Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  মূল রচনাবলীঃ  ||  ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ ১৪১৬ •  9th  year  2nd  issue  May-June  2009 পুরনো সংখ্যা
বাংলাদেশে বিশ্বের উষ্ণায়নের প্রভাব - বাপা’র সাথে আলাপচারিতা Download PDF version
 

গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও বাংলা বদ্বীপ

বাংলাদেশে বিশ্বের উষ্ণায়নের প্রভাব - বাপার সাথে আলাপচারিতা

পড়শীর আমন্ত্রণে ঢাকাস্থ বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর সাধার সম্পাদক ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন খোলামেলা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্বের ক্রমবর্ধমান উষ্ণতা নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পড়শীভজেন্দ্র বর্মনসাবির মজুমদার

 

 

পড়শী: গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্বের উষ্ণায়ন সম্পর্কে বাংলাদেশের জনগণের চিন্তা কি?

ডাঃ মতিন: বিশ্বের উষ্ণয়ান সম্পর্কে বাংলাদেশের জনগণের মনে দুধরণের প্রতিক্রিয়া রয়েছে বলে আমার মনে হয়: প্রথমতঃ, তারা খুবই ব্যথিত যে, পশ্চিমাবিশ্ব শেষ পর্যন্ত আমাদের মত দরিদ্র দেশের উপর এত মারাত্মক অমানবিক একটি বিপর্যয়ের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে দিল যা আমাদের অস্তিত্বকেই অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। এটি নিঃসন্দেহে বিভিন্নকালে বিশ্বব্যাপীর্বলের উপর সবলের ঐতিহ্যগত অত্যাচারেরই একটি আধুনিক অথচ কদর্যরূপ বই কিছু হতে পারে না। দ্বিতীয়তঃ, বাঁচা ও ভালভাবে বাঁচার চিরন্তন মানবিক আকাংখার স্বাভাবিক প্রয়াস ও সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় আমাদের আরেকটি কষ্টের সাগর পারি দেয়ার জন্য মানুষ নিজেকে প্রস্তুত করার পাশাপাশি বিশ্বের উষ্ণতার কারণ প্রশমনে পশ্চিমা বিশ্বের জনসাধারণ ও সরকারসমূহের দায়িত্বশীল, অগ্রণী, দায়ভারবহনমূলক মনোভাব ও ভমিকাও তারা কামনা করছে।

পড়শী: বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশে কি কি কুফল দেখা যাচ্ছে?

ডাঃ মতিন: বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য যত ধরণের কুফল হতে পারে তার প্রায় অনেকগুলোই এখন দৃশ্যমান। সহজ কথায় বলতে গেলে প্রথমেই ধরুন আবহাওয়ার তাপমাত্রা বৃদ্ধির কথা। বিশেষ করে গত কয়েক বছর যাবৎ বছরব্যাপী গরমের মাত্রা ও সময়কাল বৃদ্ধি পাচ্ছে, শীতের সময় ও মাত্রা হ্রাস পেয়েছে।  আবার শীতকালে কিছু কিছু স্থানে শীতের সময়কাল সংক্ষিপ্ত হলেও ঠান্ডার মাত্রা বেশ বেশী দেখা যায়। এবার কিন্তু বর্ষাকাল পার হচ্ছি আমরা কোনরূপ বৃষ্টি বাদল ছাড়াই। পানির দেশের মানুষের জন্য আকাশ থেকে নেমে আশা এই স্নিগ্ধ জলধারার আকাল বেশ অসহনীয় বিষয়। মাটির শুষ্কতা বাড়ছে, যার প্রভাব ধীরে ধীরে ফল-ফসলে দেখা যাবে। তবে ভরসা একটা রয়েছে, যদি ভরা বর্ষা যে কোন সময় নেমে আসে, তাহলে মাটি পুণরায় অন্ততঃ চলনসই পর্যায়ে সিঞ্চিত হতে পারে। গ্রীষ্মে অধিক তাপ, বর্ষায় বৃষ্টি হ্রাস, শীতে উজানের পানির স্বল্প স্রোত, নদীতে অধিক পলি বা তলানি পতন, পানি ধারণ ক্ষমতা হ্রাস, অধিক নদী ভাঙ্গন ইত্যাদিতে আমাদের নদী ও পানিসম্পদ আজ সর্বোচ্চ বিপর্যয়ের মখোমখি। আর সুযোগ পেলেই যেন সামুদ্রিক ঝড় বাংলাদেশের দিকেই ধেয়ে আসতে চায়। এক সিডরের ক্ষত না শুকোতেই কদিন পর পরই নিঃস্ব হতদরিদ্র দক্ষিণ বাংলার গ্রামীণ মানুষকে আরেক ঝড়ের সম্ভাব্য আঘাতের হাত থেকে বাঁচার জন্য আশ্রয়কেন্দ্রমখী হতে হয়। সবটা মিলে প্রায় ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা বলতে পারেন। আর এসবের অবধারিত আর্থ-সামাজিক প্রতিক্রিয়া, ক্রমবর্ধমান জলবায়ু শরণার্থী শহরমখী; অতএব বস্তিতে জনারণ্য, স্বাস্থ্য সংকট ক্রমবর্ধমান। তবে আমাদের দেশের মানুষ অনেক সাহসী, ধৈর্যশীল, শৃংখলাধর্মী, আইনানুগত ও আশাবাদী।

