Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  মূল রচনাবলীঃ  ||  ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ ১৪১৬ •  9th  year  2nd  issue  May-June  2009 পুরনো সংখ্যা
জলবায়ুর পরিবর্তন কি এবং কেন? Download PDF version
 

গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও বাংলা বদ্বীপ

জলবায়ুর পরিবর্তন কি এবং কেন?

তাপস দাস

আজকাল অনেক শীতপ্রধান দেশেও শীতকালে সতেজ সবজি পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো গ্রীষ্মকালে জন্মিয়ে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত স্টোরেজ থেকে পরে আনা নয়। এগুলো বহুদরের বিষুবীয় উষ্ণ অঞ্চলের কোন দেশে উৎপন্ন নয়। পক্ষান্তরে শীতকালেই স্থানীয়ভাবে গ্রীনহাউসে উষ্ণ ও আলোকিত ঘরে উৎপন্ন সবজি – একদম সতেজ। গ্রীনহাউস আমাদের পক্ষে এক ম্যাজিকের মতো কাজ করে।

সহজভাবে বলতে গেলে গ্রীনহাউস হচ্ছে একটা স্বচ্ছ আস্তর দিয়ে বানানো ঘর। এই স্বচ্ছ আস্তরণের মধ্য দিয়ে high frequency সূর্য্যরশ্মি প্রবেশ করতে পারে কিন্তু low frequency প্রতিফলিত ও বিকরিত রশ্মি আস্তরণের বাইরে যেতে পারে না। ফলে আস্তরণের মধ্যে ঘরের উষ্ণতা বৃদ্ধি পায় যা বাইরের তুলনায় বেশি। এবার সারা পৃথিবীকে একটি বড় গ্রীহাউস হিসেবে কল্পনা করা যেতে পারে যেখানে গ্রীহাউস গ্যাস বায়ুমন্ডলের বাইরে একটা কম্বলের ন্যায় আস্তর তৈরী করে, যার ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ে। সহজেই অনুমেয়, যদি এই গ্রীহাউস গ্যাসগুলো বায়ুমন্ডলে না থাকত তাহলে পৃথিবীর তাপমাত্রা অনেক কম হত। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল, এই গ্রীহাউস গ্যাসগুলো সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে দ্রুতহারে বৃদ্ধি পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে অভিশাপ বয়ে এনেছে। এই অভিশাপের নাম বৈশ্বিক উষ্ণায়ন।

গ্রীনল্যান্ডের জ্যাকবসন আইস স্ট্রীম ক্ষয়ে ক্ষয়ে মিশে যাচ্ছে সমুদ্রে। (সৌজন্য : Prof. Konrad Steffen, Univ. of Colorado)

কোন স্থানের কোন এক নির্দিষ্ট সময়ের বায়ুর অবস্থাকে আবহাওয়া বলে। অপরপক্ষে, জলবায়ু হল ঐ স্থানের দীর্ঘদিনের আবহাওয়ার গড় অবস্থা। উদাহরস্বরূপ বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ, আবার ভারতের র মরভমির জলবায়ু উষ্ণ ও শুষ্ক। জলবায়ুর পরিবর্তন হল দীর্ঘ দিনের জলবায়ুর ধরণে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটা। হিমালয়ের হিমবাহ এক গুরুত্বপূর্ণ পানির যোগানদাতা। কিন্তু বিগত দশকগুলোতে হিমালয়ের হিমবাহের দ্রুত গলনের ফলে হিমবাহের সংকোচন ঘটছে। বিজ্ঞানীদের মতে, হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলনের পিছনে পৃথিবীর তাপমাত্রা দ্রুতহারে বাড়ার প্রভাব রয়েছে। পৃথিবীর ভপৃষ্ঠের উষ্ণতা গত ১০০ বছরে গড়ে প্রায় ০.৭৪ (+/- ০.১৮) ডিগ্রী সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। এই উষ্ণতা বৃদ্ধির পরিমা পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন মাত্রায় দেখা দিচ্ছে। যেমন উত্তর গোলার্ধের উষ্ণতা দক্ষি গোলার্ধের চেয়ে দ্রুত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের উপর আন্তরাষ্ট্রীয় জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেল (Intergovernmental Panel on Climate Change, IPCC) এই উষ্ণতা বৃদ্ধির পিছনে মনুষ্যজনিত উষ্ণতা বৃদ্ধিকারক গ্রীনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধিকে মূলত দায়ী করেছে। যদিও পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের পিছনে কিছু প্রাকৃতিক কারণও দায়ী, কিন্তু তার প্রভাব অনেক কম ও অনেক ধীর প্রকৃতির।

