Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  উত্তর আমেরিকায় কর্মকান্ড  ||  ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ ১৪১৬ •  9th  year  2nd  issue  May-June  2009 পুরনো সংখ্যা
বীজ থেকে মহীরুহঃ বঙ্গসম্মেলনের বিবর্তন Download PDF version
 

উত্তর আমেরিকায় কর্মকান্ড

বীজ থেকে মহীরুহঃ বঙ্গসম্মেলনের বিবর্তন

আশফাক স্বপন

এই জুলাই মাসে যখন সারা মার্কিন মুলুক মেতে উঠবে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের উৎসবে, তখন স্যান হোজে কনভেনশন সেন্টার গমগম করে উঠবে কয়েক হাজার বাঙালির কোলাহলে। উদ্যোক্তাদের আশা, পাঁচ হাজারের অধিক বাঙালির সমাবেশ ঘটবে।

বাঙালির জন্য শুধু এই অনুষ্ঠান শুধু আনন্দের নয়, বেশ গর্বেরও। বাংলাদেশে অথবা পশ্চিম বাংলায় এমন অনুষ্ঠান হয় বলে আমাদের জানা নেই। বিশ্বের অন্যত্র, এমনকি অনেক অবস্থাপন্ন দেশে, যেখানে অনেক বাংলাভাষী থাকেন- যেমন মধ্য প্রাচ্য অথবা বিলেতেও এত বড় আকারে বঙ্গ সম্মেলন হয়েছে বলে আমরা শুনি নাই। সেই দিক থেকে উত্তর আমেরিকার বাঙালি সমাজ এবং মূলত পশ্চিমবঙ্গ হতে আগত বাঙালি সমাজের জন্য এটা একটি বিরাট অর্জন, সেকথা অনস্বীকার্য।

অবশ্য একথা মনে রাখা প্রয়োজন যে উত্তর আমেরিকায় শুধু বাঙালিরাই বার্ষিক সম্মেলন করছেন না, ভারত হতে আগত বিভিন্ন ভাষাগত গোষ্ঠীর মধ্যে এই ব্যাপারটা চালু হয়ে গেছে। অন্ধ্র প্রদেশের তেলুগু ভাষী সমাজ, মারাঠি ভাষী সংগঠন মহারাষ্ট্র মন্ডল এরাও খুব ঘটা করে, আড়ম্বর করে বার্ষিক সম্মেলন করে, এবং সেখানেও কয়েক হাজার লোকের সমাগম হয়, দেশ থেকে রাজ্যের মন্ত্রীমশাই, চলচিত্র তারকা, অনেক কেষ্টুবিষ্টুই সেখানে দর্শন দেন। (আশ্চর্যের ব্যাপার, হিন্দীভাষীরা ভারতবর্ষে সংখ্যায় সব চেয়ে বেশী, রাষ্ট্রভাষা নিয়ে চেচামেচিও করেন বেশি, অথচ উত্তর আমেরিকায় হিন্দী ভাষী গোষ্ঠীর কোন যৌথ সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নেই! অবশ্য বলিউড তারকাদের অনুষ্ঠানকে যদি আপনি সংস্কৃতি পদবাচ্য মনে করেন, তাহলে বলার কিছু নেই।)

মারাঠীভাষীদের সংগঠন বৃহন মহারাষ্ট্র মন্ডল এবার ওদের সম্মেলন আয়োজন করছেন ফিলাডেলফিয়ায়। তেলূগু ভাষীদের আবার কাম্মা আর রেড্ডি এই দুটি গোষ্ঠীর তীব্র কোন্দোলের কারণে দুটো আলাদা সংগঠন সম্মেলনের আয়োজন করে। একটি সংগঠন সম্মেলন করছে এবছর শিকাগোতে, আরেকটি আগামী বছর হিউস্টনে।

অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও এই সব গোষ্ঠীর কথা তুললাম, কারণ আমরা বাঙালিরা ভাবি আমরাই বুঝি একমাত্র সংস্কৃতি-অন্ত প্রাণ। উপমহাদেশের অন্যান্য ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীও যে ভাষা ও সংস্কৃতির ব্যাপারে বেশ উৎসাহী, এদের নানান বিশাল বিশাল সব অনুষ্ঠানে তার প্রমাণ মেলে।

তারপরও বঙ্গ সম্মেলন নিয়ে আমরা গর্ব করতেই পারি। এত সব শিল্পী, এত ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, তাও বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে আয়োজন করা একি চাট্টিখানি কথা? শুধু খরচের কথা চিন্তা করলেই মাথা ঘুরিয়ে যায়, তারপর এত সব হাজার হাজার লোকের থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত করা, শিল্পীদের আনা নেওয়া, অনুষ্ঠান ও মঞ্চ নিয়ন্ত্রণ সব মিলিয়ে এ এক বিশাল আয়োজন।