পড়শী: পরিবেশের পরিবর্তন এবং বিশ্বের উষ্ণতা যে পরস্পর সর্ম্পকযুক্ত তা কিভাবে সাধারণ মানুষকে বোঝানো যেতে পারে?

ডাঃ মতিন: বিষয়টার মূল সমস্যা বোধহয় সাধারণ মানুষ নয় কারণ তারা তাদের জীবন ও সৎ দৃষ্টিভঙ্গী তথা মানসিকতার জন্যই এ বিষয়টি সহজেই বুঝতে পারেন। আমরা যখন পরিবেশ আন্দোলনের বিভিন্ন সমস্যাদি বোঝানোর জন্য আমাদের গ্রাম বা ছোট শহুরে এলাকায় যাই তখন কিন্তু সাধারণ গরীব, স্বল্প শিক্ষিত জনগকে শহুরে অধিক শিক্ষিত বা অসাধারণ মানুষদের চেয়ে অধিক দ্রুত সবকিছু বুঝে নেয়ার ঘটনা প্রত্যক্ষ করি। সাধারণ লোকদের মনের মধ্যে কুটবুদ্ধি, স্বার্থপরতা, মুনাফালোভ, প্রকৃতি-লুন্ঠন, অন্যের হক মেরে খাওয়া বা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এতটা প্রকট থাকে না যা অসাধারণ তথা শিক্ষিত, ধনিক, ক্ষমতাশালী, অভিজাত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় সদা বিরাজমান দেখি। আমি কিন্তু ঢালাওভাবে সকল শহুরে বা শিক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কথা বলছি না। শিক্ষিত নগরবাসীর ব্যাপক অংশই চিন্তা-চেতনায় সাধারণ মানুষের মতই। সমস্যা শুধু ঐ কতিপয় অসাধারণ ক্ষমতাশালী মানুষদের নিয়ে।

এখন বোঝানোর প্রক্রিয়াটা সম্পর্কে বলি। মানুষের কাছে যেয়ে তাদের চলমান বা ক্রমবর্ধমান পরিবেশ সমস্যা নিয়ে কথা বলে তার সাথে দৃশ্যমান বা বৈজ্ঞানিক জ্ঞানসিক্ত সম্ভাব্য ধারণগুলো সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করলেই সাধারণ মানুষ সহজেই সব বুঝে নেন ও তারা আমাদের সংগ্রামের সাথী হতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। অনেক ক্ষেত্রে আমরা পরিবেশকর্মীগণ কিছু কিছু কঠিন বিজ্ঞানের বিষয় যেমন নদী বেষ্টনীমূলক দৃষ্টিভঙ্গী (cordon approach) পরিহার করা বিষয়ক যুক্তিসমূহ নদী বেষ্টনীর কুফলে আক্রান্ত আর্থিক বিপর্যয়গ্রস্ত গ্রামীণ জনতার কাছ থেকে স্থানীয় পরিষ্কার উদাহরসহ শিখে এসেছি যা অনেক উচ্চশিক্ষিত প্রকৌশলীদের বোঝানো অনেক সময় সহজ হয় না। অতএব আমার মতে বোঝানোর প্রক্রিয়া বা যান্ত্রিক ভিডিও, মাল্টিমিডিয়া, বইপত্র, ব্যাখ্যাদায়ক পোষ্টার, প্রচারপত্র, লিফলেট নয়, আন্তরিক সৎ কর্মীদের মানুষের কাছে পৌঁছতে পারাটাই বোঝানোর প্রধান ও সহজতম উপায়।