 

 

ছবিতে নীল রঙের এলাকাগুলো (সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ০-২৫ মিটার উপরে) জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে  ভবিষ্যতে পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। (সৌজন্য : জিম হান্সেন)

পৃথিবীর উষ্ণতা মুলত দুটি কারণে বৃদ্ধি পেতে পারে। প্রাকৃতিক কারণ ও মনুষ্যজনিত উষ্ণতা বৃদ্ধিকারক গ্যাসের পরিমা বৃদ্ধি। প্রাকৃতিক কারণগুলোর মধ্যে পৃথিবীর অক্ষরেখার পরিবর্তন, সূর্যরশ্মির পরিবর্তন, মহাসাগরীয় পরিবর্তন ও আগ্নেয়গিরির অগ্নোৎপাত মুলত দায়ী। কতিপয় বিশিষ্ট বিজ্ঞানী মনুষ্যজনিত উষ্ণতা বৃদ্ধিকারক গ্যাস নিঃসরণের পরিমাণ বৃদ্ধিকে কর্তমান কালের উষ্ণতাবৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই গ্রীনহাউস গ্যাসগুলোর মধ্যে কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO2), জলীয়বাষ্প, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, ক্লোরো-ফ্লোরো-কার্বন (CFC) অন্তর্ভূক্ত। এসব গ্রীনহাউস গ্যাস পৃথিবীর চারপাশে কম্বলের মতো একটা আবরণ তৈরী করে, যা ভেদ করে সর্যরশ্মি প্রবেশ করতে পারে, কিন্তু বের হতে পারে না। এর ফলে ভপৃষ্ঠ-সংলগ্ন বায়ুমন্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়।

পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির পিছনে বহুলাংশে দায়ী কার্বন-ডাই-অক্সাইড এর পরিমা প্রাক-শিল্পযুগ সময়ের (১৭৫০ সাল) থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত ১০০ ppmv (parts per million by volume) বৃদ্ধি পেয়েছে। তার মধ্যে বিগত ৩০-৪০ বছরেই প্রায় ৫ ppmv বৃদ্ধি পেয়েছে। সভ্যতা বিকাশের জন্য আমরা বহুলাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি জীবাশ্ম জ্বালানির উপর, যা প্রচুর পরিমাণে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করে। আবার দ্রুতহারে বন-ধ্বং ও ভমিবিন্যাসের পরিবর্তন কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে, কারণ উদ্ভিদ কার্বন-ডাই-অক্সাইডের সঞ্চয় ভান্ডার হিসেবে কাজ করে। কিন্তু বন ধ্বংসের ফলে সেই কার্বন-ডাই-অক্সাইড বায়ুমন্ডলে মুক্ত অবস্থায় থাকে।

সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে গ্রীহাউস গ্যাসের নিঃসরণের হার ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গ্রীহাউস গ্যাসের নিঃসরণের হার শিল্পোন্নত ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ দেশগুলো যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, কানাডা, জাপান, অষ্ট্রেলিয়া, জার্মানী, ফ্রান্স, ইতালিতে অনেক বেশী। আবার বিগত বছরগুলোতে ভারত ও চীনের গ্রীহাউস গ্যাসের নিঃসরণের হার অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। কতিপয় গবেষক জানিয়েছেন চীনের উন্নয়নের মাত্রা অব্যহত থাকলে অদর ভবিষ্যতে চীনের গ্রীহাউস গ্যাসের নিঃসরণের হার যুক্তরাষ্ট্রের হারকে ছাড়িয়ে যাবে।

