Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  মূল রচনাবলীঃ  ||  ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ ১৪১৬ •  9th  year  2nd  issue  May-June  2009 পুরনো সংখ্যা
কার্বন-শক্তি-জল এবং বিশ্বের উষ্ণতা Download PDF version
 

গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও বাংলা বদ্বীপ

কার্বন-শক্তি-জল এবং বিশ্বের উষ্ণতা

সুকমল মোদক

ভূমিকা

এই বসুন্ধরা আমাদের একান্ত আপন। আমাদের মতো সহস্র কোটি মানুষকে, কোটি কেটি প্রাণীকে, গাছ-গাছালীকে এই বসুন্ধরা দিয়েছে জন্ম, আশ্রয় ও জীবনভোগের অনাবিল আনন্দ। দিয়েছে এমন একটা পরিবেশ যা এই মহাবিশ্বে বিরল, বিষ্ময়করও বটে। যে অক্সিজেন ছাড়া জীবন অসম্ভব তা এই পৃথিবীর বাতাস ও জলে আছে পরিমিত পরিমান। যে কার্বন ছাড়া দৈহিক বৃদ্ধি ও ক্ষয়পরণ হয় না তাও আছে পরিমিত পরিমান। যে জল ছাড়া জীবন অসম্ভব তা আছে পর্যাপ্ত। আর যে শক্তি ছাড়া জীবন, দেহের বিকাশ, সভ্যতার বিকাশ অসম্ভব, তাও আমরা এই বসুমাতার কাছেই নানাভাবে পাই, যদিও তা আসে আমাদের অত্যন্ত নির্ভরশীলতার প্রতীক সূর্য থেকে।

পৃথিবী আর সূর্যের সম্পর্ক এক বিশাল একমুখী নির্ভরতার সম্পর্ক। পৃথিবীর বুকের প্রায় সব কর্মতৎপরতার শক্তি যোগায় আমাদের নিতান্ত আপন ঐ শক্তির আধার - সূর্য। মানুষসহ সকল প্রাণীকল - মেরুদন্ডী হোক আর অমেরুদন্ডী হোক, এক কোষী হোক আর বহুকোষী হোক, জলে বাস করুক আর স্থলে বাস করুক - সবার সব কর্মতৎপরতার শক্তির ঐ একই উৎস - সূর্য। উদ্ভিদকলও এ থেকে ভিন্ন নয়। নদীস্রোত, বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রস্রোত সব প্রাকৃতিক শক্তির ঐ একই আধার - সূর্য। কলের চাকা ঘুরায় যে বিদ্যুৎ তা কয়লা, তেল বা গ্যাস পুড়িয়েই তৈরী হোক, সূর্যালোক থেকে সরাসরিই তৈরী হোক - তারও আদি উৎস সূর্য। একমাত্র ব্যতিক্রম হল আনবিক শক্তি।

সারা পৃথিবীর উদ্ভিদকল ও প্রাণীকল প্রায় এক অসম্ভব রকম পরষ্পর ও বহুমখী নির্ভরশীলতায় আবদ্ধ। তাদের জন্ম, বয়োবৃদ্ধি, মৃত্যু, বিস্তার ও বিবর্তন সবকিছুতেই এই নির্ভরশীলতা। বহুমখী এই নির্ভরশীলতা কয়েকটি চক্রে আবদ্ধ। কার্বন চক্র, জল চক্র ও শক্তি চক্র তাদের মধ্যে মখ্য। বাতাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইড কার্বনের এক বিশল ভান্ডার। যদিও আনুপাতিক হারে বাতাসে এর মাত্রা খুব কম। যা আছে তাই পৃথিবীর বুকে বহুবিধ কর্মতৎপরতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। বিশেষ করে এই মাত্রা কার্বন চক্র, শক্তি চক্র ও জল চক্র সব মখ্য চক্রকেই নিয়ন্ত্রণ করে।

 

 

 

