Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সম্পাদকীয়  ||  ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ ১৪১৬ •  9th  year  2nd  issue  May-June  2009 পুরনো সংখ্যা
কবে হবে মনুষ্য রাষ্ট্র? Download PDF version
 

সম্পাদকীয়

 

কবে হবে মনুষ্য রাষ্ট্র?

 

মানুষের জন্যই যুগে যুগে সমাজব্যবস্থা এসেছে, সমাজ পরিবর্তন হয়েছে, ধর্ম ব্যবস্থা এসেছে, ধর্মের পরিবর্তন হয়েছে, হয়েছে ধর্মের আধুনিকায়ন, রাষ্ট্রব্যবস্থা এসেছে, রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিপ্লব হয়েছে। মানুষকে সভ্য করার জন্যই এতকিছু। শুনতে খারাপ লাগলে, মানুষ আর জন্তু-জানোয়ারের সাথে রয়েছে অনেক কিছুতেই মিল। সময়ে-সুযোগে আমাদের অসভ্যতা জঙ্গলের জানোয়ারদের মতই বেরিয়ে পড়ে। সভ্যতার শুরুতে, বিশেষ করে মধ্যযুগে, ধর্ম আর রাষ্ট্র ব্যবস্থা একাকার ছিল। আলাদা করার সুযোগ ছিল না। একথা অনস্বীকার্য যে ব্যাক্তিগত জীবনে, পারিবারিক জীবনে, সমাজিক জীবনে, বাহ্যিক জীবনে এবং আধ্যাত্বিক জীবনে ধর্মের প্রয়োজনীয়তা আগে যেমন ছিল, এখনো আছে এবং ভবিষ্যতে থাকবে। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সঙ্গত কারণেই ধর্ম ব্যবস্থা আর রাষ্ট্র ব্যবস্থা আলাদা হয়ে যাচ্ছে। তবে সারা পৃথিবীর দিকে তাকালে সহজেই দেখা যায় যে আমাদের এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে, ধর্মের উপরে উঠে মানবিক সভ্যতা অর্জন করতে হলে।

যুগে যুগে ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক আর অর্থনৈতিক আগ্রাসনের কারণে অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক নিজস্ব বিকাশ কখনো হয়নি।  হতে দেয়া হয়নি বললে ভুল হবে না।  অনেক কিছুই ছিল বহিরাগত আরোপিত।  তাতে করে শান্তিপ্রিয় মানুষের জন্য শান্তির চেয়ে অশান্তির পরিমাণ বেড়েছে অনেক গুণে।  ধর্মের কারণে, রাজনীতির কারণে, সাংস্কৃতিক বিকাশের নামে, বাণিজ্যিক কারণে পৃথিবীতে অসংখ্য যুদ্ধ হয়েছে, হচ্ছে এবং আরো হবে।  কারণ, আমরা এখনো মানুষ হতে পারিনি, সভ্য হতে পারিনি।  আরো শত বছরে হবার আলামত এখনো দেখিনা।

ধর্মীয় উন্মাদনা আর মাদকতায় ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভাজনে ভারত আর পাকিস্তানের সৃষ্টি হলে মাত্র ২৪ বছরের মাথায় স্বপ্নভঙ্গ হয় বাংলাদেশের তিহাসিক সৃষ্টিতে।  আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উদাহরণ দিয়ে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা বেশীদূর এগুবে না বিভিন্ন কারণে।  পক্ষে শুধু একটাই যুক্তি ছিল এক হাজার মাইল দূরবর্তী দুই ভূখন্ড পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) পশ্চিম পাকিস্তান (বর্তমান পাকিস্তান)-এর একীভূত রাষ্ট্রভিত্তির শুধুমাত্র ধর্ম, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা।  আধুনিক রাষ্ট্রীয় বিচারে আর সব কিছুই ছিল নিখিল পাকিস্তান-এর বিপক্ষে ভৌগলিক, সামাজিক, ভাষা-সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি।  মোটকথা কি ছিল না বিপক্ষে!  ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল এর তিহাসিক পরিণতি। সেই ইতিহাস সবার জানা।

