Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  মূল রচনাবলীঃ  ||  ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ ১৪১৬ •  9th  year  2nd  issue  May-June  2009 পুরনো সংখ্যা
বিশ্ব উষ্ণায়ন ও বাংলাদেশ Download PDF version
 

গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও বাংলা বদ্বীপ

 

বিশ্ব উষ্ণায়ন ও বাংলাদেশ

 

দীপেন ভট্টাচার্য

 

ভূমিকা

 

মূলতঃ শিল্প বিপ্লবের কারণে গত দুশো বছর ধরে বায়ুতে ক্রমাগত কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO2) ও অন্যান্য উষ্ণতা বৃদ্ধিকারক গ্যাসের পরিমাণ বাড়ার কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছেগত ৭৫০,০০০ বছরের মধ্যে CO2 পরিমাণ এখন সবচেয়ে বেশী এবং বিজ্ঞানীদের কাছে এটা পরিষ্কার যে মনুষ্যজনিত প্রভাব প্রাকৃতিক - শ্লথ ও দীর্ঘকালীন - গরম ও ঠান্ডা হবার প্রক্রিয়াকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেউষ্ণতা বৃদ্ধিকারক গ্যাসের (গ্রীনহাউজ গ্যাস) মধ্যে শুধু CO2ই পড়ে না, এর মধ্যে আছে মিথেন (CH4), নাইট্রাস অক্সাইড (N2O), ক্লোরোফ্লোরো কার্বন (CFC-12), ইত্যাদিএই সমস্ত গ্যাস সৌরীয় তাপ, যা কিনা পৃথিবীপৃষ্ঠে প্রতিফলিত হয়ে অবলোহিত তরঙ্গে মহাশূন্যে ফিরে যেত, তাকে শোষণ করে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়বর্তমানে গবেষকরা ধীরে ধীরে পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাসে হঠাৎ উষ্ণায়ন প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক মিথেনের প্রভাব সম্পর্কেও অবহিত হচ্ছেন

বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যা একটি বদ্বীপের নিম্ন-ভূমি অঞ্চলে, যা কিনা তুলনামূলকভাবে ছোট, বাস করেবাংলাদেশের ভূমি ইতিমধ্যেই বন্যা, খরা, বায়ু ও পানি দূষণ, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, স্থান সংকটতা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক ও মনুষ্যজনিত কর্মকান্ডে খুবই নাজুক অবস্থায় বিরাজ করছেবৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন নিসন্দেহে সেই সংবেদনশীল অবস্থাকে খারাপ করছে এবং ভবিষ্যতে আরো খারাপ করবে

ভবিষ্যতে পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের আভাসবাণী বিভিন্ন কম্পিউটার মডেলের সাহায্যে করা হয়; যতদিন যাচ্ছে ততই এই মডেলগুলো উন্নত হচ্ছেএই বৈজ্ঞানিক মডেলগুলো দেখাচ্ছে যে গ্রীষ্মকালীন মাসগুলোয় বাংলাদেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়বে এবং শীতকালীন সময়ে কমবেতুলনামূলকভাবে শীতের সময় তাপমাত্রা বেশী বাড়বেএই দুটি কারণে গ্রীষ্মের সময় যেমন বন্যার প্রকোপ বাড়বে, তেমনই শীতের সময় খরার সম্ভাব্যতা বৃদ্ধি পাবেবর্ষার সময় উচ্চ তাপমাত্রা ও অধিক পানির সমন্বয় ভেক্টর বাহিত বিভিন্ন রোগ, যেমন কলেরা ও ম্যালারিয়ার প্রকোপকে আরো ছড়াবেস্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হবে