আজকাল বঙ্গসম্মেলনের বাজেট মিলিয়ন ডলার, প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় উত্তর আমেরিকার কোন বড় শহরের কনভেনশন সেন্টার জৌলুস আর আড়ম্বরে এই সম্মেলন যে কোন বড় মার্কিন সম্মেলনের সাথে পাল্লা দিতে পারে।

এই অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা ও স্বত্তাধিকারী নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সংগঠন Cultural Association of Bengal (বঙ্গীয় সংস্কৃতি সংসদ)। প্রতি বছর বঙ্গসম্মেলনের আয়োজন করার স্বত্ত এরা উত্তর আমেরিকার কোন বড় শহরে অবস্থিত স্থানীয় বাঙালি সংগঠনকে প্রদান করে তারপর এই অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও তার অর্থসংস্থানের দায়িত্ব স্থানীয় বাঙালি সংস্থার।

ঠিক যেমন ছোট্ট শিশু আস্তে আস্তে সুঠাম দেহী সুপুরুষ হয়ে উঠে, কয়েক দশকের মধ্যেই বঙ্গসম্মেলন হয়ে উঠেছে এক বিশাল আয়োজন। অথচ মনে হয় এই তো সেদিন স্যান ফ্রান্সিস্কো বে এরিয়াতে বঙ্গ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এখানে বঙ্গ সম্মেলন আয়োজিত হয়েছে দুবার ১৯৮৭ সালে আর ১৯৯৯ সালে। দুটো সম্মেলনের কলেবর আর আয়োজনে আকাশ পাতাল তফাতই নির্দেশ করে বঙ্গ সম্মেলন কয়েক দশকে কতখানি বেড়ি উঠেছে।

এব্যাপারে আরও জানতে চেয়েছিলাম বে এরিয়ার প্রবীণ বাঙালি সংগঠক আশীষ কুমার সেনগুপ্তের কাছে। বে এরিয়াতে প্রথম বঙ্গ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৭ সালে। সাধারণত বঙ্গ সম্মেলন ৪ জুলাই সপ্তাহান্তে অনুষ্ঠিত হলেও সেবার আমাদের ওপর বঙ্গ সম্মেলনের দায়িত্ব আসে ফেব্রুয়ারী কি মার্চ , জানালেন আশীষদা। এত দেরিতে সিদ্ধান্ত আসায় আমাদের পক্ষে আর ৪ জলাই অনুষ্ঠান আয়োজন সম্ভব ছিলনা আমরা মূল প্রতিষ্ঠান CAB কে জানিয়ে দিই, লেবার ডে এর আগে আমরা অনুষ্ঠান করতে পারব না। সেবার বঙ্গ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হল ফ্রিমন্টের মূক ও বধির বিদ্যালয়ে। সর্ব মোট লোক হয়েছিল ৩০০ জনের মত। ভারত থেকে শিল্পী এসেছিলেন পাঁচজন, তার মধ্যে ছিলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিল্পী অজয় চক্রবর্তী। জনপ্রিয় লেখক শংকর ছিলেন প্রধান অতিথি। অশোক মিত্র মূল বক্তা। স্থানীয় শিল্পীদের অনুষ্ঠানই ছিল বেশি

এরপর যখন আবার বঙ্গ সম্মেলন বে এরিয়াতে অনুষ্ঠিত হয়, তখন ১৯৯৯। তখন তার চেহারাই পাল্টে গেছে। কয়েক হাজার লোক এসেছিল সেবার, আর প্রথমবার কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয় বঙ্গ সম্মেলন। জাদুসম্রাট পি সি সরকারের পুত্র মানিক সরকারের কারিগরী সহায়তায় দুর্ধর্ষ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান, এসেছিলেন অনেক নামকরা শিল্পী। একটা ভাল ব্যবসা বিষয়ক সম্মেলনও হয়েছিল।

দু দশকেরও বেশি সময় ধরে আশীষদা বঙ্গ সম্মেলনের বিবর্তন প্রত্যক্ষ করছেন, তাই আশীষদাকে জিজ্ঞেস করলামঃ বঙ্গ সম্মেলনকে তিনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আশীষদা বললেন, বঙ্গ সম্মেলন অনেক বদলে গেছে তার ভাল দিক রয়েছে, আবার কিছু ব্যাপার রয়েছে, যেটা তত ভাল নয়।

