Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  নিয়মিত কলাম  ||  ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ ১৪১৬ •  9th  year  2nd  issue  May-June  2009 পুরনো সংখ্যা
বারবারের দোকানে Download PDF version
 

নিয়মিত কলাম

     
  ওয়াশিংটনের জানালা

 

বারবারের দোকানে

ওয়াহেদ হোসেনী

গোসল করে নেমে এসে এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে বসলাম বসার ঘরে। জানালায় ঝোলানো লাল পাড় লাগানো সাদা ফিনফিনে পর্দার ভেতর দিয়ে দেখছি, দূরের পার্কওয়ের ট্রাফিক পাতলা হয়ে গেছে। বেলা এখন সাড়ে দশটা। যেদিন আমার চুল কাটার দরকার হয়, কিংবা পোষ্ট অপিস যেতে হয় সেদিন আবহাওয়া ভালো থাকলে হেটেই যাই আসি। যাতায়াতে মাইল দুয়েকের একটু বেশী। পাড়ার নিরিবিলী পায়ে হাটার আকাবাকা রাস্তা দিয়ে মাইল খানেক গিয়ে বড় রাস্তায় ট্রাফিক লাইটে বায়ে ঘুরলেই স্প্রীংফিল্ড শহরের দক্ষিণাঞ্চল। গোটা পাঁচেক পাক-ভারতীয় রেস্টুরেন্ট, দুটো গ্রোসারী আর বাদ বাকি যে কোন ছোট আমেরিকান শহর। বেশ কয়েকটা বারবার সপ। আমার ২৬ বছর একই বাড়ীতে থাকার সময় একই বারবারের দোকানে চুল কাটাই। বারবারদের সংগে যেন একটা আত্মীয়তা জন্মে গেছে। সুখদুঃখের আলাপ আলোচনা হয়, ভ্যাকেসন যাওয়ার কথা হয়, এখানকার ফুটবল টিম রেডস্কীন জিতলে আর কোন কথা নেই। মজা লাগে ওদের কথা শুনতে, বিশেষ করে দক্ষিণ ভার্জিনিয়ার টানওয়ালা ফিলের কথা শুনতে। ঐ বারবারদের নিজেদের মধ্যে তর্ক লেগে গেলে, দ্রুত গতির বিশেষ টানওয়ালা ইংরিজীর শতকরা ২০/৩০ ভাগ আমার বোধগম্য হয় না। এদের মধ্যে ফিল-ই মধ্যবয়স্ক। বছর দুয়েক আগে ক্যান্সারে বউ মারা গেছে। ছেলে নেই, মেয়ে তিনটা। ছোটটা এখনো বাপের সংগেই থাকে, কোন এক ফোন কোম্পানীতে কাজ করে। স্টেডী কোন ‘বয় ফ্রেন্ড না থাকায় ফিল চিন্তিত। পাশের চেয়ারের ছোকরা বারবার জন বলে, মেয়ের জন্য চিন্তিত না কচু। আসলে মেয়েটা চলে গেলেই ফিল আবার বিয়ে করবে। ফিলও ছাড়ার পাত্র নয়, চুল কাটতে কাটতেই উত্তর দেয় - যে এক সংগে তিন তিন জনের সংগে প্রেম করে বেড়ায় তার মুখে এর চাইতে ভালো আর কি শোনা যাবে। ওদের কথাবার্তা সুড়সুড়ী দেয়। আগে মনে করতাম আমার সংগে এতদিনের সম্পর্ক, তাই এত আপন করে কথা বলে। পরে বুঝতে পেরেছি- নাপিতরা হোল খৈ ফোটানো কথা বলার জাত- কোন বাছ বাছাই নেই। আর ওরা জানে না এমন বিষয় নেই। সেদিন নিকোলাস (আমি ওকে নিতাই বলে ডাকি) বলে বসল- আরে আমেরিকানরা ইচ্ছা করলে পারে না কি? যেদিন মনস্থির করলো তার দু বছরের মধ্যে মানুষকে চাঁদে বসিয়ে দিল। গলা খাকরী দিয়ে আমি বললাম- দু নয় দশ বছর লেগে ছিল। নিতাই সংগে সংগে বলে উঠলো, আরে তোমরা ডেমোক্রাটরা তো শুধু আমেরিকাকে পেছনেই টান। আমি কিছু বলার আগেই জন বলে উঠলো - এর মধ্যে ডেমোক্রাটদের টানাটানি কেন? বুঝলাম আজকে ১৮ ডলার দিয়ে চুল কাটার উপরি পাওনা নিতাই আর জনের তর্কাতর্কী উপভোগ করা।