তাপমাত্রা, বর্ষা ও শস্য

গত একশো বছরে পৃথিবীব্যাপী তাপমাত্রা গড়ে প্রায় ০.৭৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছেআপাতঃদৃষ্টিতে এই বৃদ্ধির পরিমাণ কম মনে হলেও এটা ভাবতে হবে যে এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে এবং কোন কোন অঞ্চলে কোন কোন সময় তাপমাত্রার উত্থান-পতন অনেক বেশী হবে এই শতাব্দীতে তাপমাত্রা ১.১ থেকে ৬.৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস বাড়তে পারেবিভিন্ন কম্পিউটার জলবায়ু মডেল আগামী ৩০ বছরে বাংলাদেশে তাপমাত্রা বাড়ার পরিমাণ দেখাচ্ছে শীতে ১.১৭ ও গ্রীষ্মে ০.৫৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস, কিন্তু এই শতাব্দীর শেষে মডেলের আভাস হচ্ছে যে শীতের সময় ৫.৪৪ ও গ্রীষ্মের সময় ৩.১৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়বেএকই সময়ে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ শীতের সময় শতকরা ১৬ ভাগ কমবে ও গ্রীষ্মকালে শতকরা ২৬ ভাগ বাড়বেগ্রীষ্মকালে বৃষ্টিপাত বাড়ার মূল কারণ হচ্ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে সমুদ্র থেকে বেশী পরিমাণ জলীয় বাষ্প দক্ষিণ থেকে উত্তরে আসবে এবং মৌসুমী বায়ু চালিত এই বর্ষা আগমনের সময়ের হেরফের হবেঅন্যদিকে শীতের সময় কম বৃষ্টি ও হিমবাহ-জনিত পানির অভাবে এবং তুলনামূলকভাবে অধিক তাপমাত্রার কারণে ব্যাপক খরা দেখা দেবে

বাংলাদেশ রাইস রিসার্চ ইন্সটিটিউট শীতের সময়কার অন্যতম রবিশস্য বোরো ধানের বিভিন্ন হাইব্রিড সৃষ্টি করেছেন যা কিনা ঠান্ডা সহনশীলস্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তিত আবহাওয়ার সাথে সঙ্গতি রেখে নতুন ধানের প্রবর্তন করতে হবে যা কিনা শুধু উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীলই হবে না, সেই ধানের পানির দাবি অনেক কম হতে হবেঅন্যদিকে বর্ষার পানি নেমে গেলে যে আমন চারা লাগানো হত, বর্ষার প্রস্থান সময়ের পরিবর্তনকে মনে রেখে নতুন জাতের আমনের প্রবর্তন করতে হবে  

 

লবণাক্ততা ও জীববৈচিত্র

সমুদ্র উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে সুন্দরবন অঞ্চলে লবণাক্ততার পরিমাণ আরো বাড়বে এটা ধরে নেয়া যায়শীতের সময় উত্তর থেকে মিঠা পানি আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেলে এই লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাবেঘূর্ণিঝড়ের প্রচন্ডতা বৃদ্ধি পেলে সমুদ্রের লবণ পানি খুব উঁচু জোয়ারের সাথে দেশের গভীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেএর অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হচ্ছে সুন্দরবনের ম্যাংগ্রোভ প্রকৃতির মৃত্যু এবং সমতলে চাষজমির ফলন শক্তি হারানোবর্তমানে সুন্দরবনের ৬০% ভাগ অঞ্চলের লবণাক্ততা বছরের দেড় মাস প্রতি ১ হাজারে ২০ ভাগের উপরে থাকে (মিঠা পানির লবণাক্ততা প্রতি ১ হাজারে ০.৫ ভাগের নিচে ও সমুদ্রের লবণাক্ততা ৩০ ভাগের উপর)উত্তরে ফারাক্কার মত মনুষ্যকৃত বাঁধ, ভূত্বকের টেকটনিক সঞ্চালন, চিংড়ি চাষের জন্য লবণাক্ত পুকুর সৃষ্টি, ইত্যাদি এই অবস্থাকে আরো চরম করে তুলবেস্বাভাবিকভাবেই এই পরিস্থিতি সুন্দরবনের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যকে প্রভাবিত করবে 

স্বাস্থ্য

জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি যেমন মানুষকে প্রভাবিত করবে তেমন ভাবেই আনুষঙ্গিক পানি, বায়ু ও খাদ্যের গুণ ও পরিমাণ, ইকোলজি, চাষাবাস, অর্থনীতির পরিবর্তনের মাধ্যমে তার স্বাস্থ্যের উপর চাপ সৃষ্টি করবেযে সব সংক্রামক ব্যাধি জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে ছড়াবে তার মধ্যে রয়েছে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, পীতজ্বর, কলেরা ও এনসেফালাইটিসউষ্ণতা বৃদ্ধির সাথে সাথে পানিতে শ্যাওলার পরিমাণ বাড়বে যা কিনা কলেরা ব্যাক্টেরিয়ার আধার হিসাবে কাজ করেগরম ও জলীয় আবহাওয়া সালমোনেলা জাতীয় জীবাণুর সংখ্যা বাড়াবে যা কিনা টাইফয়েড রোগের বিস্তারে সাহায্য করবেঅন্যদিকে শহরগুলিতে অধিক পরিমাণে গাড়ির ধোঁয়া ও অ-প্রজ্জ্বলিত হাইড্রোকার্বন কণা এবং রান্নার জ্বালানি হিসাবে কয়লার সরাসরি ব্যবহার, যা কিনা দক্ষিণ এশিয়ার আকাশকে কালো কার্বন কণা দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে, ফুসফুস ও হৃদযন্ত্র-ঘটিত এবং অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধিকে বাড়িয়ে দেবেউপরন্তু জলবায়ু পরিবর্তনে জমি-চ্যূত শরণার্থীরা স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত নানাবিধ বিপদের সম্মুখীন হতে পারে যা কিনা সারা দেশের জনসংখ্যার উপর প্রভাব ফেলবে  