পড়শী: বাংলাদেশ সরকার বিশ্বের উষ্ণায়নের ফলে বিশেষ করে দক্ষিনাঞ্চলের উপকলবর্তী এলাকায় নানারকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রোগের প্রাদুর্ভাব (যেমন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, সাইক্লোনের প্রকটতা, মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ম্যালেরিয়া রোগের ব্যাপকতা) ঠেকাতে কি ধরণের পরিকল্পনা নিচ্ছে? না নিয়ে থাকলে কমপক্ষে কি কি করণীয় বলে মনে করেন?

ডাঃ মতিন: আমাদের জানামতে বাংলাদেশ সরকার জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মসূচী ২০০৮ নামক একটি পরিকল্পনা প্রয়ন করেছে (http://www.moef.gov.bd/moef.pdf) এবং বিগত তত্বাবধায়ক সরকার আমলে এ বিষয়ে তিন শত কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। তবে দক্ষিণ বাংলার উপকলীয় বা গ্রামী জনপদে সরকারী কর্মসূচীর কোন ছাপ এখনও লক্ষণীয় নয়। বিগত সরকারের অভিযোজন বিষয়ে জাতীয় কর্মসূচী (National Action Plan on Adaptation or NAPA) নামে একটা পরিকল্পনার কথাও আমরা শুনেছি। তবে বর্তমান সরকার তার পুণর্মূল্যায়নের কাজ করছে বলে জানা গেছে। জরুরী অবস্থায় হাসপাতাল-প্রস্তুতি (Hospital Preparedness in Emergency or HoPE) নামক আরেকটি প্রকল্পের কথাও আমরা শুনেছি যার মাধ্যমে গণ হতাহত কালীন ব্যবস্থাপনার উপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে এসবের এখনো কোন ছাপ নেই। মাত্র সেদিন বাংলাদেশের উপকলে এসে নিস্তেজ হয়ে পরা বিজলী নামক ঘূর্ণিঝড়ের মোকাবিলায় সরকারী উদ্যোগে মোটামুটি ভালই সতর্কীকরণ বাণী প্রচার করা হয়েছে, অসংখ্য মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে শেষ সহায় সম্বল ও প্রিয়জনদের হাত ধরে দৌড়াদৌড়ির সংবাদ ও ছবি আমরা জাতীয় সংবাদ মাধ্যমে অবলোকন করেছি। কিন্তু উদাহরস্বরূপ উপকলীয় ঝালকাঠি হাসপাতাল বিজলী মোকাবেলায় কতটুকু প্রস্তুত ছিল? আমাদের জানামতে মাত্র পাঁচজন চিকিৎসক সে সময় সেখানে হাজার হাজার আহত-নিহত মানুষের অপেক্ষায় ছিলেন। অথচ সবাই জানেন যে, বিগত ঘূর্ণিঝড় সিডর এ উক্ত এলাকায় ১৬ হাজার মানুষ আহত হয়েছিলেন। আমার মনে হয় এসব থেকেই সরকারী পরিকল্পনার বাস্তব চিত্র আন্দাজ করা যেতে পারে।

 

কুয়াকাটার জনসভায় বাপা সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ। (সৌজন্যঃ বাপা)