সারা মাথা ভর্তি টাকওয়ালা লোকের পেছনের দিকে এক ঘুচ্ছ কাচাপাকা চুলের ওপর কচ কচিয়ে কাচি চালিয়ে যাচ্ছাল নিতাই। মাঝে মাঝে টাক ওয়ালার মাথাটা টেনে একেবারে বুকের কাছে ধরছে- মুখটা গম্ভীর। ক্ষণিক পরে কাচির সংগে সংগে মুখও চললো। নিতাই বলে উঠলো, কেন সে বিদেশে গিয়ে দেশের বদনাম করবে। কেন সে যার তার সংগে হাত মেলাবে। ওগুলো কি আমেরিকার সুনাম বাড়ায়। বুঝলাম বৃদ্ধ শেতাঙ্গ নিতাই বাবুর কৃষ্ণাঙ্গকে প্রসিডেন্ট হিসাবে মেনে নিতে মন চাইছে না। নিতাই-এর এই হঠাৎ অন্যধরনের আক্রমণে জন থতমত খেয়ে গেল। একটু থেমে ধীর কন্ঠে বললো, নিক, পরিবর্তন তোমাকে মেনে নিতেই হবে। সারা দুনিয়ায় পরিবর্তনের ছোয়া লেগেছে। আমেরিকায়ও লাগছে। হয় মেনে নিতে হবে, নয় কষ্ট পাবে, পিছিয়ে পড়বে। বারবারের দোকানে সারাক্ষণ টেলিভিশন চলতে থাকে- খেলার দিনে খেলা নয়, সিএনএন কিংবা ফক্স নেটওর্য়াক। আমার মাথাটা ধরে যুত মত বসিয়ে নিল ফিল। এবার দেখি ফিলের পালা। ফিল বললো- দেখো ওবামা কিন্তু কাজটা ভালো করেনি। জন আর আমি এক সংগে বলে উঠলাম- কোনটা? ঐ যে সিআইএ, জাষ্টিষ ডিপার্টমেন্টের মেমো প্রকাশ করেছে। বাপুহে সেও (বুশ) একটা প্রেসিডেন্ট ছিল। দেশকে সে ভালবাসতো। দেশের ‘সিকিউরিটির জন্য তাকে ওসব করতে হয়েছে এখন তো সারা দুনিয়া জেনে গেল। তাদের বিচার হতে পারে এই ভয়ে সরকারী লোকেরা সরকারী হুকুম তামিল করতে ইতস্তত করবে।  আমি বড় বড় চোখে ওদের কথা শুনছিলাম। পেশায় নাপিত, তারাও এত গভীরে যেতে পারে? ঘন চুল ভর্তি এক লোকের মাথার ওপর কাজ করতে করতে জন যেন ওবামার ওকালতীতে নামলো। চুল কাটতে কাটতে জন বলে চললো, ওবামা ঠিকই করেছে, বদ ও অসততা প্রকাশ করে দিয়ে আমেরিকার ইজ্জত বাড়িয়ে দিয়েছে । আর সে তো বলেও দিয়েছে নিচুস্তরের কর্মচারীরা যারা হুকুম পালন করেছিল, ওবামা তো ওদের বিচারে যাচ্ছে না। তবে ওবামা এটা বললে হবে কি, ঐ শুনলে না কংগ্রসের রথি মহারথীরা ওপরওয়ালাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায়। জানতে চায় আমেরিকাকে টেনে নামানোর মূলে কারা। জনের বক্তৃতা চলতে থাকে, দেখছো না ‘পালের গোদা (ব্লাক শীপ) চেনী মিয়া ছটফটাচ্ছে। চিৎকার করে বেড়াচ্ছে। এটা ঠিক নয়, ওটা ঠিক নয়। এটা দায়িত্বহীন। আমার মাথায় কাচি চালাতে চালাতে ফিল কি জানি বলতে চেষ্টা করলো, কিন্তু জনের তুফান মেল তখন থামার কোন লক্ষণ নেই। জন বলে চললো- ঐ চেনী পারে না এমন কাজ নেই। করবে সব কিছু কিন্তু চিহ্ন রাখবে না একটুও। ডলারের পাহাড় বানাবে তবে তুমি প্রমাণ করতে পারবে না কিছুই। শাক দিয়ে মাছ ঢাকছে। বলছে কারো কাছে আমাদের মাফ চাইতে হবে কেন?