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দ্রুত বাড়লে বাংলাদেশের একটা বিশাল অংশের পানিতে নিমজ্জিত হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে যার ফলে দেশের একটা বিরাট জনগোষ্ঠী বাস্তুহারা হতে পারেবিজ্ঞানীরা মোটামুটি এই সিদ্ধান্তে একমত যে বায়ুমন্ডলে উষ্ণতা বৃদ্ধিকারক গ্যাস নিঃসরণের পরিমাণ আমরা দ্রুত কমাতে পারলেও এই শতাব্দীতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার হ্রাস পাবে নাএই বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে আমাদের প্রাথমিক করণীয়সমূহের মধ্যে থাকবে বাংলাদেশের উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের গতিশীলতা নির্ধারণ করা, বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার অনুসন্ধান করা যা দিয়ে উপকূলের স্থিতাবস্থা কিছুটা হলেও বজায় রাখা সম্ভব এবং উপকূলের গতিশীলতা অনুযায়ী উপযুক্ত জনসংখ্যা নীতি নির্ধারণ করা

আজ থেকে প্রায় ৭,০০০ থেকে ৮,০০০ বছর আগে সমুদ্রপৃষ্ঠের দ্রুত উচ্চতা (বছরে ১০ মিলিমিটারের মতন) বৃদ্ধির সমাপ্তি ঘটেতার পরে সমুদ্রপৃষ্ঠ গড়ে বছরে ১ মিলিমিটার বা তার থেকে কম করে বাড়তে থাকে যার ফলে গত সাত হাজার বছর ধরে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ছয় মিটার বেড়েছেধরা হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য‌ সমুদ্রপৃষ্ঠ এখন বছরে ২ থেকে ৩ মিলিমিটার করে বাড়ছে

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পরিমাণ নির্ধারণ সহজ নয়, বিশেষতঃ যখন গড় সমুদ্র উচ্চতা কোন গোলাকৃতি তল দিয়ে প্রকাশ করা যায় না সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন যেমন বঙ্গোপসাগরের গড় উচ্চতা আরব সাগর থেকে প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার উঁচুসমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা মাপতে হলে দীর্ঘমেয়াদী জোয়ার ভাটার তথ্য কিংবা উপগ্রহ থেকে রাডার অল্টিমেট্রির সাহায্যে প্রাপ্ত তথ্যের যথাযথ গাণিতিক বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করতে হবেযেহেতু উচ্চতা বৃদ্ধির হার বছরে মাত্র কয়েক মিলিমিটার এবং যেহেতু সমুদ্র উচ্চতার পর বায়ুপ্রবাহ, লবণাক্ততা, চন্দ্র ও সূর্যজনিত জোয়ারের প্রভাব তার থেকে অনেক বেশী, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা মাপা সবসময়ই একটা দুরূহ বিষয়

কোন কোন গবষেণায় বাংলাদেশের উপকূলে এই উচ্চতা বৃদ্ধির হার বছরে ৪ থেকে ৮ মিলিমিটার বলে উল্লেখ আছে যা কিনা বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা বৃদ্ধিহারের চাইতে অনেক বেশিএমনকি বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-পশ্চিমে ও আরব সাগরের সীমানায় অবস্থিত বিশাখাপট্টনম, মাদ্রাজ, মুম্বাই, করাচি ও এডেনে দীর্ঘমেয়াদী (৪০ বছরের) জোয়ার ভাটার উপাত্ত উচ্চতা বৃদ্ধির হার বছরে ২ মিলিমিটারের কম বলে দেখাচ্ছেঅন্যদিকে জোয়ারের তথ্য পশ্চিমবঙ্গের হুগলী নদীর মোহনায় ডায়মন্ড হারবারে উচ্চতা বাড়ার হার দেখাচ্ছে ৬ মিলিমিটারের কাছকাছিএই সব গবেষণা থেকে যদি ধরে নেয়া যায় যে বাংলাদেশের উপকূলে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির হার অন্য নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে বেশি, তবে তার জন্যে দায়ী করতে হবে মূলতঃ বাংলাদেশের ভূমির ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়া বা অবনমনকে

