Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাম্প্রতিক  ||  ১০ম বর্ষ ১ম সংখ্যা বৈশাখ ১৪১৭ •  10th  year  1st  issue  Apr - May  2010 পুরনো সংখ্যা
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার : বিএনপি এবং সরকার Download PDF version
 

সাম্প্রতিক

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার : বিএনপি এবং সরকার

শুভ কিবরিয়া

 

১.

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত একটি বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়েছে। একটি ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। তদন্তকারী দল ঘোষণা করা হয়েছে। আইনজীবী প্যানেলের নাম ঘোষণা করার পর তা নতুন করে পুননির্ধারিত করে তিনজন আইনজীবীর নাম ঘোষিত হয়েছে। যদিও পুরো আইনজীবী প্যানেল এখনো ঘোষিত হয়নি। যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি এখন আর যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক অবস্থানে নেই, মানবতাবিরোধী অপরাধ বিষয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার একটি ত্রিমাত্রিক বিষয়। দুটি বিবদমান পক্ষ,যুদ্ধরত দুটি দেশ ইত্যাদি বিষয়কে না জড়িয়ে যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় ঘাতক,সহযোগীদের বিচারের দিকেই এগিয়েছে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের চাপ সামলাতেই সরকারের এই রণকৌশল। কৌশলগতভাবে এটিও প্রশংসার যোগ্য। কেননা, যুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশের অধিবাসী যারা রাজনৈতিক এবং সামাজিকভাবে বাংলাদেশের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে হত্যা,খুন,পাশবিকতা চালিয়েছে তাদের বিচার হওয়াটাও কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।

আওয়ামী লীগ সরকার যদি এই অভিযোগে জামায়াতের প্রথম সারির নেতৃবৃন্দকে শাস্তি দিতে পারে সেটাও বাংলাদেশের জনগণের জন্য কম প্রাপ্তি নয়। কেননা বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধীতাকারী খুনি জামায়াত নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই অপশক্তির নেতিবাচক প্রভাব যেমন কমবে না,তেমনি তাদের অপকর্মকে গৌরবজনক বলেই প্রতীয়মান করার চেষ্টা তারা অব্যাহতভাবে চালিয়েই যাবে। সেই বিবেচনায়,মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য শাস্তি দেয়া গেলেও দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য তা এক বড় নজির হয়ে থাকবে।

২.

এই বিচারের কাজটি যথেষ্ট কঠিন। দীর্ঘ ৪০ বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার বিচার খুব সহজ বিষয় নয়। অধিকন্তু প্রতিপক্ষ,ইতোমধ্যেই সাংগঠনিক,রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক শক্তিতে যথেষ্ট বলীয়ান। আন্তর্জাতিক মহলেও তাদের যোগসাজশ যথেষ্টই রয়েছে। এরা চাইবে এই বিচার কাজকে ভণ্ডুল করতে। চাইবে, দেশে-বিদেশে অবস্থিত তাদের সকল মিত্র এবং বন্ধুদের সহায়তা একত্র করে  সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সংগঠন। দেশের অন্যতম রাজনৈতিক সংগঠন বিএনপি তাদের রাজনীতি এবং ভোটের মিত্র। সুতরাং তাদের সম্মিলিত শক্তিকে মোকাবিলা করার কাজটিও সরকার বা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্য খুব সহজ নয়। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী সরকার বিশেষত শেখ হাসিনার বর্তমান সরকার এসব নানামুখী সঙ্কট এবং বিরোধিতাকে সামলে কি কৌশল,কি যোগ্যতায় পুরো বিচার কাজটি সম্পন্নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় দেখার বিষয় সেটিই। অন্যদিকে সরকার তার সোয়া বছর বয়সেই জনগণের প্রকৃত দুঃখ-কষ্টগুলো লাঘব করার ক্ষেত্রে কতটা জনদরদী,জনবান্ধব হতে পেরেছে,তার ওপরও নির্ভর করবে এই বিচারের ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য।

৩.