সরকারের কি করা উচিৎ তা এই ক্ষুদ্র পরিসরে সবটা বলা সহজ নয়। গতবার ডিসেম্বর মাসে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন বিরোধী কর্মসূচীর অংশ হিসেবে বাংলাদেশে বাপা একটি গ্রামীণ মানুষের বৃহৎ সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশ স্থলটি ছিল জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সর্বোচ্চ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান সম্ভাব্য এলাকা দক্ষিণ বাংলার পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্র উপকল। মাত্র বছরখানেক পূর্বে সিডর বিধ্বস্ত ভাঙ্গা গাছপালা পরিবেষ্টিত এই স্থানটিতে বাপা সমাবেশে আগত মানুষ যে সব দাবী উত্থাপন করেন তাই সত্যিকার অর্থে মোটা দাগে আমাদের সরকার ও সারা পৃথিবীর অন্যান্যদের প্রকৃত করণীয়। এগুলো হচ্ছে - (ক) বিশ্বের সকল দেশকেই গ্রীহাউস গ্যাস উৎপাদন সীমিত করতে হবে (খ) গ্যাস উৎপাদক দেশগুলিকে দর্যোগগ্রস্ত বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে (গ) দক্ষিণ বাংলার সম্ভাব্য নিমজ্জিত অংশের মানুষের জন্য এখনই অন্যদেশে বিকল্প জমি নিশ্চিত করতে হবে (ঘ) উপকলাঞ্চলে ঝড়-জলোচ্ছাস বান্ধব ফসল আবাদ নিশ্চিত করতে হবে (ঙ) দক্ষিণ বাংলার যোগাযোগ ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক ভাল রাখতে হবে, ভাঙ্গা রাস্তা-সেতু অবিলম্বে মেরামত বা উন্নত ও বিস্তৃত করতে হবে (চ) ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা বর্তমানে বেশ অপ্রতুল, এর সংখ্যা দ্বিগুণ বৃদ্ধি করতে হবে; বিদ্যমান ভাঙ্গাচোরা কেন্দ্রসমূহের সংস্কার করতে হবে (ছ) দর্যোগ মোকাবিলায় সরকারী বেসরকারী ব্যবস্থাপনা, স্বেচ্ছাসেবক, খাদ্য ও অন্যান্য ব্যবহার্য সামগ্রীর মজুদ অনেক বৃদ্ধি করতে হবে (জ) দর্যোগপ্রব এলাকার চিকিৎসা ব্যবস্থা, হাসপাতাল, ডাক্তার, নার্স, ঔষধপত্রের মজুদ বৃদ্ধি করতে হবে; সকল হাসপাতালেই ভাল এম্বুলেন্স প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে, নৌ-এম্বুলেন্স এর ব্যবস্থা করতে হবে। (ঝ) অত্র এলাকার বিদ্যমান বাড়ী-ঘর শক্তিশালী করে পুণনির্মাণবংর্যোগে টিকে থাকার উপযোগী বাড়ী নির্মাণের ব্যবস্থা করতে হবে। (ঞ) সাধারণ মানুষের আর্থিক সঙ্গতি বৃদ্ধি করতে হবে। (ট) যুক্তরাষ্ট্রসহ শিল্পোন্নত দেশসমূহকে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সকল চুক্তি বা সিদ্ধান্ত মানতে হবে। (ঠ) ভারত ও চীনের গ্যাস উৎপাদনের মাত্রা সীমিত করতে হবে (ড) বাংলাদেশে শুধু অভিযোজন নয়, গ্যাস উৎপাদনও হ্রাস করতে হবে (ঢ) তেল-গ্যাস ব্যবহার হ্রাস, সৌর ও বায়ুশক্তি চালু করতে হবে (ণ) নদী-জলাশয় দূষণ বন্ধ করতে হবে, কলকারখানায় বর্জ্য পরিশোধক বাধ্যতামূলক করতে হবে (ত) ইটের ভাটার গ্যাস কার্বনমুক্ত করতে হবে (থ) গাড়ীর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, ক্রটিযুক্ত ইঞ্জিন বাতিল করতে হবে (দ) রান্না-বান্নায় ক্রটিমুক্ত আধুনিক চূলা ব্যবহার করতে হবে (ধ) গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে; ব্যাপক দেশীয় গাছ লাগাতে হবে (ন) রাসায়নিক সার-কীটনাশক নয়, জৈবসার ব্যবহার করতে হবে (প) বিদেশী অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে (ফ) জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন ও মোকাবিলায় আভ্যন্তরীণ নীতি সমূহের পরিবর্তন করতে হবে।

পড়শী: সারা পৃথিবীতে উষ্ণায়নের উপর কি হচ্ছে - এর দু চারটি উদাহরণ দিবেন কি?