 

 

ভূমির অবনমন

অনেক গবেষক মনে করেন যে, বাংলাদেশের বিরাট অংশ বছরে ১ থেকে ৫ মিলিমিটার করে নিচে নেমে যাচ্ছে এই অবনমনের জন্যেই আপাতঃদৃষ্টিতে  মনে হচ্ছে বাংলাদেশের উপকূলে বৈশ্বিক মানের তুলনায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে একটু বেশি পরিমাণেএখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশের উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঠিক পরিমাণ যাচাই ও বাংলাদেশের ভূমির সার্বিক ও স্থানীয় অবনমন নির্ধারণের জন্যে এখনো অনেক গবেষণার প্রয়োজন আছেউদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে এক গবেষণায় কক্সবাজার উপকূলে সমুদ্র উচ্চতা বাড়ার হার বছরে প্রায় ৮ মিলিমিটার পাওয়া গেছে, অথচ কক্সবাজার অঞ্চল দ্রুত সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছে এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না

বঙ্গেয় বদ্বীপের ভূমি অবনমনের কারণ হিসাবে ধারণা করা হয় যে, (১) যে টেকটনিক প্লেটের উপর বাংলাদেশের অবস্থান সেটাই ধীরে ধীরে নামছে এবং () ভূমির পরে পলি পড়ে গভীরের মাটি থেকে পানি বের করে মাটিকে ঘনীভূত করে তাকে নামিয়ে দিচ্ছেএছাড়াও পানি ও কৃষি কাজের জন্য নদী ও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের জন্য ধীরে ধীরে উপরিভাগের মাটি নিচে নেমে যাচ্ছেঅবনমন ও পলি পড়ার সাম্যাবস্থার কারণেই বাংলাদেশের ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে খুব বেশী উঁচু হতে পারে নি এবং নিকট ভবিষ্যতেও পারবে নাতবে বর্তমানে বিভিন্ন মনুষ্যকৃত প্রক্রিয়া বাংলাদেশের প্লাবন অববাহিকায় এই প্রাকৃতিক পলি পড়ার প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেভারত, নেপাল ও চীন দেশে নির্মিত বাধসমূহ যেমন গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও তার উপনদীগুলোতে পানি ও পলির দক্ষিণমুখী যাত্রা ব্যাহত করছে, তেমনি বাংলাদেশে বন্যার বিরুদ্ধে নির্মিত বিভিন্ন বেড়ীবাধের ভেতরের জমিতে পলি পড়তে দিচ্ছে নাএর ফলে একদিকে নদীর তল যেমন উচু হচ্ছে, অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী প্লাবনভূমি অবনমনের কারণে অপেক্ষাকৃতভাবে নিচু হচ্ছে যার পরিণামে ভবিষ্যতে বন্যার প্রকোপ আরো বাড়তে পারে

অনেক গবেষক বন্যার বিরুদ্ধে বেড়ীবাধ নির্মাণকে অবরোধ পন্থা (কর্ডন এপ্রোচ) বলে অভিহিত করেছেনতাদের মতে উন্মুক্ত পন্থা (ওপেন এপ্রোচ) নদী ও প্লাবন অববাহিকার মধ্যে জৈবিক সম্পর্ক বজায় রেখে প্লাবন ভূমিতে নতুন পলি যোগ করে শুধু বন্যার মাত্রাই কমাবে না, তা চাষের জন্য নতুন মাটি সৃষ্টি করবে ও মাছসহ অন্যান্য জীববৈচিত্র্য রক্ষা করবে

 

 