জন ছোকরাকে আমি যতটা গবেট মনে করতাম, দেখি সে তত গবেট নয়, খোঁজ খবর রাখে। কাজ করে যাচ্ছে আর বলে চলেছে মাফ চাওয়া না চাওয়ার কথা হচ্ছে না, কথা হচ্ছে ন্যায়ের, সততার। অন্যায় যে হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এখন দোষ স্বীকার করে বেরিয়ে আসলেই হলো। ওবামা তো নিজেই বলেছে- আমরা বড়, আমরা শক্তিশালী। দোষ স্বীকার করে নিলে তবেই তো আমরা ন্যায়বান হব। আরো মহৎ হব। আর যে কথাগুলো ওবামা প্রকাশ করেছে সে গুলোতো নতুন কিছু নয়- সব কাগজ লিখেছে, সব টেলিভিশন বলেছে। দম নিতে জন একটু থামলেই চটে থাকা নিতাই বাবু সুযোগ নিয়ে বেশ গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন, তা বলে তুমি এ্যাশক্রফটের বিচার করবে, তুমি গন্জালেসের বিচার করবে? তুমি বিবি-র বিচার করবে? আমার চুল কাটতে কাটতে ফিল জুড়ে দিল - আরে ও বিচার ফিচার কিছু না। এখন ডেমোক্রাটরা রিপাবলিকানদের বাগে পেয়েছে। যতটা পারে নিংড়াবে। জন ছোকরা টুক করে কথার মধ্যে ঢুকে পড়লো। বললো, আরে জান বাঁচাতে এখন ওসব কথা বলবেই। বলবে নিরপেক্ষ নয় ইত্যাদি ইত্যাদি। আরে ঐ যে নিউট না কি জানি নাম- সেও নাকি মাঠে নামছে। একবার তো আমেরিকার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিল, আবার আসছে। বুশ তো দেশ দেউলিয়া করলো, সারা দুনিয়ার ছিছি কুড়ালো। ইউরোপ তো আমেরিকার কথা শুনলে সামনে হু হা করবে, আর পেছনে দেবে মুখ ঝামটানি। এসব জানতে বাকি আছে কার। এখন নিউট ঘোলা পানিতে প্রেসিডেন্ট হতে চায়।

আমি মুখ বুজে সব শুনছি। যতই দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক হোক না কেন, যতই নিকটত্ব বোধ করি না কেন, আমি foreign born, গায়ের রং বাদামী - ফট করে মনে করে বসবে আমি “প্রেটিয়েট” নই। এতক্ষণে আমার চুল কাটা শেষ হয়ে গেছে। বিশ ডলারের নোটটা ফিলের হাতে দিয়ে দোকানের দরজার দিকে যেতে যেতে ফিলকে জিজ্ঞেস করলাম- মেয়ে কেমন আছে। উত্তরে ফিল বললো, দেখো দেখো আমার জন্ম দিনে মেয়ে আমাকে কি দিয়েছে। পকেট থেকে বের করে দেখালো একটা আই-ফোন। বললাম, বাহ বেশ তো! জিজ্ঞেস করলাম, সব ফিচার ব্যবহার করতে শিখেছ? হেসে ফিল বললো, না আমি ওতসব বুঝি না। আমার দরকার হয় না, আমি শুধু ফোন হিসাবে ব্যবহার করি। জন ছোকরা টুপ্পনি কেটে বললো, জান, ওবামা শিগ্রী সিকিউরড ব্লাকবেরী ব্যবহার করতে শুরু করবে। ‘ইউএস ওলিম্পিক লেখা বেসবল ক্যাপটা মাথায় দিয়ে রাস্তায় নেমে পড়লাম।

বাড়ীতে বসার ঘরে বসে বসে ভাবছি ফিলের কথা, নিতাই-এর কথা, জনের কথা। নাপিত ওরা। শিক্ষার দৌড় বড় বেশী নয়। তবে কেউতো কারুর কথার ওপর কথা বলেনি। তিন জেনারেশনের প্রতিবিম্ব- আমেরিকায় যে পরিবর্তনের জোয়ার এসেছে তারই প্রতিচ্ছবি। জানালার পর্দার ভোতর দিয়ে দেখি মেলম্যান চিঠির বান্ডিল দিয়ে গেল। উঠে গেলাম দেখতে আজকে কি কি বিল আসলো।

ElderHossaini@gmail.com

ওয়াশিংটন ডিসি

এপ্রিল ২০, ২০০৯

 

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.