ধর্মের কারণই যদি একমাত্র রাষ্ট্রভিত্তি হতো তাহলে ইউরোপ মহাদেশে খৃষ্টান ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের সংখ্যা হাতে গোণা দু তিনটির বেশী হতো না।  আজকের মধ্যপ্রাচ্যে দুটোর বেশী হতো না।  শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতবাদের ভিত্তিতে যদি রাষ্ট্রকাঠামো হতো তাহলে কানাডা যুক্তরাষ্ট্র মুক্ত অর্থনীতির কারণে একটি রাষ্ট্র হতে পারতো।  একই কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী স্নায়ুযুদ্ধের সময় পূর্ব ইয়োরোপীয় দেশসমুহ, রাশিয়া চীন কম্যুনিজমের ভিত্তিতে হতে পারতো একটাই রাষ্ট্র।  কিন্তু এগুলো বাস্তবতা নয়।  কষ্ট-কল্পনা বললে ভুল হবে; আসলে উলু বনে মুক্তা ছড়ানোর মতো।

প্রশ্ন হতে পারে উলুবনে এতো মুক্তা ছড়ানোর কি কারণ?  তাহলে খোলসা করেই বলি।  যুগে যুগে চেঙ্গিস খান হালাকু খানরা এসেছে, এসেছে সালাদিন আর বিন লাদেনরা, এসেছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী, এসেছে বুশ-চেনীরা, এসেছে হিটলার-মুসোলিনী-স্টালিনরা, লেনিন-মারা, এসেছে গান্ধী নেলসন ম্যান্ডেলা - মার্টিন লুথার কিং শেখ মুজিবরা।  কেউ যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, কেউ যুদ্ধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে।  ভুলে গেলে চলবে না এরা সবাই আমাদেরই নেতা, আমাদেরই প্রতিচ্ছবি, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর।  সময়ের কারণে আমরা কখনো এদের পক্ষে যুদ্ধ করেছি, কখনোবা করেছি বিপক্ষে।  হয়তোবা আমাদের দিয়ে করানো হয়েছে, কিন্তু যুদ্ধটাই নির্মম সত্য। 

যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার কারণগুলো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন হলে, মূল কারণটা কিন্তু ক্ষমতা কিংবা ক্ষমতার লড়াই।  সেটা রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে সামাজিক পর্যায়েই হোক, আর বাণিজ্যিক পর্যায় থেকে ধর্মীয় পর্যায়েই হোক। সব যুদ্ধেরই অবসান হয় আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে,  কিন্তু ধর্মযুদ্ধের যেন কোন শেষ নেই। যুগে যুগে ধর্মের কারণেই যেন যুদ্ধ বেশী হয়েছে। আর ধর্মযুদ্ধের কারণে সভ্যতা বারংবার ভূলুন্ঠিত হয়েছে,  অগুণিত মানুষজনের প্রাণহানি হয়েছে।  অশিক্ষা-কুশিক্ষার কারণে আমাদের নেতা-নেত্রীরা আমাদেরকে ব্যবহার করেছে কলের পুতুলের মত তাদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে সেটা রাষ্ট্রীয় কারণেই হোক কিংবা সামাজিক কারণেই হোক বিংবা ধর্মীয় কারণেই হোক।

প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিচ্ছি?  আমরা কি শিখেছি কিভাবে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সম্মান করতে হয়?  আমাদের কি এখনো অন্যের রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক বিশ্বাসের জবাব দিতে হবে সশস্ত্রভাবে?  আমরা কি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষা এখনো কেড়ে নিচ্ছিনা?  আমরা কি ক্ষুদ্র কিংবা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে সম্মান দিতে শিখেছি?  না দিচ্ছি যুক্তরাষ্ট্র-অস্ট্রেলিয়ায়, না দিচ্ছি বাংলাদেশে, না দিচ্ছি ভারতে, পাকিস্তানে তো কথাই নেই।