এই নির্ভরশীলতা সবসময় গতিশীল সাম্যাবস্থায় থাকে। লক্ষ লক্ষ বছরের অভিজ্ঞতায় আমরা জানি যে গতিশীল হলেও ব্যাপারটা স্থায়ী। অর্থাৎ নির্ভরশীলতায় কিছুটা পরিবর্তন হলেও গতিশীল সাম্যাবস্থা কিছুটা নড়চড় হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘকালব্যাপী এমনভাবে পরিবর্তন হবে না যা সাম্যাবস্থাতে সর্বকালের জন্য ব্যাপক ও একমুখী পরিবর্তন ঘটায়। গণিতের ভাষায় সিষ্টেমটা স্ট্যাবল বা দীর্ঘস্থায়ী। আর দার্শনিকের ভাষায় “সর্বংসহা ধরিত্রী”। বিশ্বের উষ্ণায়নের ব্যাপারটা হল একটা পরিবর্তিত সাম্যাবস্থা - যা গতিশীল সাম্যাবস্থার একটা বহিপ্রকাশ।

কার্বন চক্র

বাতাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইড উদ্ভিদের খাদ্য। মাটিতে প্রাপ্ত ভগর্ভস্থ জল গাছের পানীয়। গাছ বাতাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইড আর ভগর্ভস্থ জল গ্রহ করে সূর্যের আলো ও বাতাসের অক্সিজেনের উপস্থিতিতে সালোক-সংশ্লেষ পদ্ধতিতে অক্সিজেন উৎপন্ন করে। একই সাথে জটিল জৈব যৌগ তৈরী করে নিজদেহে আত্তীকরণ করে। এভাবে বাতাস থেকে কার্বনের পরিমান কমিয়ে উদ্ভিদজাত যৌগের পরিমান বাড়ায়। ঐ উদ্ভিদজাত যৌগ যেমন ফল, মূল, লতা, পাতা ইত্যাদি পৃথিবীর প্রায় সব প্রাণীর খাবার যোগায়। কোন কোন প্রাণী আবার অপেক্ষাকৃত ছোট প্রাণীকে খাবার হিসেবে গ্রহ করে। এককোষী অনুজীব থেকে শুরু করে বহুকোষী স্তন্যপায়ী জন্তু পর্যন্ত প্রায় সব প্রাণী টিকে থাকার জন্য উদ্ভিদের তৈরী ঐ কার্বনজাত যৌগের উপর নির্ভর করে। অবশেষে উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃতদেহ পচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাতাস আবার কার্বন ফিরে পায়। এই পচন প্রক্রিয়া এককোষী অনুজীব ব্যাকটেরিয়া ও কিছু কিছু ছত্রাকের সাহায্যে ঘটে। কার্বনের এই বাতাস থেকে উদ্ভিদ দেহে, উদ্ভিদ দেহ থেকে প্রাণী দেহে, এবং প্রাণী ও উদ্ভিদ দেহ থেকে আবার বাতাসে ফিরে আসাকে কার্বন চক্র বলে।

কার্বন চক্র একটা গতিশীল প্রক্রিয়। পৃথিবীতে বাতাস, উদ্ভিদদেহ, প্রাণীদেহ, মৃত জৈব পদার্থ, ও মাটির তলায় সঞ্চিত কয়লা, তেল ও গ্যাস সব মিলিয়ে কার্বনের পরিমান নির্দিষ্ট। হাজার হাজার বছর ধরে উদ্ভিদ ও প্রাণীজাত যে কার্বন-যৌগ কয়লা, তেল ও গ্যাসের আকারে সঞ্চিত আছে তা আমরা পুড়িয়ে বাতাসে কার্বনের (কার্বন-ডাই-অক্সাইড, মিথেন, ইত্যাদি) পরিমা ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়ে কার্বন চক্রে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছি। বলা বাহুল্য বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমা শূন্য হলে কার্বনচক্র বলে কিছু থাকতো না। তার অর্থ পৃথিবীতে উদ্ভিদ প্রাণী থাকতো না। তাহলে পৃথিবীটা হতোরব, নিথর।