গ্রীহাউস গ্যাসের পরিমা বৃদ্ধির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে ১৯৯৭ সালে জাপানের কিয়োটো শহরে একটা প্রটোকল গঠন করা হয়, যা কিয়োটো প্রটোকল নামে পরিচিত, যাতে ৩৭টি শিল্পপ্রধান দেশ তাদের গ্রীহাউস গ্যাসের নিঃসরণের হার কমানোর লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে। এই লক্ষ্যমাত্রা স্থির করাই থেষ্ট নয়, সত্যিকার অর্থে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে। এমনকি বিজ্ঞানরা গবেষণা করে দেখিয়েছেন, এখনই যদি কোন দৈবক্রমে মনুষ্যজনিত গ্রীহাউস গ্যাস নিঃসরণ বন্ধ করা যায়, তারপরও বিশ্বের তাপমাত্রা ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পেতেই থাকবে, যদিও বৃদ্ধির হার বর্তমান হারের চেয়ে অনেক কম হবে। কারণ হল বর্তমানে বায়ুমন্ডলে গ্রীহাউস গ্যাসের পরিমা বেশী এবং মুখ্য গ্রীনহাউস গ্যাস কার্বন-ডাই-অক্সাইড-এর দীর্ঘস্থায়ী জীবন। তার অর্থ আমাদের যেমন নিঃসরণ মাত্রা কমাতে হবে, সাথে সাথে জলবায়ুর পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।

পৃথিবীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি হার, ভমিবিন্যাস ইত্যাদি তথ্যকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞানীগণ দেখিয়েছেন, একুশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ মুখ্য গ্রীহাউস গ্যাস কার্বন-ডাই-অক্সাইডের এর পরিমা প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় দুই গুণ থেকে তিন গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। এ সব গ্রীহাউস গ্যাস বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে কতিপয় বিশিষ্ট গবেষক কম্পিউটার মডেলের সাহায্যে দেখিয়েছেন যে একবিংশ শতাব্দীতে ভপৃষ্ঠ-সংলগ্ন গড় উষ্ণতা প্রায় ১.১ থেকে ৬.৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। যদিও এই বৃদ্ধির পরিমাণ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন মাত্রায় দেখা যাবে। তেমনি কোনো নির্দিষ্ট স্থানে শীত ও গ্রীষ্মে এই বৃদ্ধির পরিমাণে তারতম্য ঘটতে পারে। বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লক্ষ্যণী পরিবর্তন ঘটতে পারে। যেমন বৃষ্টিপাতের পরিমা পরিবর্তন, ঘনঘন তাপ প্রবাহ, বন্যা ও খরার প্রাদুর্ভাব, পানির প্রয়োজন ও যোগানের পার্থক্য, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, কৃষি ক্ষেত্রে ফলনে খারাপ প্রভাব, ইকোলজিতে পরিবর্তন, বিদ্যুত শক্তির চাহিদা বৃদ্ধি এবং মানুষের স্বাস্থ্যে লক্ষ্যণীয় প্রভাব পড়তে পারেযদি বিশ্বে উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাব পৃথিবীর সর্বত্র একই ভাবে এবং একই মাত্রায় হয়তোবা দেখা যাবে না।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কিছু গবেষক জানিয়েছেন, ভপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি কৃষি ক্ষেত্রে ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলতে পারে যা সামাজিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশ্বের তাপমাত্রার বৃদ্ধি বাংলাদেশের কোন কোন ক্ষেত্রে কিভাবে প্রভাব ফেলতে পারে তার জন্যে উপযুক্ত কম্পিউটার মডেলের সাহায্যে স্থানীয় তথ্যকে কাজে লাগিয়ে বহুবিদ গবেষণা করার প্রয়োজন রয়েছে।

একথা সত্য যে জলবায়ুর পরির্বতন একটা বৈশ্বিক সমস্যা এবং এই সমস্যা সৃষ্টির পিছনে বাংলাদেশ বা বৃহত্তর বাংলার জনগণের ভমিকা খুবই নগন্য। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দুই বাংলা হয়ত এড়াতে পারবে না, কিন্তু আমাদের সচেতন ও তৎপর হতে হবে যাতে ক্ষতিকারক প্রভাবকে লঘু করার জন্য আমরা যথাসময়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারি।

 

. তাপস দাস ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া সানডিয়াগো ক্যাম্পাসে জলবায়ুর পরিবর্তন ও পানিচক্রে তার প্রভাব নিয়ে গবেষণারত। লেখকের ইমেইলঃ tadas@ucsd.edu
 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.