ডাঃ মতিন: সারা পৃথিবীতে প্রায় সর্বত্রই বিশ্বের উষ্ণতা বিষয়ক অনেক ঘটনা ঘটছে।  আমাদের জানামতে উত্তর গোলার্ধেও বিরাট বরফের ম্তর গলে যাচ্ছে ফলে কানাডায় গরম বাড়ছে, যুক্তরাষ্ট্রে বন্যা-জলোচ্ছাস বা ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডব নিয়মিতই দেখা যাচ্ছে। ইউরোপেরও বিভিন্ন দেশে ব্যাপক ও নিয়মিত বন্যার খবর প্রায় প্রতিবছরই গণমাধ্যমে দৃশ্যমান হচ্ছে। এশিয়াতে হিমালয় পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত বরফ বা হিমবাহ গলে যাচ্ছে অতিদ্রুতই। বলা হয় যে, হিমবাহগুলোতে আমাদের সুপেয় পানির ৯৩% ভাগ জমা ছে। তাহলে এ ধরণের বিশাল বরফ-গিরিখাদ গলে গলে হিমালয় নির্ভর বাংলাদেশের পানি ও নদীর ভবিষ্যৎ কি?

অন্যদিকে মানুষও বসে নাই। সারা বিশ্বে অনেক মানুষ এখন সচেতন, প্রতিবাদী, আন্দোলনমখী। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনসযন্ত্রও নির্বিকার বসে থাকতে পারছে না, তাদেরও নানা পরিকল্পনা করতে হচ্ছে। জাতিসংঘও পিছিয়ে নেই। আন্তঃরাষ্ট্র জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেল তৈরী হয়েছে প্রতিবছরই তার উদ্যোগে সম্মেলন-আলোচনা-গবেষণা চলছে। কার্বন গ্যাস উৎপাদন হ্রাস, বিদ্যমান কার্বন প্রশম, উষ্ণ বিশ্বে বেঁচে থাকা বা টিকে থাকার জন্য অভিযোজন কৌশল নির্ধারণ, তার বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ ইত্যাদি নানাবিধ কাজ চলছে। আমরা আশাবাদী যে, পশ্চিমাবিশ্বের বোধোদয় ঘটবে, তারা অধিক দায়িত্বশীল হবেন, একটি উত্তর-দক্ষিণ সমন্বিত পরিকল্পনা হবে, যা দ্বারা পৃথিবীর অস্তিত্ব রক্ষা পাবে, মানবজাতি টিকে থাকবে অনাদিকাল।

পড়শী: বাংলাদেশের ব্যাপারে এগুলো প্রযোজ্য কি না?

ডাঃ মতিন: হ্যাঁ, নিশ্চই প্রযোজ্য। সমস্যাটি যেহেতু বৈশ্বিক, অতএব তার সমাধানও হবে বৈশ্বিক। আর বাংলাদেশ যেহেতু বিশ্বের উষ্ণায়নের অন্যতম প্রধান শিকার, অতএব বাংলাদেশের মানুষ ও সরকার উভয়কেই তাদের করণীয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ও দায়িত্ব গ্রহ করতে হবে। সারা পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত, বিজ্ঞানভিত্তিক জলবায়ু পরিবর্তন রোধ কার্যক্রম পরিচালিত হলে তা সত্যি রোধ হবে, তাতে কোন সন্দেহ নাই। কারণ মানুষ ইচ্ছ করলে সবকিছুই করতে সক্ষম। এবং আমার ধারণা কিছু অশুভ ও অবুঝ শক্তির চিন্তা-চেতনায় মৌলিক পরিবর্তন ঘটাতে পারলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ থেকে আমরাও বেঁচে যাব, বিশ্বও বেঁচে যাবে। এখানে বাংলাদেশের ভমিকাও কম হবেনা।

পড়শী: আপনার সংগঠন বাংলাদেশের পরিবেশ রক্ষায় কি কি কার্যক্রম গ্রহ করেছে? তার কতটুকু বিশ্বের উষ্ণায়নের সাথে জড়িত?