শক্তি চক্র

 

পৃথিবীর প্রায় সব শক্তির উৎস সূর্য। গাছ সূর্য থেকে পাওয়া তাপ ও আলোর কিছু শক্তি ব্যবহার করে তা বাতাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে জটিল জৈব-যৌগে রূপান্তরিত করে নিজ দেহে আত্তীকরণ করে রসায়নিক শক্তি হিসেবে জমা রাখে। বিভিন্নভাবে এই রসায়নিক শক্তি পৃথিবীর তা প্রাণীর মধ্যে সঞ্চারিত হয়।

 

 

সূর্যের বিকরিত তাপ ও আলো পৃথিবী পৃষ্ঠের ও বায়ুমন্ডলের উষ্ণতা বাড়ায়। আবার উষ্ণই পৃথিবী তাপ বিকির করে শীতল হয়। এই বিকির প্রক্রিয়া না থাকলে পৃথিবী অব্যাহতভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠতো এবং কোন এক সময় উদ্ভিদ ও প্রাণীর বাসের অযোগ্য হয়ে যেতো। বিকির প্রক্রিয়া আছে ও থাকবে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় বাধা দেয় বায়ুমন্ডলীয় গ্রীনহাউস গ্যাস - যাদের মধ্যে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও মিথেন অন্যতম। বিশেষ করে কার্বন-ডাই-অক্সাইড পরিমাণের কারণে বড় ভমিকা পালন করে। এই গ্রীহাউস গ্যাস পৃথিবীর চারদিকে একটা প্রলেপ তৈরি করে। সূর্যের বিকরিত তাপ ও আলো ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের। এই তাপ ও আলো গ্রীহাউস গ্যাসের প্রলেপের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে আসতে পারে। কিন্তু বিকরিত তাপ অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের হওয়ায় তা ঐ প্রলেপের মধ্য দিয়ে সব বের হয়ে যেতে পারে না।

যেহেতু কোটি কোটি বছর ধরে এই প্রক্রিয়া চলে আসছে এবং কমবেশী পৃথিবীর তাপমাত্রা স্থিতিশীল আছে, গড় হিসেবে সূর্য থেকে পৃথিবীর ধারণ করা শক্তি ও পৃথিবীর বিকরিত শক্তির পরিমান প্রায় সমান। যদি গ্রীহাউস গ্যাসের বাধার পরিমান বাড়ে, তখন পৃথিবীর বিকিরণের মাত্রা কিছুটা কমে যাবে। তাতে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়তে থাকবে এবং এমন এক তামাত্রায় স্থিতিশীল হবে, যে তাপমাত্রায় পৃথিবীর বিকির পৃথিবীতে আগত শক্তির পরিমাণ সমান হয়। আমরা পৃথিবীর বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, মিথেন ও অন্যান্য গ্রীনহাউস গ্যাস বাড়িয়ে সরাসরি শক্তি চক্রে হস্তক্ষেপ করছি। বলাবাহুল্য, গ্রীহাউস গ্যাসের অনুপস্থিতিতে পৃথিবীর বিকিরণের হার অনেক বেশী হতো ও পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা কমে যেতো - হয়ত তা জীবজগতের বসবাসের অযোগ্য হতো। কার্বন-ডাই-অক্সাইড একটি প্রধান গ্রীহাউস গ্যাস হওয়ায় কার্বন চক্র ও শক্তি চক্রের মধ্যে একটা বিশাল যোগাযোগ আছে।

এখানে দেখা যাচ্ছে বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়নের মূল কারণ হলো বায়ুমন্ডলে গ্রীনহাউস গাসের পরিমান বৃদ্ধির মাধ্যমে শক্তিচক্রের ভারসাম্যে নড়চড় হওয়া। আমরা মনুষ্য প্রজাতি - বিশেষত শিল্পায়িত তথাকথিত সভ্যজগত - বাতাসে গ্রীহাউস গ্যাসের বিস্তারে মখ্য ভমিকা পালন করে থাকি।