পলির পরিমাণ

কিছু গবেষণার ফল অনুযায়ী গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও তার উপনদীগুলো বছরে ১ বিলিয়ন টন পলি বাংলাদেশে নিয়ে আসেএই পলির আনুমানিক ৫০% প্লাবন অববাহিকায় ও নদীর তলদেশে ও ৫০% উপকূল অঞ্চলে চলে যায় তবে এই হিসাবটা নিয়ে অনেক মতভেদ আছে কিছু গবেষকদের মতে প্লাবন অববাহিকা, উপকূল-নিকটবর্তী সমুদ্র তলদেশ ও অনেক দক্ষিণে গভীর সমুদ্র সমান সমান ভাবে (৩৩%) এই পলিমাটি ভাগ করে নেয়অনেকের মতে উপকূলে চলে যাওয়া পলির কিছু অংশ সরাসরি পানির নিচে পড়ে নতুন জমি সৃষ্টি করে ও কিছু অংশ আবার জোয়ারের মাধ্যমে উপকূলে ফিরে এসে নতুন জমিতে যোগ দেয়কিন্তু উপকূলে চলে যাওয়া পলির একটা বিশাল অংশ সুন্দরবনের ৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের অবস্থিত সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ডস নামক খাদের মাধ্যমে গভীর সমুদ্রে চলে যায়অনেকে গভীর সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া পলিমাটিকে আটকে নতুন জমি সৃষ্টির স্বপ্ন দেখেন, কিন্তু বিদ্যমান প্রযুক্তি এই মাটিকে আটকাতে পারবে কিনা তা অনেক গবেষণার বিষয়

পলি ভরণের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে মেঘনা মোহনায় ও মোহনার দক্ষিণে নতুন জমি সৃষ্টির আশা দেখিয়েছেঅন্যদিকে সুন্দরবনের দক্ষিণাঞ্চলের জমি হয়তো ক্ষয় হচ্ছেসুন্দরবনের বদ্বীপ উত্তর থেকে মনুষ্যজনিত কারণে পানি ও পলিমাটি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেঅন্যদিকে কিছু টেকটনিক কারণে গত কয়েক শত বছর ধরে দক্ষিণ বঙ্গ পূর্ব দিকে কাত হবার ফলে মূল পানির ধারা ধীরে ধীরে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে সরেছেএর ফলে সুন্দরবনের দক্ষিণে নতুন জমি সৃষ্টি হচ্ছে নাএই দুটি কারণেই (মনুষ্যজনিত ও প্রাকৃতিক) যে প্লাবন অববাহিকা পূর্বে মেঘনা, উত্তরে পদ্মা ও পশ্চিমে ভাগিরথী নদীর মাঝে অবস্থিত তা ধীরে ধীরে এক মৃত বদ্বীপে পরিণত হচ্ছেতাই ভবিষ্যত সমুদ্র উচ্চতা বৃদ্ধির ফলাফল গণনা করতে বাংলাদেশের উপকূলের বিভিন্ন অংশের গতিশীলতাকে মনে রাখতে হবে 

সুন্দরবনের জন্যে হয়তো সমুদ্র থেকে জোয়ারের মাধ্যমে পুনরাগত পলিকে ব্যবহার করার জন্যে কোন চিন্তা ভাবনা করা যেতে পারে, কিন্তু যে কোন কারিগরী সমাধান যেন আগেকার অকৃতকার্য প্রজেক্ট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেউদাহরণস্বরূপ খুলনা যশোর ড্রেনেজ রিহ্যাবিলেটশন প্রজেক্টের  ফলে অনেকের মতে দক্ষিণ বঙ্গের কিছু নদীর মৃত্যু হয়েছে, অনেক জায়গায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছেঅন্যদিকে কিছু প্রজেক্টের কার্যকারিতা সুস্পষ্ট - যেমন নতুন জেগে ওঠা জমিতে ম্যাংগ্রোভ গাছ লাগিয়ে সেই জমিকে স্থিত করার এবং পলি পড়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরাণ্বিত করার প্রচেষ্টাদুঃখের বিষয় অনেক জায়গায় নতুন ম্যাংগ্রোভ কেটে বসতি হচ্ছে অথবা চিংড়ি চাষের জন্যে লবণাক্ত পুকুর বানান হচ্ছেতাই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে যে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী তার বিরুদ্ধে কিছু সুচিন্তিত পদক্ষেপ এখনই নেয়া প্রয়োজন