ডাঃ মতিন: বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) তার দীর্ঘ প্রায় এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশের সার্বিক পরিবেশের দুরাবস্থা, এসবের বাস্তবসম্মত প্রতিকার ও সম্ভাব্য বিপর্যয় প্রতিরোধের উপর একটি বিজ্ঞানসম্মত ধারণা গ্রহ ও তার যথাযথ প্রচার পরিচালনায় মোটামুটি সফল হয়েছে বলে আমার ধারণা। ফলে আমাদের পরিবেশ সংকটের গভীরত নিয়ে মানুষের মধ্যে কোনপ্রকার দ্বিমত নেই। আর বাপাও আপামর মানুষের মধ্যে ব্যাপক গ্রহযোগ্যতা পেয়েছে। বাপার প্রতি পরিবেশ দূষণকারী, দখলদার, প্রাকৃতিক লুটেরাগোষ্ঠীর আন্তরিক উষ্মাও বাপার কাজের সঠিকতার আরেকটি ভাল প্রমা

গ্রীনহাউস গ্যাসের নিঃসরণের বিরুদ্ধে বাপার শোভাযাত্রা। (সৌজন্যঃ বাপা)

আপনারা সম্ভবতঃ জানেন যে বাপা প্রতিষ্ঠায় প্রবাসী বাঙালিদের সংগঠন বাংলাদেশ এনভায়ারমেন্টাল নেটওয়ার্ক (BEN অথবা বেন)-এর ভূমিকা ছিল অগ্রণী। অধুনালপ্ত বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবদের সংগঠন পরিবেশ রক্ষা শপথ (পরশ), বুয়েট ও বর্তমানে বিলুপ্ত কোয়ালিশন ফর এনভায়রমেন্টাল এনজিওস (CEN অথবা সে) কে সাথে নিয়ে বেন ২০০০ সনে প্রথম বাংলাদেশ পরিবেশ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন এর আয়োজন করে ও তার সিদ্ধান্ত হিসেবেই বাপার সৃষ্টি হয়। সে সম্মেলনের মধ্য দিয়ে যুগপৎ জ্ঞানচর্চা ও মাঠের সংগ্রামভিত্তিক যে বাপার শুভ সূচনা করা হয়েছিল, তা একই ধারায় আজও চলমান ও বিকাশমান রয়েছে। অর্থাৎ বাপার এখনো মূলনীতি হচ্ছে প্রথমে মানুষের স্থানীয় বা তৃণমূল পর্যায়ের চাহিদাভিত্তিক পরিবেশ সমস্যা চিহ্নিত করে তার উপর সম্যক জ্ঞান আহর (সেমিনার, সম্মেলন, তথ্যসংগ্রহ) এবং তার প্রেক্ষিতে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে আন্দোলন বা সংগ্রাম পরিচালনা করা। আমাদের সকল প্রয়াসেই বেন হচ্ছে অবিরাম আন্তরিক সহযোগী। অন্যান্য কিছু সংগঠন ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেন এর আর্থিক-বৈয়িক-মেধাবৃত্তিক যৌথ সহযোগিতা ও উদ্যোগে গত প্রায় এক দশকের মধ্যে বাপা সার্বিক পরিবেশ, সুন্দরবন, পরিবেশ স্বাস্থ্য, ভারতীয় আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প, আভ্যন্তরীণ নদী, জ্বালানি, আদিবাসী পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সর্বমোট নয়টি বৃহৎ সম্মেলনের সফল আয়োজক। এসবের মধ্য দিয়ে বাপা জাতিকে উল্লেখিত বিষয়ে মূল্যবান নীতিমালা উপহার দিয়েছে, নীতিমালা বাস্তবায়নে দেশব্যাপী আন্দোলন পরিচালনা করছে। অসংখ্য সেমিনার, আলোচনা, গণসমাবেশ, মানববন্ধন, মিছিল, অধিপরামর্শ, স্মারকলিপির মাধ্যমে পরিবেশ বিষয়ে সর্বোচ্চ প্রয়াসে বাপা সকল মহলে প্রশংসিত। পূর্বের সকল কাজ অব্যাহত রেখেও বাপা এখন পরিবেশ বিষয়ে বাংলাদেশের সকল নীতি নির্ধারণী উদ্যোগে ইতিবাচক ভূমিকা পালনে সচেষ্ট রয়েছে।