জল চক্র

পৃথিবী একটা বিশাল জলের ভান্ডার। কিন্তু এখানে জল নানাভাবে আছে। সাগর ও মহাসাগর গুলোতে আছে লোনাজল। নদ-নদী, খাল-বিল, হ্রদ-পুকুর - এগুলোতে আছে মিঠাপানি। উচু পর্বতশৃঙ্গে, হিমবাহে, মেরু অঞ্চলে জল থাকে জমাটবদ্ধ হয়ে বরফ আকারে। মাটির মধ্যে থাকে ভগর্ভস্ত জল হিসেবে। আর বাতাসে থাকে জলীয়বাষ্প হয়ে।

উষ্ণ এই ধরণীতে সূর্যের উত্তাপে জল, যার বেশির ভাগ মহাসাগরীয়, বাষ্প হয়ে বাতাসে চলে যায়। এই জলীয় বাষ্প মেঘের ও বৃষ্টিপাতের কারণ ঘটায়। বৃষ্টিপাত স্থলভাগে নদ-নদীর গতির সঞ্চার করে। ভরে দেয় খাল-বিল, হ্রদ মিঠা পানিতে। ভরে দেয় ভগর্ভস্থ জলের ভান্ডার। জমিয়ে রাখে পর্বতশৃঙ্গে, হিমবাহে, যা আবার সারা বছর ধরে গলে গলে নদীর গতিশীলতা ধরে রাখে। এই নদী তার শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে সারা পৃথিবীর স্থলদেশে জল ছড়িয়ে দেয়। পৃথিবীটাকে করে তোলে সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা। করে তোলে “ধনে ধান্যে পুষ্পে ভরা”। প্রাণের সঞ্চার ঘটা পৃথিবীতে। করে তোলে পৃথিবীটাকে জীবন্ত।

সারা পৃথিবীটাকে যদি একটা জীবিত দেহের সাথে তুলনা করি তাহলে নদ-নদীগুলো হলো তার রক্তনালী। যা প্রতিটি কোষে কোষে খাদ্য, পানি ও অক্সিজেন সরবরাহ করে। সমুদ্র ও মহাসমুদ্রগুলো হলো হৃৎপিন্ড যার শক্তি যোগায় সূর্য। খাল-বিলগুলো হলো গ্রন্থি। নদ-নদীগুলো পৃথিবীকে ফলে-ফুলে ভরে দিয়ে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে সাগরে পৌঁছে। আবার জল জলীয়বাষ্প হয়ে মিশে যায় বাতাসে। এভাবে চলে জলের চক্র। আমরা বাতাসে গ্রীহাউস গ্যাস বাড়িয়ে পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়িয়ে সরাসরি জলচক্রে হস্তক্ষেপ করছি। এই হস্তক্ষেপ আমাদের জন্য অশুভ। বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে গবেষণা করছেন। তারা বলে দিচ্ছেন এর কুফল কি কি হতে পারে। বাস্তবে তা আমরা প্রত্যক্ষও করছি।

এই কুফলগুলোর মধ্যে আছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে মেরু অঞ্চলের, পর্বতশৃঙ্গের ও উচু মালভুমির হিমবাহের সঞ্চিত জলের বা বরফের পরিমা কমে আসবে এবং সমুদ্রে জলের পরিমান বৃদ্ধি পাবে। তারপর আবার সমুদ্রের বিশাল জলরাশির উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে আয়তনে বেড়ে যাবে। সব মিলিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে যা বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের উপকলীয় অঞ্চল প্লাবিত করবে। উপকলীয় ও নিম্নাঞ্চলীয় অনেক মানুষ হবে গৃহহীন। হবে অন্নহীন। তারপর ঝড়-জলচ্ছাস যদি হয় তা বিভীষিকায় পরিত হবে।