সরকার এই বিচারের ক্ষেত্রে কতটুকু প্রস্তুতি নিয়েছে। এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের এই বিষয়ক মন্তব্যগুলো দেখা যেতে পারে ।

* যুদ্ধাপরাধীদের নয়, মানবতা লঙ্ঘনকারীদের বিচার করা হবে- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

* যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হবে - আইনমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

* প্রতীকী বিচার হবে- স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম

* প্রতীকী নয়,পূর্ণাঙ্গ বিচার হবে - আইনমন্ত্রী শফিক আহমদ

* জামায়াতের নয়,যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হবে- সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম

* মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের নয়,যারা মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী,যেমন নারীধর্ষণ,অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন ও শিশু নির্যাতনসহ,নানান অপরাধ করেছে তাদের বিচার করা হবে। - সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম

* যারা যারা যুদ্ধাপরাধের শিকার তারা নিজেরাও অভিযোগ করতে পারেন,সরকার সেগুলো পর্যালোচনা করে দেখবে। - আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম

(তথ্য সূত্র : আমাদের সময় ॥ ৩০ মার্চ ২০১০)

সরকারের কর্তা ব্যক্তিদের এসব নানামুখী বক্তব্য এসেছে এই বিষয়কে কেন্দ্র করে। গত কয়েক মাসে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা এই বিষয়টি নিয়ে এত পরস্পরবিরোধী এবং নানামুখী কথা বলেছেন, যে সংশয় জাগে সরকার এই বিষয়ে কতটা মনোযোগী এবং কেন্দ্রীভূত।

আবার বিচার বা তদন্ত শুরুর আগেই যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা প্রকাশিত হচ্ছে মিডিয়ায়। ৩১/ ৩৪/ ৩৬/ ৪৯ বা ২৫ শীর্ষ অভিযুক্তের কথা এসেছে। এটিও সংশয় এবং দুর্ভাবনার কারণ। কেননা কতজনকে এই অভিযোগ অভিযুক্ত করা হবে,তা কোনভাবে তদন্তের আগে বলা সমীচিন নয়। নিদেনপক্ষে যারা সরকারের উচ্চপদে আসীন তারা কোনভাবেই একটি বিচারযোগ্য বিষয় নিয়ে এ রকম মন্তব্য করতে পারেন না।

সরকারের ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের এসব মন্তব্য প্রমাণ করে এ বিচারের বিষয়টিকে তারা রাজনৈতিক বিষয় বলে যতটা ভেবেছেন,আদালতের বিষয় বলে ততটা ভাবেননি। এ ক্ষেত্রে তাদের রাজনৈতিক ভাবাবেগে যতটা কাজ করেছে, বিজ্ঞচিত আইনি যুক্তি বা বস্তুনিষ্ঠতার বিবেচনা ততটা কাজ করেনি। সুতরাং এ রকম একটি জটিল বিচার কাজ সম্পন্ন করা,যার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নেই,সে ক্ষেত্রে কাজটি শেষ করা হয়ত দুরূহ হয়েও পড়তে পারে।

৪.

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে আওয়ামী লীগ এটি ছিল তাদের নির্বাচনী ইশতেহার। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল তারা বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করবে,আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবে,চাঁদাবাজি-মাস্তানি কমাবে,দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত হবে,সুশাসন নিশ্চিত করবে। জনগণ এসব নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা করেছিল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বের মহাজোট তাদের নির্বাচনী ওয়াদা পালন করবে সেই ভরসায় ভোটের বাক্সে সমর্থন জুটেছিল। কিন্তু গত এক বছর চার মাসে সরকারের সার্বিক কর্মকান্ড জনগণকে খুশি করতে পারেনি। সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির সঙ্কট জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে। ছাত্রলীগ নামীয় সরকারি ছাত্র সংগঠনের চাঁদাবাজি-মাস্তানি-টেন্ডারবাজি,সাংবাদিক পেটানো কর্মকান্ড যেমন প্রবলভাবে বেড়েছে এসব নিরসনে সরকারি নিস্পৃহতাও তেমনভাবে বেড়েছে। ছাত্রলীগের এই অনায্য আচরণ প্রতিকারে,সরকারি নিস্পৃহতায় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে,মানুষ ভাবতে শুরু করেছে এদের ঠেকানোর কেউ নেই। কিংবা সরকারের সর্বোচ্চ মহলের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়েই এসব ঘটছে। অন্যদিকে ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বাড়ছে। দুর্নীতি তার আগের চেহারায় ফিরেছে। প্রশাসনসহ সর্বত্র দলবাজি বড় ভূমিকা রাখছে। সুশাসন প্রায় তিরোহিত। জনগণ ত্যক্ত বিরক্ত। সরকার এবং সরকারি দল দুটোর কোনোটিই সঠিকভাবে চলছে না।