ভালোর মধ্যে লোক সমাগম বেড়েছে প্রচন্ড। ফলে কলকাতা আর যুক্তরাষ্ট্রে আর্থিক সহায়তাও বেড়েছে। ভারতে NABC-এর সুনাম এখন যথেষ্ট, ফলে শিল্পীরা অংশ নেওয়ার ব্যাপারে বেশ আগ্রহী। ভারতের অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এখন NABCতে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে উৎসুক

কিন্তু সমস্যাও রয়েছে। খরচ বেড়েই চলেছে। তাছাড়া আমার মনে হয় আমরা মূল লক্ষ্য থেকে সরে যাচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ আগামী প্রজন্মকে বাংলা সংস্কৃতির সাথে পরিচিত করে তোলা, আমাদের কৃষ্টিকে পশ্চিমা সমাজ ও অবাঙালিদের কাছে তুলে ধরা

আশীষদা বললেন, নতুন প্রজন্মকে আরও নিবিড়ভাবে বঙ্গ সম্মেলনের সাথে জড়াতে হবে, আর স্থানীয় বাঙালি শিল্পীদের অনুষ্ঠান আরও অনেক বাড়াতে হবে। কলকাতা আর ঢাকার শিল্পীরা নিশ্চয়ই থাকবেন, তবে সংখ্যায় একটু কম।

তবে সীমাবদ্ধতা যাই থাক, বঙ্গ সম্মেলনে যারা যান, তাদের জন্য এ এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। আশীষদার জন্য তো বটেই।

আমার জন্য সব চেয়ে বড় আনন্দ এত বাঙালিকে একত্র দেখা। কত পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা হয়, যাদের কাউকে বহুদিন দেখিনি। ভারত বাংলাদেশের কতরকম জিনিষপত্র কেনার সুযোগ হয়, পুরনো প্রতিষ্ঠিত অথবা নবীন কতরকম শিল্পীর অনুষ্ঠান সরাসরি দেখবার সুযোগ হয়

সেই সাথে চ্যালেঞ্জের কথাও বলতে ভুললেন না আশীষদা। এতবড় অনুষ্ঠান আয়োজনে চ্যালেঞ্জ তো রয়েছেই। আমার মতে সব চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এত বড় একটা অনুষ্ঠান নানান স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করা। এসব স্বেচ্ছাসেবীদের চাকুরি আছে, বাড়িতে বৌ/স্বামী ছেলেমেয়ে আছে, তার ফাঁকে তারা সময় করে নেন সম্মেলনের কাজের জন্য। তাছাড়া বিচিত্র মত, স্বভাব, আর নানা ধরণের মানুষকে নিয়ে একত্রে মিলে মিশে কাজ করাও একটা চ্যালেঞ্জ বটে।

এছাড়া কলেবর বৃদ্ধির সাথে সাথে বঙ্গ সম্মেলন বড্ড ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে গেছে। লোক প্রচুর এলেও নিবন্ধনের অর্থ থেকে খরচ ওঠে না, প্রচুর টাকা তুলতে হয়, সেও এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ

সেসব চ্যালেঞ্জে দমে যায়নি বে এরিয়ার বাঙালি সংস্থা প্রবাসী। এক খরচের ঝুঁকি, এত উদয়াস্ত পরিশ্রম, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো, এই সব কিছুর উৎস কিন্তু বাংলা, বাঙালি, বাংলা সংস্কৃতির প্রতি নিঃস্বার্থ ভালবাসা।

সে কথাটা ভুললে চলবে না, আশীষদা বললেন।

এই বার যারা আসছেন এবং ভবিষ্যত বঙ্গ সম্মেলনে যারা অংশগ্রহণ করবেন, তাঁদের কাছে আমার একটাই অনুরোধ: আপনারা অনুগ্রহ করে একটা কথা মনে রাখবেন প্রতি বছর যারা বঙ্গ সম্মেলন আয়োজন করেন, তারা সবাই স্বেচ্ছাসেবী, বিনা পারিশ্রমিকে আমরা খেটে যাই, কোন পুরস্কারের আশা করি না। শুধু বঙ্গ সম্মেলনকে ভালবাসি বলেই আমাদের এত পরিশ্রম। আমরা রক্ত-মাংসের মানুষ, আমাদের ভুল ক্রুটি হতেই পারে। কিন্তু সে ভুল ইচ্ছাকৃত নয়, তাই কিছু মনে করবেন না। সব দিক বিবেচনা করলে এসব স্বেচ্ছাসেবীদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ

বঙ্গ সম্মেলনের ওয়েব সাইট: www.nabc2009.com

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.