লাটি বিপরীত দিকে ঝুঁকে আছে তাদের চোখে মোপার্তুইর অধ্যাত্নবাদী পদার্থবিদ্যা একটু হাস্যাস্পদ মনে হওয়াই স্বাভাবিক। তদোপরি তাঁর জাতশত্রু ভল্টেয়ার তো সবসময়ই তক্কে তক্কে থাকতেন কখন সুযোগ পাওয়া যায় মোপার্তুইকে এক হাত নেওয়ার। ভল্টেয়ার নিজে ছিলেন পাঁড় নাস্তিক, সুতরাং মোপার্তুইকে নাস্তানাবুদ করবার এই সুবর্ণ সুযোগ তিনি হাতছাড়া করবেন কেন। সাথে সাথে মোপার্তুইর কাল্পনিক ঈশ্বরকেও খানিক ধোলাই করা যাবে, এই ছিল তাঁর মতলব। অতএব বেশ কয়েকবছর ধরে অনবরত চলল তাঁর ধারালো কলম। লোকটাকে যতভাবে অপদস্ত করা যায় কোনটাই বাদ দিলেন না তিনি। সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ও ব্যাপক জনপ্রিয়তাপ্রাপ্ত লেখা ছিল ক্যাণ্ডিড নামক একটা বড় গল্প। তাতে ডক্টর প্যানগ্রস নামক এক হাস্যকর চরিত্র দাঁড় করিয়েছিলেন তিনি যার বিচারে পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে সবই ভালোর জন্যে, এমনকি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও। ডক্টর প্যানগ্রস আর পিয়ের মোপার্তুই যে একই মানুষ সেটা বুঝতে কারুরই অসুবিধা হয়নি। বার্লিন বিজ্ঞান পরিষদের সর্বাধিনায়ক, মধ্যযুগীয় ইউরোপের বিজ্ঞানজগতের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ভল্টেয়ারের কলমের খোঁচায় একটি করুণ হাস্যকর চরিত্রে পরিণত হলেন।  একসময় বেশ দাপটের মানুষই ছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানসম্মান বজায় রেখে বেঁচে থাকা সম্ভব হয়নি বেচারার। ভগ্নহৃদয়ে মৃত্যুবরণ করেন ১৭৫৯ খৃষ্টাব্দে।

মোপার্তুই নিখুঁত মানুষ ছিলেন না মোটেও। দেমাগ গরিমা আত্নম্ভরিতা প্রতিহিংসাপরায়নতা, এসব সাধারণ দোষত্রুটি বিস্তরপরিমানেই ছিল তাঁর চরিত্রে। কিন্তু তাঁর বৈজ্ঞানিক কীর্তি, যার ইঙ্গিত একটু আগেই দেওয়া হল তা কোনভাবেই নগণ্য ছিল না। বিশেষ করে তাঁর ন্যূনতম ক্রিয়া তত্বটি। ওটার যৌক্তিক ভিত্তি খানিক নড়বড়ে হলেও তার প্রভাব পরবর্তীকালের অনেক চিন্তাবিদ ও গবেষক-দার্শনিকের কাজেই স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। গোড়াতে, তাঁর কর্মজীবনের প্রথমদিকে, একটা গুজব উঠেছিল যে এই ন্যূনতম ক্রিয়ার চিন্তাটি তাঁর মাথা থেকে উদ্ভূত হয়নি, হয়েছিল জার্মান দার্শনিক-গাণিতিক উইলেম লাইবনিজের( ১৬৪৬-১৭১৬)। এটা ঠিক যে লাইবনিজ নিজেও একটা ন্যূনতম ক্রিয়ার কথা ভেবেছিলেন, এবং সে-মর্মে একটা চিঠিও লিখেছিলেন এক বৈজ্ঞানিক বন্ধুর কাছে। কিন্তু সেটা নিয়ে বেশিদূর এগুননি তিনি, কারণ উনি ছিলেন মূলত দর্শনশাস্ত্রের লোক, যদিও গণিতের ক্যালকুলাস শাখাটির অন্যতম জনক হিসেবে তাঁর নাম সর্বজনবিদিত। ক্যালকুলাসের দ্বিতীয় জনকটি ছিলেন আইজ্যাক নিউটন। ‌তাঁরা ছিলেন সহ-আবিষ্কারক।