করণীয়

আগামী একশো বছরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৫০ সেন্টিমিটার থেকে ২০০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়ার কথা বিজ্ঞানীরা বলেছেনবর্তমান বৃদ্ধির হার বছরে ৩ মিলিমিটার হলে এই শতাব্দীর শেষে উচ্চতা বাড়বে মাত্র ৩০ সেন্টিমিটার, কাজেই আমরা ধরে নিতে পারি যে উচ্চতা বৃদ্ধির হার ভবিষ্যতে বাড়বে১ মিটার উচ্চতা বাড়ার জন্য বছরে ১০ মিলিমিটার করে সমুদ্রকে বাড়তে হবেখুব শীঘ্রই আমরা এই ধরণের বাড়ার হার দেখতে পাবো কিনা সেই আলোচনায় যাবার জন্য যথেষ্ট তথ্য আমাদের কাছে নেই, যদিও ১ মিটার সমুদ্র উচ্চতা বাড়লে বাংলাদেশের কতখানি ক্ষতি হবে তা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছেঅনেক গবেষণা সমুদ্র উচ্চতার ১ মিটার বৃদ্ধিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিস্তার করে দেখিয়েছে যে দেশের ১৭ থেকে ২০ শতাংশ জমি পানিতে ডুবে যাবেকিন্তু বঙ্গেয় বদ্বীপ একটা জীবন্ত ভূমিকত শতাংশ জমি তলিয়ে যাবে সেটা নির্দিষ্ট করতে উত্তর থেকে আসা পলি ভরণের প্রক্রিয়ার মাত্রার পরিমাণ জানতে হবে

সারা বিশ্বে উষ্ণতা বৃদ্ধিকারক গ্যাসের পরিমাণ কমাতে যেমন আমাদের চেষ্টা করতে হবে তেমনই বাংলাদেশের উপকূলে প্রাকৃতিক পলিমাটি ভরণের প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখতে হবেহাজার হাজার বছর ধরে যে পানি ও পলিমাটি প্রতিবছর বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তার একটা বিরাট অংশকে আমরা যদি বাধাহীনভাবে প্লাবন অববাহিকায় ও উপকূলে ফেলতে পারি তবে সমুদ্রপৃষ্ঠের দ্রুত উচ্চতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আমরা অন্ততঃ কিছুটা সময় পাব অন্য কোন সমাধানের কথা ভাবতে এর জন্যে যেমন ভারত (গঙ্গা), নেপাল ও চীনের (ব্রহ্মপুত্র) সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে, তেমনই দেশের ভেতর বন্যার বিরুদ্ধে নির্মিত ও পরিকল্পিত বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে পুনর্ভাবনা করতে হবেমনে রাখতে হবে যে জমিকে আমরা আজকে বন্যার হাত থেকে বাঁচাচ্ছি, ভবিষ্যতে সেই জমিকেই আমরা অবধারিত ভাবে আরো ভয়াবহ বন্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছি তাই পরে উল্লিখিত বেড়ীবাধ জাতীয় অবরোধ পন্থা ত্যাগ করে উন্মুক্ত পন্থা অবলম্বন করে নদীর সঙ্গে প্লাবন অববাহিকার যোগসূত্র আবার স্থাপিত করতে হবেসমুদ্র উচ্চতা বাড়ার প্রক্রিয়াকে আমরা হয়তো বন্ধ করতে পারবো না, কিন্তু তার ফলাফলকে লঘু করতে আমাদের এখনই সক্রিয় হতে হবেএই সব কার্যক্রমের বাস্তবায়নের জন্যে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কারিগরী, রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক পদক্ষেপের প্রয়োজন

______________________

. দীপেন ভট্টাচার্য ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড ক্যাম্পাসে জ্যোতির্বিদ্যার গবেষক ও বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট নেটওয়ার্কের (বেন) সদস্যএই প্রবন্ধে উল্লিখিত বিভিন্ন গবেষণার তালিকা পাওয়া যাবে নিম্নোল্লিখিত ওয়েবসাইটে - http://tigre.ucr.edu/dipen/climateলেখকের ইমেইল : dipenb@gmail.com

 

রিভারসাইড, ক্যালিফোর্নিয়া

এপ্রিল ১২, ২০০৯

 

মন্তব্য:
Albelee   May 16, 2009
Dipenda - very good/timely article. We are hopeful climate change will wake up us all in Bangladesh to clean up our act and the environment. It is so important for Bangladesh to reduce impervious cover (paved areas)and retain forested/vegetated land cover and grass cover to slow down surface runoff with polluted water after barsha in the monsoon,which makes the local rivers dirty. Trees are the first line of defense for coastal areas against storm surges/sea level rise. Good deeds are planted just like sheltering trees along life's pathways.
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.