ধর্মীয় মাদকতায় ফিরে আসি।  এটা বাংলাদেশকে যেমন পাকিস্তানের সাথে রাখতে পারেনি, তেমনি পারবে না বেবিলনীয় সভ্যতার ইরাককে এখনকার ভৌগলিক সীমানায় একীভূত রাখতে, পারবে না সেলুকাস-ফেরৎ আফগানিস্তানকে, পারবে না আজকের ইসলামী বোমা পাকিস্তানকে  পশ্চিমা দুনিয়ার ভাষায় মডারেট মুসলিম কান্ট্রি হলে বাংলাদেশের জন্য একই কথা প্রযোজ্য।  ইসলামের আদিভূমি সৌদি আরবের রাজতন্ত্র কিংবা পারস্য সভ্যতার পূণ্যভূমি ইরানের মোল্লাতন্ত্র রাখতে পারবে না দেশ দুটোকে আজকের অবস্থানে খুব বেশী দিন।  যেটা প্রয়োজন সেটা হলো অক্ষশক্তি স্থানীয়-অস্থানীয় ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক অপশক্তির উর্ধ্বে উঠা;  উর্ধ্বে উঠে নিজস্ব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা উদ্ভাবন প্রতিষ্ঠা করা।  ধর্মীয় উন্মাদনা আর মাদকতা থাকা সত্ত্বে নিজস্ব গণতান্ত্রিক পরিচর্যার কারণেই উৎরে যাচ্ছে ভারত আর যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্র ব্যবস্থা।  এ ব্যাপারে আরো কিছু ভালো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার উদাহরণ তো অবশ্যই বর্তমান।  এছাড়া যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার মাঝে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র ইজরায়েল আর প্যালেস্টাইনে গণতান্ত্রিক চর্চা লক্ষ্যণীয়।

আমার বিশ্বাস, ধর্মকে রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে আলাদা করতে পারলেই বিদ্যমান রাষ্টীয় বৈশ্বিক সমস্যার অর্ধেক সমাধান হয়ে যাবে। বাকি অর্ধেক রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক আর বাণিজ্যিক সমস্যাগুলোর যোগফল।  মনে রাখতে হবে মানুষের জন্য ধর্ম, মানুষের জন্য রাষ্ট্র।  রাষ্ট্রের জন্য যেমন মানুষ নয় তেমনি ধর্মের জন্য মানুষ নয়।  নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে পৃথিবীব্যাপী হাজার হাজার স্থানীয় নাগরিক এবং বিশ্ব নাগরিকরা এ লক্ষ্যে অক্লান্তভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।  কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় এ সংখ্যা এখনো অপ্রতুল।  ঘুম থেকে আরেকটু তাড়াতাড়ি উঠুন, আরেকটু চোখ মেলে তাকান নিজের দিকে যেমন, তেমনি অন্য মানুষের দিকে।  শুধুমাত্র আত্মীয়-স্বজনের দিকে তাকালে কিন্তু হবে না। মন খুলে অন্ধ ধর্মবিশ্বাসের উপরে উঠুন, অন্ধ রাজনৈতিক বিশ্বাসের উপরে উঠুন, অন্ধ ব্যবসায়িক স্বার্থের উপরে উঠুন, মানুষকে মানুষ ভাবুন।  বিদ্রোহী কবি নজরুলের ভাষায় - সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই  তবেই এই একবিংশ শতাব্দীতেই আমরা মনুষ্য রাষ্ট্রগুলোর সহাবস্থান দেখবো।  আর নয় জঙ্গলের রাষ্ট্র। 

 

- সাবির মজুমদার

ই-মেইল : sabir.majumder@comcast.net

ফ্রিমন্ট, ক্যালিফোর্নিয়া

মে ৭, ২০০৯

 

 

মন্তব্য:
Iftekhar Choudhury   May 22, 2009
An excellent article. The answer to Mia Shaheb's question is- yes, a secular state not only can safeguard a modern society, but also can assist a modern society to grow beautifully with changing times. Look at Pakistan and see what religious bigots can do to a modern country. Religion is personal and shall not play any role in democracy.
মিয়া সাহেব   May 16, 2009
সম্পাদকীয় পড়ে ভাল লাগল। কিন্তু ধর্ম নিয়ে যেমন বাড়াবাড়ি ভাল নয় তেমনি ধর্মের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করা ভাল নয়। ধর্মকে বাদ দিলেই কি আধুনিক রাষ্ট্র আর আধুনিক সমাজব্যবস্থা কায়েম হয়ে যাবে?
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.