 যাই হোক, ন্যূনতম ক্রিয়ার আইডিয়াটি মোপার্তুই সাহেবের নিজস্ব, না লাইবনিজের কাছ থেকে ধার করা, সে-বিতর্কে না গিয়েও একটা বিষয়ে কোন দ্বিমতের অবকাশ নেই যে মোপার্তুই লাইবনিজের মত চুপ করে বসে থাকেননি আইডিয়া নিয়ে, ওটার ওপর কাজ করেছেন, গভীর চিন্তাভাবনা করেছেন। ওটুকু কৃতিত্ব তাঁকে দিতেই হবে। পরবর্তীকালের ইতিহাসবিদরাও সেটা সশ্রদ্ধে মেনে নিয়েছেন। এই আইডিয়াকে কেন্দ্র করে অনেক নতুন নতুন তত্ব ও তথ্য সৃষ্টি করে গেছেন গণিতজগতের কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তি। তার মধ্যে যে নামটি সর্বাগ্রে উল্লেখ করতে হয় তিনি হলেন সুইস গণিতজ্ঞ লিওনার্ড অয়লার ( ১৭০৭-১৭৮৩)। গণিতশাস্ত্রে তাঁকে আমি রবীন্দ্রনাথের সমতুল্য মনে করি। এতই বিশাল অতলগর্ভ অবদান তাঁর। অনেকে তাঁকে গণিতের  রাজপুত্র বলে আখ্যায়িত করেন। গণিতের অনেকগুলো শাখার তিনি উদ্ভাবক। এমনকি পদার্থবিদ্যা, প্রকৌশল এসব বিষয়েও তিনি মৌলিক অবদান রেখে গেছেন। এই লোকটির কাছে মোপার্তুইর সম্ভাব্য পৃথিবীগুলো একটি গাণিতিক সংজ্ঞালাভ করে। এবং তাঁর ন্যূনতম ক্রিয়ার আইডিয়াটি আধ্যাত্নিকতার অঙ্গন অতিক্রম করে একটি ব্যবহারিক সত্তা ধারণ করে। অয়লার নিজেও খুব ঈশ্বরবিশ্বাসী ছিলেন, এবং অনেকটা মোপার্তুইর মতই সৃষ্টিকর্তার সুপ্ত হাতের ছাপ দেখতেন সবকিছুতে। তবে গণিতের ব্যাপারে তিনি ছিলেন পুরোপুরি বস্তুনিষ্ঠ গবেষক- অধ্যত্নবাদ দিয়ে বিজ্ঞানের কোনকিছুর ব্যাখ্যা খুঁজবার প্রবণতা তাঁর ছিল না। তাঁরই সৃষ্টি গণিতের একটি নতুন শাখা- ক্যালকুলাস অব ভ্যারিয়েশন, যা অচিরেই একটি মূল্যবান গাণিতিক হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায় পদার্থবিদদের জন্যে। নিউটনের বলবিদ্যা এই নতুন শাখার আলোতে এক অভিনব রূপ ধারন করে, যার ফলশ্রুতিতে কালক্রমে বিজ্ঞানের আরেকটি আধুনিক শাখা, কুয়ান্টাম বলবিদ্যা, অঙ্কুরিত হতে শুরু করে। অয়লারের ক্যালকুলাস অব ভ্যারিয়েশনের ওপর যাঁরা অমর কাজ রেখে গেছেন তাঁদের মধ্যে জোসেফ লাগ্রাঞ্জ (১৭৩৬-১৮১৩), উইলিয়ম হ্যামিল্টন( ১৮০৫-১৮৬৫) ও কার্ল জ্যাকবি হলেন একেবারে প্রথম কাতারের। তাঁরা প্রত্যেকেই একটু একটু করে শাখাটিকে এগিয়ে দিয়েছেন, সমৃদ্ধ করেছেন। আমরা যারা ফলিত গণিতের ছাত্র তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকশ্রেনীতে পড়াকালেই অয়লার-লাগ্রাঞ্জ ইকুয়েশনের সঙ্গে পরিচয় লাভ করেছিলাম। পুরো নিউটনিয়ান বলবিদ্যাটিই অয়লার-লাগ্রাঞ্জ সমীকরণ থেকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। সেদিক থেকে ভাবতে গেলে বিশ্বজগতের প্রকৃতি সম্বন্ধে মোপার্তুইর সেই ন্যূনতম ক্রিয়ার আইডিয়াটি একেবারে দুনিয়াছাড়া ছিল না। অবশ্য ক্রিয়া বলতে তিনি যা ভাবতেন তার সঙ্গে পরবর্তীকালের  গবেষকদের চিন্তার ছিল আকাশ পাতাল তফাত্‌।