ফলে দল নিজেও সরকারের কর্মকান্ডে আস্থাবান নয়। যার প্রমাণ মিলছে দলীয় কর্মকান্ডেও

যে কারণে আসন্ন ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ভয় পাচ্ছে আওয়ামী লীগ। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের এক সভায় এ নির্বাচন পিছিয়ে শীত মৌসুমে করার দাবি উঠেছে। মন্ত্রিসভার এক মিটিংয়ে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

সরকার ও জনগণের এই দূরত্ব,যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াকে কতটা লক্ষ্যে পৌঁছুতে সহায়তা করবে তাও দেখার বিষয়।

জনগণের দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে,এমন সব বিষয়ে সরকারের ব্যর্থতা,মানুষকে সরকারের বিষয়ে যদি নেতিবাচক করে তুলতে থাকে তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুটিকে আম জনগণের পক্ষ থেকে কতটা গুরুত্বপূর্ণ করে রাখা যাবে,সেটিও বিবেচ্য বিষয়।

৫.

বিএনপি দৃশ্যত: এই বিচারের বিষয়ে নেতিবাচক। তারা এটিকে মীমাংসিত ইস্যু মনে করে। সরকার যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার থেকে সরে এসে একে মানবতাবিরোধীও অপরাধের বিচার হিসেবে অভিহিত করে ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে, তখন বিএনপির দিক থেকে একে একটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ঘায়েল ইস্যু হিসেবেই বিবেচনা করা সহজ হয়েছে।

যারা য্দ্ধুাপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল,সেই পক্ষকে রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে বিএনপি। বিএনপির নিজের দলেও জনকথিত যুদ্ধাপরাধীদের অনেকের জায়গা হয়েছে। সুতরাং এই বিচার কাজটি বিএনপির জন্য কখনোই খুব সুখকর বিষয় হয়নি। ভবিষ্যতেও হবে না। তাই সরকারের বিচারিক উদ্যোগে বিএনপি রাজনৈতিক এবং প্রায়োগিক দিকে বাধার সৃষ্টি করবে। আদালতে,আদালতের বাইরে বিএনপির এই বাধাকে সরকার যত ছোট ভাবছে,আদতেই তা তত ছোট নয়। সরকারের কৌশলগত এই ভুলও এই বিচার কাজে সরকারকে পেছনে ঠেলবে।

৬.

একটা বড় প্রশ্ন ছিল,যুদ্ধাপরাধের বিচার কি আওয়ামী লীগ করবে? আওয়ামী লীগের অনেকেই তা বিশ্বাস করেনি। আজও সেই প্রশ্ন বিদ্যমান,সরকার কি সত্যি সত্যিই এই বিচারের কাজটি শেষ করবে? নাকি,একে ঝুলিয়ে রেখে ভবিষ্যতের নির্বাচনী মুলা হিসেবে ব্যবহার করবে?

রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে এ কথা বলা যায়,সরকার যেভাবে চলছে,তাতে গুণগত পরিবর্তন না এলে,যে কোনো কঠিন কাজ সম্পন্ন করা সরকারের জন্য সহজ নয়। এ সরকার রাজনৈতিক সরকার হলেও কাজে এবং বিশ্বাসে তারা আমলা (সামারিক ও বেসামরিক) নির্ভরতায় নিজেদের পরিপুষ্টি করেছে। এটি বড় বিপদের দিক।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়ে সরকারকে তাই অনেক পথ পেরুতে হবে। ভয় ও আশঙ্কা সেখানেই।

ঢাকা।

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.