বর্তমানে বাপার কর্ম-বিষয়গুলো হচ্ছে - নদী ও জলাশয় কর্মসূচী, বুড়িগঙ্গা, জাতীয় নদী রক্ষা; বায়ু, শব্দ ও দৃষ্টি দূষণ; নগরায় ও নগর সশাসন; প্রাকৃতিক সম্পদ ও জ্বালানি; খেলার মাঠ, উদ্যান ও জাতীয় ঐতিহ্য; নিরাপদ খাদ্য ও পানীয়, পরিবেশ-স্বাস্থ্য, অর্থ, বাণিজ্য ও বাজেট; আদিবাসী ও বন সম্পদ, জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধ; বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পলিথিন এবং প্লাষ্টিক, পানি, পয়:নিষ্কাশন ও ড্রেনেজ; চলন বিল, টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা, জীব-বৈচিত্র, সংঘাত-যুদ্ধ ও দর্যোগ ব্যবস্থাপনা, গণ-পরিবহন, পরিবেশ আইন, জেন্ডার, গৃহাভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও সমুদ্র উপকল। এসব বিষয়ে বাপার নিজস্ব প্রোগাম কমিটি ছাড়াও বাপার নেতৃত্বে ও উদ্যোগে বুড়িগঙ্গা, জাতীয় নদী, আদিবাসী পরিবেশ, জলবায়ু, সমন্বিত জৈব-স্বাস্থ্য, নগরায়, জাতীয় স্বাস্থ্য অধিকার বিষয়ে জাতীয় আন্দোলন; চলন বিল, ওসমানী উদ্যান, ঢাকা মহানগরী পরিকল্পনা বিষয়ে স্থানীয় আন্দোলন; সীমান্ত অতিক্রান্ত নদী বিষয়ে আঞ্চলিক আন্দোলন; জলবায়ু, টেকসই জীবনযাত্রা (ব, ভূমি ব্যবহার, বৃহৎ অবকাঠামো) বিষয়ে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক রয়েছে। বাপার কাজে বর্তমানে সমানাধিকার ও সন্মানের ভিত্তিতে সারাদেশে বিভিন্ন বিষয় ভিত্তিক ছয় শতাধিক বন্ধু সংগঠন স্থানীয় পর্যায়ে সহযোগী ভূমিকা পালন করছে বাপার অরাজনৈতিক, আত্মনির্ভর, স্বেচ্ছাসেবী, জনকল্যানমূলক সামাজিক ও গণসম্পৃক্ত চরিত্র সকলের নিকটই আকর্ষণীয় বিষয়।

বাপা, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন বিরোধী জাতীয় আন্দোলন ও লন্ডনভিত্তিক গ্লোবাল ক্যাম্পেইন এগেইনষ্ট ক্লাইমেট চেঞ্জ (Global Campaign Against Climate Change) শীর্ষক সংগঠন দটির মাধ্যমে বিশ্বের উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে। বাপা-বেন এর উদ্যোগেই এ বছর জানুয়ারী মাসের প্র্রথম সপ্তাহে আয়োজিত হয়েছে “জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশের উন্নয়নকৌশলঃ আভ্যন্তরীণ করণীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগীতা” শীর্ষক বিশেষ সম্মেলন। এ সম্মেলনের ঘোষণা বাস্তবায়নে বাপা এখন কাজ করছে।

মানুষের অসাধ্য কিছু নাই। আমাদের জনগ পঞ্চাশের দশকে ভাষা, ষাটের দশকে স্বাধিকার, সত্তরের দশকে স্বাধীনতা ও আশির দশকে গতন্ত্রের জন্য সফল সংগ্রাম করেছেন। অতএব, দেশের অস্তিত্ব রক্ষায় ১৫ কোটি মানুষ শেষ পর্যন্ত পরিবেশ বাঁচাবে, দেশও বাঁচবে - এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। আর তারই প্রস্তুতি হিসেবে মানুষকে সচেতন করা আমাদের সকলের কাজ। বাপা তাই করার চেষ্টা করছে।

পড়শী: পড়শীর পক্ষ থেকে আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ

ডাঃ মতিন: আপনাদেরকেও অনেক ধন্যবাদ

 

ঢাকা

এপ্রিল ১৯, ২০০

 

মন্তব্য:
albelee   May 16, 2009
great interview, thanks to PORSHI and Sabit bhai. It is understandable that the less educated poor villagers understand climate change/global warming faster because they are the worst sufferers..BUT in case of epidemic outbreaks everyone may be affected ultimately, rich-poor, educated, uneducated, adult-children and the most vulnerable is elderly and infants. Sooner we wake up and understand that public-corporate behavior modification is critical to win the climate war the better.
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.