বিজ্ঞানীরা বলেছেন উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে রিতুচক্রে পরিবর্তন আসবে, বন্যার প্রকোপ বাড়বে, আবার খরারও প্রকোপ বাড়বে। এতে করে প্রয়োজনীয় সময়ে জলের অভাব হবে - যা কৃষিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। বাড়বে খাদ্যের মূল্য। বাড়বে দারিদ্র। বাড়বে অসন্তোষ। বাড়বে হানাহানি। যা আন্তঃদেশীয়, আন্তঃআঞ্চলীয় আন্তঃগোষ্ঠী দ্বন্দ্বের কারণ ঘটাবে। আর দ্বন্দ্ব থাকলে তা মাত্রায় বাড়িয়ে দিবে। সমাজবিজ্ঞানীরা ভবিষ্যবাণী করেছেন - পানীয় ও কৃষিসেচের জলের অভাব ভবিষ্যতে অনেক মারাত্মক যুদ্ধের কারণ হয়ে দাড়াবে।

উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে ঝড়, টর্নেডো, কালবৈশাখী, সাইক্লোন ঘন ঘন এবং অপেক্ষাকৃত প্রচন্ড আকারে আবির্ভুত হবে - যা জনজীবনে ও ইনফ্রাস্ট্রাকচারে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। প্রভাব পড়বে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলায়।

শেষ কথা

বিশ্বের উষ্ণায় ও শীতলীকর একটা স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া - যা মানব সভ্যতা বিকাশের আগেও চলেছে। কিন্তু প্রাকৃতিক এই প্রক্রিয়া মন্থর প্রকৃতির। প্রাকৃতিক ইতিহাসে বরফযুগ এসেছে, আবার চলেও গেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কালের উষ্ণায় প্রাকৃতিক উষ্ণায়নের চেয়ে অনেক দ্রুত। এতে মানব সভ্যতার প্রভাব আছে। বিশেষত বিগত দুই শতকে শিল্প বিপ্লবের প্রভাব অত্যন্ত প্রকট। এই সময়ে মানুষ অধিক হারে বন ধ্বং করেছে এবং প্রাকৃতিক ও সঞ্চিত জ্বালানী ব্যবহার করে বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইড সহ অন্যান্য গ্রীহাউস গ্যাসের পরিমা বাড়িয়েছে। লাভের জন্য কলের চাকা ঘুরাতে শক্তি দরকার। তার জন্য চাই জ্বালানি। তার অবিসংবাদী ফল বাতাসে গ্রীহাউস গ্যাস নিঃসরণ। তার অবধারিত ফল বিশ্বের উষ্ণায়

সভ্যতার ভারসাম্যহীন ক্রমবিস্তার বিশ্বব্যাপী উষ্ণায় ঘটিয়ে সভ্যতার অস্তিত্ব বিনাশের পর্যায়ে নিতে পারে। আমরা দেখছি সর্বংসহা ধরিত্রীরও সহনশীল সীমা আছে। দায়িত্বহীনভাবে সভ্যতার ব্যাপক বিস্তার ঘটিয়ে আমরা মনুষ্য প্রজাতি সেই সীমা লংঘন করতে শুরু করেছি। সভ্যতার বিস্তার আমাদের কাম্য। কিন্তু তা হতে হবে দায়িত্বপূর্ণভাবে। সভ্যতার বিস্তার এমনভাবে করতে হবে যাতে আমরা সীমা লংঘন না করি। আমরা চাই না সভ্যতার ক্রমবিস্তার কোন ধ্বংসের কারণ হয়ে দাড়া