  অয়লার-লাগ্রাঞ্জ সমীকরণের পেছনে একটা ছোট্ট কাহিনী আছে। মূল কাজটি ছিল অয়লারের। পেপার লিখার পর প্রকাশের জন্যে পাঠিয়েছিলেন প্যারিসের এক খ্যাতনামা জার্নালে। লাগ্রাঞ্জ তখন সদ্য পাস করা তরু ছাত্র প্যারিসে। এবং অয়লারের দারুন ভক্ত। পেপারটি তাঁর কাছে পাঠানো হল মূল্যায়নের জন্যে। লাগ্রাঞ্জ পেপারিটি আগাগোড়া পড়ার পর অনুমোদনের সুপারিশ পাঠালেন সম্পাদকের দপ্তরে। সাথে সাথে কতগুলো মূল্যবান মন্তব্যও জুড়ে দিলেন যাতে বিষয়টির ওপর তাঁর নিজস্ব চিন্তাভাবনা প্রকাশ করেছিলেন। রিপোর্টটি তিনি এমন বিনয়ী ভাষাতে লিখলেন যাতে অয়লারের মনে কোন সন্দেহ না জাগে যে তিনি তাঁর কাজে কোন ফাঁকফোকর ধরার চেষ্টা করছেন, সেরকম ধৃষ্টতা তাঁর কখনোই ছিল না। শুধু এটুকুই বলতে চাচ্ছেন তিনি যে পেপারটি যদি অয়লার না হয়ে তিনি লিখতেন তাহলে হয়ত এভাবে না লিখে ওভাবে লিখতেন। বলা বাহুল্য যে সম্পাদক সাহেব নির্দ্বিধায় গ্রহণ করে নিলেন পেপারটি, কিন্তু অয়লার রিপোর্টটি পড়ে এতই মুগ্ধ হয়ে গেলেন যে কে এই অজ্ঞাতনামা রেফারি তা জানার জন্যে সম্পাদকের কাছে চিঠি লিখলেন। পরিচয় জানবার পর অয়লার প্রস্তাব পাঠালেন লাগ্রাঞ্জকে যে পেপারটি শুধু তাঁর নামে নয়, উভয় প্রণেতার নামে প্রকাশ হওয়া উচিত। অবশ্য তার আগে লাগ্রাঞ্জের প্রস্তাবিত রদবদলগুলো যুক্ত করা দরকার। বিজ্ঞানজগতে এধরণের উদারতা খুবই বিরল- বরং তার উলটোটাই দেখা গেছে সচরাচর। অয়লার ছিলেন একজন সত্যিকার মহাপুরুষ, শুধু গণিতেই নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও। ইতিহাসের পূজনীয় ব্যক্তিদের একজন। মোপার্তুইর ন্যূনতম ক্রিয়া তত্বের ওপর অয়লারের যে কি অবদান তার মূল্যায়ন করেছিলেন বিখ্যাত পদার্থবিদ-চিন্তাবিদ-মনস্তত্ববিদ আর্নস্ট ম্যাক ( ১৮৩৮-১৯১৬): অয়লার ছিলেন একজন মহত্‌প্রানের মানুষ। ন্যূনতম ক্রিয়া তত্বটির নাম পরিবর্তন করে অন্যকিছু রাখতে পারতেন অনায়াসে, কারণ তাঁর হাতে এসে তত্বটির চেহারা আকার আকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করে। কিন্তু তিনি তা করেননি। এমনকি মোপার্তুই সাহেবকেও তাঁর প্রাপ্য গৌরব থেকে বঞ্চিত করতে চাননি

  অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ছোট্ট একটি আইডিয়ার জন্ম। আলোর প্রতিসরণ রহস্যের সমাধান খুঁজতে গিয়ে মোপার্তুই নামক এক মাঝারি মাপের বিজ্ঞানীর মাথায় উদয় হয় এমন ধারণা যে প্রকৃতির আসল উদ্দেশ্য সরল পথ খোঁজা নয়, সময় বাঁচানোও নয়, আসল উদ্দেশ্য শ্রমের সদব্যবহার- খাটুনি কমানো। এই চিন্তার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল না সেসময়। নেহাত্‌ই একটা বিশ্বাস, একটা কল্পনা। তাঁর বিশ্বাসটি একরকম ধর্মীয় পর্যায়ে পৌঁছে যায় যখন তিনি দাবি করলেন যে শুধু আলোকরশ্নি নয়, প্রকৃতির সকল ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য। বিজ্ঞানের প্রত্যক্ষ সমর্থন ছাড়া এধরণের আজগুবি বিশ্বাস বেশিদিন টিকবার কথা নয়, সাধারণত টেকেও না। কিন্তু এক আশ্চর্য উপায়ে এই আইডিয়াটি কালের প্রাচীর লঙ্ঘন করতে সক্ষম হয়। শুধু টিকেই থাকে না, ক্রমে ক্রমে শাখায় প্রশাখায় চারদিকে বিস্তারলাভ করে। অবশ্য অয়লার, লাগ্রাঞ্জ, পঁয়সন প্রমুখ বিশিষ্ট গণিতজ্ঞদের সহায়তা ছাড়া এটি সম্ভব হত কিনা সন্দেহ। এঁরা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে গ্যালিলি থেকে শুরু করে নিউটন পর্যন্ত বলবিদ্যার যত সূত্রাবলী তার সবকটাই ন্যূনতম ক্রিয়া তত্বের ভিত্তিতে উদ্ধার করা সম্ভব। বলতে গেলে পুরনো নির্দিষ্টতাবাদী বিশ্বাসের ওপর যে বিজ্ঞান দাঁড়িয়ে আছে তার প্রায় পুরোটাই কোন-না-কোন ন্যূনতম ক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। অন্তত সেকালের বিজ্ঞানীদের অনেকেরই সে ধারণা ছিল। যদিও জ্যাকবি, ম্যাক, এঁদের মত জাঁদরেল বিজ্ঞানীদের কেউই ভাবতেন না যে নির্দিষ্টবাদের সব ব্যাখ্যাই আছে ন্যূনতম ক্রিয়াতে। গ্যালিলি-নিউটনের ব্যাখ্যা হয়ত আছে, কিন্তু বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখা?

  আধুনিক বিজ্ঞানে অবশ্য নির্দিষ্টতাবাদী চিন্তাটি বহুলাংশেই বর্জিত। প্রকৃতির সব ঘটনাই এমন নয় যে প্রাথমিক অবস্থাটা জানা থাকলে শেষেরটিও উদ্ধার করা যাবে অঙ্ক কষে। অনেক সময় প্রকৃতি স্মরণশক্তি হারিয়ে ফেলে, অর্থাত্‌ গোড়াতে কি হয়েছিল তার কোন প্রভাব থাকে না পরবর্তীতে। এমনকি সাবেক বলবিদ্যাতেও ক্যায়স থিওরি বলে একটা নতুন জিনিস দেখা দিয়েছে যেখানে সেই নির্দিষ্টতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গী একেবারেই কাজে লাগে না। তারপর আছে গতির স্বাভাবিক অনিশ্চয়তা- যেমন পারমানবিক পর্যায়ে ছোট্ট কনাটি বাঁয়ে যাবে না ডানে সেটা সঠিক বলা সম্ভব নয়, যদি গতি ও অবস্থান দুটোই একসাথে জানার ইচ্ছে হয় কারুর। নিউটন আর গ্যালিলির কনার বেলায় সেটা সম্ভব, কিন্তু পরমানুর বেলাতে নয়। মজার ব্যাপার যে সে ক্ষুদ্রকনার বিশাল জগতেও একরকম ন্যূনতম ক্রিয়ার ছাপ আছে।

  সেকথা আরেকদিন বলা যাবে।

 

 

ফ্রিমন্ট, ক্যালিফোর্নিয়া,

 ১৭ই ডিসেম্বর, ২০০৯

 

সূত্রঃ

১। “ The Best of all Possible Worlds: Mathematics and Destiny,” by Ivar Ekeland, The University of Chicago Press, Chicago and London, 2006

      ২। “ Descartes: the life and times of a genius”, by A.C. Grayling, published by Walker Publishing Company, New York, 2005.

 

মন্তব্য:
দীপেন ভট্টাচার্য   May 21, 2010
মীজান ভাই, কি বলব, বলার ভাষা নেই। এ যেন অমৃতের হাঁড়ি, খেয়ে সাধ মেটে না। কিছু ছবি দিলে হত না? ওঃ আর একটা যেন কি বলব ভাবছিলাম, ড। প্যানগ্লসকে অনেকে লাইবনিজও ভাবেন। সামনের লেখার অপেক্ষায়।
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.