বিশ্বের উষ্ণায়নের শ্রেষ্ঠ সমাধান হতে পারতো উষ্ণায়ন প্রক্রিয়ার বিস্তার রোধ করা। এর জন্য আমাদেরকে সারা বিশ্বজুড়ে গ্রীহাউস গ্যাসের নিঃসর কমাতে হবে। যার জন্য দরকার হবে সূর্যালোক ও সুর্যতাপ নির্ভর নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যাপক আহর ও তার ব্যবহার। একই সাথে কয়লা, তেল ও গ্যাস নির্ভর শক্তির উৎপাদন বন্ধ করা। এই সহজ সমাধানের সাথে পৃথিবীর সব দেশের অর্থনীতি জড়িত। এর জন্য দরকার বিশ্বের সব দেশের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা ও এক যোগে কাজ করা। গ্রীহাউস গ্যাসের নিঃসর বন্ধ হলে উষ্ণায়নের ত্বরায়িত প্রক্রিয়া বন্ধ হবে সত্য, কিন্তু উষ্ণায় চলতেই থাকবে। কারণ বাতাসে গ্রীহাউস গ্যাসের পরিমা এখন অনেক বেশী। উষ্ণায় থামাতে ব্যাপক বনায়নের মাধ্যমে বাতাস থেকে কার্বনের পরিমা কমাতে হবে। নবায়নযোগ্য সৌর শক্তির ব্যবহার ও বনায়নের এই শ্রেষ্ঠ সমাধানের জন্য পৃথিবী এখনও প্রস্তুত নয়। কারণ ভোগবাদ মানুষকে পেয়ে বসেছে। কারণ লাভ ও লোভ মানুষের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্র করে। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য।

বিশ্বের উষ্ণায়নের দ্বিতীয় সমাধান হতে পারে উষ্ণায় প্রক্রিয়ার খারাপ ফল কমিয়ে আনা। যেহেতু উষ্ণায় প্রক্রিয়ার বিস্তার রোধ করা বৃহত্তর বাংলা-মুলুকের - বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের - জনগণের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, এই প্রক্রিয়ার খারাপ ফল কমিয়ে আনার পদ্ধতি উদ্ভাবন আমাদের জন্য প্রায় শ্রেষ্ঠ সমাধান। এই দুই সমাধানের কোনটাই সম্ভব না হলে নিজেদেরকে পরিবর্তন করে, নিজেদের ক্ষতি স্বীকার করে, এই প্রক্রিয়ার সাথে সহাবস্থান করা ছাড়া উপায় নেই।

বিশ্ব উষ্ণায়নের সমাধানের লক্ষ্যে পরিবশবাদীরা, বিভিন্ন পরিবেশ সচেতন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, ও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। এ ব্যাপারে সারা পৃথিবীতে প্রায় হুলুস্থুল পড়ে গেছে।  তাঁদের আন্দোলন, দাবী এবং পরিকল্পনার মাধ্যমে আশা করি কার্বন-শক্তি-জল চক্রের ভারসাম্য বজায় থাকবে। আর আমাদের এ বসুন্ধরা দিতে পারবে তার সন্তান-সন্ততিদের জন্ম, আশ্রয় ও জীবনভোগের অনাবিল আনন্দের নিশ্চয়তাপারবে অনাদিকাল পর্যন্ত।

______________________

. সুকমল মোদক পুরকৌশলের বিশেষায়িত শাখা স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং সফটওয়ার ডেভেলপমেন্ট পেশায় ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলীতে কর্মরত। ড. মোদক বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (www.bdiusa.org )-এর কার্যকরী পরিষদের সমস্য। ইমেইল : sukomal_modak@yahoo.com
 

মন্তব্য:
দীপেন ভট্টাচার্য   May 16, 2009
লেখাটি পড়ে খুবই ভাল লাগলো। সাবলীল ভাষায় লেখা ড. সুকোমলের উষ্ণায়নের ব্যাখ্যা ও বর্ণনা খুবই বোধগম্য। আশা করি ওনার মতে অনেকেই বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান সংক্রান্ত রচনা লিখতে উদ্যোগী হবেন।
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.